স্বপ্নের সেতু সমাচার

Syed.Abul.Maksud's picture

বাংলার মাটিতে গাঁয়ের মেঠোপথের ওপর সাড়ে ছয় গজ দৈর্ঘ্য ও দুই গজ প্রস্থ কালভার্ট তৈরিতে অবধারিতভাবে কয়েক মণ গম ও কয়েক হাজার টাকার দুর্নীতি হয়ে থাকে। সেখানে প্রকাণ্ড এক নদীর ওপর সাড়ে ছয় কিলোমিটার লম্বা ব্রিজ নির্মাণে কোনো দুর্নীতি অর্থাৎ টাকা ও ডলার খাওয়াখাওয়ি হবে না—তা বাংলার একটি বালুকণাও বিশ্বাস করে না। ওই ধরনের একটি স্বর্গীয় প্রকল্পে টাকা উড়বে, চৈতী ঘূর্ণি হাওয়ায় যেমন শুকনো পাতা উড়তে থাকে। যার আকাঙ্ক্ষা ও মুরোদ আছে, সে ওই উড়ন্ত টাকা কুড়িয়ে থলে ভর্তি করতে পারে। এই মাটিতে এমন মানুষের সংখ্যা অতি কম, যারা একটি অনবদ্য প্রকল্পে টাকা উড়তে দেখেও চোখ বুজে হনহন করে হেঁটে বাড়ি চলে যাবে খালি হাতে।

বাংলাদেশে বছর দুই বয়স যেসব শিশুর, তারা জানে পদ্মা নদীর ওপর একটি অপরূপ সেতু বিদ্যমান। তারা প্রতিদিন প্রতিটি টিভি চ্যানেলে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত অবধি খবরে দেখছে ওই ব্রিজ। সেতু দিয়ে শাঁ করে চলছে মোটরগাড়ি, মালবোঝাই ট্রাক প্রভৃতি। দাতাদের অনুমোদিত ত্রৈমাত্রিক গ্রাফিক ডিজাইন মডেলটিকেই শিশুরা মনে করে বাস্তব ব্রিজ। আসলে ওটা সত্যি ব্রিজ নয়। ব্রিজের ইমেজ। বাংলাদেশের সরকার ও সংবাদমাধ্যমের কাছে ওটা স্বপ্নের ব্রিজের রূপকল্প। কংক্রিটের বাস্তব ব্রিজ হবে অনেক পরে, যখন এই দুবছরি শিশুদের গোঁফ গজাবে।

ভারতীয় ষড় দর্শনের মধ্যে চার্বাকবাদীরা আশাবাদী ও ভোগবাদী। তাঁদের সম্পর্কে একটি বাজে কথা প্রচলিত আছে, তা হলো, জীবনকে উপভোগ করার জন্য যা খুশি তা-ই করো। তাঁরা ঋণ করে ঘি খাওয়ার কথা বলেছেন বটে, তবে সেই ঋণ হবে সুদবিহীন। চড়া সুদে ধার করে প্রমত্ত নদীর ওপর প্রকাণ্ড ব্রিজ বানানোর কথা বলেননি। তবে ধারদেনা করে সেতু বানানো দোষের নয়, যদি তা দেশের মানুষের বৃহত্তর কল্যাণে আসে।

পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণের কথাবার্তা চলছে বহুদিন ধরে। এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি ও অন্যান্য উন্নয়ন-সহযোগী ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহযোগিতার হাত বাড়ায়। ২০১১ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা সেতু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। খবরটি ছিল দেশবাসীর জন্য আনন্দের, আর পরমানন্দের ছিল মন্ত্রী-আমলাদের জন্য।

কোন দেশে কোন সরকার ক্ষমতায় রইল আর কোন সরকার চলে গেল, তা নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও তার বন্ধুরা মাথা ঘামায় না। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর বাবার তালুক থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু যে টাকা তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে কর্জ দেন, তা ধনী দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করা। সেই টাকা ওই সব দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকা—ঘুষের টাকা নয়। সেই টাকা দেশে-দেশে ঠিকমতো ব্যয় হয় কি না, তা পর্যবেক্ষণ করার অধিকার তাদের আছে। বিশ্বব্যাংক একটি অর্থলগ্নীকারী সুদখোরি প্রতিষ্ঠান—কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। তার প্রেসিডেন্টের পদটি একটি চাকরি। ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা করা তাঁর দায়িত্ব। তাঁরও প্রভু আছে। তাঁরা নজর রাখেন, তিনি তাঁর দায়িত্ব ঠিকমতো তালিম করছেন কি না।

আমি যখন আশির দশকে এরশাদ সাহেবের সময় কলাম লেখা শুরু করি, প্রথম লেখাই ছিল বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে। শুধু আমি নই, কাজী নূর-উজ-জামানের নয়া পদধ্বনিতে এবং কাজী শাহেদ আহমেদের খবরের কাগজ ও আজকের কাগজ-এ কমিউনিস্ট নেতা সাইফ-উদ্-দাহার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমদ শরীফ, আবদুল মতিন খান, শাহরিয়ার কবিরসহ অনেকেই বিশ্বব্যাংকের ক্ষতিকর ভূমিকার কথা খুব জোরালোভাবে লিখতেন। মতিউর রহমানের ভোরের কাগজ-এ লিখতাম নিয়মিত। বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা মারাত্মক।

বিশ্বব্যাংকের অপরাধসমূহ জনগণকে অবগত করতে আমরা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দু-আড়াই বছর আগে একটি গণট্রাইব্যুনালে শুনানি করেছিলাম। বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী ছিলেন তার চেয়ারম্যান। প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ আমিও ছিলাম বিচারকদের প্যানেলে। প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সেই ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার জন্য আমরা বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধিকে সমন পাঠিয়েছিলাম। তিনি ও তাঁর কোনো প্রতিনিধি অভিযোগ খণ্ডনের জন্য টাইব্যুনালে উপস্থিত হননি। শুনানি শেষে বিশ্বব্যাংককে অভিযুক্ত করে রায় ঘোষণা করি। এ ধরনের গণট্রাইব্যুনাল ভারতেও হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও আমলারা যে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী, তা তাঁরা বাপ-দাদা বা শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রাপ্ত নন। তাঁরা বিশ্বব্যাংকের কাছে ঋণী। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের কল্যাণেই তাঁরা মহানগরের অভিজাত এলাকায় প্রকাণ্ড বাড়ির মালিক হতে পারেন, ইউরোপ-আমেরিকায় ছেলেমেয়েদের জন্য বাড়ি কিনতে পারেন।

ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন প্রভৃতি কাজে প্রথাগত দুর্নীতি হয়েছে, সেই প্রমাণ বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছে আছে। এর ভাইস প্রেসিডেন্ট কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে এসে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখে খুব রেগে যান। আঙুল নাচিয়ে এবং চোখ পাকিয়ে বলেন, ‘দিস টাইম আমরা কোনো করাপশন বরদাশত করব না।’ তিনি দিব্যি দিয়ে বলেন, ‘নো করাপশন, নো করাপশন, নো করাপশন।’

খুবই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ। আমাদের প্রগলভ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা সেদিন বলেননি, কী কথা কন মেম সাব! আমরা টাকা-পয়সা খাই না। জনগণের জন্য রাজনীতি কইরা সব বিলাইয়া দিছি। সরকারের দিক থেকে টুঁ শব্দটি হলো না। ভাবখানা এমন যে, করাপশনের কথা কইল তো কী হইল?

মেম সাহেব দুই দিন চেঁচামেচি করেন, আমিও তাঁর সঙ্গে দুই দিন দুই টেলিভিশনে উগ্রভাবেই প্রতিবাদ করি। বলেছিলাম, চুরিচামারির কথা ঘরের মধ্যে বসে বলুন, দরজা বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট লোকদের ধমকান, মাওয়া ও আরিচা ঘাটে দাঁড়িয়ে দেশসুদ্ধ আমাদের সবাইকে ধমকানোর অধিকার আপনার নেই। সেদিন আমাদের অতি সাহসী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মনোভাব ছিল—যে গাভি দুধ দেয়, তার লাথি খাওয়াও ভালো।

কিন্তু গাভিটি দুধ দিল না। লাথিই দিল। দুধের বাটি মুখের কাছে ধরে বলল, এই যে ফিরিয়ে নিলাম। দিমু না। খাও, ভালো কইরা খাও।

দুধের বাটি মুখের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরে শুরু হলো হাহাকার। বাটি সরানোর খবর নাকি ঢাকায় কর্তাদের কাছে পৌঁছায় ‘শেষ রাতে’, অর্থাৎ সুবেহ সাদেকের অল্প আগে। দিনেদুপুরে নয়, ভোররাতে বিনা মেঘে বজ্রপাত। আসলে বজ্রপাত শুধু নয়, মন্ত্রীর ভাষায়, ‘বজ্রাঘাত’। বজ্রাঘাতের পর এমন হাহাকার শুরু হয়েছে, যা মিসেস সিম্পসনকে ভালোবেসে সম্রাট অষ্টম এডওয়ার্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারিত্ব পরিত্যাগ করার পরও সে দেশে হয়নি।

দেড় বছর ধরেই পদ্মার ওপর এক খণ্ড কালো মেঘ ঝুলছিল। কন্ট্রাক্টর নির্বাচনের সময়ই বিশ্বব্যাংক ইঁদুরের গন্ধ নাকে টের পায়। তাঁরা কাঁচা লোক নন। খোঁজ নিয়ে দেখেন, কম্ম কাবার। বাংলাদেশ সরকারকে ঘটনাটি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ঘুষদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন এবং ভদ্রভাবে এ কথাও জানিয়ে দেন যে ব্যবস্থা না নিলে তাঁরা এই প্রকল্পে ঋণ না-ও দিতে পারেন। ওই কথায় বাংলাদেশ সরকার চটে যায়। কোনো রকমের বিচারবিবেচনা না করে, তদন্তের প্রয়োজন বোধ না করে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের ঘরের টিভির বাকেশা গর্জে উঠল: কিসের দুর্নীতি? তোমাদের আমরা পরোয়া করি না। আমাদের টাকা দেওয়ার জন্য বহু দেশ এক পায়ে খাড়া। দেখাচ্ছি চমক।

বিশ্বব্যাংক তাজ্জব। বলল তদন্ত করতে, সরকার দৌড় দিল মালয়েশিয়ায়। সেখান থেকে চীন। চীন থেকে কাতার। সংসদ থেকে বলা হলো, কাজই শুরু হয়নি তো দুর্নীতি হয় কীভাবে? আমাদের কিশোর-কিশোরীরা অনেকে তা বিশ্বাস করল।

বিশ্বব্যাংক বোকার মতো তা বলেনি। তারা বলেনি যে আমরা যে টাকা দিয়েছি, সেগুলোর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মচ্ছব চলছে। তাদের অভিযোগ, কাজ পাইয়ে দেওয়ার তদবিরে লেনদেন হয়েছে। এ-জাতীয় লেনদেনের টাকা নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়। পদ্মার মতো কীর্তিনাশার কারণে কানাডার দুজন শ্রীঘর পর্যন্ত গেছেন। পরের টাকা চুরি করা যেমন দুর্নীতি, স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজের টাকা থেকে ঘুষ দেওয়াও স্রেফ দুর্নীতি।

পদ্মা সেতুর দুর্নীতি প্রসঙ্গে গত কয়েক মাসে আমাদের শীর্ষস্থানীয় তিনজন ৮২ রকমের বক্তব্য দিয়েছেন। আমি অঙ্কে ফেল করা মানুষ, আমার গণনায় বা যোগে ভুল হওয়া সম্ভব।

২৯ জুন মধ্যরাত থেকে অন্তিম অধ্যায়ের সূচনা। অস্তাচলগামী সূর্যকে কেউ স্যালুট করে না, বিদায়ী কর্মকর্তাকে তো নয়ই। বজ্রাঘাত হতেই অর্থমন্ত্রী বললেন, অর্থায়ন বন্ধ বিশ্বব্যাংকের কাজ নয়, বিদায়ী প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত দুশমনি। মহাজোটের ভোটাররা বুঝতে পারল, জোয়েলিক লোকটি বিএনপি-জামায়াতপন্থী। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে নতুন প্রেসিডেন্ট প্রসন্ন হবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। দেখা গেল, তিনিও আওয়ামীবিরোধী। তিনি তাঁর প্রথম কার্যদিবসেই শুভ বাংলাদেশের নাম মুখে আনেন। বলেন, আগের দিন যা করা হয়েছে, আলবৎ ঠিক কাজ হয়েছে।

পদ্মা কেলেঙ্কারির দ্বিতীয় পর্বে ছিলেন শুধু মন্ত্রী-রাজনীতিক। অন্তিম পর্বে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন উপসম্পাদকীয় লেখক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা প্রভৃতি। এই পর্বে প্রথম আট দিনে আট পেশার মানুষ ৬৪ রকম কথা বলেছেন। বলা অব্যাহত রয়েছে।

প্রথমে জরিপ করা হলো, বিশ্বব্যাংকের ঘোষণায় কে বেজার হলো আর কার মুখে হাসি ফুটল। এক প্রতিমন্ত্রী জানালেন, একজন নাকি ‘দাঁত কেলিয়ে’ হেসেছেন। কোনো কোনো দাঁত-বের-করা হাসিতে মুক্তা ঝরে, মধু ঝরে পড়ে। যেমন সুচিত্রা সেন ও মাধুরী দীক্ষিতের। কারও কারও হাসিতে ঝরে পড়ে বিষ। সেই হাসি দেখে প্রবল প্রতিমন্ত্রীর পিত্তি জ্বলে।

নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু হবে—এই এক কথাই হাজার কথা। কিন্তু ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিভিন্ন ব্যক্তি বলতে থাকলেন বিচিত্র কথা। টিভিতে শুনলাম, রাষ্ট্রের কোষাগারে এত টাকা আছে, যা গৌরী সেনেরও ছিল না। ওই টাকায়ই পদ্মা সেতু হবে। ১১০০০ কোটি টাকা দিতে চান ইনস্যুরেন্স-কর্তা। সংসদ উপনেতা আমেরিকাকে একহাত নিয়ে বললেন, এক বেলার বাজারের টাকা বাঁচিয়ে ব্রিজ বানাবেন। এক শিল্পগ্রুপ ‘নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সাহসী ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন’ জানিয়ে শবে বরাতের রাতে ওয়াদা করেছেন, ‘ন্যূনতম ২০০ কোটি টাকা অর্থায়নের’ জন্য দেবেন। অর্থনীতি সমিতির সভাপতি বললেন, বাংলাদেশের জন্য এটা আশীর্বাদ, বিশ্বব্যাংককে ক্ষমা চাইতে হবে। দপ্তরবিহীন মন্ত্রী দুর্নীতি পছন্দ করেন না। তিনি ধরেছেন মোবাইল ফোনঅলাদের। দুই টাকা করে প্রত্যেকে দিলে, তাঁর ভাষায়, মাসে ৪২০ কোটি টাকা আসবে। অর্থাৎ ফোরটোয়েন্টি কোটি টাকা। বলা হচ্ছে, ঋণচুক্তি বাতিল হলো ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ প্রভৃতি। কেউ বলছেন, ‘চেক ফতুয়া গায়ে দেওয়া’ কোনো ব্যক্তির কাজ এটা।

চুয়ান্ন বছর ধরে যাঁরা রাজনীতি করছেন, তাঁরা যখন চামচামি ছাড়তে পারেন না, তখন মানুষের করুণা হয়। অতীতে বিশ্বব্যাংক বহু গালাগাল খেয়েছে, কিন্তু মুখ ভেংচানি খায়নি। বাংলাদেশ থেকে খাচ্ছে মুখ ভেংচানি।

বামরা বিশ্বব্যাংকবিরোধী। তাঁরা টাকাপয়সা জোগাড় করতে না পারলেও গতরে খেটে দিতে পারেন। তাঁরা স্লোগান দেবেন: ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

মহাজোটের বড় দলের নেতারা চমকে উঠে বলবেন, আবার শ্রমিকদের এক হওয়ার কথা আসে কেন? এমনিতেই বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে ভাঙচুরের শেষ নেই। বাম নেতারা বলবেন, এবার ডাক দিয়েছি পদ্মা সেতুতে বিনা মজুরিতে এক বছর কাজ করার জন্য।

মহাজোটের নামসর্বস্ব দলের নেতারা, যাঁদের কোনোই মুরোদ নেই, বলবেন উঁচু আদর্শের কথা। পদ্মা সেতুতে ঋণের প্রয়োজন নেই। বিদ্যাসাগর যদি মায়ের জন্য দামোদর নদ সাঁতরিয়ে পার হতে পারেন, আমরাও সাঁতরে যাব এপার থেকে ওপার। সেতুর বদলে সাঁতার।

মহাজোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতা কবি। তিনি বলবেন, বিশ্বে বিশ্বব্যাংক আছে—বাঙালির আছে বিশ্বকবি। বিশ্বব্যাংক বিমুখ করলেও বিশ্বকবি হতাশ করবেন না। একূল ওকূল সব কূল হারানোর পরে, পদ্মার ওপার কাওরাকান্দি ঘাট থেকে পল্লিবন্ধু বলবেন: ‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা।’ এপার মাওয়া থেকে মন্ত্রী জবাব দেবেন: ‘কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা।’

দল, সরকার ও দেশ তিন জিনিস। দল বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। সরকারের বদল হবেই—’২১ সালের পরে হলেও। দেশটা থাকে। রাষ্ট্রীয় ভূগোলের অনিবার্য কারণে পরিবর্তন সাপেক্ষে দেশ স্থায়ী। আমি সরকারের অবৈতনিক উপদেষ্টা হলে বলতাম, একেকজন একেক দিন একেক কথা নয়। যে অভিযোগ বিশ্বব্যাংক করেছে, তা অসত্য হলেও একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ স্বাধীন তদন্ত হওয়া দরকার। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিশ্বব্যাংককেও অনুরোধ করি, বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করুন।

বিশ্বব্যাংক আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত ও আমেরিকার লালিত একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংক ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর যেকোনো লড়াই-সংগ্রামে সক্রিয় সমর্থন দেব। কোনো উগ্র বক্তব্যে দেশের ক্ষতি হবে। বিশ্বব্যাংক থেকে ‘ক্ষতিপূরণ চাওয়া’ সমর্থন করি। তার হিসাব-নিকাশ বিশ্বের কাছে তুলে ধরার দাবিও সমর্থন করি—কিন্তু তার সঙ্গে গ্রাম্য ঝগড়া করা নয়। কাইজা-ফ্যাসাদ করতে গেলে তারা এমন কিছু তথ্য ফাঁস করতে পারে, তাতে ষোলো কোটি মানুষের মুখে পড়বে চুনকালি।