আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণপ্রাপ্তির শর্ত অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ করতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ঋণদাতা সংস্থাটির শর্ত অনুযায়ী অর্জিত হয়নি সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যও। আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গতকাল পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দুটি ব্যর্থতার কথা জানানো হয়েছে। 

ডলার সংকট কাটাতে আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণসহায়তা নিচ্ছে সরকার। এ ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থছাড়ের আগে সংস্থাটির একটি রিভিউ মিশন বাংলাদেশ সফরে এসেছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে প্রতিনিধি দলটি তাদের কর্মসূচি শুরু করেছে। সকাল ৯টায় বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ডেপুটি গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আইএমএফের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন সংস্থাটির এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে যায়। সেখানে অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়।

জানা গেছে, উভয় বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইএমএফের ঋণপ্রাপ্তির শর্ত পূরণের অগ্রগতি, সফলতা ও ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরা হয়। আইএমএফের পক্ষ থেকে ঋণ দেয়ার অন্যতম শর্ত ছিল জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ থাকতে হবে ২৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। যদিও বছরের এ ষষ্ঠ মাস শেষে দেশের নিট রিজার্ভ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলারেরও কম। বর্তমানে আরো প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার কমেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। আইএমএফ প্রতিনিধি দলের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে রিজার্ভ সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণগুলো তুলে ধরা হয়। 

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আইএমএফ ঋণ অনুমোদনের সময় আমাদের কিছু শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে বেশকিছু শর্ত পূরণ করা হয়েছে। তবে দুটি শর্ত পূরণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। শর্ত অনুযায়ী যে পরিমাণ রিজার্ভ থাকার কথা ছিল, সেটি রাখা যায়নি। সরকারের রাজস্ব আহরণও কম হয়েছে। তবে অনেক কিছু বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন প্রকাশের কথা ছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটি প্রকাশ করেছে। বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ হিসাবায়ন করা হচ্ছে। ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ঋণের সুদহারের নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। তাদের দেয়া যেসব শর্ত অর্জন হয়েছে, সেগুলো আমরা জানিয়েছি। আর যেগুলো অর্জন হয়নি তা কেন হয়নি সেটিও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’ 

শর্ত পূরণে ব্যর্থতা নিয়ে আইএমএফের পক্ষ থেকে কী বলা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুখপাত্র বলেন, ‘কেবল বৈঠক শুরু হয়েছে। আইএমএফ প্রতিনিধি দল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে বসে আলোচনা করবে। প্রথমে তথ্য নিচ্ছে তারপর আবার বৈঠক করবে। ১৯ অক্টোবর শেষ বৈঠক। সেখানেই তাদের মতামত জানাবে। আমরাও আমাদের বিষয়গুলো জানাব।’ 

বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাবটি চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের সভায় অনুমোদন পায়। সাত কিস্তিতে ৪২ মাসে এ ঋণ পাবে বাংলাদেশ, গড় সুদহার ২ দশমিক ২ শতাংশ। ৪৭০ কোটি ডলারের মধ্যে দুই ধরনের ঋণ রয়েছে। বর্ধিত ঋণসহায়তা বা বর্ধিত তহবিল (ইসিএফ অ্যান্ড ইএফএফ) থেকে পাওয়া যাবে ৩৩০ কোটি ডলার। রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় মিলবে ১৪০ কোটি ডলার। গত ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটির কাছ থেকে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার বুঝে পেয়েছে বাংলাদেশ। 

২০২৬ সাল পর্যন্ত এ ঋণ কর্মসূচি চলাকালীন বাংলাদেশ সরকারকে বিভিন্ন শর্ত পরিপালন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের পর এক বিবৃতিতে আইএমএফ জানিয়েছিল, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক ব্যয়ে সক্ষমতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা, নীতি কাঠামো আধুনিক করে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার কাজে এ ঋণ সাহায্য করবে।

রাহুল আনন্দের নেতৃত্বাধীন আইএমএফ প্রতিনিধি দলটি ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবে। মিশন চলাকালে তারা বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। রিভিউ মিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইএমএফের পর্ষদ সভার অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী নভেম্বর ছাড় হতে পারে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *