‘উন্নয়ন টিভি’ চ্যানেলের উদ্যোগ

muhammad.jahangir's picture

টিভি মিডিয়া সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর অফিস একটি প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

‘সংসদ টিভি’ নামে বর্তমানে যে টিভি চ্যানেলটি চালু রয়েছে, তার অব্যবহূত সময় নিয়ে (যখন সংসদ অধিবেশন চলে না) সরকার ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট টিভি’ নামে একটি চ্যানেল চালু করার কথা ভাবছে। যে চ্যানেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিশু, দুর্যোগব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে। আপাতত ‘সংসদ টিভি’ থেকে সময় ধার নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করলেও পর্যায়ক্রমে এই ‘উন্নয়ন টিভি’ একটি পৃথক টেরিস্ট্রিয়াল টিভি চ্যানেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

পুরো পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এই বিষয়ে প্রথম মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আরও বহু মতবিনিময় সভার পর এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ লাভ করবে। এ ব্যাপারে স্পিকার ও জাতীয় সংসদ সদস্যদের মতামতেরও প্রয়োজন রয়েছে। তাঁরা ‘সংসদ টিভির’ অব্যবহূত সময় ব্যবহার করতে না দিলে পুরো পরিকল্পনাটিই ভেস্তে যেতে পারে। আমরা আশা করি, স্পিকার ও জাতীয় সংসদ এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাবই প্রদর্শন করবেন।

‘উন্নয়ন টিভি’র এই উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ‘এ টু ওয়ান’ প্রোগ্রাম। তাদের সহায়তা দিচ্ছে ইউএনডিপি, জাইকা ও জাপানের এনএইচকে। এই টিভি চ্যানেল পরিচালনায় প্রথম পর্যায়ে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া যাবে এসব বিদেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে। তথ্য মন্ত্রণালয় তথা বিটিভিও এই চ্যানেলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকবে। তবে প্রাথমিক আলোচনা থেকে যা বোঝা গেছে তাতে মনে হয়, এই টিভি সরকারি উদ্যোগে হলেও এর ওপর তথ্য মন্ত্রণালয়ের খবরদারি থাকবে না। এটাই সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সরকারি ‘বিটিভি’ এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে এই মন্ত্রণালয়কে আর কোনো টিভির দায়িত্ব দেওয়া উচিত হবে না। ২০০৪ সালে উদ্বোধন হওয়া ‘বিটিভি ওয়ার্ল্ড’ এখনো টেকঅফই করতে পারেনি।

‘উন্নয়ন টিভি’র প্রাথমিক ধারণাপত্র থেকে জানা যায়: এই টিভি পিপিপির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভিত্তিতে। এখানে পাবলিক বলতে অবশ্যই বাংলাদেশ সরকার। আর প্রাইভেট পার্টনার রয়েছে: ইউএনডিপি, জাইকা, এনএইচকে, দেশি-বিদেশি মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ও অন্য আগ্রহী উন্নয়ন-সহযোগীরা। এদের সবার প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থাপনা বোর্ড গঠন করা হবে। তারাই এই টিভি চ্যানেলের যাবতীয় কিছু পরিচালনা করবে।

এই চিন্তাটি খুবই প্রশংসনীয়। যে এজেন্ডা নিয়ে এই টিভি চ্যানেল যাত্রা শুরু করবে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে এ ধরনের একটি ব্যবস্থাপনা বোর্ড ছাড়া কখনো তা কার্যকর হতো না। একটা যেনতেন টিভি চ্যানেল হয়তো হতো। তথ্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত বর্তমান ‘বিটিভির’ অবস্থা দেখলেই দর্শক বা পাঠকেরা তা অনুধাবন করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যে ‘উন্নয়ন টিভিকে’ তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে দিতে চাননি, এটা একটা বড় সিদ্ধান্ত। সরকারি কাজকর্মেও যে মাঝেমধ্যে উজ্জ্বল চিন্তা দেখা যায়, এই সিদ্ধান্ত তার একটি বড় প্রমাণ।

তবে সরকারকে উপেক্ষাও করা হচ্ছে না। তথ্য মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (যারা উদ্যোক্তা) যথাযথ প্রতিনিধি এই বোর্ডে থাকবেন।

এ ধরনের একটি পিপিপি ব্যবস্থাপনা বোর্ড বাংলাদেশে নতুন। এটা বলা যত সহজ, বাস্তবায়ন করা তত সহজ নয়। তবে অসম্ভবও নয়। আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এই ব্যবস্থাপনা বোর্ডের কাঠামো, ক্ষমতা, কার্যপরিধি ইত্যাদি চিহ্নিত করা যায়। সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে এই টিভি চ্যানেলের একজন প্রধান নির্বাহী নিয়োগ দেওয়া। যিনি টিভি মিডিয়া, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, প্রডাকশন, প্রশাসন, উন্নয়ন, বাংলাদেশের নানা উন্নয়ন ইস্যু ইত্যাদি সম্পর্কে ভালো ধারণার অধিকারী হবেন। এসব গুণের অধিকারী একজন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমি প্রধান নির্বাহীর ওপর বেশি জোর দিতে চাই। কারণ, চ্যানেলটা প্রতিদিন চালাবেন তিনি। আর যত কমিটি গঠন করা হোক না কেন, তাঁরা মাসে বা দুই মাসে একবার আসবেন। এই টিভি চ্যানেল পরিচালনা তাঁদের একমাত্র কাজ নয়। কাজেই প্রধান নির্বাহী, পরিচালক অনুষ্ঠান ও পরিচালক প্রশাসন—এই তিনটি পদ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনজনের প্রতিভা, কর্মক্ষমতা ও কমিটমেন্টের ওপর এই চ্যানেলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

আমার ধারণা, এই চ্যানেল নিজেরা যতটা অনুষ্ঠান তৈরি করবে, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুষ্ঠান (চাহিদামতো) বাইরে থেকে ক্রয় করবে (প্যাকেজ অনুষ্ঠান)। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিশু, নারী ইত্যাদি জগৎ নিয়ে সৃজনশীল, তথ্যমূলক, শিক্ষামূলক, আনন্দময় অনুষ্ঠান তৈরি করার একটা বড় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই টিভির একটা বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকার সম্প্রতি যে স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু করেছে, তা আরও কার্যকরভাবে এই টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই টিভি চ্যানেল কীভাবে ভূমিকা পালন করতে পারে, তা নিয়ে প্রতিটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করা এখন প্রধান কর্তব্য। উদ্যোক্তা ও কর্মকর্তারা কেউ বিষয় বিশেষজ্ঞ নন। অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অবশ্যই মতবিনিময় করতে হবে। বিষয়বস্তুর অগ্রাধিকার নির্ণয়ও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি সেক্টরে অনেক বিষয় আছে। সীমিত সময়ে আমরা কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেব? বিষয়বস্তু নির্ধারণের জন্য বহুমাত্রিক আলোচনায় বসতে হবে। কাজটি সহজ নয়। নানা বিশেষজ্ঞের নানা মত। যেমন: একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান মনে করেছে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের শুদ্ধ ইংরেজি বানান শেখাতে না পারলে ছাত্রদের জগৎ অন্ধকার। আরেকটি প্রতিষ্ঠান ভেবেছে: প্রি-স্কুলের ছেলেমেয়েদের বর্ণমালা, সংখ্যা ইত্যাদি সম্পর্কে স্কুলে যাওয়ার আগেই তাদের জ্ঞান দিতে হবে। এসব অনুষ্ঠানের জন্য হাজার হাজার ডলার বা পাউন্ড ব্যয় হচ্ছে। টাকা থাকলেই যা খুশি অনুষ্ঠান করব, নাকি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠান করব—সেটা নির্ণয় করা এক কঠিন কাজ। কঠিন হতো না যদি নানা মুনির নানা মত না থাকত।

‘উন্নয়ন টিভি’ চ্যানেলের ধারণাপত্রে আরও বলা হয়েছে: ‘এই টিভি চ্যানেল ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে চলবে। কোনো সরকারি সাবসিডিতে নয়।’ তবে আমার ধারণা, প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক বছর এই চ্যানেল পরিচালনার জন্য সরকার ও উন্নয়ন-সহযোগীদের টাকা দিতে হবে। অনুষ্ঠানগুলো যদি দর্শকদের কাছে ‘প্রয়োজনীয়’ হয়, তাহলে দর্শকেরা অনুষ্ঠান দেখবেন। দর্শকেরা অনুষ্ঠান দেখলে স্পনসররা আগ্রহী হবে। অনুষ্ঠান যদি দর্শকদের আগ্রহী করতে না পারে, তাহলে দর্শক পাওয়া যাবে না। পাঁচটি বিনোদন অনুষ্ঠান ও ‘খবরের’ ফাঁকে একটি কৃষি অনুষ্ঠান দেখাকে আমি টার্গেট দর্শক বলব না। কৃষি বা স্বাস্থ্য অনুষ্ঠানটি দেখতে হবে—এই প্রতিজ্ঞা করে যিনি টিভি সেটের সামনে বসবেন, তিনিই অনুষ্ঠানের প্রকৃত দর্শক।

একটি টিভি অনুষ্ঠান তৈরি করা আজকাল হয়তো কঠিন কাজ নয়। তবে একটি তথ্যভিত্তিক অনুষ্ঠান কার্যকরভাবে ও আনন্দময়ভাবে প্রযোজনা করা খুব সহজ কাজ নয়। এ ধরনের অনুষ্ঠান করার জন্য দক্ষ প্রযোজক, পরিচালক, উপস্থাপক ও লেখক তৈরি করতে হবে। আমাদের সমাজে সে রকম দক্ষ ছেলেমেয়ের সংখ্যা বেশি নেই। শেখারও উপযুক্ত জায়গা নেই। এমনকি সাধারণ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করার মতো দক্ষ ছেলেমেয়েও পাওয়া যায় না। ঢাকার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তিন-চারজন দক্ষ উপস্থাপকের ঘন ঘন উপস্থিতি আমাদের এই অভাবের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

উদ্যোক্তারা আশা করছেন, আগামী বছরের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে এই টিভি চ্যানেলের উদ্বোধন করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে খুব আগ্রহী বলে জানা গেছে। এখন থেকে প্রতিদিন কাজ করলে ২৬ মার্চ উদ্বোধন করা অসম্ভব কিছু নয়। তবে প্রচুর কাজ। কাজগুলো করার জন্য একটি কমিটেড টিমও দরকার। শুধু সরকারি কর্মকর্তা দিয়ে এত কাজ করা হয়তো সম্ভব হবে না। জুলাই থেকে মার্চ (২০১৩) পর্যন্ত সময়কালের জন্য একটা প্রকল্প টিম গঠন করা হলে ভালো হতো। সবার আগে দরকার একজন প্রকল্প পরিচালক। যিনি উদ্বোধন পর্যন্ত এই প্রকল্পে নেতৃত্ব দেবেন ও সব কাজের সমন্বয় করবেন।
এই চ্যানেল নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। এর ব্যবস্থাপনায় পিপিপি কাঠামো থাকাতে আমি বেশি আশাবাদী। আশা করা যায়, এটা আরেকটা ‘বিটিভি’ হবে না। এ রকম একটি টিভি চ্যানেল বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য খুবই প্রয়োজন। অনেক আগেই এ রকম টিভি চ্যানেল হওয়া উচিত ছিল। এই উদ্যোগ গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের আবার অভিনন্দন জানাই।