সেই রিক্সাচালক বাবা এবং আমার অপারগতা
বেশ কিছু দিন আগে, ফেসবুকে একজন রিক্সাচালকের একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। একজন বৃদ্ধ বাবা তার মেডিক্যালে পড়ুয়া মেয়ের খরচ চালানোর জন্য সবার কাছে সাহায্য চাইছিলেন। ছবিটি ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে যথেষ্ঠ সাড়া পড়েছিল। এবং একটি বড় অংশের মানুষ ভদ্রলোককে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। অনেকের স্মৃতিতে হয়তো বিষয়টি আছে। এবং তাদের স্মৃতিকে সাহায্য করার জন্য নীচে ছবিটি আবারো দিয়ে দিচ্ছি।
অনেকের মতো ছবিটি আমাকেও আলোড়িত করেছিল। এবং লোকটিকে খুঁজতে মাঠে নেমে পড়েছিলাম, যদি তাকে সত্যি কিছুটা সাহায্য করা যায়। মাত্র দু'দিনের মাথায় ভদ্রলোককে খুঁজে পেয়েও যাই। এবং তারপর আমি আর কোনও আপডেট দেইনি। আজকে সেই দায় মুক্তির চেষ্টা করছি।
ভদ্রলোক আমাকে তার নাম বলেছিলেন কাজী ইউসুফ। মাদারীপুরে তার বাড়ি। তিনি কিছুদিন বিদেশেও ছিলেন। তারপর অনেক দিন ধরেই শ্যামলীতে থাকেন। শ্যামলীর একটি রিক্সা গ্যারেজ থেকে রিক্সা নিয়ে চালিয়ে থাকেন। তার এলাকা মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি, লালামাটিয়া এবং শ্যামলী। তিনি মিরপুর রোডের উপরই বেশি রিক্সা চালিয়ে থাকেন।
একটা সময়ে তিনি রিক্সার পেছনে ওই ব্যানারটি লাগিয়ে নেন। তিনি প্রতিদিন রিক্সা চালান না; সপ্তাহে ৩/৪ দিন রিক্সা চালান।
আমার সাথে যেদিন তার প্রথম দেখা হয়, তখন তিনি কিছু তথ্য এলোমেলো ভাবে রেখে যান। আমি সেগুলো প্রফেশনাল দায়িত্বের মতো খাতায় নোট করে রাখি। আমি তার কাছ থেকে যথেষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছিলাম। কিছু তথ্য তিনি পরিষ্কারভাবে দিলেন না। হয়তো তার মেয়েটির কথা ভেবেই তিনি এমনটি করেছিলেন। যেমন, তিনি তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বার মুখস্ত দিতে পারলেন, কিন্তু মেয়ের ফোন নাম্বারটি আমাকে দিতে পারলেন না। আমি মনে করি, তিনি এটা আমাকে দিতে চাননি। তারপর বাসায় গিয়ে আমাকে ফোন করে মেয়েটির যোগাযোগের নাম্বার দেয়ার কথা থাকলেও, তিনি সেটা করেননি। তারপরেও তার সাথে আমার কয়েকবার কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে। তিনি আমাকে দেবেন বলে আর দেননি। বলেছিলেন, মেয়েটি তার ফোন হারিয়ে ফেলেছে। নতুন ফোন কিনলেই আমাকে জানাবেন।
আমি তার এই গোপনীয়তার কারণটি ধরে নিয়েছি, তিনি চাননি তার মেয়ে জনসম্মুখে আসুক। এবং আমি তার এই সিদ্ধান্তকে সন্মান জানাই। এবং আমি নিজেও চেষ্টা করেছি, যতটা সম্ভব মেয়েটির পরিচয় গোপণ রাখতে।
এর মাঝে অনেক মানুষ আমাকে ফোন করতে থাকেন। তারা সাহায্য করতে চান। আমি যেন টাকাটা তুলে তাদেরকে দিয়ে আসি। নিজের টাকা নিয়ে আমি যা-ইচ্ছে করতে পারি। কিন্তু মানুষের টাকা নেয়াটা বিশাল একটি দায়িত্ব বলেই আমি মনে করি। তাই কারো কাছ থেকে টাকা নেয়ার আগে, আমি আরো নিশ্চিত হয়ে নিতে চাইছিলাম। তাই আপনাদের অনেকের অনুরোধ সত্ত্বেও আমি কাউকে বলিনি, আমাকে টাকা পাঠান।
তবে দিনে দিনে চাপ বাড়তে থাকে। আমি একদিন ইউসুফ সাহেবকে ফোন করে বললাম, আপনি আপনার মেয়ের সার্টিফিকেটগুলো আমাকে কপি করে দিয়ে যাবেন। তার উপর ভিত্তি করে আমি মানুষের কাছে হাত পাতবো। কিন্তু তিনি সেই কাজটি করলেন না।
তার সাথে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছে। আমি মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনেছি। এবং তিনি তার মেয়ের সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন, যা দিয়ে মেয়েটিকে খুঁজে পেতে আমার খুব একটা কষ্ট হয়নি। তিনি হয়তো বুঝতে পারেননি, বাংলাদেশে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা খুব বেশি নয়; এবং সেখানে একজন ছাত্র/ছাত্রীকে খুঁজে বের করা খুব বেশি ঝক্কির কাজ নয়।
আমার একজন ডাক্তার বন্ধু মেয়েটির সাথে কথা বলে। মেয়েটির পরিচয় আমরা নিশ্চিত করি। তারপর মেয়েটি আমার বন্ধুটিকে যে তথ্য দেয় তার সারমর্ম হলো - তিনি ইবনে সিনা ট্রাষ্ট থেকে লেখাপড়ার খরচ পান। তার আর বাড়তি টাকার প্রয়োজন নেই।
মেয়েটির সততা আমাকে মুগ্ধ করে। মেয়েটির মোবাইল ফোন নাম্বার আমার কাছে আছে। কিন্তু তিনি পাছে লজ্জা পান, সেই ভয়ে আমি তাকে ফোন করিনি। আমি চাইনি তার স্বাভাবিক নিজস্ব ভূবনটি আমাদের আক্রমনে ক্ষতিগ্রস্থ হোক। আমি তাকে তার মতো থাকতে দিয়েছি। ডাক্তার বন্ধুটিকে বলে রেখেছি, মেয়েটির কোনও প্রয়োজনে যেন খেয়াল রাখে।
আমি ইচ্ছে করেই এই তথ্যটি এতোদিন নিজের কাছে গোপন রেখেছিলাম। সেই সময়ে অসংখ্য মানুষ সেই রিক্সা চালক ইউসুফ সাহেবকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। সবার ভেতর একটি আবেগ জড়িয়ে ছিল। এমন কি আমার অনেক বন্ধু আমার সাথে ইউসুফ সাহেবের বাড়ি পর্যন্ত যেতে চেয়েছিল। তথ্যটি জানার পর থেকে আমি চুপ মেরে যাই। ইউসুফ সাহবকে নিয়ে টানা-হেচড়া হতে পারে, এমন একটি আশংকায় ছিলাম। আমি চাইনি, কেউ এই পরিবারটিকে নিয়ে আর টানাটানি করুক।
দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর এখন আমি নতুন করে বাংলাদেশকে চিনতে শুরু করেছি। বলতে পারেন, অনেকটা এক্সপ্লোর (Explore) করা। এখনও গ্রামে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে ঢাকা শহরের মানুষদেরকে কিছুটা হলেও চিনি বলতে পারি। উচ্চ-বিত্ত, মধ্য-বিত্ত এমনকি নিম্ন-বিত্ত কিংবা বিত্তহীন মানুষ। আমার মনে হয়, ঢাকা শহরের গড়-পড়তা মানুষের মোরাল ভ্যালু খুব নীচে নেমে গিয়েছে। মানুষ কারণে অকারণে মিথ্যা বলে, এবং সব কিছুতেই একটা সন্দেহের চোখে দেখে। পুরো সমাজ ব্যবস্থা যেন সন্দেহবাতিক হয়ে পড়েছে। আপনি বা'য়ে গেলে কিছু মানুষ হৈ হৈ করে উঠবে এই বলে যে, ওই ব্যাটা বা'য়ে গেলো কেন, নিশ্চই কোনও ব্যাপার আছে। আবার আপনি ডানে গেলে আরেকটি দল চিৎকার করে উঠবে, নিশ্চই কোনও ধান্ধায় আপনি ডানে গিয়েছেন! কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে, আপনি মনের আনন্দে ঘুরার জন্য ডানে-বা'য়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। মানুষের স্বাভাবিক চিন্তার শক্তি লোপ পেয়েছে। আপনি যদি বৃষ্টির দিন মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকেন, সেখানেও কেউ কেউ আপনার একটি উদ্দেশ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। আপনি মনের আনন্দে বৃষ্টি উপোভোগ করে ভিঁজছেন, এটা খুব কম মানুষ বিশ্বাস করবে! ঢাকার মানুষের বিশ্বাস শক্তি লোপ পেয়েছে। এই শহরে হয়তো এমনি এমনি কেউ কিছু করে না। হয়তো সবাই কিছু না কিছু পাওয়ার আশায় কিছু করে - তাই মানুষের চিন্তা শক্তিও ঠিক ওইভাবে বেঁকে গিয়েছে। সবাই কেমন যেন পোষা কুকুরের মতো ছোঁক-ছোঁক করে গন্ধ খুঁজছে। আমি মনে করি, এটা এক ধরনের অসুস্থ্যতা।
আমাদের এই ঢাকা শহরে এই যে অসুস্থ্যতা, সেখানে ইউসুফ সাহেবের এই সামান্য জীবন চালানোর জন্য, জীবনকে আরেকটু সহজ করার জন্য সামান্য এই সাইনবোর্ড লাগানো তেমন বড় মাপের অন্যায় কিছু নয়। পুরো দেশ যেখানে চলছে অনিয়মের ভেতর, সেখানে এই সামান্য ঘটনাটিকে এতো বড় করে দেখার কোনও বিষয় আছে বলে আমি মনে করিনি। আমি কখনই "পেনি ওয়াইজ, পাউন্ড ফুলিশ"-এর মতো হতে চাইনি। আমাদের কিছু মানুষের সামান্য দয়ায় তার যদি জীবনটা একটু স্বাচ্ছন্দে কেটে যায়, যাক না!
আর তাই এতোদিন আমি এর কোনও আপডেট দেইনি। তবে যারা ভদ্রলোকটিকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, এবং আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তাদেরকে আমি কিছুটা হলেও হতাশ করেছিলাম। কেন করেছিলাম, তা এখানে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম। আশা করি, আপনারা আমার এই অপরাগতাটুকু ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
ঢাকা
১৩ আগষ্ট ২০১২
- zswapan's blog
- Login to post comments
- 2528 reads
একই রকম আরো কিছু ব্লগ
- দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সোমবার ঢাকা পৌঁছবে হুমায়ুন আহমেদ এর মরদেহ - Shibbir.Ahmed
- শুভ হউক জন্মদিন ডঃ মোহাম্মদ ইউনূস - syed shah salim...
- মানবতা তুই আজ কোথায়। - Anik Bin Rashid
- শিরোনামহীন ব্রিটেনের কাহিনী--দ্বিতীয় পর্ব - syed shah salim...
- উদ্দীন থেকে আর আলী-আমাদের আশা আর ভালোবাসার আলো - syed shah salim...
- কিছু স্মৃতি - Anik Bin Rashid
- সংসদে প্রশ্নোত্তর (কাল্পনিক) - Maruf.Rahman
- সাম্প্রতিক ধনী-দরিদ্রের চেহারা - juliansiddiqi
- শিরোনামহীন ব্রিটেনের গল্প-একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে - syed shah salim...
- বাড়ীওয়ালাদের দুর্নীতি দমন করবে কোন কমিশন? - Qazi Manzur

Recent comments
18 hours 37 min ago
19 hours 18 min ago
1 day 2 hours ago
1 day 3 hours ago
1 day 3 hours ago
1 day 4 hours ago
1 day 9 hours ago
1 day 2 hours ago
2 days 19 hours ago
2 days 21 hours ago