ডলার সংকটের সমাধান খুঁজতে হবে সৃজনশীল উপায়ে

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর:

বৈদেশিক মুদ্রার দুটি বিষয় নিয়ে এখন আমাদের উদ্বেগ। একটি সরবরাহে ঘাটতি, আরেকটি হলো দর বৃদ্ধি। ২০২২ সালের ৩০ জুন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল। এখন কমে ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) মে-জুন সময়ের জন্য ১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের পর এটা আরও কমবে। এর মানে, রিজার্ভ কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

এখন আলোচনার বিষয় হলো, সরবরাহ কেন কমলো। এর তিনটি কারণ ছিল। প্রথম কারণ, ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানিতে অনেক বড় উল্লম্ফন ঘটেছিল। ওই অর্থবছরে প্রায় ৩৬ শতাংশ আমদানি বেড়েছিল। কীভাবে এত আমদানি হলো, তার হিসাব মেলানো যায় না। কেননা, চট্টগ্রাম বন্দরে ওই অর্থবছরের পণ্য খালাসের তথ্যের সঙ্গে আমদানির পরিমাণ মেলে না। আবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ডাটার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের মিল নেই।

আরেকটি বিষয় হলো, সারাবিশ্বের মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ধরলেও আমদানিতে এত উল্লম্ফন হওয়ার কারণ নেই। এর মানে, ওই সময় বাংলাদেশ থেকে বড় অংকের ডলার বাইরে চলে গেছে। এর সঙ্গে পুঁজি পাচারের একটা সম্পর্ক রয়েছে বলে অনেকে বলে আসছেন। তবে এ অভিযোগের এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত হয়নি। সরবরাহে ঘাটতির দ্বিতীয় কারণ ব্যাপক পরিমাণ বিদেশি ঋণ। ১৯৭১ থেকে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত বেসরকারি খাতে যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ এসেছে; এর পরের ৭ বছরে ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে। বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এই ঋণ শোধ করতে গিয়ে এখন সরবরাহে ঘাটতি হচ্ছে। তৃতীয়ত, বৈধ উপায়ে যে পরিমাণ প্রবাসী আয় দেশে আসার কথা, এসেছে তার অনেক কম। আবার রপ্তানি আয়ও আগের মতো বাড়েনি। অতীতে ১৫ শতাংশের মতো রপ্তানি আয়ও বাড়ছিল। এবার তার অনেক কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি করেছে।

এখন দর কেন বাড়ল? প্রথমত, সরবরাহ ঘাটতিজনিত কারণে দর বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, হুন্ডির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দর বেড়েছে। আরেকটি বিষয় ঘটেছে, যা নিয়ে আমরা কেউ আলোচনা করছি না। যখন এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়; কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় মিলে সৃজনশীল উপায়ে সমাধান খুঁজতে হয়। প্রচলিত উপায়ে এ রকম সমস্যার সমাধান করা যায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৫৬-৫৭ সালে যখন পাউন্ডের দরপতন হচ্ছিল তখন অফশোর কায়দায় সমাধান বের করা হয়। পাউন্ড দিয়ে লেনদেন না করে অন্য মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। এটা ভালো না খারাপ, তা বলছি না। তবে প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে বিকল্প উপায় বের করা হয়েছে। এভাবে ক্রিয়েটিভ উপায়ে পরিস্থিতি দেশের অনুকূলে রাখতে হবে। আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক কারেন্সি সংকটের সময় মালয়েশিয়ায় প্রতিদিন ডাক্তারের মতো দেখা হচ্ছিল কত ডলার ঢুকছে, আর কত বের হচ্ছে। এটা হলো ফরেন্সিক উপায়। তার মানে ক্রিয়েটিভ এবং ফরেন্সিক দুটি উপায়েই সমাধান খুঁজতে হবে।

আমাদের এখানে দুটি বড় অভিযোগ– পুঁজি পাচার এবং হুন্ডি। এটাকে ক্রিয়েটিভ বা ফরেন্সিক কোনোভাবেই মোকাবিলা করা হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করা হয়েছে। সরবরাহে যেসব কারণে ঘাটতি হচ্ছে, তার একটিও সমাধান করা হয়নি। অথচ নীতি প্রণয়নকারীদের জন্য পরীক্ষা হচ্ছে কীভাবে ফরেন্সিক, বিশ্লেষণধর্মী এবং ক্রিয়েটিভ উপায়ে সমস্যার সমাধান করা হবে; অপ্রচলিত উপায়ে কীভাবে সেটার সমাধান হবে। তবে আমাদের এখানে পরিস্থিতির আলোকে সে রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। অথচ প্রতিটি সমস্যা সমাধানযোগ্য। এ ছাড়া অভিযোগগুলোর তদন্ত না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। দায়মুক্তির সংস্কৃতি সব সময় রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে যুক্ত।

লেখক : অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারপারসন, উন্নয়ন অন্বেষণ

(লেখাটি দৈনিক সমকালের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *