৭ মার্চের ভাষণ ও আজকের প্রেক্ষাপটে প্রজন্ম চত্বর

Qazi Manzur's picture

১.
আজকের এই বিশেষ দিনটিতে যে কথাটি ঘুরে ফিরে মনে হচ্ছে, তা হলো, ৭ মার্চের মহান ভাষণ কেন আ.লীগ একা প্রচার করবে? বি.এন.পি. কি এটা প্রচার করে বুঝিয়ে দিতে পারে না, জাতীয় পতাকার মতোই এই ভাষণ আমাদের জাতীয় সম্পদ, আ.লীগের একার নয়? ২৬ মার্চ আর ১৬ই ডিসেম্বর-এর মতো এই দিনটাও কেন জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয় না? রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চিরকাল থাকবে, কিন্তু কিছু বিষয়কে বিতর্কের উর্ধ্বে রাখতে হয়।
অহিংস আন্দোলন-এর যে নজির প্রজন্ম চত্বর স্থাপন করেছে, তার সুপ্রভা এখন দীপ্তমান; এবং এর নামে কুৎসা রটনা না করে এর সাথে সংহতি প্রকাশ করাতেই যে সকল বিরোধী দলের জন্যে মঙ্গল, সেটা আমার মতো নির্বোধ বোঝে, তারা কেন বোঝেন না?

২.
দীর্ঘদিন ধরে দেশের সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করে আছেন, কবে রাজনীতির নোংরা পরিবেশ সুস্থ, সুন্দর হবে। আমিও তেমনি, অপেক্ষা করে আছি। ৬ ফেব. ২০১২ থেকে শাহবাগে অপরিকল্পিতভাবে একটি গণজাগরণ সূচিত হলো; যা শুরুতে ছিল অরাজনৈতিক। রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে পুরো দেশ একীভূত হলো, বিভিন্ন শ্রেনি-পেশার মানুষ একাত্মা হলেন; যেন রূপার কাঠির স্পর্শে ঘুম থেকে জেগে উঠলো গোটা জাতি।
এর কিছুদিন পর দেখা গেল গণজাগরণ নিয়ে জনমনে দ্বিধা: এটা কি নাস্তিকদের সভা, নাকি আ.লীগের নাটক, নাকি এটা ট্রাইবুনালের উপর বাড়তি চাপ? যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠলো তাদের অনুসারীরা। আর সেটা দমন করতে পুলিশ চালালো গুলি! গুলি করে গণহত্যা করছে সরকার, এসব বন্ধ করা দরকার, মানছি। কিন্তু যারা এটা বলছেন, কই, তারা তো এটা বলছেন না, অন্য ধর্মাবলম্বী নিরীহ মানুষদের (ওরা সংখ্যালঘু, এটা কেন বারবার খোঁচা দিয়ে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, আমি বুঝি না) ওপর যারা হামলা করল কীভাবে তাদেরকে পরাস্ত করা যায়? পুলিশের ওপর যখন আক্রমণ করা হয়, তখন সেটা প্রতিহত না করে পুশিল বাহিনীর প্রাণ দেওয়াটা কি সমীচিন?

৩.
“শাহবাগী” তকমা লাগিয়ে গণজাগরণকে কোনঠাসা করতে যারা তৎপর, তারা কি সুস্থ রাজনীতির চর্চা করছেন? ব্যক্তিগতভাবে আমি কোন রাজনৈতিক দলের অনুসারী নই। কিন্তু রাজনীতি যতটুকু বুঝি, তাতে মনে হয়, সুনেতৃত্বের যে সংকটে জাতি ভুগছে সেই ১৯৭২ থেকে, তার থেকে উত্তরণ ঘটাতে কোন ওহী নাজিল হবে না, আসবে না কোন আসমানী কিতাব। আমাদের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসবে ২০১৩ সালের শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন বা জিয়াউর রহমান। কাজেই, যারা মাঠে নেমেছেন, তাদেরকে সঠিক পথ দেখানো উচিত আমাদের বুদ্ধিজীবিদের। যারা অসত্য সমালোচনা করছেন, তারা শুধু মুখেই মারতে পারেন, কাজে তারা কী? তারা কী চান, তারা কি সেটা প্রকাশ্যে বলতে পারবেন?
একই সাথে বিপরীত কথা বলি, প্রজন্ম চত্বরকে নিয়ে কোন সমালোচনা করলেই তাকে “রাজাকার” বা “ছাগু” উপাধি দেবার কিছু নেই, কেউই বিতর্কের উর্ধ্বে নন। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্যে তারা গণজারণ যেমন ঘটাননি, আবার রাজনৈতিক কুটকচালি থেকেও তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে চলবে না। কিছু সমালোচনার জবাব যু্ক্তি দিয়ে তারা দিচ্ছেন, এভাবেই দিতে হবে সবসময়। সেই সাথে মনে রাখতে হবে, দেশের সিংহভাগ মানুষের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, যারা জানেন না ব্লগ কী, কিন্তু ইতিমধ্যে ব্লগারদেরকে ইসলামের শত্রু ভাবতে শুরু করেছেন, যারা জানেন না পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব কত, বরং সেখানে তারা একজনের মুখ দেখতে শুরু করেছেন। এই বিপুল জনগোষ্ঠির সমর্থন আদায় এখন আরো একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। গণমাধ্যমের অপপ্রচারের জবাব গণমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে দিতে তো হবেই, সেই সাথে যুক্ত করতে হবে সাধারণ মানুষদের অংশগ্রহণ। আশা করছি গণজাগরণ সেই পথেই এগোচ্ছে।