সুইফট কী? আন্তর্জাতিক লেনদেনে এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সুইফট (SWIFT)-এর পূর্ণরূপ- সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (Society for Worldwide International Financial Telecommunication)। বিশ্বব্যাপী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে আর্থিক লেনদেন করতে এই সুইফট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। বেলিজিয়ামের ব্রাসেলসে মে ৩,১৯৭৩ খ্রি. তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয় সুইফট (SWIFT)।

রাশিয়া গত বছর ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরু করার পর পশ্চিমা দেশগুলোর নের্ত্বত্বে মস্কোকে সুইফট থেকে বের করে দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ এই অনুসঙ্গটি আবারও বিশ্বব্যাপী আলোচনায় এসেছে। বলাই বাহুল্য, সুইফট সিস্টেম থেকে রাশিয়াকে বের করে দেওয়াতে বিদেশের সঙ্গে লেনদেনে নানামুখী সমস্যা মোকাবেলাৈ করতে হচ্ছে মস্কোকে। 

সুইফট হলো মূলত আন্তঃব্যাংক সংক্রান্ত তাৎক্ষনিক মেসেজিং ব্যবস্থা যা কোনো লেনদেনের ব্যাপারে গ্রাহককে তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দেয়। বিশ্বের অধিকাংশ ব্যাংক নিজেদের মধ্যকার বার্তা আদান প্রদানের কাজে সুইফট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।

সুইফট নেটওয়ার্ক হলো শুধুই একটি যোগাযোগের মাধ্যম, এর মাধ্যে সরাসরি অর্থ প্রেরণ করা যায় না। সুইফট শুধু অনলাইনে পেমেন্ট অর্ডার প্রেরণ করে। একটি ব্যাংক তাদের সুইফট নেটওয়ার্ক এ সংযুক্ত অন্য একটি ব্যাংককে অর্থ পরিশোধের অনুরোধ পাঠায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সেই আদেশ গ্রহণ করে সে অনুযায়ী কাজ করে।

বিশ্বের ২০০ টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইফটের সদস্য। আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে তথ্য আদান প্রদানের জন্য সুইফটকে একটি নিরাপদ নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বব্যাপী খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভূমিকা রাখলেও, কোনো দেশের উপর অবরোধ আরোপের আইনি ক্ষমতা নেই এই প্রতিষ্ঠানটির।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

সুইফট সৃষ্টি হয়েছিল আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান ব্যাংকসমূহের উদ্যোগে, যারা চাননি একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কোন একক সিস্টেম তৈরি করে কাজ করবে এবং নিজেদের একচেটিয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনা করবে।

যৌথভাবে এই নেটওয়ার্কের মালিক বিশ্বের দুই হাজার ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে মিলে বেলজিয়ামের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অব বেলজিয়াম সুইফটের কাজকর্ম তদারক করে থাকে।

এই নেটওয়ার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পরিচালিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিশ্চিত হয় সুইফটের মাধ্যমে, এবং কোন বিরোধের ক্ষেত্রে পক্ষ অবলম্বন করার কথা নয় প্রতিষ্ঠানটির।

কিন্তু, ২০১২ সালে পরমাণু কর্মসূচির কারণে ইরানের ওপর সুইফটের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল।

ফল হিসেবে দেশটির তেল রপ্তানি থেকে আয় অর্ধেক কমে গিয়েছিল এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ হারায় দেশটি।

সুইফট বলছে, কারো ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ব্যাপারে তাদের কোন প্রভাব থাকে না, বরং নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে কোনো দেশের সরকারের ওপর।

কোনো ব্যাংককে সুইফট থেকে বের করে দেওয়া হলে সে ব্যাংকটির বিশ্বব্যাপী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সামর্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যেমন, রুশ ব্যাংকগুলোকে সুইফট থেকে বের করে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো যাতে সুইফটের মাধ্যমে স্বাভাবিক সময়ের মত নির্ঝঞ্ঝাটে এবং তাৎক্ষণিক লেনদেন পরিচালনা করতে না পারে।

ব্যাংকগুলোকে তখন সরাসরি একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। এতে সময়ক্ষেপণ হয় এবং বাড়তি খরচ গুনতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত রুশ সরকারের রাজস্ব আয় কমিয়ে দেয়।

এর আগে ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রাইমিয়া দখল করে নেয়, সেসময় সুইফট থেকে রাশিয়াকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল। রাশিয়া তখন বলেছিল, সেটা করা হলে তা হবে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য। সেসময় পশ্চিমা দেশগুলো আর সামনে এগোয়নি।

কিন্তু ওই হুমকির ফল হিসেবেই রাশিয়া দ্রুত তার প্রতিবেশী দেশ, যাদের মুদ্রা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রায় একইরকম, তাদের সাথে আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের নিজস্ব একটি ব্যবস্থা চালু করে।

এ ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় রুশ সরকার ন্যাশনাল পেমেন্ট কার্ড, যা মির নামে পরিচিত, তৈরি করে। যদিও অল্প কয়েকটি রাষ্ট্র বর্তমানে সেটি ব্যবহার করছে।

রাশিয়ার ব্যাংকগুলো সুইফটের অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বাংলাদেশ সরকারও রূপপুর পরমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কিস্তির অর্থ রাশিয়াকে স্বাভাবিকভাবে পরিশোধ করতে পারছে না। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, রাশিয়াকে সুইফট থেকে বের করে দেওয়ার কারণে দেশটির অর্থনীতি অন্তত ৫ শতাংশ কমবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *