জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মেধাবীদের বৃদ্ধাশ্রম

mutasimbillahnasir's picture

øাতক পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার সুবিধার জন্যই গেল শতকের নব্বইয়ের দশকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত হয়। এটি ইংল্যান্ডের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গঠিত হলেও বর্তমানে তার সাথে কাজের কোন অংশেরই মিল নেই। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সেশনজট আতঙ্ক কাজ করে। দেশের কল্যানে বেশী সংখ্যক শিক্ষার্থীর গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করার জন্য এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা হলেও বর্তমানে এটি মেধাবীদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমের ন্যয়। যেখান থেকে কেউ আর মুক্তির পথ দেখতে পায়না। তার স্বপ্ন ভঙ্গের প্রবেশ পথ যেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এটাকে মেধাবীদের জন্য জেলখানা বললেও খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবেনা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। ফলে বাবা-মায়ের ইচ্ছা থাকে তার সন্তান যেন দ্রুত শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সেশন জটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। কেউ অনৈতিক, অসামাজিক, অবৈধ পথে পা বাড়ায়, কেউ চাদাবাজিঁ কেউবা ছিনতাই আবার কেউ হয় সন্ত্রীসীদের গডফাদার। এ পথে যারা না যায় তারা আবার পরিবারের কাছে বোঝা না হওয়ার জন্য ডেসটিনি, ব্রাভো, মিথস, ডলেনসারের মতো কোম্পানির দারস্থ হয়। এক সময় তার জীবন এ সকল ফাকিবাজ কোম্পানির জালে বন্দি হয়ে পড়ে। তার শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য তার কাছ থেকে বিদায় নেয়, তাদের এই দীর্ঘসময়ের অসহায়ত্বর জীবনকে নিয়ে বিভিন্ন চক্র তাদের বিভিন্ন ধরণের প্রলোভন দেখিয়ে তার গন্তব্যর যাত্রা পাল্টে দেয়।

শিক্ষার জন্য আগমন ঘটলেও সে শিক্ষা জীবন যেন তাকে এক অভিশপ্ত জীবনে ধাবিত করে। পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ করতে আট-থেকে নয় বছর লেগে যায়। ফলে বিসিএস পরীক্ষা সহ সরকারী বিভিন্ন পরীক্ষায় তাদের চাকরীর বয়স সীমাও পার হয়ে যায়। দেশের জন্য মাটির জন্য মায়ের জন্য স্বপ্ন দেখা যেন তার আর হয়ে ওঠেনা। অভিজাত সমাজেও যেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আড় চোখে দেখা হয়। পৃথিবীতে নিজেকে বড় বোঝা ও অপরাধী বলে মনে হয়।

বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আপদমস্তক সমস্যায় জর্জরিত। তার সর্বাঙ্গে ব্যাথা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভর্তি, ক্লাস, পরীক্ষা, খাতা মূল্যয়ন কোন কিছুই সময় মতো হয়না। নানা কারণে পরীক্ষা পিছায়, ফল প্রকাশে সময় লেগে যায় কয়েক মাস তাও আবার দেখা যায় যে ভূল ফল প্রকাশ হয়েছে। যার কারণে বর্তমানে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা হতাশ, দিশেহারা, উদভ্রান্ত। এক ধরনের মানসিক রোগেও ভোগেন শিক্ষার্থীরা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের অবস্থাও বেহাল। দু এক জন ছাড়া সব উপাচার্যকেই বিদায় নিতে হয়েছে দূর্নীতির অপবাদ মাথায় নিয়ে। যার কোন তদন্ত ও শাস্তি অদ্যবধি হয়নি। দলীয় রাজনীতির নোংরা থাবা থেকে মুক্ত হতে পারেনি এ বিশ্ববিদ্যালয়। দূর্নীতি অনিয়মই যেন এখানের চিরাচরিত নিয়ম হতে চলছে। সরকার,প্রশাসন বদল হলেও এ প্রতিষ্ঠানটির চরিত্র বদল হয়নি শুরু থেকেই। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত কলেজ প্রায় আটারশত, বিভাগ আছে ২৭টি। সেশন জট কমানোর বহু আবেদন নিবেদন করা হলেও সরকার, শিক্ষামন্ত্রী, উপাচার্য কারোরই সেই দিকে মাথা ব্যাথা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার, ডীনবৃন্দ, কলেজ পরিদর্শক, রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সকলের প্রশাসনিক অদক্ষতা আর অবহেলার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অচলপ্রায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে যথেষ্ট সমন্বয়ের অভাব। যেমন- সারাদেশে কলেজের অধিভুক্তি ও কোর্সের অনুমোদন প্রদান করার কাজ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদি তদারকি করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। পদোন্নতি ও পোস্টিং দিচ্ছে মন্ত্রণালয়। নিয়োগ দিচ্ছে পি, এস,সি। কেউ জানেনা কি তার পরিকল্পনা কে কতটা কাজ ও কোন পরিসরে কাজ করবে।

অগোচালো সংসারে সন্তানরা যেমন বঞ্চিত হন তেমনি শিক্ষার্থীরাও বঞ্চিত তাদের মৌলিক অধিকার থেকে। যার পরিত্রানের জন্য কোন দরবেশে মুক্তি দিতে পারে তাও জানা নেই শিক্ষার্থীদের। ভূল করবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ, মনিটরিং এ ভূল করবে শিক্ষামন্ত্রণালয় আর খেসারত দিবে শিক্ষার্থীরা কি আজব! সেটাই মেনে নিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

রাজনৈতিক ভাবে উপাচার্য, প্রো-উপাচার্য, ট্রেজারার নিয়োগের ফলে এ্যাকাডেমিক চর্চার থেকে রাজনীতি চর্চা, দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন, করাই হয় তাদের প্রধান কাজ। প্রায় পাঁচবছর যাবৎ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট অকার্যকর হয়ে রয়েছে। সিনেট কার্যকর না থাকায় কর্তৃপক্ষেও দায়িত্ব পালনের তদারকি, কাজের দায়বদ্ধতা থাকছেনা। ফলে প্রশাসন হয়ে পড়ছে বেপড়োয়া। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্য দেশের সবচেয়ে বড় ও অখন্ড জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চলছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মতো প্রশাসক দিয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই কোনো প্রশ্নপত্র তৈরি করার নিজস্ব ব্যবস্থা। বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র নিয়ে আসে। বিজি প্রেস জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র করতে বাধ্য নয়, ফলে দেখা যায় কোন একটি কাজ করাতে দশবারো বার বলতে হয় বিজি প্রেসকে। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অর্থ আছে তাতে দশলক্ষ শিক্ষার্থীর কল্যানার্থে প্রেস করা কোন ধরনের সমস্যা না কিন্তু সেদিকে কারো দৃষ্টি নেই।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গনমাধ্যম সচেতন থাকলেও কোন কতৃপক্ষকেই পাওয়া যাচ্ছেনা সেই সচেতনদের কাতারে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের গভীরে পৌছে গেলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য চরম এনালগ পদ্ধতির মুখোমুখি দাড়াতে হচ্ছে। যার দরুন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া তো দূরের কথা একটি স্থিতিশীল দেশ গড়াও সম্ভব নয়। কারণ এই মাণহীন শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ যারা ভগ্নহৃদয় নিয়ে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন। তার স্বপ্ন সেশনজটের যাতাকলে হারিয়ে যায় সে দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে দেশের জন্য বোঝা হিসেবে জাতির কাধেঁ আবির্ভূত হয়। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে এই দশলক্ষাধিক শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করার মাধ্যমেই সম্ভব। আর এই শিক্ষার্থীদের সেশনজট মুক্ত ও মেধার বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকারেরই অংশ। ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন আমরা একই দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বে পাবলিক ও অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম সুযোগ সুবিধা ভোগ করছি, প্রত্যক্ষ বৈষম্যর শিকার হচ্ছি আমরা। তাই সরকারের উচিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

শিক্ষার্থীরা আজ অসহায় , অভিভাবক তথা দেশবাসী যেন আজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালর অনাকাক্ষিত অচলাবস্থার শিকার। অবকাঠামো ও শিক্ষক স্বপ্লতার ভারে নুয়ে পড়া প্রচুর চাপ বইতে অসমার্থ এই প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো সময় পরিত্যক্ত হয়ে পড়তে পারে। ফলে কর্তৃপক্ষ যদি এর যথোপযুক্ত ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে এর খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে। তাই আজ দশলক্ষাধিক শিক্ষার্থীরই প্রাণের আকুতি তাদেরকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামক বৃদ্ধাশ্রম থেকে মুক্তি দিয়ে একটি স্বাপ্নিক বিশ্ববিদ্যালয় ফিরিয়ে দেয়া হোক