অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ রিজার্ভ ও ডলারের বিনিময় হার

দেশে চলতি অর্থবছরের শুরুর দিন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার। সেটা কমতে কমতে এখন ২৯ বিলিয়নের ঘরে নেমে এসেছে। অর্থাৎ রিজার্ভের ক্ষয় ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এছাড়া অর্থবছরের প্রথম দিন দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৯ টাকা। ব্যাংকেই প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ১০৮ টাকা ৫০ পয়সায়। এ হিসাবে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ২২ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে স্বল্প সময়ে এত পরিমাণ রিজার্ভ ক্ষয় ও টাকার অবমূল্যায়ন এর আগে কখনো দেখা যায়নি। 

পুরো অর্থবছরে চলা বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এখনো কাটেনি। ডলার সংকটে কয়লা আমদানি করতে না পারায় বন্ধ হয়ে গেছে দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পায়রার প্রথম ইউনিট। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানির বিলও যথাসময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে এসব পণ্যের আমদানি। ডলারের তীব্র এ সংকটের মধ্যেই ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসেই ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) ঘাটতি ৮ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থবছর শেষে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ নির্দেশকের ঘাটতি ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। এক অর্থবছরে বিওপির এত ঘাটতি আগে কখনো দেখা যায়নি। বিওপির বড় এ ঘাটতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরো বেশি চাপে ফেলবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান। ডলার সংকটের কারণে দেশের অনেক ঋণপত্রের (এলসি) দায় যথাসময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এলসি দায় পরিশোধ করতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেল, গ্যাস, কয়লাসহ ভোগ্যপণ্য আমদানি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সরকারের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ আমদানি করতে গেলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।

বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটি নজিরবিহীন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘দেশে পণ্য আমদানির যে ব্যয় দেখানো হচ্ছে, সেটি প্রকৃত ব্যয় কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমদানির আড়ালে মূলত দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন কমে যাচ্ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। দেশে হুন্ডির যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, সেটি অসম্ভব শক্তিশালী। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ডলারের সংকট কমবে না বরং সরকার যে বিপুল উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে, তাতে ডলারের সংকট আরো তীব্র হবে।’ 

সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সরকারি অর্থের বিপুল অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থ সংস্থানের জন্য সরকার জনগণের ওপর চাপাচ্ছে ভ্যাট-ট্যাক্সের বোঝা। এখন সময় হলো অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে সুরক্ষা দেয়ার। বিপুল অংকের বাজেট ঘোষণা আর আজেবাজে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে অর্থনীতির কোনো মঙ্গল নেই।

সরকার ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। রেকর্ড এ বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) নেয়া হয়েছে ৮২ হাজার ৫৭ কোটি টাকা, যার ৮০ শতাংশই জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু এপ্রিলেই ব্যাংক খাত থেকে ২৯ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে। ২০২২ সাল শেষে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ ৭ লাখ ১৭ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে জনগণের কাছ থেকে এ ঋণ নিয়েছে সরকার।

বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ২০২১-২২ অর্থবছরজুড়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি পার করেছে দেশ। রেকর্ড ৮৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানির ধাক্কায় বাণিজ্য ঘাটতিতে ইতিহাস সৃষ্টি হয়। ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। দেশের বিওপির ঘাটতিও ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের আমদানি ঋণপত্রের লাগাম টেনে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার সংকটের পাশাপাশি এলসি খোলার শর্ত কঠোর করায় আমদানির পরিমাণ কমে এসেছে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশে।

তবে আমদানি কমলেও অর্থনীতির চাহিদার তুলনায় ডলারের জোগান এখনো অনেক কম। গত মাসে পবিত্র রমজান ও ঈদ সত্ত্বেও রেমিট্যান্সের বড় পতন হয়েছে। আবার বিদেশী বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদান কমে এসেছে। এ কারণে বিওপির ঘাটতি বড় হচ্ছে। বিওপির ঘাটতি ইতিবাচক ধারায় না ফিরলে অর্থনীতির ভঙ্গুরতা কাটবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী ডলারের সংস্থান করা আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোরতার কারণে আমদানি কমে এসেছে। কিন্তু আমদানি কমার প্রভাবে দেশের অনেক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমদানিনির্ভর ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওই খাতগুলো শেষ হয়ে যাবে। এর প্রভাবে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়বে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো দূরের কথা, বিদ্যমান কর্মীরাও চাকরি হারাবেন।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকার মূল্যস্ফীতিকে ৫ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করছে। এখনো দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের বেশি। এটিকে কীভাবে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে, সেটি স্পষ্ট নয়। ব্যাংক খাতে জুন থেকে ঋণের সুদহার বাড়বে। মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।’

দেশের আমদানি নিয়ন্ত্রণে আনতে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই কঠোর নীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিলাসপণ্যের এলসি মার্জিনের হার শতভাগে উন্নীত করা হয়। এর বাইরেও এলসি খোলায় জুড়ে দেয়া হয় নানা শর্ত। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোও এলসি খোলা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। ফলে গত জুলাই থেকে নতুন এলসি খোলার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৭৬ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের আমদানির এলসি খোলা হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নতুন এলসি খোলা হয়েছে ৫৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের। এ হিসাবে আমদানির এলসি খোলার হার ২৬ দশমিক ৮০ শতাংশ কমেছে। এলসি খোলার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও নিষ্পত্তি খুব বেশি কমেনি। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এলসি নিষ্পত্তির হার কমেছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।

রেকর্ড এলসি নিষ্পত্তির চাপে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৮৫ থেকে বেড়ে ১১৪ টাকা পর্যন্ত ওঠে। আর খুচরা বাজারে ডলারের দাম উঠে যায় ১২০ টাকা পর্যন্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থানের কারণে ডলারের দাম বর্তমানে কিছুটা কমে এসেছে। গতকাল ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ বিনিময় মূল্য ছিল ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা। তবে কার্ব মার্কেট বা খুচরা বাজারে এখনো প্রতি ডলার ১১২-১১৪ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।

আমদানি দায়ের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য অব্যাহতভাবে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে প্রায় সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। আর চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে প্রায় সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েই চলছে। ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়নে উন্নীত হওয়া রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

(এটি দৈনিক বণিক বার্তার বিশেষ প্রতিবেদন। পত্রিকাটির সৌজন্যে এখানে প্রকাশিত হলো)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *