নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস এবং অপরাধ থেকে দায়মুক্তির সংস্কৃতি

Shahriar.Kabir's picture

গ্রামীণ ব্যাংকসহ অর্ধ শতাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে হালে গণমাধ্যমে যে বিতর্কের ঝড় উঠেছে তার সূচনা হয়েছে নরওয়ের প্রামাণ্য চিত্রনির্মাতা টম হেইনেম্যানের 'মাইক্রোডেট' মুক্তি লাভের পর। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এবং বিভিন্ন বস্নগে এরপর থেকে ড. ইউনূসের পক্ষে-বিপক্ষে কয়েক হাজার লেখা প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। টমের প্রামাণ্যচিত্র ইউরোপে প্রদর্শিত হয়েছে ২০১০-এর নবেম্বরে। পাঁচ মাস পর গত ২৬ এপ্রিল এ ছবির বাংলা ভাষ্য প্রদর্শিত হয়েছে ঢাকার এটিএনে। প্রামাণ্যচিত্রটি দেশে প্রদর্শিত হওয়ার আগেই অনেকে খবরের কাগজে এর বিষয়বস্তুর বিবরণ পড়ে ইউনূসের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

এই বিতর্কের এক পর্যায়ে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি (ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১) লঙ্ঘন করে ৬০ বছর বয়স সীমা অতিক্রম করার পর অবৈধভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে আসীন থাকার জন্য ড. ইউনূসকে তার পদ থেকে অপসারণ করেছে। এর পাশাপাশি সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকা- সম্পর্কে টমের প্রামাণ্যচিত্রে যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে তা তদনত্ম করার জন্য বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক একে মনোয়ার উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি রিভিউ কমিটি গঠন করেছে, যে কমিটি ২৫ এপ্রিল তাদের প্রতিবেদন সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করেছে। পরদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে পদে পদে গ্রামীণ ব্যাংকে ড. ইউনূসের অনিয়ম ও বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে রিভিউ কমিটি এবং ৮৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সেসব অনিয়মের বিবরণ এবং সঙ্কট উত্তরণের সুপারিশও করা হয়েছে। (কালের কণ্ঠ, ২৬ এপ্রিল ২০১১)

এর আগে গত ৩ মার্চ (২০১১) গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ থেকে তার অপসারণকে অবৈধ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে উচ্চতর আদালতে সরকারের বিরম্নদ্ধে মামলা করেন ড. ইউনূস। ৮ মার্চ হাইকোর্ট ড. ইউনূসের অভিযোগ বাতিল করে তার অপসারণ আইনানুগ বলে রায় দেয়। হাইকোর্টের রায়ের বিরম্নদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপিল করেও মামলায় হেরে যান ইউনূস। তারপরও তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় অগ্রাহ্য করে গ্রামীণ ব্যাংকে নিয়মিতভাবে অফিস করছেন এবং তাকে পূর্ব পদে বহাল রাখার দাবিতে ব্যাংকের কর্মচারী ও ঋণগ্রহীতাদের আন্দোলনে নামিয়েছেন।

এর পাশাপাশি ড. ইউনূস বিদেশে তার বন্ধুদের, বিশেষভাবে আমেরিকার ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে বাংলাদেশকে হুমকি দিতেও পিছপা হননি। গত মার্চে আমেরিকার একজন এ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রবার্ট বেস্নক বাংলাদেশে এসে সকল কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে বলে গেছেন_ইউনূসের সঙ্গে সরকার যদি সমঝোতা না করে তাহলে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে তার প্রভাব পড়বে। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে হিলারি ক্লিনটনের প্রীতিধন্য ড. ইউনূসকে বহাল রাখার জন্য বাংলাদেশের প্রতি বেস্নকের এই হুমকিতে সচেতন নাগরিক সমাজ ক্ষুব্ধ ও বিচলিত হলেও ইউনূসপ্রেমী সুশীল সমাজ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যারপরনাই বিগলিত হয়েছে। গত ২৪ মার্চ সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে আমরা বলেছিলাম_'গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি লঙ্ঘন করে প্রায় দশ বছর গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপক পরিচালক পদে নিযুক্ত ছিলেন_উচ্চতর আদালতে এটি বিচারাধীন থাকার পরও বাংলাদেশ সফরকারী মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে যে মনত্মব্য করেছেন তা শুধু অবাঞ্ছিত বা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহিভর্ূত নয়, একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম সত্তার প্রতি উপহাসের শামিল বলে আমরা মনে করি। আমরা একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যনত্মরীণ বিষয়ে এ ধরনের অযাচিত হসত্মক্ষেপ ও চাপ প্রয়োগের তীব্র নিন্দা করছি।'

'পৃথিবীর কোন দেশে কোন ব্যক্তি আইনের উর্ধে নন। উচ্চতর আদালত যদি মনে করেন ড. ইউনূসের অপসারণ অবৈধ তাহলে নিশ্চয়ই তিনি সসম্মানে তাঁর পদে বহাল থাকবেন। একটি দেশের আদালতে বিচারাধীন একটি বিষয় সম্পর্কে অন্য দেশের কোন সরকারী প্রতিনিধি কোন মনত্মব্য করতে পারেন না। আমেরিকা এমন একটি দেশ যা আনত্মর্জাতিক আইন, রীতি-নীতি, ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে একের পর এক ন্যক্কারজনক সব কাজ করছে। কিছুদিন আগে আমেরিকার আরেক প্রতিনিধি বাংলাদেশে এসে যেমন বলে গেছেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে কয়েকজন ব্যক্তির বিচার করা যেতে পারে; কিন্তু কোন সংগঠনের বিচার করা যাবে না। এ কথা বলে মার্কিন বিশেষ দূত প্রমাণ করেছেন '৭১-এ আমেরিকার সরকার ও প্রশাসন যেভাবে গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে ছিল এখনও তাই আছে। '৭১-এর সুহৃদ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিচার বন্ধ করতে না পেরে আমেরিকা ড. ইউনূসের বিচার বন্ধের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।'

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব অবশ্য এ বিষয়ে মনত্মব্য করতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মৈত্রীবন্ধন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে মুহাম্মদ ইউনূসের অপসারণের কারণে ক্ষতিগ্রসত্ম হবে না। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে, কোন ব্যক্তির অবস্থানের ওপর নয়।
আমরা খবরের কাগজ থেকে জেনেছি_ শীঘ্রই বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া 'নারদ নারদ' বলে আমেরিকা সফরে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি বলেও ফেলেছেন বাংলাদেশের অবস্থা নাকি মিসর আর লিবিয়ার মতো হবে।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর বিএনপি-জামায়াত দিশেহারা হয়ে পড়েছে। একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইবু্যনাল গঠন এবং '৭১-এর গণহত্যা, মানবতার বিরম্নদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিরোধী জোটের ৬ শীর্ষ নেতার গ্রেফতার, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান এবং ২১ আগস্টের নৃশংস গ্রেনেড-বোমা হামলার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতাদের সম্পৃক্তি, সেই সঙ্গে খালেদা জিয়ার পুত্রদ্বয়ের বিরম্নদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মামলা; অপরদিকে দলের ও জোটের ভেতর বহুমাত্রিক সঙ্কটে চোখে অন্ধকার দেখছেন বিরোধী দলের 'আপোসহীন' নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, বিদু্যৎ ঘাটতি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি প্রভৃতি ইসু্যতে খালেদা জিয়া আন্দোলনের ডাক দিয়ে জনসমর্থন না পেয়ে আমিনীর নেতৃত্বে জঙ্গী মৌলবাদীদের বলেছেন, 'নারীনীতি', 'শিক্ষানীতি' ইত্যাদি নিয়ে মাঠ গরম রাখতে, অন্যদিকে বাংলাদেশে মিসর-লিবিয়ার মতো কিছু ঘটানো যায় কি না এ নিয়ে হিলারির সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে তিনি আমেরিকা যাচ্ছেন। মার্কিন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য খালেদা জিয়া বার বার বলছেন, বাংলাদেশে হিলারিসুহৃদ ইউনূস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।

ইউনূসসুহৃদ বাংলাদেশের সুশীল সমাজও খালেদা জিয়ার সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলছেন, ইউনূস আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। এরা আরও বলছেন, নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের মতো আনত্মর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিকে আদালতে পাঠিয়ে সরকার ঘোরতর অন্যায় কাজ করেছে। এমন কথাও বলা হচ্ছে, যাঁরা ইউনূসের বিরম্নদ্ধে কথা বলছেন তাঁরা সব আওয়ামী লীগের দালাল এবং ইউনূসের সমালোচনা করে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হচ্ছে। তাঁরা মনে করেন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু থেকে আরম্ভ করে হাসিনা, খালেদা সবার সমালোচনা করা যাবে কিন্তু ইউনূসের সমালোচনা করা যাবে না। ইউনূসপ্রেমী সুশীল এবং তাদের মুরবি্বদের লাগাতার হুমকি-ধমকি দেখে শুনে আশঙ্কা করছি ক'দিন পর আমিনীর মতো তাঁরা বুঝি ইউনূস সমালোচকদের জিব কেটে ফেলার ফতোয়া দেবেন।

পশ্চিমের কিছু পত্রিকায় ও ইন্টারনেটে ইউনূসকে আকাশে তুলতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেছে। কোন পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে_'নোবেল বিজয়ী ইউনূসের বিরম্নদ্ধে বাংলাদেশ' কিংবা 'ইউনূস বনাম বাংলাদেশ।' পশ্চিমের হোমরা-চোমরারা 'ইউনূসসুহৃদ মঞ্চ' গঠন করেছেন, হেজি-পেজিরাও পিছিয়ে নেই।
গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে ইউনূস, তার পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগীরা কতগুলো কল্পকাহিনী রচনা করেছেন। এর একটি হচ্ছে ড. ইউনূস দারিদ্র্যলাঞ্ছিত এই বিশ্বে দারিদ্র্যজনের জন্য 'ক্ষুদ্রঋণের জনক।' ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের জনক কিনা এ নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব। তার আগে আলোচনা করা দরকার ড. ইউনূসের ওপর দেবত্ব আরোপ সম্পর্কে। পশ্চিমের সাংবাদিকরা ইউনূসের প্রতি তাদের ভালবাসার অভিব্যক্তি হিসেবে প্রায়ই লেখেন 'মাইক্রোক্রোডিট গুরম্ন।' এই 'গুরম্ন'র শানে নজুল আমাদের বোঝা উচিত।

আমাদের দেশে আউল-বাউল-মারফতিরা গুরম্নর ভজনা করেন, গুরম্নর মাধ্যমে আলস্নাহ বা ঈশ্বরের নৈকট্য কামনা করেন। এর বিপরীতে ভারতের মাড়োয়াড়ি ব্যবসায়ীরা আধ্যাত্মিক গুরম্নদের ব্যবহার করেন পার্থিব সম্পদ লাভের হাতিয়ার হিসেবে। সদ্যপ্রয়াত সাঁইবাবা, কিংবা গুরম্ন রজনীশ হচ্ছেন সেই গোত্রের গুরম্ন, যাদের নিজস্ব জেট বিমান থাকে বিশ্বব্যাপী ভক্তকুলকে দর্শন ও আশীর্বাদ প্রদানের জন্য। পাকিসত্মানে আছে পীর বাবারা, যাদের ভক্তদের তালিকায় রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা থেকে আরম্ভ করে জাঁদরেল সমরনায়ক, আমলা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এমনকি চলচ্চিত্র তারকারাও থাকেন। এ নিয়ে তাহমিনা দুররানী একটি অসাধারণ উপন্যাস লিখেছেন 'বস্নাশফেমি' নামে।

আমরা শুরম্ন বানাই, গুরম্নর ভজনা করি ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের জন্য। আমেরিকাসহ পশ্চিমা জগতে 'গুরম্ন' বা 'সেলিব্রিটি' সৃষ্টি করা হয় 'ডলার', 'ইউরো' বা 'পাউন্ড' নামক ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য। ড. ইউনূসকে পশ্চিমে যারা গদগদ হয়ে 'মাইক্রোক্রেডিট গুরম্ন' বলেন, ইউনূস বা বাংলাদেশের সুশীল বাবুরা স্মিত হেসে দক্ষিণ হসত্ম প্রসারিত করে তাদের উদ্দেশে বলতে পারেন 'তথাস্তু', বা 'জয় হোক।' কাউকে গুরম্ন বা দেবতা বানাবার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকে সকল বিতর্ক ও সমালোচনার উর্ধে স্থাপন করা। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে_'দেবতার বেলায় লীলা, আমাদের বেলায় পাপ।' এর উৎপত্তি হচ্ছে রাধার সঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রেম থেকে। আত্মীয়তার সম্পর্কে রাধা ছিলেন কৃষ্ণের মামী। তাঁরা যখন প্রেম করেন তখন সেটা পরকীয়া বা পাপ নয়। কিন্তু যদু মধু বাবুরা যদি মামীর সঙ্গে প্রেম করেন সেটা সমাজের বিচারে তা ঘোরতর পাপ হিসেবে গণ্য হবে।

আমি যদি কারও বাড়ি থেকে ঘরের চালা, আসবাবপত্র, তৈজসপত্র কিংবা অন্যান্য সামগ্রী লুট করি ফৌজদারি দ-বিধির ৩৭৯ ও ৩৮০ ধারা অনুযায়ী তা হবে জামিন অযোগ্য অপরাধ, তিন থেকে সাত বছরের শাসত্মির আইন আছে। ড. ইউনূস বা তার সহযোগীরা যদি এমত কাজ করেন তাহলে তা শতকরা ৯৮ ভাগ ঋণ আদায়ের কৃতিত্ব হিসেবে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হবে।

আমাদের দেশের গুরম্ন ইউনূসের ভক্তকুলের তালিকায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি থেকে আরম্ভ করে লেখক হুমায়ূন আহমেদ পর্যনত্ম আছেন। বাংলাদেশের গুরম্নভক্ত সুশীল বাবুদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে হুমায়ূনও বলছেন, ইউনূসের মতো দেবতুল্য মানুষের সমালোচনা অত্যনত্ম অনুচিত ও হীনম্মন্যতার পরিচায়ক। 'মাইক্রোক্রেডিট গুরম্ন' ইউনূসের বন্দনা করতে গিয়ে হুমায়ূন বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেছেন_'যদ্যপি আমার গুরম্ন শুঁড়িবাড়ি যায়/ তদ্যপি আমার গুরম্ন নিত্যানন্দ রায়।' (প্রথম আলো, ২৮ এপ্রিল ২০১১)

গুরম্নদের সম্পর্কে ভক্তের এই উচ্ছ্বাস অন্ধ। গুরম্ন সৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্ধত্ব তৈরি করা_গুরম্ন যা করবেন তা চোখ বুজে মেনে নাও, প্রশ্ন করলে নরকে যাবে। গ্রামীণ ব্যাংকের কয়েক হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী এভাবে নরকে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনের শেষে পরিশিষ্টে ড. ইউনূসকে লেখা গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক ড. মোজাম্মেল হকের চিঠি পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন গুরম্নরা এবং তাদের চ্যালারা কোন গঠনমূলক সমালোচনাও সহ্য করতে নারাজ।
গত পাঁচ মাসে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশ ও ড. ইউনূসের পক্ষে ও বিপক্ষে যেসব লেখা পত্রিকায় ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন বস্নগে বেরিয়েছে তার বেশিরভাগই পড়েছি। খবরের কাগজে রাজনৈতিক ভাষ্য, মনত্মব্য প্রতিবেদন প্রভৃতি লিখি বলে ইউনূসবির্তক অনুসরণকারী আমার বহু পাঠক জানতে চেয়েছেন এ বিষয়ে আমি কেন লিখছি না। আমার পাঠকদের প্রথমে ব্যসত্মতার কথা বলেছি। গত পাঁচ মাসের প্রথম তিন মাস ব্যসত্ম ছিলাম যুদ্ধের আইন ও যুদ্ধাপরাধের ইতিহাস লেখার কাজে। এরপর মনোযোগ দিয়েছি সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার প্রভৃতি বিষয়ে। পাঠকরা জানতে চেয়েছেন ড. ইউনূস সম্পর্কে আমি কি কিছু জানি না? তাদের আমি আমাদের প্রথম চীন সফরের অভিজ্ঞতার কথা বলেছি।

১৯৮৭ সালে প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক ফয়েজ আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের লেখকদের একটি প্রতিনিধি দল চীন গিয়েছিল। সেই দলে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ূন আহমেদ ও মুনতাসীর মামুনের মতো খ্যাতিমান লেখকদের সঙ্গে অখ্যাত আমিও ছিলাম। সবাই যাওয়ার আগেই ঠিক করেছিলেন ফিরে এসে চীন সফরের ওপর বই লিখবেন। সেবার প্রায় তিন সপ্তাহ চীনে ছিলাম। অনেক ঘুরেছি, অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। সবার নোট বই বিচিত্র সব তথ্য আর অভিজ্ঞতায় ভরপুর। দারম্নণ বই লেখার উত্তেজনায় সবাই টগবগ করছি উত্তেজনায়। দেশে ফেরার আগে আমাদের তরম্নণী দোভাষী শেন বেলি সবার উৎসাহ আর আগ্রহে এক বালতি ঠা-া পানি ঢেলে দিল। বলল, দেশে ফিরে নিশ্চয়ই তোমরা চীন সফরের ওপর বই লিখবে। সবার হঁ্যা সূচক জবাবই আশা করছিল শেন। বলল, বিদেশী যাঁরা দুই তিন সপ্তাহ যা এক মাসের জন্য চীন সফরে আসে তাঁরা দেশে ফিরে আসত্ম একটা বই লিখে ফেলে। যাঁরা ছয় মাসের জন্য আসে তারা একটা প্রবন্ধ লেখে। আর যাঁরা অনত্মত এক বছর চীনে থেকেছে, চীনের আদ্যোপানত্ম জেনেছে বলে মনে করেছে তাঁরা দেশে ফিরে কিছুই লিখতে পারে না।
আমাদের হতবাক করে শেন বলেছিল, তোমরা চীনে বেড়াতে আসো সরকারের আমন্ত্রণে। সরকার তোমাদের সফরসূচী তৈরি করে। সেসব জায়গায় তোমাদের নেয়া হয় সরকার যেখানে নিতে বলে। সেসব লোকের সঙ্গে তোমরা কথা বলো, যারা জানে বিদেশীদের কী বলতে হবে। চীনকে জানতে হলে নিজের খরচে এসো, ভাষা শেখো, তারপর ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াও অনত্মত এক বছর_তাহলে কিছুটা জানতে পারবে। দেশে ফিরে একমাত্র মুনতাসীর মামুনই চীন সফরের ওপর বই লিখেছিলেন, তাও বেশ কয়েক বছর পর। চীন সফরের আগে চীনা বিপস্নবের নেতা মাও সেতুংয়ের ওপর আসত্ম বই লিখেছিলাম বটে, ফিরে এসে সাপ্তাহিক বিচিত্রার জন্য চীনের পরিবর্তন সম্পর্কে একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাড়া উলেস্নখযোগ্য কিছুই লিখিনি। ইউনূস সম্পর্কে এতদিন না লেখার এটাও এক কারণ। আমেরিকার ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন, স্পেনের রানী সোফিয়া এবং তাদের মতো অতিথিদের গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিদর্শন এবং তৎপরবর্তী কার্যক্রম আমাদের চীন ভ্রমণের মতোই সাজানো ঘটনা।

ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে আমার অবস্থা হয়েছে পুরনো সেই বাংলা প্রবাদের মতো_'অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর।' খবরের কাগজে ও ইন্টারনেটে ইউনূসভক্তদের লেখা পড়ে তাদের আমি মোটা দাগে দু'ভাগে ভাগ করেছি। ১) অর্থের বিনিময়ে কমিশন লেখা_ঠিক যেমনটি চান ড. ইউনূস ও ভক্তকূল এবং ২) ড. ইউনূসের রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক বুদ্ধি, গণসংযোগ দক্ষতা ও উচ্চাভিলাষ সম্পর্কে না জেনে তাঁকে গরিব মানুষের ত্রাতা এবং গরিবদের জন্য বিনাবন্ধকিতে ক্ষুদ্রঋণের জনক ইত্যাদি বিবেচনা করে নোবেল পুরস্কার অর্জনে উচ্ছ্বসিত এবং বিরূপ সমালোচনায় উত্তেজিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে লেখা। প্রথমোক্তদের সম্পর্কে আমার বলার কিছু নেই। ভাড়াটে লেখক পৃথিবীর সব দেশেই থাকেন। তাদের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা ক্রয় করেন ক্ষমতাবান ব্যক্তি কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় ধরনের লেখকদের অজ্ঞতা সম্পর্কে করম্নণা করতে পারি, কিন্তু তাদের আবেগকে আহত করতে চাই না। কারণ এদের দলে আমাদের কিছু বন্ধুও আছেন। তবে গত তিন সপ্তাহে 'আমাদের সময়'-এ আবদুন নূর তুষার এবং 'জনকণ্ঠে' মুনতাসীর মামুনের দীর্ঘ লেখা পড়ে, টম হেইনেম্যানের 'মাইক্রোডেট' দেখে এবং সবশেষে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে রিভিউ কমিটির প্রতিবেদন পড়ে মনে হয়েছে আমার কিছু লেখা উচিত।

বন্ধু মুনতাসীর মামুন ও অনুজপ্রতিম আবদুন নূর তুষার তাদের লেখায় কতগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। জনসংযোগে অকল্পনীয় দক্ষ ড. ইউনূসের উচিত ছিল মামুন ও তুষারের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব দেয়া। আমেরিকার অত্যনত্ম প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন ক্লিনটন দম্পতি, কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা এবং কিছু দক্ষ কমিশন লেখক গত দুই যুগ ধরে ড. ইউনূসের যে ভাবমূর্তি নির্মাণ করেছেন, যেভাবে তাকে দেবম-লীতে ঠাঁই দিয়েছেন মামুন ও তুষারের লেখা এবং টমের প্রামাণ্যচিত্র তার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। তারপরও আমার মনে হয়েছে সব কথা বলা হয়নি, যা এ সময়ে বলা প্রয়োজন। ইউনূসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটনের প্রতিনিধি রবার্ট ও বেস্নকের চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ মনত্মব্যে অনেকের মতো আমিও ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করেছি। এই বোধ আমার অনেক মনত্মব্যকে প্রভাবিত করতে পারে কিন্তু তথ্য প্রভাবিত করবে না।

» Topics:

Comments

Future BD's picture

So Late! All Faltus Joining Slowly @ SHAHRIAR KABIR

Why you are so late here I don't understand. It is not the issue of war criminals, therefore; you know that you will be established as a DALAL in this case.New generation might accept your Rajakar issue, but they will not accept this Yunus issue by the same way. Rather, they have opposite sense on this issue. Just remember, this world is passing a very crucial time now. Here we need to survive, we don't need to die. Your Hasina could not save our lives from Yaba or Fancy. That was the prime issue if she liked to save our next generation. Not to attack Yunus.


You people will be hatred in our  history and you will also see a big change in our Futiure BD. Our next generation will recognize that you "faltu people" always liked to have an issue; you didn't make anything for them to get the life smooth.

Completely agree with you!!

 


 


This kind of writer always hurt general people of Bangladesh, have no courage to write about our democratic dictator’s who wants to be in power forever. Shame on this writer and one day his son/daughter will say the same thing!!

Future BD's picture

Our protest will work someday @ Raju

Thanks. I also agree with you. This type of so called writers only liked in focusing themselves; no matter the country was benefited or not. We will protest against all evil works and our protest may help some people to wake up. And, joining us together will make a big if we can stay in truth and serve for our beloved country only.

WatchDog's picture

বৃক্ষ নাম তার ফলে পরিচয়...

 আপনার নামই বলে দেয় লেখার সারমর্ম কি হবে, মূল লেখা পড়ার দরকার হয়না। তাই পড়লাম না। ভাল থাকুন।

মিঃ শাঃকঃ, আপনি কি মনে করছেন

মিঃ শাঃকঃ, আপনি কি মনে করছেন - আপনি যে একটা আওয়ামী-দালাল, এইটা আমরা ভুলে গেছি??