গোলাম আযমের গ্রেফতারের মাধ্যমে একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার প্রক্রিয়া গতি পেল। সরকার যে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ সেটিও প্রমাণিত হলো। ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে বাংলাদেশে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আইনের শাসন। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মহাজোটের শরিক ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ইস্যুতে এককাতারে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেছিল তাদের দাম্ভিকতাকে ভেঙে দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট বিশ্বজনীন, সময়োচিত ও পরীক্ষিত, আইন বলে বিশ্ব সমাজের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছে। নুরেমবার্গেও এ ধরনের আইনি বিচার হয়নি। বাংলাদেশে মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ আইনটি প্রথম গ্রন্থভুক্ত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক চাপসহ অন্যান্য পারিপাশ্বর্িক অবস্থার কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নানা কারণে এতদিন করা সম্ভব হয়নি। বিচার না হলেও তাতে যুদ্ধাপরাধীদের দায়মুক্ত হয়ে যায় না। দীর্ঘ ৪০ বছর পর সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার_ যারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেছিল তাদের বিচার করার। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রসিকিউটররা এ জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। একথা সত্য যে, তারা সবসময় ঈজচঈ নিয়ে কাজ করেছেন কিন্তু এটাও সত্য, তারা ধীরে ধীরে এ আইন আত্দস্থ করে ফেলেছেন। স্বাধীনতাবিরোধী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এখন জাতির দাবি। গোলাম আযমকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই প্রক্রিয়া আরও একধাপ এগিয়ে গেল। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। গোলাম আযমের বাংলাদেশ বিরোধিতা কেবল ১৯৭১ সালেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বাধীনতার পরও তিনি বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। এমনকি তিনি তার আত্দজীবনীতেও লুকাননি নিজের মনোভাবকে। সেখানেও তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নানা মন্তব্য করেছেন, সাফাই গেয়েছেন রাজাকার বাহিনী ও আলবদরের জন্য। যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাংলাদেশে যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে তাতে ন্যায়বিচারের শতভাগ সুযোগ রাখা হয়েছে। অভিযুক্তদের আত্দপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছে এই আদালত। এমনকি রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। যা অন্য কোনো দেশের ট্রাইব্যুনালে দেওয়া হয়নি। গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে অপরাধী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে বলে আমরা মনে করি।
মুক্তিযোদ্ধা এবং ৩০ লাখ শহীদ পরিবারের সদস্যরা গত ৪০ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছেন। গোলাম আযমের গ্রেফতার আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক এবং ট্রাইব্যুনালের জন্য এটি একটি বড় সাফল্য। তার গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে '৭১-এর ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি গঠন করা হয়। গত ২০ বছর ধরে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। ২৬ মার্চ ২০১০ অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতার করা হলেও গোলাম আযমকে ধরা হয়নি বলে আমরা যথেষ্ট হতাশ ও ক্ষুব্ধ ছিলাম। গোলাম আযম বাইরে থাকলে কখনও তার এবং অন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যথাযথভাবে করা যেত না। সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ছাড়াও গোলাম আযম এবং তার দল চলমান বিচার প্রক্রিয়ার কার্যক্রম বিঘি্নত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য দেশে ও দেশের বাইরে বহুমাত্রিক তৎপরতা চালাচ্ছে। গোলাম আযমের গ্রেফতারের ফলে এসব তৎপরতা কিছুটা হলেও বন্ধ হবে। গোলাম আযমসহ অন্য শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচার ২০১৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমি মনে করি। জামায়াত ও তার সহযোগীরা এ বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করার জন্য দেশে এবং বিদেশে যে চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে তা রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য সরকারের উদ্যোগ খুবই ইতিবাচক। বর্তমান কারাবন্দী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার করলেই হবে না_ তাদের সহযোগীদেরও বিচার করতে হবে নতুবা সাক্ষী দিতে ভয় পাবে নির্যাতিতরা। ১৯৭৩ সালে ১১ হাজার দালালের বিচার শুরু হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের সময় এরা ছাড়া পেয়ে যায়। যদি অর্ধেক যুদ্ধাপরাধীও বেঁচে থাকে তাদের বিচার একটি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তুতি চলছে এবং সরকারের কাছে আমরা অনুরোধ জানাই অন্তত আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের। মোট তিনটি ট্রাইব্যুনাল হলে বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন হবে। প্রসিকিউশন বর্ধিত এবং অনেক বেশি শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি তদন্ত দলকে আরও দক্ষ করে তুলতে এবং যোগ্য আইনজীবীর সংখ্যা বাড়ালে এ বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। এসব বাধা দূর হলে ২০১৩ সালের মধ্যে গোলাম আযমসহ শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হবে। তাদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সজাগ থাকতে হবে। জামায়াত, জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

Recent comments
19 min 49 sec ago
20 min 18 sec ago
20 min 59 sec ago
21 min 15 sec ago
22 min 31 sec ago
25 min 13 sec ago
26 min 8 sec ago
26 min 29 sec ago
26 min 54 sec ago
27 min 41 sec ago