হরতাল না বর্বরতা?

Sohrab.Hassan's picture

গতকাল প্রথম আলোর প্রথম পাতার ছবিটি যেকোনো পাঠকের মনকে ধাক্কা দেবে। বেঞ্চে শুয়ে আছে তিন-চারটি শিশু আর আতঙ্কভরা দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে আছে সতীর্থরা। যে শিশুরা বিদ্যালয়ে এসেছিল পাঠ নিতে, একদল দুর্বৃত্ত তাদের আহত করেছে। আহত অবস্থায় তারা শুয়ে আছে বেঞ্চে। হরতালের নামে যাঁরা এমন নিষ্ঠুর ও বর্বর কাজ করতে পারেন, তাঁরা রাজনৈতিক কর্মী নন, দুর্বৃত্ত। আমরা এই দুর্বৃত্তদের ধিক্কার জানাই।

শুধু কয়েকটি শিশু নয়, এই দুর্বৃত্তরা আহত করেছে সেই বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে। হামলা চালিয়েছে পাশের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপরও। অপরাধ, বিরোধী দলের হরতালের সময় তাঁরা বিদ্যালয় খোলা রেখেছিলেন। শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছিলেন। এই দুর্বৃত্তরা চায় না স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকুক। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করুক। শিক্ষা নয়, বোমা-ককটেল-রামদা-চাপাতির উত্তম ব্যবহারই তাদের আরাধ্য।

গত বৃহস্পতিবার ছিল ১৮-দলীয় জোট আহূত ৩৬ ঘণ্টা হরতালের শেষ দিন। সেদিন সকালে লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ সরকারি প্রাথমিক ও খুনিয়াগাছ উচ্চবিদ্যালয়ে শতাধিক লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করেন। বিএনপির স্থানীয় নেতা আমিনুল ইসলাম এ হামলায় নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ আছে। হামলাকারীরা প্রথমেই খুনিয়াগাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ওপর চড়াও হন। তাঁকে কিছু বলারও সুযোগ দেননি। এরপর তাঁরা শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের বেধড়ক মারধর করেন। বিভিন্ন শ্রেণীকক্ষে গিয়ে ভাঙচুর চালান।

এই নেতা-কর্মীরা যে দলেরই হোক না, তাঁরা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চেনেন। কী করে তাঁরা শিক্ষকদের গায়ে হাত দিলেন? মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের সম্পর্কে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম লিখেছিলেন, ‘যেজন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সেজন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ এখন সেই আবদুল হাকিমের কবিতার পঙিক্ত ঘুরিয়ে বলতে হয়, ‘যেজন শিক্ষকের গায়ে হাত দিতে পারে, সেজন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’

পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন শিক্ষিকা মাইকে ‘স্কুলে হামলা হয়েছে, শিশুদের বাঁচান’ বলে গ্রামবাসীর সহায়তা চাইলে তাঁরা ছুটে আসেন এবং হামলাকারীরা পালিয়ে যান। তাঁরা যদি এতই বীরপুরুষ হবেন তবে কেন পালালেন? স্থানীয় বিএনপির নেতা হাফিজুর রহমান বলেছেন, হামলার সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতা-কর্মী জড়িত নন। বরং স্কুল এলাকায় বিএনপির সাইনবোর্ড আওয়ামী লীগের লোকজন নষ্ট করেছেন। আওয়ামী লীগ তাঁদের সাইনবোর্ড নষ্ট করলে তাঁরা মামলা করতে পারতেন। গ্রামবাসীকে ডেকে প্রতিকার চাইতে পারতেন। সেসব না করে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন কেন? এই বর্বরতার নামই কি রাজনীতি?

সমাজে এখনো মানুষ শিক্ষকদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন। সেই শিক্ষকদের ওপর যাঁরা হামলা করেছেন, অবিলম্বে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হোক। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। যাঁরা শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলেন, যাঁরা কোমলমতি শিশুদের ওপর হামলে পড়তে পারেন তাঁদের রাজনীতি করার বা জেলখানার বাইরে থাকার অধিকার নেই।

আমাদের দেশে কখনোই গ্রাম এলাকায় হরতাল পালিত হয় না। হরতাল হয় শহরে দোকানপাট ও যানবাহন বন্ধ করে। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার দুটি বিদ্যালয়ের ওপর স্থানীয় বিএনপির এই আক্রোশের কী কারণ থাকতে পারে? কী জবাব দেবে হরতাল আহ্বানকারী দল ও জোট? জোট নেতারা কি তাঁদের কর্মীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ছোট্ট শিশুদের পেটানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন? বিদ্যালয়ে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করতে বলেছিলেন? বই ছিঁড়ে ফেলতে বলেছিলেন? যদি না বলে থাকেন তাহলে খুনিয়াগাছ বিদ্যালয়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাঁরা কী ব্যবস্থা নেন, আমরা দেখতে চাই। আর যদি তাঁরা ব্যবস্থা না নেন, তাহলে এই শিক্ষক ও শিশুদের ওপর হামলার দায় নেতাদেরও নিতে হবে।
কেবল লালমনিরহাটের ঘটনাই শেষ নয়, বৃহস্পতিবার সকালে মায়ের হাত ধরে নবম শ্রেণীর ছাত্রী অন্তু বড়ুয়া যাচ্ছিল চট্টগ্রামের চেরাগি পাহাড় এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে। কিন্তু মা ও মেয়ে কোতোয়ালি থানার মোমিন রোডের হেমসেন লেনে আসতেই শিবিরের মিছিল থেকে ককটেল নিক্ষেপ করা হয় এবং অন্তুর ডান চোখে স্প্লিন্টারের আঘাত লাগে। এখন মেয়েটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হরতালে পথচারীদের চলাচল বন্ধ—এ রকম কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি বিরোধী দল। তাহলে কেন রাস্তায় ককটেল নিক্ষেপ করে পথচারীকে আহত করা হলো? হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্তু বলেছে, ‘আমি ঈশ্বরের কাছে বিচার চাই। যারা এসব করেছে তাদের যেন সুমতি হয়।’ কিন্তু যারা ককটেল মেরে, গাড়িতে আগুন জ্বেলে হরতালের নামে জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, কখনোই তাদের সুমতি হবে না।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, এইচএসসি পরীক্ষার সময়ও হরতাল হতে পারে। আরও হরতাল মানে আরও সংঘর্ষ, আরও প্রাণহানি, আরও সম্পদহানি। ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ পরীক্ষার সময় হরতাল না দেওয়ার জন্য বিরাধী দলের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। বলেছেন, পরীক্ষার সময়ে রাতে হরতাল করুন, দিনে নয়। নিশ্চয়ই পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধী দলের নেতাদের ছেলেমেয়েরাও আছে। মন্ত্রীর আবেদনে সাড়া দিন, অন্তত নিজেদের ছেলেমেয়েদের স্বার্থে পরীক্ষার সময়ে হরতাল বন্ধ রাখুন। হরতালের নামে পরীক্ষার্থীদের জিম্মি করবেন না।

হরতালের নামে শিশুদের ওপর এই বর্বর হামলা ও নিরীহ পথচারীর ওপর ককটেল নিক্ষেপের মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হোক। সবশেষে কিশোরী অন্তুর ভাষায় বলি, ‘কেবল কর্মী নয়, রাজনৈতিক নেতাদেরও সুমতি হোক।’