ভারতের সঙ্গে রুপিতে লেনদেন, ডলারের ওপর চাপ কমার আশা

ভারতীয় মুদ্রা রুপি বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার। এর ফলে রপ্তানি আয় বাবদ যে পরিমাণ রুপি আসবে, সমপরিমাণ আমদানি দায় নিষ্পত্তি করতে পারবে ব্যাংক। আবার স্বল্পমেয়াদি রুপির ঋণ নিয়ে আমদানি করা যাবে। এতে ডলারের ওপর সৃষ্ট চাপ সাময়িকভাবে কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকাররা জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলারের মতো বাণিজ্য হয়। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য নিষ্পত্তিতে আগের মতোই ডলারই হবে প্রধান মুদ্রা। এর সঙ্গে রুপিতেও লেনদেনের একটি ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের সোনালী, ইস্টার্ন ও ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে রুপিতে লেনদেন করতে পারবেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। ভারত অংশে এ সম্পর্কিত বিষয়ের দায়িত্বে থাকবে দেশটির আইসিআইসি ব্যাংক এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। রুপিতে লেনদেনের চাহিদা বাড়লে পর্যায়ক্রমে অন্য ব্যাংককেও অনুমতি দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ভারতীয় হাইকমিশনের যৌথ আয়োজনে আগামীকাল ঢাকার লা মেরিডিয়ান হোটেলে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, ডেপুটি গভর্নর, বিভিন্ন ব্যাংকের এমডি, ভারতীয় হাইকমিশমনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য রয়েছে এমন ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আমদানির বড় অংশ হয় চীন ও ভারত থেকে। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত মোট আমদানির ১৯ শতাংশের বেশি এসেছে ভারত থেকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৬৯ কোটি ডলার বা মোট আমদানির ১৮ দশমিক ১০ শতাংশ। গত মার্চ পর্যন্ত চীন থেকে এসেছে মোট আমদানির ২৬ শতাংশের বেশি। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, ডলার সংকটের এ সময় রুপিতে বাণিজ্যের এ ব্যবস্থা হয়তো সাময়িক স্বস্তি দেবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দায় যদি অনেক বেড়ে যায়, আবার রুপি যদি টাকার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়– তখন বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের চাপে পড়বে। অবশ্য এ ব্যবস্থার ফলে ভারতে রপ্তানি বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে।

ব্যাংকাররা জানান, ডলারের ঋণ এখন অনেক ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। তাই  ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বিদেশি ঋণে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আবার কিছু ব্যাংকের ক্রেডিট লাইন কমাসহ বিভিন্ন কারণে কেউ কেউ চাইলেও আগের মতো আর ঋণ পাচ্ছেন না। এসব কারণে গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার কমে ২৪ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত বছরের জুনের তুলনায় যা ৩৭৭ কোটি ডলার কম। এতে বাণিজ্য ঘাটতি এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি অনেক কমলেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমে এখন ২৯ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারের নেমেছে। দেশের ইতিহাসে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল ২০২১ সালের আগস্টে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নিয়োজিত যে কোনো ব্যাংক শাখা থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহিবল (আইএমএফ) স্বীকৃত পাঁচটি মুদ্রা এবং কানাডিয়ান ডলারে এলসি খুলতে পারে। এ জন্য আলাদা করে কোনো ব্যাংকের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আইএমএফ স্বীকৃত পাঁচটি মুদ্রা হলো– ইউএস ডলার, ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড, জাপানি ইয়েন ও চায়নিজ রেনমিনবি। ২০১৬ সাল থেকে চীনের মুদ্রা আইএমএফ স্বীকৃত হলেও গত বছরের সেপ্টেম্বরে এলসি খোলার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ২০১৮ সাল থেকে ইউয়ানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি রয়েছে। তবে ডলারের বাইরে ইউয়ানসহ অন্য মুদ্রায় লেনদেনে এখনও তেমন আগ্রহ তৈরি হয়নি।

আঞ্চলিক বাণিজ্যে ডলারের প্রভাব কমাতে বেশ আগে থেকে চেষ্টা করে আসছে বড় দেশগুলো। বিশেষ করে ভারত, চীন ও রাশিয়া নিজেদের মুদ্রা লেনদেনের জন্য অনেক দিন ধরে আলোচনা করছে। করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডলারের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। এর পর নতুন করে নিজ দেশের মুদ্রার প্রচলনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। যদিও ডলারের বাইরে অন্য মুদ্রায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অনেক সতর্ক।

সৌজন্যে: দৈনিক সমকাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *