বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য রেমিট্যান্স কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মধ্য ও নিন্ম আয়ের দেশগুলোর জন্য রেমিট্যান্স বা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী অর্জিত রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ যায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপিন্সের মতো দেশগুলোতে। রেমিট্যান্সের আরেকটি বৈশিষ্ট হচ্ছে এই অর্থ ধনী দেশগুলো থেকে সাধারণত গরীব দেশগুলোতে যায়। বিশ্বের রেমিট্যান্স প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট বোঝা যাবে।  যেমন- ২০১৮ সালে ভারত ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করে, যা দেশটির মোট জিডিপির ৩ শতাংশ। একই বছর ফিলিপিন্সের অর্জিত রেমিট্যান্স ছিল দেশটির জিডিপির ১০ শতাংশ।বাংলাদেশ ২০২২ সালে মোট ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করে, যা আমাদের দেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ।বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও এর ডাটা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ১৬৯ মিলিয়ন বা ১৬ কোটি ৯০ লাখ কর্মী প্রবাসে কর্মরত ছিল। সংস্থাটির তথ্যমতে তরুণদের মধ্যে প্রবাসে কাজের চাহিদা ও ইচ্ছাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

প্রবাসী কর্মীদের চিত্র

আইএলও’র ২০২১ সালের ডাটা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী প্রবাসী শ্রমিকদের মধে ৫৮ শতাংশ (৯৯ মিলিয়ন) পুরুষ এবং নারীর সংখ্যা প্রায় ৭০ মিলিয়ন। সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী কর্মী নিয়োজিত আর তার পরের অবস্থানে আছে মেনুফেকচারিং ইন্ডাস্ট্রি। কৃষিকাজে নিয়োজিত প্রায় ৭ শতাংশ প্রবাসী শ্রমিক। স্বাস্থ্য ও গৃহসেবা খাতে নারীর উপস্থিতি বেশি আর মেনুফেকচারিংয়ে পুরুষেদের অংশগ্রহণ বেশি।দুই-তৃতীয়াংশ প্রবাসী কর্মী উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে কাজ করেন। ৬৩.৮ মিলিয়ন প্রবাসী কাজ করেন ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে আর ৪৩.৩ মিলিয়ন প্রবাসী নিয়োজিত আমেরিকা অঞ্চলে। আফ্রিকায় কাজ করেন ১৩.৭ মিলিয়ন প্রবাসী, যা মোট প্রবাসী শ্রমিকের ৮.১ শতাংশ।১৫-২৪ বছর বয়সী কর্মীদের প্রবাসে কাজ করার পরিমাণ ২০১৭ সালে ছিল ৮.৩ শতাংশ, ২০১৯ াসলে বড়ে হয়েছে ১০ শতাংশ। তবে তা সত্বেও এখনো ২৫-৬৪ বছর বয়সী প্রবাসীদের সংখ্যাই ৮৬.৫ শতাংশ।

রেমিট্যান্স কীভাবে ভূমিকা রাখে

একটি দেশ ও এর জনগণের উপর রেমিট্যান্সের প্রভাব অসীম। বিদেশে কর্মরতরা মূলত তাদের পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের কাছে অর্থ পাঠান। রেমিট্যান্স গ্রহণকারীরা এসব অর্থ শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, ব্যবসাসহ জরুরী প্রয়োজনীয় ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় করেন।  সুস্বাস্থ্যবান ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠি একটি সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফিলিপিন্স, ভারত ও বাংলাদেশের মতো উচ্চ রেমিটেন্স গ্রহণকারী দেশগুলোর জিডিপিতে এই রেমিটেন্সের সরাসরি ভূমিকা আছে। স্কুলে পড়ুয়া শিশুদের উপরও রেমিট্যান্সের প্রভাব অনেক। ২০০৪ সালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ এল সালভাদরের উপর করা এক গবেষনায় দেখা গেছে যেসব পরিবার রেমিট্যান্স গ্রহণ করে, সেসব পরিবারের শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে যাওয়ার প্রবণতা অনেক কম এবং স্কুলে ভর্তি হওয়ার হার তুলনামূলক অনেক বেশি।

একটি দেশ মূলত পণ্য ও সেবা রফতানি করে অর্থ আয় করে।  প্রবাসে কর্মী পাঠানো বা জনশক্তি রফতানিও একটি দেশের, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম বড় আয়ের উৎস। কোনো দেশের আয় কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, তার ক্রয় করার ক্ষমতা সীমীত হয়ে যাওয়া। প্রবাসী কর্মীরা কোনো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এসব অর্থ দিয়ে নির্দিষ্ট দেশ তার প্রয়োজনীয় পণ্য কেনে। কারণ কোনো দেশই তার প্রয়োজনীয় সবকিছু নিজ দেশে উৎপাদন করতে পারে না। যদি কোনো দেশ আমদানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে দুটি জিনিস ঘটতে পারে- হয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে, নয়তো জনগণকে অনেক পণ্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। উভয় চিত্রই দেশের অর্থনীতি ও জনগণের কল্যানের বিপরীত।

অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় রেমিটেন্সের প্রভাব এখন আরও বিস্তৃত। যেসব কারণে রেমিট্যান্স এতটা গুরুত্বপূর্ণ-

১. বিশ্বের অন্তত ১০০ কোটি মানুষ – প্রতি ৭ জনে একজন- সরাসরি রেমিট্যান্সের সঙ্গে যুক্ত। প্রতি বছর পা্রয় ২০ কোটি মানুষ নিজ দেশে রেমিট্যান্স পাঠায় আর ৮০ কোটি মানুষ সরাসরি সেই রেমিট্যান্স থেকে উপকৃত হয়।

২. করোনাভাইরাস প্যান্ডেমিক এবং বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক নানা অচলাবস্থার মধ্যেও রেমিটেন্স প্রবাহে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে (নিন্ম ও মধ্য আয়ের দেশ) ৬০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স গেছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্সের এই পরিমাণ বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি।  

৩. প্রবাসীরা প্রতি এক বা দুই মাস পর পর গড়ে তাদের পরিবারের কাছে ২০০-৩০০ মার্কিন ডলার পাঠায়। এই অর্থ তাদের আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ। বাকী সব অর্থ কর্মীরা যে দেশে কাজ করছেন, সে দেশে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু প্রবাসীদের আয়ের এই ১৫ শতাংশ অর্থই রেমিটেন্স গ্রহীতার মোট আয়ের ৬০ শতাংশ। এই অর্থ দিয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছে এবং এটি তাদের জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য।

৪. গত ২০ বছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে অন্তত ৫ গুণ। দেখা গেছে, দুর্যোগ বা সঙ্কটকালে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যায় কারণ প্রবাসীর তখন তাদের পরিবারের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে আরও বেশি অর্থ পাঠায়। সঙ্কটকালে এই অর্থ রেমিটেন্স গ্রহণকারী দেশ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহার করতে পারে।

৫. আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো প্রান্তে মুহূর্তেই অর্থ পাঠানো সম্ভব। প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মানুষের জন্য এসব প্রযুক্তি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। রেমিট্যান্স পাঠানো এখন আর অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকে যাওয়া বা ব্যাংক একাউন্ট থাকার প্রয়োজন হচ্ছে না। ছোট পরিমাণ অর্থ এখন মোবাইল ট্রান্সফারের মাধ্যমে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। মোবাইল ট্রান্সফারের মাধ্যমে ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী ১২.৭ বিলিয়ন ডলার আর ২০২১ সালে ১৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠানো হয়েছে। এর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

৬. ৫০ শতাংশ রেমিট্যান্স পাঠানো হয় মূলত গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলোতে, যেখানে বিশ্বের ৭৫ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠির বসবাস। গ্রামীণ জনগোষ্ঠি এই রেমিট্যান্সের অর্থের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়েই তারা জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে পারছে।

৭. রেমিট্যান্সের অর্থের ৭৫ শতাংশই ব্যায় হয় খাবার, চিকিৎসা, বাসস্থান ও স্কুলের বেতন পরিশোধে। কোনো সঙ্কটের সময় প্রবাসীরা আরও বেশি করে অর্থ পাঠায়, যাতে দেশে তাদের পরিবার ফসলের ক্ষতি কিংবা অন্যান্য পারিবারিক দুর্যোগ ভালোভাবে সামাল দিতে পারে। বাকী ২৫ শতাংশ অর্থ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে ব্যয় হয়। এসব বিনিয়োগ থেকেও নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

৮. বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশ তাদের জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশের জন্য রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশও তাদের একটি। এসব দেশের গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতির বিকাশের জন্য রেমিট্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৯. রেমিট্যান্স পাঠানো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যায়সাধ্য। ব্লকচেইন ও মোবাইল ট্রান্সফার প্রযুক্তি হয়তো কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু এখনো বিশ্বব্যাপী মোট রেমিট্যান্সের ৬ শতাংশ খরচ হয় কারেন্সি কনভার্সন ও অর্থ পাঠাতে, যা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারিত পরিমানের দ্বিগুণ। খরচ কমিয়ে আনতে নতুন ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এই লক্ষ্য নিয়ে চালু হয়েছে প্রিয়পে। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য সীমীত আকারে কিছু সেবা চালু করা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে প্রিয়পে কম খরচে রেমিট্যান্স পাঠানোর সেবা চালু করবে।

১০. ২০২২ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত (এসডিজি লক্ষ্যমাত্র অর্জনের বছর) প্রবাসীরা তাদের নিজ দেশে আনুমানিক ৫.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই অর্থের মধ্যে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার সঞ্চয় বা বিনিয়োগ খাতে যাবে।

১১. এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রবাসীরা তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের সাহায্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রেমিট্যান্সের সাহায্যে দারিদ্র দূরীকরণ হচ্ছে (এসডিজি১), ক্ষুদা দূর হচ্ছে (এসডিজি ২), সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হচ্ছে (এসডিজি ৩), সুশিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে (এসডিজি ৪), সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন নিম্চিত করা যাচ্ছে (এসডিজি ৬), আর্থিক উন্নতি হচ্ছে (এসডিজি ৮) এবং বৈষম্য দূর হচ্ছে (এসডিজি ১০)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *