সেবাও টিকে থাক চিকিৎসার সঙ্গে

Mostafa.Hussain's picture

কথাসাহিত্যিক কৃষণ চন্দরের সৃষ্টি, একটা গল্প মনে আসছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিষয়ে লেখা। ঝড়ে রাস্তার ওপর গাছ পড়ে আছে একটা। সেই গাছের নিচে চাপা পড়েছে এক পথযাত্রী। রাস্তা বন্ধ, গাড়ি চলছে না। গাছের নিচ থেকে মানুষকে উদ্ধারেও কেউ এগিয়ে আসতে পারছে না। কারণ রাস্তা থেকে গাছ সরিয়ে মানুষ উদ্ধার করতে হলে রাস্তার মালিক সড়ক ও জনপথ বিভাগের অনুমতি লাগবে। যথারীতি অনুমতি পাওয়া গেল। গাছের নিচ থেকে এর পরও মানুষটি উদ্ধার করা গেল না। কারণ গাছ কাটার জন্য বন বিভাগের অনুমতি লাগবে। সুতরাং ফাইল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি। গল্পের মূলকথা অনেকটা এমনই।

গল্পের সেই মানুষটি গৌণ বিবেচিত আইনের কাছে। মানুষ বাঁচানো বড় কথা নয়। চাকরির বিধান রক্ষাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসাক্ষেত্রে যদি মানুষ গৌণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে পরিণতি কী হতে পারে? সে ক্ষেত্রে যদি ফাইলের ভূমিকা পালন করে মানিব্যাগ, তাহলে?

যমদূত নিশ্চিত ঘরের দুয়ার পেরিয়ে বিছানার পাশে পৌঁছে যাবে দ্বিধাহীনভাবে। মানবতা নির্বাসিত হবে অবশ্যম্ভাবী। তেমনি অমানবিক এক দৃশ্য দেখা গেছে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত একটি সংবাদে। অগ্রিম টাকা দিতে না পারায় মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছতে যাচ্ছিল আড়াই বছরের টুকটুকে এক শিশু। একবারও মন কাঁদেনি অবোধ শিশুটির জন্য। একদিকে মানুষ, অন্যদিকে টাকা। শেষ পর্যন্তও অর্থের প্রয়োজনীয়তাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও হাসপাতালের কাছে। কী দুর্বিষহ অবস্থা! নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার নোয়া গ্রামের দরিদ্র ফাহাদুল ইসলামের আদরের সন্তান তাসমিয়া জীবনের শুরুতেই দেখতে পেল, মানুষের এক কদর্য রূপ। কসাই আর চিকিৎসকের পার্থক্য এই মাসুম বাচ্চাটি না বুঝলেও তার মা-বাবা বুঝতে পেরেছেন, দুনিয়ায় টাকার চেয়ে বড় কিছু নয়। তাসমিয়ার নিকটজনরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে, রাষ্ট্র, মানবতা ও মৌলিক অধিকার কিংবা সংবিধান এগুলো নিছক বুলি ছাড়া কিছু নয়। তারা বুঝতে পেরেছে, চিকিৎসার সঙ্গে সেবা যোগ করে যে শব্দমালা তৈরি হয়, সেগুলো শুধুই অভিধানের পাতায় থাকা কিছু অক্ষরের সমষ্টি মাত্র।

রাষ্ট্রীয় অর্থ সহযোগিতাসহ পরিচালিত ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামের চিকিৎসাকেন্দ্র মুমূর্ষু তাসমিয়ার চিকিৎসা না করে ফিরিয়ে দেয় চিকিৎসাব্যয়ের সমুদয় অর্থ অগ্রিম পরিশোধ করতে না পারার কারণে। অথচ বাচ্চাটিকে বাঁচানোর জন্য ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টার থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। বাচ্চার বাবা অনুনয়-বিনয়ের কমতি করেননি সন্তানের চিকিৎসাসুবিধা প্রদানে এগিয়ে আসার জন্য। কিন্তু কর্তৃপক্ষ রোগীর দিকে ফিরে তাকায়নি। তারা চিকিৎসাই করল না অগ্রিম পয়সা না পাওয়ায়।

ভাগ্য ভালো তাসমিয়ার, মানবিক কারণে এগিয়ে গেলেন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। নির্দেশিত হয়ে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ হার্ট ফাউন্ডেশনকে নিশ্চয়তা দিল চিকিৎসাব্যয়ের অর্থ পরিশোধের। তাতেও কাজ হলো না। কারণ তাদের বিধান- তাদের নীতিমালা হচ্ছে মানুষের চেয়েও অর্থ বড়, যেভাবেই হোক আক্রে ধরো। সেটাই তারা করতে চাইল। অবশেষে শিশুটির চিকিৎসা দেওয়া হয় ইউনাইটেড হাসপাতালে। আল্লাহর রহমত বলতে হবে- বসুন্ধরা গ্রুপের আর্থিক সহযোগিতায় তাসমিয়ার স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে উন্নতির পথে।

অগ্রিম টাকা ছাড়া চিকিৎসা করতে অনীহা প্রকাশের এ ঘটনা থেকেই অনুমান করা যায়- গোটা দেশের চিকিৎসাসেবার মান ও অধিকার হিসেবে নাগরিকের পাওয়ার বিষয়টি কতটা অবহেলার শিকার। প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের নাগরিকের প্রতি দেশের সংবিধানও কার্যকর কতখানি। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসকের মন্তব্য প্রমাণ করে দেয়- প্রতিষ্ঠানটি মানুষ নয়, জীবন নয়, অর্থকেই বড় করে দেখে। মানবসেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান সেখানে একটি সাইনবোর্ড মাত্র।

এই অমানবিক অবস্থা দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হলেও নূ্যনতম সেবার নিশ্চয়তা না থাকাটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু সেই অনাকাঙ্ক্ষিত কাজটিই করছে সেবাবিষয়ক কোনো নীতিমালা সরকার এ পর্যন্ত প্রণয়ন করতে পারেনি বলে; কিংবা বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর ওপর সরকারের তদারকি কিংবা আইনানুগ নিয়ন্ত্রণ নেই বলে। সরকারের দুর্বলতার সুযোগে কিছু বাণিজ্যধর্মী প্রতিষ্ঠান রোগীদের কাছ থেকে যথেচ্ছ অর্থ আদায়ের পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতারণাও করছে। চিকিৎসাব্যয়ের নির্ধারিত কোনো হার যেমন নেই, তেমনি শয্যাব্যয় কিংবা অস্ত্রোপচার ব্যয়ের কোনো সীমা-পরিসীমাও নেই। আবার প্রতারণা হিসেবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যেই বিজ্ঞাপনও দিচ্ছে। বলছে, ২৫ শতাংশ হ্রাসকৃত মূল্যে তারা অপারেশনসহ চিকিৎসাসুবিধা প্রদান করছে। যেখানে মূল্য হার বলতে কিছু নেই, সেখানে ২৫ শতাংশ কমে চিকিৎসাসুবিধার অর্থ কী? গরিব মানুষ আর্থিক সুবিধা লাভের আশায় সেই প্রতিষ্ঠানে যায়। সেবা কতটা পায় কিংবা না পায় তা বোঝা যায় তাসমিয়ার মতো রোগীদের প্রতি অমানবিক আচরণ থেকে।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় সরকারি হাসপাতালগুলোর সুযোগ-সুবিধা মোটেও সন্তোষজনক নয়। দেশে বিদ্যমান উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন আশানুরূপ হয়নি। সেখানে চিকিৎসকদের যেতে অনীহা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশ মিলিয়ে মানুষকে রাজধানীমুখী করছে প্রতিনিয়ত। রাজধানীর দেড় কোটি মানুষের জন্য হাতে গোনা কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল চিকিৎসাসুবিধা দিতে পারছে না প্রয়োজন অনুযায়ী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিত্র দেখেই তা প্রমাণিত হয়। এক হাজার ৭০০ শয্যার এই হাসপাতালে ফ্লোর, বারান্দা কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না কখনোই। একমাত্র বহির্বিভাগেই দৈনিক চার হাজারের বেশি রোগী ভিড় করে চিকিৎসা লাভের আশায়। এই মানুষগুলোর অবস্থা বিশ্লেষণ করেই বোঝা যায়, দেশের মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত কতটা। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শতকরা প্রায় ৪০ জন চিকিৎসক নিয়মিত অনুপস্থিত থাকেন। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর যে কী চেহারা তা সহজেই অনুমান করা যায়। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই মানুষ ছুটে যায় বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে। সেই সুযোগটি গ্রহণ করে কিছু অর্থলোভী চিকিৎসাকেন্দ্র।

চিকিৎসালয়গুলো গলা কাটা মূল্য আদায়ের ক্ষেত্রেও কতটা অস্বাভাবিক তাও দেখা যায় সংবাদে। সেখানেও মানবিক কোনো বিবেচনা কাজ করে না। ঢাকার বিখ্যাত একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয় নিয়ে কয়েক দফা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কালের কণ্ঠে। এক প্রসূতিকে ১৭ লাখ টাকার ফাঁদে ফেলেই ক্ষান্ত হয়নি ওই চিকিৎসালয়, জরায়ুও কেটে দিয়েছিল ওরা। শুধু রক্তচাপ মেপে দেড় হাজার টাকার বেশি আদায় করেছে এমন অভিযোগও ছাপা হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে। কিন্তু সরকার আদৌ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়নি। চিকিৎসাব্যয়ের এই অনিয়ম কি চলতেই থাকবে? অপারেশনের প্রয়োজনীয় ছুরি-কাঁচি কি চালানো হবে রোগীর নিকটজনের কাছ থেকে? সরকার কবে এদিকে নজর দেবে? মানুষ কি তার মৌলিক অধিকার পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবে এই দেশ থেকে?