রোববার (২৮শে মে) বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে বিবরণী তৈরি করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা; ২০২২ সালের একই সময়ের চেয়ে তা ১৬ শতাংশ বা ১৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা বেশি।
খেলাপি ঋণকে ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এই সমস্যা সমাধান তো হচ্ছেই না, উল্টো খেলাপি ঋণের অতল গহ্বরে আরও হারিয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত।
গত বছরের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বরের চেয়ে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক শেষে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ শতাংশ বা ১০ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা।
হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে বিতরণ করা ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা; খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০২২ সালের মার্চ শেষে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
কেন খেলাপি ঋণ বাড়ল, এ প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক সারোয়ার হোসেন জানান, গত ডিসেম্বরে খেলাপির যে তথ্য ব্যাংকগুলো জমা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনের পর আরও কিছু নতুন খেলাপি পাওয়া গেছে।
এছাড়া পুরনো খেলাপি ঋণের বিপরীতে সুদ যোগ হওয়ায় তা এমনিতেই কিছুটা বেড়ে থাকে বলে যোগ করেন তিনি।
দীর্ঘদিন থেকে ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত বিপুল এ খেলাপি ঋণ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার ছাড়া কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের একার পক্ষে তা এখন আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।
এ সম্পর্কিত বিডিনিউজ-এর এক প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানকে উদ্বুত করে বলা হয়, ‘‘পুনঃতফসিল, উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে রাখাসহ অনিয়মের ঋণগুলো হিসাব করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি হয়ে দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আইএমএফও একবার বলেছিল খেলাপি ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংক যা দেখায়, তার চেয়ে বেশি হবে।’’
খেলাপি ঋণের পাশাপাশি অবলোপন করা ঋণের পরিমাণও জানুয়ারি শেষে ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি হয়ে যাওয়া আদায় অযোগ্য ঋণকে তিন বছর পর অবলোপন (রাইট) করতে পারে ব্যাংক, যা খেলাপির তালিকায় না রেখে পৃথক একটি খাতায় হিসাব রাখতে হয়। ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো এ সুযোগ পাচ্ছে।
সেলিম রায়হান বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের একার পক্ষে আর খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও সেই ক্ষমতা নেই তার। এখন সরকারকেই সৎ সাহস দেখাতে হবে অস্বাভাবিক সুবিধা নেওয়া ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।
‘‘সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পানাতেও ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের সংস্কারের কথা বলেছে সরকার। সরকার নিজেই যে সমস্যার কথা চিহ্নিত করেছে-তা বাস্তবায়নেও সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। আইএমএফও আর্থিক খাতের সংস্কারের কথা বলেছে।’’
খেলাপিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার প্রধান কারণ জানিয়ে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, জাতীয় সংসদে একাধিকবার খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। কই তাদের শাস্তি দিতে তো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি?
২০১৯ সালে শীর্ষ ৩০০ খেলাপির তালিকা প্রকাশ করে সংসদে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জানিয়েছিলেন, তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা।
এরপর গত জানুয়ারিতে শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকা সংসদে প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এদের কাছে ব্যাংকের পাওনা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১৬ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা, ৮৬ শতাংশ।
খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের নানা ছাড় ও সুবিধা দিয়ে আসা বাংলাদেশ ব্যাংক কোভিড মহামারী ও পরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সময়েও বিশেষ ছাড় দিয়েছিল। এরপরও তা কমেনি।
এরমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক মন্দ ঋণ বা খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিলের দায়িত্ব কিছু শর্ত রেখে ঋণ প্রদানকারী ব্যাংককেই দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ বিবরণী অনুযায়ী, মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা, খেলাপির হার ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে তা ৬৫ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা, খেলাপির হার ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ; বিদেশি ব্যাংকে ৩ হাজার ৪১ কোটি, খেলাপির হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা ও খেলাপির হার ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ।
খেলাপিদের তিরষ্কারের বদলে বিভিন্ন সময়ে নানা ছাড় দিয়ে পুরস্কৃত করায় ব্যাংকিং খাতের প্রধান এ সংকট কাটছে না বলে মনে করছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।
সূত্র: বিডিনিউজ