দেশে হুন্ডি-হাওলার বাজার ৩০-৩৫ বিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক অপরাধমূলক কার্যক্রম। পণ্য বাণিজ্য, রেমিট্যান্স, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচার, স্বর্ণ-মাদকসহ অন্যান্য দ্রব্য চোরাচালান ও মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কার্যক্রমে হুন্ডি-হাওলার ব্যবহার বৃহৎ রূপ ধারণ করেছে। অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে হিসাব করে দেখা গেছে, দেশে হুন্ডি-হাওলার বাজার এখন ৩০-৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আরো গভীর ও গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধান চালালে দেখা যাবে দেশে হুন্ডি-হাওলার বাজার আকৃতি হয়তো এর চেয়েও অনেক বড়। 

হিসাব অনুযায়ী, দেশে আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যে হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে লেনদেনকৃত অর্থের পরিমাণ কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স হিসেবে আসছে আরো ১০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া দুর্নীতি ও কালোবাজারির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ পাচার, স্বর্ণ ও অন্যান্য পণ্য চোরাচালান, মানব পাচারের মতো কার্যক্রমে হুন্ডি-হাওলার অবদান ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার।  

বাংলাদেশ সরকার ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর প্রিভেন্টিং মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কমব্যাটিং ফাইন্যান্সিং অব টেরোরিজম ২০১৯-২১’ শীর্ষক একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছে। কৌশলপত্রে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশের কথা উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত (বিশেষ করে দুবাই), মালয়েশিয়া, কেইমান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস। এসব গন্তব্যে অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো হুন্ডি-হাওলা।

অভিযোগ রয়েছে, পণ্য বাণিজ্যে কর ফাঁকি দেয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ হুন্ডি বা হাওলার দ্বারস্থ হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তাদের অনেকেই আন্ডার ইনভয়েসিং (আমদানি মূল্য প্রকৃতের চেয়ে কম দেখানো) করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে পণ্যমূল্যের অপ্রদর্শিত অংশটুকু পরিশোধ করা হয় হুন্ডি বা হাওলার মাধ্যমে। বিষয়টিকে এখন দেখা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য তথ্যে গরমিলের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে। চীন ও বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যানে ২০২১ সালে বাণিজ্যের আকারের গরমিল ছিল ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন (৫৬৮ কোটি) ডলারের বেশি। এ গরমিলের পরিমাণ গত বছর আরো বেড়ে ৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন (৭৫২ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যায়। চীনের পর ভারতের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২১-২২ অর্থবছরের তথ্যে গরমিল রয়েছে ৩ দশমিক ১৯ (৩১৯ কোটি) বিলিয়ন ডলারের। প্রধান বাণিজ্য গন্তব্যস্থল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য পরিসংখ্যানে গরমিল রয়েছে ২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন (২৯৩ কোটি) ডলারের। অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধানের তথ্য বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাবে, দেশে পণ্য বাণিজ্যের আড়ালে হুন্ডি-হাওলায় লেনদেন হচ্ছে কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলারের। 

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‌একটি সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছিল প্রতি বছর ২০-২১ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে চলে যায়। সে প্রেক্ষাপটে বললে হুন্ডি-হাওলার বাজার ৩০-৩৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। তবে এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। শুধু বাণিজ্যের মাধ্যমে নয়, অন্যান্য পন্থায়ও দেশ থেকে অর্থ যায়। আবার বলা হয় বাংলাদেশে ৩০-৪০ শতাংশ রেমিট্যান্স হুন্ডির মাধ্যমে হয়। হুন্ডির চাহিদা আছে বলেই রেমিট্যান্সে হুন্ডি হয়। আমাদের দেশে রেমিট্যান্সে বিনিময় হারের যে হেরফের হচ্ছে, তা হুন্ডির জন্য হচ্ছে। বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীল রাখতে না পারার বড় কারণ হুন্ডি-হাওলা। আজকে যদি প্রতি মাসে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত পাওয়া যেত সমস্যা এত প্রকট হতো না। হুন্ডি-হাওলার বাজার যত ডলারেরই হোক, তা সামষ্টিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এ সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

বিশ্বের সব স্থানেই হুন্ডি বা হাওলাকে দেখা হয় অননুমোদিত ও আইনি কাঠামোর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হিসেবে। এক্ষেত্রে প্রেরক কোথাও অর্থ পাঠানোর জন্য ব্যাংক বা প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডি বা হাওলা এজেন্টের (দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো স্থানে হাওলাদার নামে পরিচিত) সহায়তা নিয়ে থাকেন। এজন্য ওই এজেন্টকে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ ও নির্দিষ্ট হারে ফি বা কমিশন পরিশোধ করা হয়। গন্তব্যস্থলে এজেন্টের কোনো সহযোগী বা অংশীদার এজেন্ট ওই অর্থ প্রাপককে পরিশোধ করে থাকে। এরপর প্রেরক প্রাপককে এবং এজেন্ট তার সহযোগীকে লেনদেনের বিশদ তথ্য অবহিত করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রেরক ও এজেন্ট আলোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি কোড বা পাসওয়ার্ড ঠিক করে নেয়। লেনদেনের পরে এজেন্ট ও তার সহযোগী নিজেদের মধ্যে দেনা-পাওনা পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করে থাকে। অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায় হওয়ায় এ হাওলা ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারির সুযোগ থাকে কম। লেনদেন চিহ্নিত করার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রেরক বা প্রাপককে চিহ্নিত করা যায় না। 

বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও গত অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ না বাড়ার পেছনে এখন হুন্ডি-হাওলাকেই সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন নীতিনির্ধারক ও ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা। খোদ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বছর অভিযোগ তুলেছেন, দেশে আগত রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই (৪৯ শতাংশ) আসছে হুন্ডির মাধ্যমে। ব্যাংকিং বা বৈধ চ্যানেলে আসে ৫১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ২১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন (২ হাজার ১২৮ কোটি) ডলার।

অর্থমন্ত্রীর অভিযোগ অনুযায়ী ব্যাংকিং চ্যানেল ও হুন্ডির মাধ্যমে আগত রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রায় সমান হওয়ার কথা। তবে অতিরক্ষণশীলভাবে হিসাব করতে গিয়ে হুন্ডিতে আগত রেমিট্যান্সকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আগত অংকের অর্ধেকও যদি ধরে নেয়া হয়, তাহলেও হুন্ডির মাধ্যমে আগত রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ বিলিয়ন (দেড় হাজার কোটি) ডলারের বেশিতে। 

দেশের ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ হুন্ডিকে দেখছেন সামষ্টিক অর্থনীতির বড় হুমকি হিসেবে। এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘‌হুন্ডি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। আবার বাইরে থেকে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে হুন্ডির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপত্র করা কঠিন হয়ে গেছে। এ সুযোগে হুন্ডিটা আরো বেড়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে হয়তো দেখা গেছে ১ লাখ ডলারের এলসি হওয়ার কথা ছিল, সেটা হয়তো হয়েছে ৩০ হাজার ডলারের। বাকিটা হুন্ডিতে গেছে। ডলার সংকটের কারণে এটা আরো বেড়েছে। আমাদের রেমিট্যান্স আসলে আড়াই থেকে ৩ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে, কিন্তু হুন্ডিতে বিক্রি করলে এর চেয়ে বেশি রেট পাওয়া যাচ্ছে। এভাবে অসম প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। আবার হুন্ডিতে অর্থ পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজে কোনো ঝামেলা ছাড়াই। এজন্য প্রণোদনা বাড়াতে হবে। আমাদের রেমিট্যান্সের উৎস দেশগুলো যেমন দুবাই, সিঙ্গাপুর, নিউইয়র্ক, লন্ডন, জেদ্দা এ জায়গাগুলোয় নজর দিতে হবে।’

গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের প্রপার্টি ক্রয়সহ নানা বিনিয়োগের তথ্য সামনে এসেছে। দুবাই, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্যসহ অনেক স্থানেই অভিজাত এলাকায় বাংলাদেশী ধনীদের গৃহসম্পত্তি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। আবার অনেকে বিদেশে ব্যবসায়ে বিনিয়োগের তথ্যও সামনে এসেছে। কিন্তু বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে এসব বিনিয়োগের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ থেকে হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পুঁজি স্থানান্তরের সন্দেহ করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

আরও পড়ুন: কেন চট্টগ্রামে হুন্ডি ও খেলাপি ঋণের পরিমান সবচেয়ে বেশি?

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘‌হুন্ডি বা হাওলার পরিমাণ যদি আমাদের রিজার্ভের আকারের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়, তাহলে করণীয়ও অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। সুশাসনের উন্নতি না হলে দুর্নীতি বাড়ে। আর দুর্নীতিগ্রস্ত পরিস্থিতির যদি উন্নতি না হয়, রাজনৈতিক জবাবদিহিতা যদি না থাকে, তাহলে টাকা কীভাবে থাকবে? যারা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ সম্পদ অর্জন করেছে তারা দেখে টাকাটা কোথায় নিরাপদ। এমন বহু কারণে টাকা চলে যাচ্ছে। এটাকে ঠেকানো অনেক কঠিন।’

আন্তর্জাতিক স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালান এবং মানব পাচারের বড় রুট এখন বাংলাদেশ। চিহ্নিত করার সুযোগ না থাকায় এ ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অবৈধ কার্যক্রমে লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে হুন্ডি-হাওলার ব্যবহার করে থাকে সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বর্ণ ও মাদক এবং অন্যান্য পণ্যদ্রব্য চোরাচালান এবং মানব পাচারের ব্যবহৃত হুন্ডি-হাওলার পরিমাণ অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। 

দেশে স্বর্ণ চোরাচালান সবচেয়ে বেশি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে যশোর অঞ্চল দিয়ে। গত তিন-চার বছরে এখান দিয়ে স্বর্ণ পাচারের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। এজন্য লেনদেন হচ্ছে প্রধানত হুন্ডিতে। শুধু স্বর্ণ চোরাচালানকারী নয়, ব্যবসায়ীরাও হুন্ডির মাধ্যমে টাকা ভারতে পাঠাচ্ছেন।  

বাংলাদেশ জুয়েলারি ব্যবসায়ী সমিতি যশোরের সভাপতি রকিবুল ইসলাম চৌধুরী সঞ্জয় জানান, ‘‌স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত মূল হোতারা আটক হয় না। তাদের চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ তারা হুন্ডিতে টাকার বিনিময়ে লোক দিয়ে এ কাজ করে থাকে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোরের একাধিক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ও ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা ভারতে পাচার হচ্ছে অনেক আগে থেকে। ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ টাকার এলসি করেন তার ১০ গুণ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাঠান। সে টাকা ব্যবহার হয় স্বর্ণ চোরাচালানে। 

এ বিষয়ে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলাল হুসাইন বলেন, ‘‌হুন্ডিতে অর্থ পাচার রোধে আমাদের সদস্যরা কাজ করছেন।’ 

ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) প্রতিবেদন অনুসারে, মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। বর্তমানে দেশে মাদক পাচারের বড় একটি কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয় কক্সবাজার জেলাকে। মাদক পাচারের পাশাপাশি এখানে এখন হুন্ডি ব্যবসার ব্যাপ্তিও দিনে দিনে বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। 

তারা বলছেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের হাত ধরে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে। বিশেষ করে কক্সবাজার জেলার সদর, টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে হুন্ডির রমরমা বেশি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো হয়ে উঠেছে হুন্ডি কারবারিদের ট্রানজিট রুট। এখানে এখন হুন্ডি কারবারি চক্রের একাধিক সিন্ডিকেটের নাম শুনতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে কোনো কোনো সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক দেশের অভ্যন্তরে ঢাকা-চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত বলে জানা গেছে। আগ্নেয়াস্ত্র, মাদকদ্রব্য, স্বর্ণ চোরাচালান ও নারী শিশু পাচারকারী চোরাকারবারিদের সঙ্গে এসব সিন্ডিকেটের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। আবার মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানব পাচার ও সমুদ্রপথে অবৈধভাবে লোক পাঠানোর সঙ্গেও হুন্ডি সিন্ডিকেটের বড় ধরনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়। 

স্থানীয়রা বলছেন, হুন্ডির ওপর ভর করেই টিকে আছে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের কারবার। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানিয়েছে, ১৫-২০ জনের একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, দুবাই, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের হুন্ডি কারবারিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শীর্ষস্থানীয় ইয়াবা কারবারিদের অনেকেই এ হুন্ডি সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘নির্দিষ্ট একটি ফর্মুলায় হিসাব করে দেখেছি ২০১৬ থেকে ২০২২ সময়কালে অর্থনীতির অন্তত ৭০ থেকে ১৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের খোঁজ নেই। খুব রক্ষণশীল হিসাবও যদি করি তাহলে দেখা যাচ্ছে ১৮ বছরে দেশ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ পাচার হয়ে গেছে। হিসাবে পরিমাণ যাই আসুক, দেখা যাচ্ছে একটা বড় অংক প্রতি বছরই বিভিন্ন পথে নিরাপত্তার খোঁজে চলে যাচ্ছে। এতে হুমকি তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের কিন্তু এরই মধ্যে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। এই পুঁজিগুলো যদি দেশে বিনিয়োগ হতো তাহলে আমাদের প্রবৃদ্ধি তো অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ যোগ হতো। এগুলো বন্ধ করতে হলে পথ একটা প্রিভেনটিভ আরেকটা কিউরেটিভ। প্রিভেনটিভটাই বেস্ট। অর্থাৎ অসুখ না হওয়াটা ভালো।’

দুদকের প্যানেলভুক্ত আইনজীবী খুরশীদ আলম বলেন, ‘‌আমরা সতর্ক আছি। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের একটা প্রসিকিউশন করতে সময় লাগে। হুন্ডি পাচার নিয়ে সিআইডি খুবই ভালো কাজ করছে। আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যের আড়ালে যে লন্ডারিংটা হচ্ছে এগুলোর বিরুদ্ধে বিএফআইউ খুব শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দুদকও খুব ভালো করছে।এগুলো আমরা আইনগতভাবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা করছি। এখন পর্যন্ত দুদকের কোনো মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় আসামিরা খালাস পায়নি। ডেসটিনির সবার শাস্তি হলো। হুন্ডি ও মানি লন্ডারিংয়ের ব্যাপ্তিটা বেড়ে গেছে। এজন্য সরকার মানি লন্ডারিং আইনটি সংশোধনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। সংশোধন হলে এর ব্যাপ্তি ও দুদকের ক্ষমতা আরো বাড়বে।’ 

দেশের হুন্ডির বাজার আকৃতি নিয়ে বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ রয়েছে বলে জানালেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘‌দেশের হুন্ডি বাজার নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা নেই। এটি নিয়ে বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ রয়েছে। গবেষণা থাকলে আমরা হুন্ডিসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার সম্পর্কে ধারণা পেতাম। বিএফআইইউ এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে হুন্ডি প্রতিরোধে বেশ কিছু কাজ করেছে। প্রতিদিন দুই শতাধিক এজেন্টের লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিস্ট্রিবিউটরদের অনেকের বিরুদ্ধে বড় অংকের হুন্ডি তৎপরতা চালানোর প্রমাণ পেয়েছি। এদের মাধ্যমে রেমিট্যান্সের অর্থ হুন্ডি হচ্ছে। এজন্য বেশ কিছু মামলাও হয়েছে।’ 

বিএফআইইউ নিজের সক্ষমতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে কাজ করছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘‌মানব পাচার, বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাজার, স্বর্ণ পাচারসহ এ-সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো কাজ করছে। তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনুরোধ এলে সে বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিই।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) পর্যবেক্ষণ অনুসারে, বাংলাদেশের মোট বৈধ বাণিজ্যের মধ্যেও ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ মিসইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি ও রফতানি মিলিয়ে মোট বাণিজ্য হয়েছে ১২ হাজার ১৮৩ কোটি ডলার। সে অনুযায়ী সাড়ে ১৭ শতাংশ হিসাব করলেও বাণিজ্যের আড়ালে পাচারের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ১৩২ (২১ বিলিয়নের বেশি) কোটি ডলার। 

সৌজন্যে: বণিক বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *