‘ঐ দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা...’

পথে-প্রান্তরে ঘোরার সুবিধা, আবার অসুবিধাও। পল্লির গায়কেরা সুধায় যবে থেকে ‘ভরা নদীর বাঁকে’ অনুষ্ঠান করা ছেড়ে গেছেন, টেলিভিশনে আর সুযোগ পাচ্ছি না। নদী যেমন শুকায়, দিনে দিনে অবলুপ্তির পথে আমরাও। ঝাঁকড়া চুলওয়ালারা সুযোগ বুঝে ঢাউস সাইজের লাউডস্পিকার নিয়ে গ্রামকে গ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। যেখান থেকে শোনা যেত মালজুড়া গানের ধুয়া, জারিগানের কাঠির আওয়াজ, রাতব্যাপী ‘মহুয়া সুন্দরী’, ‘ভেলুয়া সুন্দরী’র পালা, সেখান থেকে শোনা যাচ্ছে বিকট আওয়াজে নানা বাদ্যযন্ত্র সমাহারে বিকট সংগীত। জীবিতকালে লোকসংগীতের এই হাহাকার কীভাবে সহ্য হয়!
লোকসংগীতের আকর বলে পরিচিত এই শ্যামল পলিদ্বীপ আক্রান্ত একই যন্ত্র দ্বারা, যে যন্ত্রে এক দিন উদ্ভাসিত হয়েছিল ‘আমার ঠিকানা’, ‘আপন ভুবন’, ‘ভরা নদীর বাঁকে’, ‘লৌকিক বাংলা’। সারা বাংলা থেকে শত শিল্পী চয়ন করে আনা হয়েছিল নিজস্ব ভঙ্গিতে গান গাইতে, ছিল না যন্ত্রের বাড়াবাড়ি, অনাবশ্যক পোশাক-আশাকের জঞ্জাল। দীর্ঘদিন গ্রামে না গিয়েও পল্লির অনুষ্ঠানগুলো মনে-প্রাণে উপভোগ করতেন দেশ-বিদেশের শহুরেরা। প্রথমে চেষ্টা করা হলো এ ধরনের অনুষ্ঠান অন্যদের দিয়ে করানো। অবাক হয়েছিলাম প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক ও অভিনেতাও আমার ওই ছোট্ট ভূমিকাটিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এ কথা সত্যি, সবাইকে দিয়ে সব কাজ হবে না।
লোকসংগীতের দুরবস্থার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন আবদুল লতিফ। বলেছিলেন, আমাদের মতো কয়েকজন গত হলে এই সংগীতকে কে রক্ষা করবে? আবদুল আলীম, বেদারউদ্দিন, গনি বয়াতি, তসের আলী, মমতাজ আলী খান, নূরুদ্দিন আহমেদ, সাবদার আলী, ওসমান খান, আবদুল মজিদ তালুকদার, নূরুন্নাহার, শামসুদ্দোহা, উজির মিয়া, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, শেফালী ঘোষ, ফেলু শেখ, চাঁদ মিয়া, হরলাল রায় চলে যাওয়ার পর বিরাট শূন্যতা। কোনোমতে বেঁচে আছেন সোনা মিয়া, [বয়স চুরাশি], আবদুর রহমান বয়াতি, গনি মিয়ার ছেলেরা। জানামতে শ দুয়েক বৃদ্ধ লোকসংগীতশিল্পী কোনোমতে বেঁচে আছেন। তাঁদের কোনো পেনশন নেই, খোঁজ নেওয়ার মানুষও নেই। তাঁদের গানগুলো কেউ শেখেনি। গান ও রেকর্ড বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে। টেলিভিশন কর্তৃক সমাদৃত হাতে গোনা শিল্পী যেমন মমতাজ, কিরণ, ইন্দ্রমোহন, মীনা, ব্যস। নতুন শিল্পীদের মাঝে কয়েকজন কল্কে পেলেও বাদবাকিরা সেখানে ঢুকতেই পারেন না। কারণ, তাঁদের যারা ঢুকতে দেবে সে রকম অভিভাবক স্টেশনগুলোর কোথাও নেই। যখন বিটিভিতে কাজ করতাম পল্লির সাধারণ গায়কেরা ঢোকার অনুমতি পেতেন, সহজেই পরীক্ষায় পাস করতেন, ঘষে-মেজে পরিবেশন করলে শ্রোতাদের কাছে ওঁদের মূল্য।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবচেয়ে ভালোবাসতেন লোকসংগীতশিল্পীদের। তিনি গান শোনার পর পকেট থেকে প্রায় দশ টাকা পাঁচ টাকা গুঁজে দিতেন। আমার পিতা ও পিতৃব্য জসীমউদ্দীন এই কাজই করেছেন সারা জীবন। বড় কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার ছিলাম বিধায় এই শিল্পীরা নানা ছুতায় আমার বাসায় এসে আশ্রয় নিতেন, তুলে ধরতেন তাঁদের জানা-অজানা অনেক গান, যেগুলো সময়ের আবর্তনে আজ বিলুপ্ত। এসেছিলেন বিজয় সরকার ও এমনি আরও অসংখ্য পল্লিকবি। সেদিন তাঁদের সমাদর করে বসিয়েছিলাম। আজ নিজেই বৃদ্ধ ও সহায়তাদানে অসমর্থ। পল্লিগীতি ও লোকসংগীতের পথ কি অবরুদ্ধ হয়ে যাবে? এ দেশে কি কোনো দিন ফোকলোর ইনস্টিটিউট হবে না, যাঁরা রাজনীতিতে আছেন তাঁরা কি বুঝতে সক্ষম হচ্ছেন না কত অনায়াসেই আমরা আমাদের সম্পদ হারিয়ে ফেলছি?
কী করা দরকার এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। আজ দ্বারস্থ হচ্ছি আমার প্রিয় প্রতি জেলার ডিসিদের কাছে। ইচ্ছা করলে এই ডিসিরাই পল্লিগ্রামের গানগুলোকে উজ্জীবিত করতে পারবেন। দেড় শ বছর আগে জর্জ গ্রিয়ারসন ছিলেন রংপুরের ডিসি। ব্রিটিশ হলেও ভালোবেসেছিলেন বাংলার লোকসংগীত উত্তরাঞ্চলের ভাওয়াইয়া ও চটকা গান সংগ্রহ করে নোটেশন তৈরি করেছিলেন ‘লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’, ভলিউম ১৩তে ইংরেজি অনুবাদ ও ট্রান্সলিটারেশনসহ ছাপা হয়েছিল সেই সময়ে। চিন্তা করুন, একজন বিদেশি গানগুলোকে কতটা ভালোবেসেছিলেন। পিতার গাওয়া ‘আবো নওদারিটা মরিয়া মোর সে হইছে হানি, আন্দার ঘরোত পড়ি থাকং পড়ে চোখের পানি, আবো টাপ্পাস কি টুপ্পুস করিয়া’ গানটিকে পৃথিবীবিখ্যাত করেছি আমরা। ভাবতে অবাক লাগে, এই গানটি সংগ্রহ করেছিলেন স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন। রংপুরের লোক অবশ্যই তাঁকে ভোলেনি। তাঁর নামে আজ গড়ে তুলেছেন লাইব্রেরি। এ খবরটি যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করে। আজও যদি ডিসি ভাইয়েরা এ কাজটি করেন তাহলে সারা দেশের মানুষ তাঁদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে। বলা হয়ে থাকে, ডিসিরাই রাজা, তাঁদের রাজা মানতে রাজি যদি তাঁরা আমাদের গান সংগ্রহ করেন ও ছড়িয়ে দেন নতুন প্রজন্মের মাঝে। এটা করা তাঁদের জন্য খুবই সহজ বলে ধারণা। অনেক ডিসিকে পেয়েছি, যাঁরা গানপাগল।
রবীন্দ্রনাথের গান ভালোবাসি, ভালোবাসি নজরুল। সারা দেশের মানুষ যখন শুনতে চায় লোকসংগীত, তখন তাদের অন্যটা ধরিয়ে দিলে লাভ হবে না, বরং ফল হবে উল্টো। জেনেশুনেই কথাগুলো বলছি। দেশে সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনার অভাব, ফলে যার যার মতো চলছে। ছোট প্রডিউসাররা ভাবছেন এত কষ্ট করে কী লাভ, যা পাওয়া যায় সেটাই পরিবেশন করে চাকরিটা বজায় রাখি। শহুরে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন হলো। তাই বা মন্দ কী।
ভরা নদী হলো মরা নদী। ‘ঐ দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা...’
- Mustafa.Zaman.Abbasi's blog
- Login to post comments
- 653 reads
একই রকম আরো কিছু ব্লগ
- রবীন্দ্রনাথ—সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে - Syed.Abul.Maksud
- মেঘ মল্লারের কথা : একজন পাথর মানুষের কথা - Kulada.Roy
- একটি পুরনো সম্পর্কের স্মৃতিচিত্র - Sazzad.Qadir
- জীবনের গাড়ি থামলেও... সবার মনের মধ্যে চলছে সঞ্জীব দা'র গাড়ি - abdullah.shafi
- তবুও পালিয়ে বেড়াই - Quazi Johirul Islam
- একটি বিবৃতি এবং রুশদির সাথে কিছুক্ষণ - Saifullah.Dulal
- What have you done during 2 years in power? - ashraf
- দুঃস্বপ্নের যাত্রী - Mostafa.Kamal
- ফুজিকোর প্রতিদান - Quazi Johirul Islam
- শীতপদ্য! - Rain

Recent comments
12 hours 54 min ago
13 hours 35 min ago
20 hours 28 min ago
21 hours 44 min ago
21 hours 46 min ago
23 hours 13 min ago
1 day 4 hours ago
20 hours 59 min ago
2 days 13 hours ago
2 days 15 hours ago