ডিজিটাল ব্যাংকিং কি? সুবিধাগুলো কেমন?

বাংলাদেশ ব্যাংক অবশেষে দেশে  ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গতকাল বুধবার ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের নীতিমালা অনুমোদন করেছে। প্রথাগত ব্যাংক গঠন করতে ৫০০ কোটি টাকা লাগলেও ডিজিটাল ব্যাংক গঠনে লাগবে ১২৫ টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালনার জন্য শুধু প্রধান কার্যালয় থাকবে, কিন্তু নিজস্ব কোনো শাখা বা উপশাখা, এটিএম, সিডিএম অথবা সিআরএমও থাকবে না। সব সেবাই হবে অ্যাপ–নির্ভর, মুঠোফোন বা ডিজিটাল যন্ত্রে। এই ব্যাংক কোনো ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) সেবা দেবে না। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই সেবা মিলবে। গ্রাহকদের লেনদেনের সুবিধার্থে ডিজিটাল ব্যাংক কিউআর কোড, ভার্চুয়াল কার্ড  ও অন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য দিতে পারবে, তবে লেনদেনের জন্য কোনো প্লাস্টিক কার্ড দিতে পারবে না। অবশ্য এই ব্যাংকের সেবা নিতে গ্রাহকেরা অন্য ব্যাংকের এটিএম ও এজেন্টসহ নানা সেবা ব্যবহার করতে পারবেন।

বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল ব্যাংকিং অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বিখ্যাত মার্কিন বিজনেস সাময়িকী ফোর্বসের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৭৮ শতাংশ মানুষ সরাসরি ব্যাংকে যাওয়ার পরিবর্তে ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। করোনা মহামারি ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজলভ্য ও জনপ্রিয় করেছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধাগুলো কী কী?

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সকল কার্যক্রম অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গ্রাহকরা কোনো ধরনের ফিজিক্যাল শাখায় যাওয়া ছাড়াই লেনদেন ও ঋণসহ সকল ধরনের ব্যাংকিং সেবা পেতে পারে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

নানারকম সুযোগ-সুবিধার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল ব্যাংকিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থান থেকে তাদের অ্যাকাউন্টে প্রবশে করতে পারা, ব্যালেন্স চেক করা, তহবিল স্থানান্তর, বিল পরিশোধ এবং ঋণের জন্য আবেদন করার মতো বিস্তৃত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেন গ্রাহকরা।

ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো কার্যক্রমের জন্যই কখনও ফিজিক্যাল ব্যাংকে যাওয়া লাগবে না। তাই অনেক সময় বেঁচে যায়।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আরেকটি সম্ভাবনাময় দিক হচ্ছে ক্যাশ টাকার ব্যবহার এড়িয়ে চলা। পুরোপুরি ক্যাশলেস সমাজ গঠনে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সহজলভ্যতা অপরিহার্য।  ডিজিটাল লেনদেনে সক্ষম একটি ক্যাশলেস সমাজে আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও বেশি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হতে পারে।

অনেক ডিজিটাল ব্যাংক প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের সব সুযোগ-সুবিধাই দেয়, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা দেয়। তবে বড় ধরনের কোনো ঋণ কিংবা বিনিয়োগের আগে ডিজিটাল ব্যাংকের শুধু অ্যাপের ওপর নির্ভর না করে অনলাইনেই সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে নেওয়া ভালো।

অ্যাকাউন্টের ওপর আপনার সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ থাকাটাও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আরেকটি বড় সুবিধা। প্রথাগত ব্যাংকের সেবা পেতে হলে ব্যাংকের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আবেদন করতে হয় বা তাদের অফিসে যেতে হয়। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আপনি যখন ইচ্ছা তখনই ব্যাংকিং কাজ করতে পারবেন। ব্যাংকিং থাকবে পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণে।

অনলাইনে নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান দুনিয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা নিয়েও তাই অনেক উদ্বেগ আছে। তবে এটি মাথায় রেখেই ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। গ্রাহকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো যেমন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, আবার গ্রাহকের ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রেও একাধিক ধাপে পরিচয় যাচাই হয়। অন্য ডিভাইস থেকে লগ ইন করার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়তি তথ্য দেওয়া লাগে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিজিক্যাল কার্ডের চেয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট বা ই-ওয়ালেট অনেক বেশি নিরাপদ।

ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ও পেমেন্ট করা আরও সহজ ও নিরাপদ।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

১৪ জুন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ‘বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক: সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে । এতে বক্তারা বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক কারা হবেন, কাদের হাতে যাবে মালিকানা এই বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকের নীতি প্রণয়নে প্রযুক্তি খাতের মানুষদের যুক্ত করারও আহ্বান জানান তারা। গোলটেবিলে শিওর ক্যাশের প্রধান নির্বাহী ডিজিটাল ব্যাংক বিষয়ে একটি উপস্থাপনা দেন। এতে তিনি বলেন, দেশে সঠিক গ্রাহক ডেটাবেজের অভাব রয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংক গড়ে তুলতে গেলে ডেটাবেজ লাগবে।

বেসিসের সভাপতি রাসেল টি আহমেদ প্রশ্ন তোলেন, ডিজিটাল ব্যাংক বলতে স্বচ্ছতার কথা মাথায় আসে। এখানে শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে গ্রাহক পর্যন্ত সব জায়গায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে। স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে হলে প্রযুক্তি লাগবেই। এই ব্যাংক কে নিয়ন্ত্রণ করবে? গতানুগতিক মানসকিতার লোকই কি থাকবে? মালিক কারা হবেন?

বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর ডিজিটাল ব্যাংক গড়ে তোলার জন্য মানসিকতার পরিবর্তনে জোর দেন। তিনি বলেন, এখনও অনেক লোকের হাতে স্মার্টফোন নেই, তাহলে ডিজিটাল ব্যাংকিং কেমন হবে সেসব বিবেচনায় রাখতে হবে।

ফিনটেক প্রতিষ্ঠান জয়তুনের প্রধান আরফান আলী ডিজিটাল ব্যাংক গড়ে তুলতে অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বলেন, ডিজিটাল ব্যাংক হলেই সঙ্গে সঙ্গে মুনাফা করবে, তা নয়, এটা পরিপক্ব হতে সময় লাগবে। আর্থিক লিটারেসির অভাব ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য বড় বাধা হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *