‘ওয়াদা’ ও ‘শপথ ভঙ্গকারী’ সাংসদেরা

Sohrab.Hassan's picture

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর এ পর্যন্ত পাঁচটি সংসদ গঠিত হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদ দিলে চারটি। এ চার সংসদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব, পরের সংসদের চেয়ে আগের সংসদটি কিঞ্চিৎ বেশি কার্যকর ছিল। অন্তত বিরোধী দলের অনুপস্থিতির নিরিখে এ কথা বলা যায়।

পরিসংখ্যানে দেখতে পাই, পঞ্চম সংসদে মোট ৪০০ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল বয়কট করেছে ১৩৫ দিন (১৯৯১-১৯৯৫)। সপ্তম সংসদে মোট ৩৮২ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল বর্জন করেছে ১৬৩ দিন (১৯৯৬-২০০১)। অষ্টম সংসদে মোট ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল বর্জন করেছে ২২৩ দিন (২০০১-২০০৬)। ২৫ জানুয়ারি তক বর্তমান সংসদে অধিবেশন চলেছে ২৫৫ দিন। বিরোধী দল বর্জন করেছে ২০১ দিন। উপস্থিত ছিল মাত্র ৫৪ দিন। এ ধারা বজায় থাকলে আগামী দেড় বছরে তাদের অনুপস্থিতি ৩০০-এর ঘর ছাড়িয়ে যাবে। আর সরকারি দল ও বিরোধী দল সংসদ অকার্যকর করার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকবে। বিরোধী দলে অভিযোগ, বর্তমান সংসদে তারা শত শত মুলতবি প্রস্তাব আনলেও স্পিকার একটি নিয়ে আলোচনা করেননি। স্পিকার বলেছেন, ‘বিরোধী দলের সাংসদেরা মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব আনলেও সংসদে আসেন না। অনুপস্থিত সদস্যের মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার বিধান নেই।’

আর সরকারি দলের সাংসদেরা মূলতবি বা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রস্তাব আনবেন কী? তাঁরা তো ব্যবসা-বাণিজ্য-তদবির ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান সংসদে ৬২ শতাংশ ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের একমাত্র কাজ হলো মুনাফা লোটা। সরকারি দলে থাকলে আরও সুবিধা। অতএব, অনেকেই সাংসদ পদবিটি সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করাই উত্তম।

তুলনামূলকভাবে পঞ্চম সংসদের প্রথম তিন বছর সরকারি ও বিরোধী দলের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত ছিল। সেই সংসদে একাধিক মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব নিয়েও ভোটাভুটি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দল হেরে গেছে। কিন্তু সেই সুযোগে তারা দেশবাসীর কাছে তাদের কথাগুলো তুলে ধরতে পেরেছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মনে থাকার কথা, সেই সংসদে গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে তাঁর আবেগময় ভাষণের পর সরকারদলীয় সাংসদেরা কীভাবে টেবিল চাপড়ে তাঁকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। প্রয়াত ফরিদা হাসান নিজের আসন থেকে ছুটে এসে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তাতে কিন্তু তাঁদের সদস্যপদ চলে যায়নি। সেই সংসদে বিএনপির একজন মন্ত্রীর দুর্নীতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল। একাত্তরের ঘাতক দালালবিরোধী আন্দোলনে জাহানারা ইমামসহ বিশিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়েরের প্রতিবাদে বিরোধী দল সংসদ বর্জন করলে সরকার তাদের সংসদে ফিরিয়ে আনতে চার দফা চুক্তি পর্যন্ত করেছিল, যার একটি ছিল প্রচলিত আইন অনুযায়ী গোলাম আযমের বিচার করা। আজ বিএনপির অবস্থান কোথায়? অথচ মানুষগুলো একই। এভাবে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ থেকে নিজেদের বিযুক্ত করলে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে কোনো পার্থাক্য থাকবে না।

সপ্তম জাতীয় সংসদও প্রথম দিকে মোটামুটি সচল ছিল, কারণ সেই সংসদেও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও জাসদের আ স ম রবকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল তারা। কিন্তু সপ্তম সংসদে সেই সুস্থ ধারা বেশি দিন চলেনি আওয়ামী লীগের লোকভাগানো রাজনীতি (বিএনপির দুজন সাংসদকে ভাগিয়ে নিয়ে মন্ত্রী করা হয়েছিল) এবং বিএনপি, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ও জামায়াতের ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের কারণে।

অষ্টম ও নবম সংসদ কার্যকর না হওয়ার প্রধান কারণ ক্ষমতাসীনদের অভাবিত বিজয় এবং পরাজিত পক্ষের ফল মেনে নিতে না পারার ভ্রান্তিবিলাস। বিরোধী দল নির্বাচনী ফল না মানলেও পদ-পদবি ছাড়তে রাজি নয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমরা শপথও নেব না, সংসদেও যাব না।’ তবে তিনি সংসদে গিয়েছিলেন ৭০ কার্যদিবস পরে। নবম জাতীয় সংসদ গঠিত হওয়ার তিন বছর পরও খালেদা জিয়া বলে চলেছেন, ‘২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ও ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের ষড়যন্ত্রের ফল।’ এসব কথাবার্তার মাধ্যমে তাঁরা জনগণ তথা ভোটারদের রায়কেই অপমান করে চলেছেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একবার বলেছিলেন, ‘সমস্যা হলো চেয়ার একটি, দাবিদার দুজন।’ আমাদের নেত্রীরা এতই উঁচু মাপের যে কখনোই নিজেদের বিরোধী দলে ভাবতে পারেন না। এ কারণে খালেদা জিয়া নবম সংসদে মাত্র ছয় দিন হাজিরা দিয়েছেন।

আরেকটি ধারণা বিরোধী দলকে সংসদবিমুখ করেছে। তা হলো, দুই দলই পালাক্রমে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে রাজপথে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। কেউ ১৮৩ দিন, কেউ ১৭২ দিন হরতালের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। আগামী নির্বাচন কমিশনে কারা যাবেন, কার অধীনে নির্বাচন হবে—দলীয় না তত্ত্বাবধায়ক, সেই বিতর্কের চেয়েও দুই পক্ষের কাছে বড় হয়ে উঠেছে রাজপথে নিজেদের জয় নিশ্চিত করা। পত্রিকায় এসেছে, ২৯ জানুয়ারি বিরোধী দলের গণমিছিলের দিন সরকারি দলও মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ ডেকেছে। এ খবর সত্য হোক বা মিথ্যা হোক—সরকার ও বিরোধী দল ইতিমধ্যে মুখোমুখি অবস্থানে। শেয়ানে শেয়ানে লড়াই চালিয়ে যাবে। আর আমজনতা চিড়েচ্যাপ্টা হতে থাকবে।

এই হলো আমাদের গণতন্ত্রের নমুনা।
পাঁচ বছরে মাত্র একটি দিনের গণতন্ত্রের জন্য কত আন্দোলন, কত মহড়া, কত রক্তপাত! কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ চায় ৩৬৫ দিনের গণতন্ত্র। প্রতিদিনই তারা গণতান্ত্রিক, মানবিক ও নাগরিক অধিকার ভোগ করতে চায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশ চায়। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়। সেসব নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি—কারো মাথাব্যথা নেই।

২.
বাংলাদেশের মানুষ এ পর্যন্ত নয়টি সংসদ গঠন করার সুযোগ পেলেও তাঁরা প্রতিনিধি হিসেবে যাঁদের পাঠিয়েছেন, তাঁরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেননি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, এখন সরকারি দলের সাংসদেরাও সংসদে যেতে আগ্রহী নন। হাতেগোনা কয়েকটি দিন বাদ দিলে এই নবম সংসদেও কোরাম-সংকট ছিল নিয়মিত ঘটনা। এর জন্য অপচয় হয়েছে সাত হাজার ৭৮৫ মিনিট। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাব অনুযায়ী, কোরাম-সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। (প্রথম আলো, ২৫ জানুয়ারি, ২০১২)
আমরা কথায় কথায় পাকিস্তানি শাসকদের নিন্দামন্দ করি, কিন্তু সেখানেও সংসদ কার্যকর করা কিংবা জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তানে জিলানি সরকার এ মুহূর্তে সেনাবাহিনী দ্বারা কঠিন চাপের মুখে আছে। কিন্তু সেই সুযোগে নেওয়াজ শরিফ সরকারকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পরিষদে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে বেঠক করেছেন।

বাংলাদেশে সম্প্রতি সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের চেষ্টা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনার সম্ভাবনা একেবারেই শূন্য। কেননা বিরোধী দল সংসদে যাবে না। সরকারি দলও তাদের সহযোগিতা চাইবে না। তারা তদন্তের আগেই ‘ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের’ সঙ্গে বিরোধী দলের যোগসাজশ আবিষ্কার করে ফেলেছে। আর বিরোধী দল এই সুযোগে গণঅভ্যুত্থানের মওকা খুঁজছে। এ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বক্তৃতা-বিবৃতির ঝড় বইছে। উভয় পক্ষ সমস্যার সমাধানের চেয়ে সমস্যা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। সেই হিসাবে ২৫ জানুয়ারি সংসদের তিন বছর পূর্তি হলো। এ তিন বছরে বিরোধী দল সংসদ বর্জনের ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। নবম সংসদে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের হার ৭৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অষ্টম, সপ্তম ও পঞ্চম সংসদে এ হার ছিল যথাক্রমে ৬০, ৪৩ ও ৩৪ শতাংশ। অথচ বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল, সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি থেকে তারা বেরিয়ে আসবে। সরকারি দল বলেছিল, বিরোধী দলের সহযোগিতা নিয়ে সরকার ও সংসদ চালাবে। কেউ কথা রাখেনি।

৩.
জাতীয় সংসদের প্রত্যেক সদস্য বা সাংসদকে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই একটি শপথনামা পাঠ করতে হয়। সেটি এরকম: ‘আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি তাহা আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য ঘোষণ করিব। ...এবং সংসদ সদস্য রূপে আমার কর্তব্য পালন ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হইতে দিব না।’

সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে আছে, ‘জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশে একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত হইবে।’ একজন সাংসদের দায়িত্ব সেই আইন প্রণয়নে সক্রিয় অংশ নেওয়া। আইন প্রণয়নে অংশ নেওয়া মানে সংসদে উত্তাপিত বিলের পক্ষে শুধু হাত তোলা নয়, বিলের বিরোধিতাও আইন প্রণয়নের অংশ। সাংসদদের দ্বিতীয় দায়িত্ব হলো, জনগণের সমস্যা সমাধানে সঠিক নীতি-কৌশল প্রণয়ন। আমরা উদাহরণ হিসেবে বার্ষিক বাজেটের কথা বলতে পারি। কিন্তু আমাদের বিরোধী দলের সাংসদেরা কোনো দায়িত্ব পালনেই রাজি নন। অথচ তাঁরা সংসদ সদস্য থাকবেন। বেতন-ভাতা নেবেন। কিন্তু সংসদে যাবেন না।

এই যে সংসদে না গিয়ে তাঁরা একদিকে যেমন শপথভঙ্গ করছেন, অন্যদিকে নির্বাচকমণ্ডলীর সঙ্গে প্রতারণা করছেন। কেননা সংসদে গিয়ে জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্যই তাঁদের সেখানে পাঠানো হয়েছে।

আজ যাঁরা বিরোধী দলে আছেন, তাঁরাই শুধু শপথ ভঙ্গ করেননি, যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরাও বিরোধী দলে থাকতে একই কাজ করেছেন। দিনের পর দিন সংসদ বর্জন করেছেন। এখন বিরোধী দলন সাংসদেরা সংসদ বর্জনের পক্ষে যেসব যুক্তি দিচ্ছেন, তাঁরাও সেসব যুক্তিই দিতেন।
শেষ কথা। অতীতের ও বর্তমানের শপথভঙ্গকারীদের হাত থেকে জাতি মুক্তি চায়।

» Topics: