বাকিতে কিনে পরে অনুশোচনা করছেন না তো?

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এখন ‘বাই নাউ, পে লেটার’ (বিএনপিএল) সেবা জনপ্রিয় হচ্ছে। অর্থাৎ, এখন বাকিতে কিনে পরে দাম পরিশোধ করার ব্যবস্থা। যেসব কোম্পানি এসব সেবা দিচ্ছেন, তারা গ্রাহকদেরকে বলছেন, এটি জরুরি পণ্য যথাসময়ে কেনার একটি উত্তম উপায় এবং পুরোপুরি নিরাপদ। আবার এই কোম্পানিগুলোই বিনিয়োগকারী ও রিটেইলারদেরকে বলছে, এই সেবার ফলে গ্রাহকরা আরও বেশি অর্থ খরচ করছে, যা আদতে বাজার ব্যবস্থার জন্যই লাভজনক। কিন্তু একই সঙ্গে এই দুটো ব্যাপার কি সত্যি হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে ক্রেতা ও পরিস্থিতির ওপর। 

যুক্তরাষ্ট্রের কনজ্যুমার ফাইনান্সিয়াল প্রোটেকশন ব্যুরো‘র তথ্য অনুসারে, বিএনপিএল সেবাদাতা পাঁচটি বড় কোম্পানি এই খাতে বড় প্রভাব রাখছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই পাঁচটি কোম্পানির গ্রাহক কর্তৃক নেওয়া ঋণের পরিমাণ ২ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিএনপিএল সেবার আওতায় গ্রাহকদের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ প্রতিবছরই বাড়ছে। কনজ্যুমার রিপোর্টসের তৈরি একটি জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২৮ শতাংশ ভোক্তা বিএনপিল সেবা গ্রহণ করেছে। 

বিএনপিল সেবাদাতা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- অ্যাফার্ম, আফটারপে, ক্লারনা, পেপাল ও জিপ। ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর তুলনায় এদের সেবা আরও সহজ। প্রত্যেকের বিজনেস মডেল আলাদা হলেও মোটাদাগে এই কোম্পানিগুলো গ্রাহককে চারটি কিস্তিতে কোনো পণ্য কেনার সুযোগ দেয়। প্রথম কিস্তি কেনার সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে হয় আর বাকি তিন কিস্তি প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে কোনো ইন্টারেস্ট দিতে হয় না। 

দামি পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অ্যাফার্ম অবশ্য আরও দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি সুবিধা দেয়। আফটারপে, ক্লারনা ও পেপালও এই সুবিধা দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে ইন্টারেস্ট দিতে হয়। ক্রেডিট কার্ডের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, এখানে সুদের ওপর আবার সুদ ধার্য হয় না, যা ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে হয়। ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া অর্থ যথাসময়ে পরিশোধ করা না হলে বকেয়া অর্থের ওপর সুদ জমা হতে থাকে এবং পরবর্তী সময়ে সমুদয় অর্থের ওপরই পর্যায়ক্রমে সুদ যোগ হতে থাকে। 

বিএনপিএল সেবাদাতা কোম্পানিগুলো সুদের ওপর আবার সুদ ধার্য করছে না, এটা ভালো দিক। তবে তারা আপনাকে অবশ্যই দাতব্য সেবা দিচ্ছে না। বিএনপিএল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে (অ্যাফার্ম ছাড়া) প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ফাইনান্সিয়াল টেকনোলজি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ৯০ শতাংশ কোম্পানির আয় আসে মার্চেন্টের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে। অর্থাৎ বিএনপিএল সেবার কারণে বাড়তি বিক্রির জন্য রিটেইলাররা এসব সেবাদাতা কোম্পানিগুলোকে অর্থ প্রদান করে। 

২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত কনজ্যুমার ফাইনান্সিয়াল প্রোটেকশন ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুসারে কনজ্যুমার খাতে বড় পাঁচটি কোম্পানির প্রভাব-

অ্যাফার্ম: অন্যান্য পেমেন্ট মেথডের তুলনায় অ্যাফার্মের বিএনপিএল পেমেন্ট মেথডে মার্চেন্টের অর্ডার বেড়েছে ৮৫ শতাংশ।

আফটারপে: অনলাইন ক্রেতাদের খরচের তুলনায় আফটারপে গ্রাহকদের প্রতি ট্রানজ্যাকশনে খরচ ৭২ শতাংশ বেশি।

ক্লারনা: মার্চেন্টের অর্ডার বেড়েছে ৪১ শতাংশ, কনভারশান রেট বেড়েছে ৩০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ বিএনপিএল ক্রেতারাই সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টের জন্য নতুন গ্রাহক।

পেপাল: মার্চেন্টের অর্ডার বেড়েছে ৫৬ শতাংশ এবং ৬৫ শতাংশ গ্রাহকই রিপিট কাস্টমারে পরিণত হয়েছে।

জিপ: কনভারশান রেট বেড়েছে ২০ শতাংশ। রিপিট কাস্টমার রেট বেড়েছে ৮০ শতাংশ, আর গড় অর্ডার বেড়েছে ৬০ শতাংশ। 

বিএনপিএল কোম্পানিগুলো যদি গ্রাহকের কাছ থেকে শুধু সুদ নিতো আর গ্রাহকদের অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা না দিতো, তাহলে সেগুলো সফল হতে পারত না। কোম্পানিগুলো আগে গ্রাহকের ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করে এবং গ্রাহকের সক্ষমতা অনুসারে ঋণসীমা নির্ধারণ করে। যদি কোনো গ্রাহক পণ্য কেনার পর চার কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে তার ঋণমান কমিয়ে দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে আর তাকে বাকিতে পণ্য কেনার সুযোগ দেওয়া হয় না।

তারপরও বাকিতে কেনার সুযোগ নিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা লোভে পড়ে কেনাকাটা করাটা সবসময়ই ভুল সিদ্ধান্ত। বিএনপিএল মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে উদ্বুদ্ধ করে। 

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপিএল ক্রেডিট কার্ডের মতো লিগ্যাসি ক্রেডিট প্রোডাক্টসের তুলনায় সরাসরি আর্থিক চাপ অনেকটা প্রশমিত করে, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সেবাগ্রহীতারা যে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করছে না, এটি প্রমাণিত হয়নি। 

‘অনেক বিএনপিএল গ্রাহকরা এই সেবাটি গ্রহণ করার ফলে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করেছেন, অন্য উপায়ে অর্থ পরিশোধ করতে হলে হয়তো এত অর্থ খরচ করতেন না’, বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

একটি সম্ভাব্য সমস্যা হচ্ছে লোন স্ট্যাকিং, যার ফলে একজন গ্রাহক একাধিক বিএনপিএল সেবাদাতার কাছ থেকেই ঋণ পেতে পারে। কারণ কোনো কোম্পানিই জানে না সংশ্লিষ্ট গ্রাহক অন্য আরও কোনো কোম্পানি থেকে ঋণ পাচ্ছে কিনা। বিএনপিএল ঋণ সাধারণ ক্রেডিট রিপোর্টে আসে না বলে এটা সম্ভব হচ্ছে। 

এ ছাড়া মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর ধরে যদি কোনো গ্রাহক বিএনপিএল সেবা গ্রহণ করে, তাহলে অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রমে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে কনজ্যুমার ফাইনান্সিয়াল প্রোটেকশন ব্যুরোর প্রতিবেদনে। 

গবেষণা প্রতিষ্ঠান মফেটনাথানসনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউজিন সিমুনাই বলেন, ‘অনেক দামি কিছু বাকিতে বা কিস্তিতে কেনাটা হয়তো ঠিক আছে। কিন্তু আপনার নিত্যদিনকার প্রয়োজনীয় জিনিসও যদি বাকিতে বা কিস্তিতে কিনতে হয়, তাহলে এটি বড় সমস্যা হতে পারে। আপনার যদি সাপ্তাহিক মুদি পণ্যও বাকিতে কিনতে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আপনি অনেক পিছিয়ে পড়বেন।’ 

বাকিতে কোনাকিছু কেনার সময় সর্বদা মনে রাখা উচিত যে, এই সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তী সময়ে অনুশোচনা করতে হবে কিনা। অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে অনেক কিছু কিনতে হয়, তখন বাকিতে কেনাটা হয়তো ঠিক আছে। কিন্তু সব অর্থ একবারে পরিশোধ করতে হচ্ছে না কিংবা বাকিতে পাচ্ছেন বলেই যা ইচ্ছা কিনে ফেলা উচিত নয়। আজ হোক বা কাল, এই অর্থ কিন্তু আপনাকেই পরিশোধ করতে হবে। কখনও কখনও সুদসহও পরিশোধ করতে হতে পারে। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *