ধ্বংস ও ষড়যন্ত্রের অপরাজনীতি

Rahat.Khan's picture

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। শ্লেষের ভাষায় বলেছেন, 'পেয়ারে পাকিস্তান' নাকি বেগম খালেদা জিয়ার দেশ। আরও কিছু কিছু কথা খালেদা জিয়া সম্পর্কে বলেছেন শেখ হাসিনা। নিষ্প্রয়োজন বোধে সেসব কথা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এ মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়ার মিশনটা কি, যে কারণে তিনি একদফা তথা সরকার পতনের আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছেন? তার আহ্বানকে দেশের 'জনগণ' তো বটেই, এ ছাড়া কয়েকটি রাজনৈতিক এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলও অত্যন্ত প্রীতির সঙ্গে সমর্থন দিয়েছে। যেমন জামায়াতে ইসলাম। যেমন ইসলামী ঐক্যজোটের 'আমিনী' গ্রুপ। যেমন নেজামে ইসলাম। এ ছাড়া কর্নেল অলি আহমদ, শফিউল আলম প্রধান, শওকত হোসেন নীলু প্রমুখ সাইনবোর্ড-সর্বস্ব কয়েকটি এতিম দল তো আছেই। আরও আছে জামায়াতের টাকা খাওয়া দু-একটি গোষ্ঠী। সোজা-সরল ভাষায় বলতে হয়, খালেদা জিয়ার নতুন রাজনৈতিক মিশনে জামায়াত ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি এতিম রাজনৈতিক দল ও 'সব সে ভালো রুপাইয়া' ধরনের কিছু অ-ধর্মীয়, ধর্মীয় উপদল ও গোষ্ঠী রয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়া একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি দলটিও বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল। এ নিয়ে তর্কের কোনো অবকাশ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, বেগম খালেদা জিয়া তথা তার নেতৃত্বাধীন দলটির 'মিশন'টা কি, যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শ্লেষ বিদ্রূপের অবতারণা করেছেন?

সেই মিশনটা কি দেশের 'কুক্ষিগত' গণতন্ত্র উদ্ধার করা? জবাবে বলা ছাড়া গত্যন্তর নেই, গণতন্ত্রে মাননীয় খালেদা জিয়া এবং তার দল বিএনপির আস্থা কোনো দিন ছিল না, এখনো নেই, ভবিষ্যতে থাকবে বলেও মনে হয় না। আমার এ উক্তির পক্ষে বহু যুক্তি ও প্রমাণের অবতারণা করা যায়। তবে বাহুল্য বোধ করে সেসব পুরনো হয়ে যাওয়া তর্কে আর গেলাম না। শুধু দু-একটি কথা বলি এ প্রসঙ্গে। সংসদীয় গণতন্ত্রের অর্থ তো সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতি। ক্ষমতায় যেতে না পারলে যারা সংসদ সদস্য পদ রক্ষা এবং নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য বছরে দু-চার দিন ছাড়া সংসদের ছায়া মাড়ান না, তাদের কি গণতান্ত্রিক বলা যায়? যারা হরতালের মতো একটি মহান রাজনৈতিক অধিকারকে সহিংস, হিংস্রতা ও নাশকতা প্রয়োগ করে হরতালের অর্থটাই পাল্টে দিয়েছেন, তাদের কি গণতান্ত্রিক বলা যায়? যারা দেশের জাগ্রত, স্বাধীনতা সচেতন তরুণ সমাজকে নষ্ট এবং মুরতাদ বলেন, তাদের কি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ব্যক্তি বা দল বলা যায়? যারা হিংসাত্দক রাজনীতি করে করে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের চরমে পেঁৗছে, দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান, তারা কিবং-প্রকারের গণতান্ত্রিক।

বিএনপির গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি একটা চরম রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। নব্বই দশকে প্রথমবার ক্ষমতায় যেতে না পেরে প্রথমদিকে বেশ অনেক দিন সংসদ বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগও। এটাও সংসদীয় গণতন্ত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে আওয়ামী লীগ কিছুদিন শাসক দলের বিপক্ষে নানা অভিযোগ তুলে সংসদে যোগ দেওয়া থেকে বিরত ছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই আওয়ামী লীগের সংসদ বর্জন এবং বিরোধী দলে থাকাকালে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহিংস হয়ে ওঠা হরতালকে অসংসদীয় এবং অগণতান্ত্রিক বলা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তবে দুই দল বা জোটের সংসদ বর্জন ও হরতালের মধ্যে কিছুটা হলেও পার্থক্য আছে। আওয়ামী লীগ নিজের ভুল বুঝতে পেরে সংসদে যোগ দিয়েছে অধিকাংশ অধিবেশনে। সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগের দেওয়া হরতালেও সহিংস ঘটনা ঘটেছে। তবে হরতালের নামে বর্তমানে বিএনপি-জামায়াত যা করছে, সে তুলনায় আওয়ামী লীগের দেওয়া হরতালকে অনেকটা নিরীহ-ই বলতে হয়। পক্ষান্তরে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের অখায়রা-বখায়তা লেজুড়গুলো হরতালের নামে ১৯৭১ সালের বর্বর পাকিস্তান সেনা বাহিনীর স্টাইলে মানুষ হত্যা, সম্পত্তি ধ্বংস এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি জ্বালানো, লুটপাট ইত্যাকার গর্হিত ও কুৎসিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। আর সংসদে যাওয়া? মহাজোট সরকার নানাভাবে বিএনপিকে সংসদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অনুরোধ-উপরোধ করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুসহ অন্যান্য বিবদমান ইস্যুতে সংসদে গিয়ে বিকল্প প্রস্তাব দিতে বলেছে। কিন্তু বিএনপি কোনো দিন এসব আহ্বান এবং অনুরোধ-উপরোধে কান দেয়নি। যোগ দেয়নি সংসদে। সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন তো দূরের কথা!

এসব কর্মকাণ্ড এবং বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে বিএনপি যেন এ ইঙ্গিতই দিয়েছে যে, ক্ষমতায় না থাকলে কিসের সংসদ? কিসের গণতন্ত্র? এই দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণা আর যাই হোক গণতান্ত্রিক নয়। নিবন্ধের সূচনা বক্তব্যের জের ধরে নির্দ্বিধায় বলা যায়, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার তাদের মিশন নয়। বড়জোর এটা রাজনৈতিক ধাঁধা। সরল বাংলায় রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি। বিএনপির মিশন দেশ রক্ষা করা নয়, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার তো নয়ই। যে রাজনৈতিক সিস্টেমের মাধ্যমে ছলে হোক, বলে হোক, কৌশলে হোক, দেশের শাসন-ক্ষমতায় প্রত্যেকবার আসা যায় না, সেটা কোনো অনুকরণযোগ্য রাজনৈতিক সিস্টেম হতে পারে? বিএনপি পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রকে সেরকমই ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল সিস্টেম বলে মনে করে। বিএনপি 'অবরুদ্ধ' গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার দূরে থাক_ সংসদ, গণতন্ত্র ইত্যাদি কিছুই বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করেননি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানও। যদি বিশ্বাস করতেন তাহলে ইনডেমনিটির মতো ঘৃণ্যতম আইন প্রণয়ন করতে পারেন? পারেন মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অর্জন, গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সাম্যবাদ সংবলিত সংবিধান থেকে গায়ের জোরে সংবিধানের চারটি মূল স্তম্ভের তিনটিই বাতিল করে দিতে? পারেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধু সরকারের করা দালাল আইন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ আইন পকেট পার্লামেন্টের সহায়তায় বাতিল করতে?

বিএনপি নামক দলটির জন্মই একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশকে ধীরক্রমে পাকিস্তানকরণের প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা। মওদুদী নামক ইসলামের অবমাননাকারী ব্যক্তির পর বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানই হচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর জন্মদাতা। রাজনীতি খোলা গ্রন্থ। সরল ভাষায় লেখা। তাই না বোঝার কিছু নেই। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মিশন মৃত স্বামীর মিশনই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দেশ রক্ষা, 'অবরুদ্ধ' গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এসব বলার জন্যই বলা। রাজনৈতিক ধাঁধা বা ভাঁওতাবাজি।

নামে না হোক কামে কীভাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি তরিকায় একটি দেশে পরিণত করা যায়? এই হচ্ছে বিএনপি-জামায়াত রাজনীতির মিশন বা লক্ষ্য। সে জন্য একটি নতুন কৌশল নিয়েছে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের লেজুড় ধরা দল ও গোষ্ঠীগুলো।

পন্থাটা কি বলার আগে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের ধ্বংসের যে স্ট্র্যাটেজি নিয়েছিল তা খানিকটা বলা দরকার। সে দিনের পূর্ব পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশ ধ্বংসের স্ট্র্যাটেজি হিসেবে তারা নিয়েছিল নির্বিচারে বাঙালি হত্যা, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের হত্যা এবং তাদের দেশছাড়া করা। এই স্ট্র্যাটেজিকে বলা হয় পোড়ামাটি নীতি। পাকিস্তানি সেদিনকার শাসকগোষ্ঠী এবং কতিপয় জেনারেলের পূর্ব পাকিস্তানে 'কর্তব্যরত' পাক সেনাদের প্রতি নির্দেশ ছিল 'পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ চাই না, মাটি চাই।'

১৯৭১ সালের ৯ মাসে সেই চেষ্টাই করেছিল নৃশংস ও বর্বর পাকিস্তান বাহিনী। কিন্তু তাদের সেই ঘৃণ্য খায়েশ পূর্ণ হয়নি। ৩০ লাখ বাঙালি এবং দুই লাখ নারী তাদের হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল বটে। তবে শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছিল বাঙালি জাতিই। হত্যা, রক্তস্রোত ও নির্যাতনের ভেতর দিয়ে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নামে একটি দেশ। তবে পাকিস্তানের বাংলাদেশ ধ্বংসের সেই মিশন ব্যর্থ হয়েছিল।

বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অগ্রগতির সব সূচকের হিসাবে পাকিস্তানের বহু উপরে। সেনা শাসন, জঙ্গি ও তালেবানের উত্থান পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় দ্বিতীয় শীর্ষ দেশে পেঁৗছে দিয়েছে। এদিকে নানা প্রতিকূলতা, সুশাসনের অভাব, দুর্নীতির প্রবল বিস্তার সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত উন্নতি সমৃদ্ধির পথে ধাবমান পঞ্চম দেশ হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছে। উন্নয়নশীল বাংলাদেশের তালিকা থেকে শীঘ্রই মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে উত্থান ঘটতে চলেছে বাংলাদেশের। কথাটা অতি সম্প্রতি জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। অপারেশন সার্চলাইটে তো বাংলাদেশকে ধ্বংস করা যায়নি। তাহলে? কথা হচ্ছে বাংলাদেশকে তো ঠেকাতে হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব?

পাকিস্তানপন্থি বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের স্ট্র্যাটেজি এখন বাংলাদেশের 'ভাইব্রেন্ট' অর্থনীতি ধ্বংস করা। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস হওয়া মানে তো ভেতরে ভেতরে বাংলাদেশকে ফোঁকলা করে ফেলা! ধ্বংসের বাকিটা আর কি থাকে। এ জন্যই তো একদফা আন্দোলনের নামে হরতালের পর হরতাল দেওয়া। একেবারে পরীক্ষিত স্ট্র্যাটেজি! বিএনপি-জামায়াত রাজনীতির মিশন এখন সেটাই!