ঈদ, তালা ও মেডিকেলে ভর্তি

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘরে তালা দিয়ে নিরাপদে সবাইকে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শ জনগণকে মোটেই আশ্বস্ত করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী টিভির টক শোওয়ালাদের সরকারের প্রতিপক্ষ ভাবলেও ঘরমুখী লাখো মানুষের ভোগান্তি নিয়ে তাঁদের তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। ঈদের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অলিম্পিকের সুযোগে দুই দফায় লন্ডন ঘুরে এলেন, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বরাবরের মতো সৌদি বাদশাহের সম্মানিত মেহমান হয়ে ওমরাহ করে এলেন, আর সাবেক সামরিক শাসক এরশাদ দিল্লিতে গেছেন নিজের হারানো ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে।
দেশের হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী, যাঁরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে ইচ্ছুক, তাঁরা খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন। ঈদের আগে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা বহাল রাখার দাবিতে তাঁরা এক দফা আন্দোলন করেছেন এবং ২৭ আগস্টের পর আবার রাজপথে নামবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যে দেশে পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে আন্দোলনের নামে হরহামেশা গাড়ি ভাঙচুর চলে, সেই দেশে ভর্তি পরীক্ষার দাবিতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নেমে আসার ঘটনাকে কোচিংওয়ালাদের ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে-বিপক্ষে জোরালো যুক্তি আছে। কিন্তু সরকার ভর্তি পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত আগে নিল না কেন? সব ক্ষেত্রেই সরকারের দীর্ঘসূত্রতা, আজকের কাজ পরশু করার মানসিকতা।
বহু বছর ধরে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির জন্য পরীক্ষার নিয়ম চালু হয়ে আসছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি হন। সব সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি পরীক্ষা যথারীতি চালু আছে। তাহলে হঠাৎ করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা কেন বাতিল করা হলো? গত বছরের মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার ফল নিয়ে এখনো আদালতে মামলা ঝুলছে। ভুল প্রশ্নপত্র ও প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার দায় কেন শিক্ষার্থীরা নেবেন?
প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পরীক্ষাপদ্ধতির ভুল সংশোধন করতে গিয়ে সরকার নতুন ভুলের জন্ম দিচ্ছে কি না, তা-ও ভেবে দেখতে হবে। এবারও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিট হয়েছে। আদালত ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়েছেন। সব ব্যাপারে আদালতকে টেনে আনা সমীচীন নয়। উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের সব প্রতিষ্ঠানকেই চলতে হবে নিজস্ব আইনকানুন ও নীতিমালার ভিত্তিতে। গত বছর মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় বেশ কিছু অনিয়ম ও ভুল চিহ্নিত হওয়ায় সরকার এবার পরীক্ষাটিই বাতিল করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, তাঁদের ওপর অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এ কারণে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন।
শিক্ষার্থীদের ওপর যে অন্যায় হয়নি, সে কথা বোঝানোর দায়িত্ব সরকারের। এই যে ভর্তি নিয়ে প্রতিবছর মহা হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে যায়, লাখ লাখ শিক্ষার্থী অনিশ্চয়তায় থাকেন, এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়, কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে ১০টি জায়গায় পরীক্ষা দিতে হয়, সেসব নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো মাথাব্যথা আছে কি? অধিকাংশ শিক্ষার্থী পছন্দের বিষয়টি পান না। এর কি কোনো প্রতিকার নেই? সরকারের উচিত, দেশের সেরা বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে আসা। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলাদা ভর্তি পরীক্ষা হবে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিন্ন পরীক্ষা হবে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষাই নেওয়া হবে না—এই স্ববিরোধিতা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই নিয়ম হওয়া উচিত।
সরকার মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি আগে নিলে হয়তো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যেতে হতো না। আগে থেকেই তাঁরা বুঝতে পারতেন, এত দিন যে পদ্ধতিতে ভর্তির কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, সেই পদ্ধতিতে এখন ভর্তি হওয়া যাবে না। যেমনটি হয়েছে এবার উচ্চমাধ্যমিকে। সব কলেজে একই নিয়ম। তাহলে সব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই নিয়ম চালু হবে না কেন?
ভবিষ্যতে সব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিন্ন ভর্তি-প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যদি মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করা হয়ে থাকে, তাকে একেবারে অযৌক্তিক বলা যাবে না। কিন্তু যদি প্রশ্নপত্রে ভুল কিংবা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কোনো পরীক্ষাই ত্রুটিমুক্ত নয়। সব বোর্ডে পাসের হারও এক নয়। সব বোর্ডের পরীক্ষকেরা একই দৃষ্টিভঙ্গিতে উত্তরপত্র দেখেন, তা-ও বলা যাবে না। সব মিলিয়েই আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় মহা নৈরাজ্য চলছে। ভর্তির ব্যাপারে এক বছরে এক নিয়ম চালু করে এ সমস্যার সমাধান হবে না।
সরকার মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের পক্ষে আরেকটি যুক্তি দেখিয়েছে, কোচিং-বাণিজ্যের। কিন্তু একটি মাত্র বিভাগ—মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা রহিত করে এই কোচিং-বাণিজ্য তারা কীভাবে বন্ধ করবে? যাঁরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, যাঁরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, যাঁরা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, তাঁদের জন্য কি কোচিং-বাণিজ্য উন্মুক্ত থাকবে?
সব ক্ষেত্রে সরকারের যে স্ববিরোধিতা আছে, তারই প্রতিফলন দেখা গেল উচ্চশিক্ষায় ভর্তি-প্রক্রিয়ায়। এই ঈদে মেডিকেলে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। সরকারের সিদ্ধান্ত যে শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিপরীত নয়, সেই কথাটিও তাঁদের বোঝাতে হবে।
রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যাটির সমাধান হোক।
সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।
- Sohrab.Hassan's blog
- Login to post comments
- 719 reads
একই রকম আরো কিছু ব্লগ
- আমরা লিখিয়েরা ও আদালত - Ataus.Samad
- বিচারপতি হাবিবুর রহমানের স্পষ্ট ভাষণ - Ataus.Samad
- চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক - abdullah.shafi
- ভারতে বাংলাদেশ-ভাবনা - সাজ্জাদ শরিফ - sajjad.sharif
- সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা - Haidar.Akbar.Kh...
- একটি 'অকারণ' বিতর্কের 'প্রকৃত কারণ' - Mujahidul.Islam...
- সাতটি লাশের রাজনীতি - Mohshin.Habib
- প্লিজ প্রধানমন্ত্রী, খালেদা জিয়ার ভাষায় কথা বলে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবেন না - Abdul.Gaffar.Ch...
- ভালো কাজে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার - Ataus.Samad
- কচুঘেচু, লুটপাটের সংস্কৃতি - Hasan.Hafiz

1Comments
Sohrab saheb,
Sahara gave an advice to be careful and take safety measures. Why criticize that? If you don't like that, keep your doors open. Do you think any govt. can keep one police in front of each house in BDesh? Where were you Mr. Sohrab when BNP-Jamat made grenade attack on a public meeting and killed 23 people Y made thousands handicapped?
If you don't like self defence safety tips, go and walk in the middle of the road, jump in fire and keep your gas burner on 24/7. Pl write something fruitful. Don't try to be a hero by criticizing a safety tip? P use your talent to give some alternatives to help this poor nation and its poor people.