২০২৪ সালেও রেমিট্যান্সে উন্নতির সম্ভাবনা দেখছে না বিশ্বব্যাংক

চাপের মধ্যে রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। ডলার সংকটে দায় মেটাতে গিয়ে টান পড়ছে রিজার্ভে। বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সামনের বছরেও পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হবে না বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। বরং ২০২৪ সালে দেশে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে বলে সংস্থাটির পূর্বাভাসে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) দেশে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৮ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এর আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ২৮৮ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। এ সময়ের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে ১৯৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যেখানে আগের বছরের প্রথম মাসে এসেছিল ১৭০ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। একইভাবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৫৬ কোটি ৫ লাখ, মার্চে ২০২ কোটি ২৫ লাখ, এপ্রিলে ১৬৮ কোটি ৪৯ লাখ, মে মাসে ১৬৯ কোটি ১৭ লাখ, জুনে ২১৯ কোটি ৯১ লাখ ও জুলাইয়ে ১৯৭ কোটি ৩২ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। অন্যদিকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৪৯ কোটি ৪৫ লাখ, মার্চে ১৮৫ কোটি ৯৭ লাখ, এপ্রিলে ২০১ কোটি ৮ লাখ, মে মাসে ১৮৮ কোটি ৫৩ লাখ, জুনে ১৮৩ কোটি ৭৩ লাখ ও জুলাইয়ে ২০৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে।

২০২৩ সালের প্রথম সাত মাসে গড়ে ১৮৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। সে হিসাবে এ বছর রেমিট্যান্স আসার কথা ২ হাজার ২৪৪ কোটি ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, চলতি মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত ১৩২ কোটি ৩১ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে।

দেশে বিনিময় হারে পার্থক্যের কারণে বেশি টাকা পাওয়ার আশায় প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি অবৈধ এ পথে দেশে অর্থ পাঠালে সরকারের প্রণোদনার চেয়েও বেশি লাভ মেলে। এক্ষেত্রে বিনিময় হারকে একীভূত ও বাস্তবসম্মত করতে না পারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের জানুয়ারি শেষে দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮৬ টাকা। এ বছরের জুলাই শেষে এ হার দাঁড়িয়েছে ১০৯ থেকে ১১০ টাকায়। সর্বশেষ গতকালও আন্তঃব্যাংক ডলারের সর্বোচ্চ দর ছিল ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘‌মুদ্রার বিনিময় হার এখনো ঠিক হয়নি। সম্প্রতি কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বেশি দরে লেনদেন হয়েছে। ফলে বেশি ব্যবধান থাকার কারণে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে না এসে হুন্ডির মাধ্যমে হয়তো অর্থ আসছে। সরকার আইএমএফের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরও বিনিময় হারকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করল না। এর সঙ্গে সঙ্গে সুদের হারকেও সমন্বয় করল না। এতে রাজস্ব খাতে বিশেষ করে ব্যালান্স অব পেমেন্টে সমস্যা থেকেই যাবে।’ 

এ মুহূর্তে নীতি সমন্বয়ের ঘাটতিই সবচেয়ে বড় বিষয় উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেবে এ শঙ্কার কারণে বিনিময় হার সমন্বয় করার ক্ষেত্রে দ্বিধা রয়েছে। ইতিহাস বলে এ ধরনের দ্বিধার ক্ষেত্রে যেটা হয় যে একসময় গিয়ে আপনাকে মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন করতে হয়। সেটার ফল আরো খারাপ হয়। নিয়ম হচ্ছে ধীরে ধীরে সমন্বয় করা। বড় ধরনের ধাক্কা সহ্য করার মতো যেসব বিষয় থাকে যেমন আর্থিক, ব্যাংকিং, বিদেশী বিনিয়োগ ও বিদেশী ঋণের মতো সূচকগুলো দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। মূলত এ মুহূর্তে দেশে সামষ্টিক অর্থনীতির কোনো সমন্বয় নেই।’

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছর বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পরিমাণ দাঁড়াবে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে। আর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় হবে ২ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার এবং প্রবৃদ্ধি হবে ৩ শতাংশ। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিময় হারের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই আনুষ্ঠানিক থেকে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স চলে যাচ্ছে।

দেশ থেকে বিদেশে যাওয়া জনশক্তির সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সে হারে দেশে রেমিট্যান্স বাড়ছে না। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশ থেকে ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩১ কর্মী বিদেশে গেছেন। এর আগের অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে যা ছিল ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৯১০ জন। অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ১৬১ কোটি ৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এর আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‌পরিসংখ্যান বলছে বিদেশে জনশক্তি রফতানির সংখ্যা বেড়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ করে জনশক্তি বিদেশে যাচ্ছে। তারা যেসব বাজারে গেছে সেগুলো হচ্ছে মূলত সৌদি আরব, ওমান, মালয়েশিয়া, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। মালয়েশিয়া বাদে বাকি দেশগুলোতে সাম্প্রতিক কালে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে দুর্যোগ এসেছে তার প্রভাব সেভাবে পড়েনি। এসব দেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও আয় কমে গেছে এমন নয়। আর সেখানে অন্যান্য দেশের তুলনায় মূল্যস্ফীতিও কম বেড়েছে। ফলে সেখান থেকে তো রেমিট্যান্স বেশি আসার কথা।’ 

তিনি বলেন, ‘রেমিট্যান্স কম আসার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে যারা বিদেশে যাচ্ছে ভিসা বাণিজ্যের কারণে তাদের বিদেশী মুদ্রায় একটি ব্যয় রয়েছে। এক হিসাবে দেখা গেছে এটি কম করে হলেও ১ হাজার ৫০০ ডলার। ফলে যে রেমিট্যান্স আনুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে আসত সেটি অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে গত বছর যারা বিদেশে গিয়েছে তাদের পাঠানো আয়ের কারণে এ বছর তো অন্তত রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রভাব দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটি দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে আমাদের মুদ্রাবাজারের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের দরে পার্থক্য। বিশ্বব্যাংকের গত এপ্রিলের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারে মুদ্রার দরে যদি ১ শতাংশ বেড়ে যায় তাহলে রেমিট্যান্স আনুষ্ঠানিক চ্যানেল থেকে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে যায়।’

দেশে বাণিজ্য ঘাটতি কমলেও সার্বিকভাবে ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি বেড়ে গেছে উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘তার মানে ডলারের সরবরাহ বাড়েনি কিংবা সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান কমেনি। তার পরও আনুষ্ঠানিক বাজারে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ডলারের দর বাড়েনি। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসা বন্ধ না হলেও সেটি আসছে হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে। তাই অনানুষ্ঠানিক বাজারের তুলনায় আনুষ্ঠানিক বাজারে ডলারের দামের পার্থক্য যদি ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা যায় তাহলে রেমিট্যান্স বাড়বে এবং ডলারের সরবরাহও বাড়বে বলে আশা করা যায়।’

সূত্র: বণিক বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *