ভাগ্য-২৯

Waset Shahin's picture

টিপু আর প্রাপ্তির বিয়ের ফুল ফুটতে শুরু করেছে । সম্ভাব্য বাধাগুলো একটা একটা করে সরে যাচ্ছে । টিপুর মা বজলু সাহেবের সাথে কথা বলেছেন । তিনি উত্তেজিত হননি বা রাগও করেন নি । তবে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন । এর মাঝে মাও কোন কথা বলেন নি । স্বামীর মুখের দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইলেন । বজলু সাহেবের চিন্তার গতি প্রকৃতি বুঝতে চেষ্টা করলেন । শেষে বজলু সাহেব বললেন,’ আমরা কি বলব বল, উপযুক্ত ছেলে । সে কি আর কম বোঝে ? ওর ইচ্ছেয় বাধা দেয়া ঠিক হবেনা । সামনে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ । তুমি কি বল ?’ মায়ের মন থেকে দুশ্চিন্তার মেঘ সরে গেল । যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন তিনি । বললেন,’ ছেলে রাজী, তুমি রাজী, আমি কি আর অমত করতে পারি ? তাছাড়া যতটুক শুনেছি মেয়েটি খুব ভাল । টিপু আমাকে ছবি দেখিয়েছে । খুবই সুন্দরী । যে কারো পছন্দ হবে ।‘ বজলু সাহেবের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল । টিপুর জন্য তিনি মনে মনে একটি সুন্দর মেয়ের খোঁজ করছিলেন । তাহলে তার চাওয়া পূরণ হতে চলেছে । বললেন,’ ছবি আছে তোমার কাছে ? কই দেখি ?’ টিপুর মা উঠে গিয়ে স্টীল আলমারী খুলে ছবি বের করে আনলান । বজলু সাহেব রসিকতা করলেন,’ বাহ, বৌমাকে দেখি আগেভাগেই সিন্দুকে তুলে রেখেছ ?’ মা হাসলেন । তবে ছবি দেখে বজলু সাহেবের চোখও যেন টেরা হয়ে গেল । বললেন,’ আগুনের মত রূপ দেখি মেয়েটির ? আল্লাহপাক আমার ছেলেটির ভাগ্য মনে হয় বিশেষভাবে গড়ে দিয়েছেন । হাত দিলেই সোনা ফলে ।‘

বেঁকে বসেছিল প্রাপ্তির বাবাও । জানিয়ে দিলেন, চাকুরীজীবি পরিবারে মেয়েকে বিয়ে দেয়ার ইচ্ছে তার নেই । তার স্ত্রী বলল,’ কেন, চাকরীজীবিদের অসুবিধা কি ?’
‘ আছে অসুবিধা । এদের মন থাকে ছোট ?’
‘ কেন তোমার এমন ধারনা হল বলত ?’
‘ শোন , তুমি থাক ঘরে তাই বোঝ না ।‘
‘ বুঝলাম । তুমি তাহলে মেয়েকে কার কাছে বিয়ে দিতে চাচ্ছ ?‘
‘ বড় ব্যবসায়ী অথবা শিল্পপতি হতে পারে ।‘
‘ কি দরকার, আর বেশি টাকা হলেই কি সুখ মিলে ? মেয়ের ইচ্ছে দেখবেনা ? ওতো এটাই চাচ্ছে ।‘
‘ শোন ও ছেলে মানুষ , ওকে বোঝাও ।‘
‘ প্রাপ্তি মোটেই ছেলে মানুষ না । একুশে পড়েছে । এরচে বরং তুমি নিজে বোঝার চেষ্টা কর । টাকা পয়সা কম থাকতে পারে কিন্তু টিপুযে সোনার টুকরা ছেলে তাতো মান ?’

প্রাপ্তির বাবা কোন জবাব দিলেন না । জরুরী কাজ ছিল । তিনি বেরিয়ে গেলেন । কয়েকদিন কেটে গেল । এ বিষয়ে স্বামী স্ত্রীর মাঝে আর কোন আলাপ হলনা ।

অনেকদিন হল সবুজের সাথে যোগাযোগ নেই । ওর কথা মনে হলেই টিপুর বুকের মাঝে খচ খচ করে উঠে । তার অফুরন্ত সুখের ফুলের বাগানে অস্বস্তির কাঁটা হয়ে জেগে আছে সবুজ । শুনেছে পাশ করে বেরিয়ে চাকরির সন্ধানে আছে ও । ঢাকাতেই উঠেছে । আরামবাগের কাছে কবন্ধু মিলে বাসা ভাড়া করেছে । প্রাপ্তিদের বাসায় আসেনি একবারের জন্যও । সৌজন্যের দেখাটুকু করার প্রয়োজনও বোধ করে নি । আর টিপু হল ছেলে বেলার বন্ধু । অনেক দূরের বস্তু । হালে আবার প্রাণের শত্রুও বটে । যদিও টিপু নিজের কোন দোষ খুঁজে পায়না । সে মনে মনে সবুজের মংগল কামনা করে । ওর ভাল একটা জব জুটে যাক এটাই সে প্রার্থনা করে ।

অতীতের দিকে তাকালে টিপুর বেশ অবাক লাগে । কেমন ঘোর ঘোর লাগে । নাটকের দৃশ্যের মত মনে হয় । ইন্টারের পর কবছরে সবকিছু কেমন অন্যরকম ঘটে গেল । জীবন এত সুন্দর সাজানো হবে কে ভেবেছিল ! প্রাপ্তির মত একটা মেয়েকে পাশে পাওয়ার আশা ছিল অলীক কল্পনা । অথচ তাই বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে । তার মনে হয় আল্লাহ মানুষকে এমনিই দিয়ে থাকেন । টিপু ইদানিং নামাজ পড়া শুরু করেছে । মাঝে মাঝে মসজিদেও যায় । জুম্মাবারে আগে ভাগে গিয়ে ইমাম সাহেবের সামনে বসে থাকে । মনযোগ দিয়ে বয়ান আর খুতবা শোনে । তার মনের গহীনে আল্লাহ রসুলের প্রেমের ঢেউ জাগে । আবেগে চোখ ছল ছল করে উঠে ।

তার জীবন বসন্তের কচি পাতায় ছেয়ে গেছে । প্রাপ্তির সাথে প্রায়ই দেখা হয় । সুযোগ পেলে একসাথে অনেকক্ষণ ঘুরে বেরায় দুজনে । রমনার লেকের পাড়ে বসে বাদাম খায় । কখনো বোটানিক্যাল গার্ডেনের গোলাপ বাগানের দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখে । হালে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট নামে এক ধরনের রেস্টুরেন্ট গজিয়ে উঠেছে । মানুষজন বেশ ভিড় করছে এতে । প্রাপ্তিকে নিয়ে টিপুও দুবার গেছে । চাংপাই নামক রেস্টুরেন্টটির ভেতরে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছে । কি সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্য অভিজাত পরিবেশ । মনোরম আলো আঁধারি । তবে খরচ বেশ বেশি । প্রাপ্তি শেষমেশ ঢাকা ভার্সিটিতে ইংরেজিতে ভর্তি হয়েছে । তবে এ বিষয়টির কথা আগে সে কোন দিন বলেনি । এটি তার মনের গহীনে লুকানো ছিল বলে মনে হয় । সে হঠাৎ ইচ্ছে করেই বিষয়টি বেছে নিল । টিপু ভাবল ভালই হয়েছে । মেয়েদের জন্য এসব সাব্জেক্ট মানানসই । প্রাপ্তির মত সুন্দরী মেয়ের জন্যতো কথাই নেই । ইংরেজী পাশ করা রূপবতী একটি মেয়ের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা । একথা শুনে প্রাপ্তি হেসে গড়িয়ে পড়ল । তার হাসি আর থামতেই চায় না । টিপু বলল,’ এত হাসছ কেন ? আমি কি হাসির কথা বলেছি ?’

‘ নয়তো কি ? তুমি বলছ তখন আমাকে রাগী ম্যাডাম ম্যাডাম লাগবে ?’ প্রাপ্তি বলল । হাসির দমকে বেরিয়ে আসা পানি চোখে টল টল করছে । টিপু বলল,’ তাইতো লাগবে ।‘
‘ তুমি আমাকে কি বলে ডাকবে, ম্যাডাম না আপা ?’
‘ সে দেখা যাবে, সময় আসুক না ।‘

প্রথম প্রথম ওরা দুএকটা চিঠি দেয়া নেয়া করেছে । এখন আর তা করেনা । ঘন ঘন দেখা হওয়ার কারনে তার প্রয়োজনও হয়না । তবে প্রাপ্তি ডায়েরীতে অনেক কিছু লেখে । মাঝে মাঝে সেটি ব্যাগে থাকে । চাইলে টিপুকে পড়তে দেয় । কি সুন্দর কাব্যিক ভাবনা প্রাপ্তির । আর কি চমৎকার তার প্রকাশ । টিপু মুগ্ধ হয় । টিপুও ডায়েরী লিখে । সেও পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরে ফেলে । দুবার প্রাপ্তি বাসায় নিয়ে আরাম করে সেসব পড়েছে । এটাও চিঠির নতুন সংস্করন যেন ।

বাবার সাথে মায়ের আলাপের খবর প্রাপ্তি জেনেছে । তবে তেমন চিন্তিত হয়নি । জানে বাবা ঠিকই রাজী হবে । চাকুরীজীবির বদলে যদি ব্যবসায়ীর প্রস্তাব আসত তাহলে তিনি বলতেন ব্যবসায়ীর চেয়ে চাকুরীজীবি ভাল । এটিই তার স্বভাব । কোন বিষয়ে তিনি প্রথমবারেই সম্মত হননা । তার যে সত্যিই অমত আছে তা নয় । কিছুক্ষণ ঝোলাঝুলির পর ঠিকই মত দেন । তাই বাবার বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে প্রাপ্তি অযথা সময় নষ্ট করতে চায় না ।

-----চলবে----

একই রকম আরো কিছু ব্লগ