দ্য ফিঙ্কলার কোয়েশ্চেন ::হাওয়ার্ড জ্যাকবসন ( ম্যান বুকার পুরস্কার পাওয়া উপন্যাসের প্রারম্ভিক অধ্যায়ের অনুবাদ)

তার আগেই আঁচ করতে পারা উচিত ছিল। তার জীবনটাই তো একটা দুর্ঘটনা ; একের পর এক বিপত্তিতে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে । তাই এ ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার মতো প্রস্তুতি তার রাখা উচিত ছিল। তাছাড়া সে এমন একজন মানুষ, কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারে। বিষয়টি ঘুমোতে যাওয়ার আগে কিংবা জেগে উঠবার পরে অস্পষ্ট ছায়ার মতো আসন্ন বিপদ নিয়ে অস্বস্তিবোধে ভোগার ব্যাপার নয়, বরং দিনের আলোর মতোই মূর্তিমান এবং বাস্তব ।
কিছু বুঝে উঠবার আগেই ঘটনাটি ঘটেছিল। মুহূর্তেই তার চোখের সামনে চলে এলো সারি সারি গাছ আর ল্যাম্পপোস্ট। হাঁটু গুঁড়িয়ে যাওয়ায় ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো সে। গাড়িটি খুব জোরে চলছিল। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে আসে। পরণেই সে নিজেকে আবিস্কার করলো ছেঁড়া জামা আর ভেঙ্গে যাওয়া হাঁড় নিয়ে মাটিতে পড়ে আছে। পাশেই একটি বাড়ির দেয়ালে মাঁচা বেধে রাজমিস্ত্রীরা কাজ করছে। সেখান থেকে শক্তমতো কিছু একটা পড়লো, সবেগে তার মাথার খুলিতে এসে বিদ্ধ হলো।
মেয়েটিই যত বিপত্তির জন্য দায়ী। মেয়েটি একদিন জুলিয়ান ট্রেসলোভের সামনে দিয়ে আচমকা হেঁটে গিয়েছিল, সেই চলে যাওয়ার আচমকা অভিঘাত শরীরে নয় যেন তার হদয়ে এসে লাগে। তাকে ব্যাকুল করে তোলে। সত্যি বলকে কি সে কখনোই স্থির ছিলনা। কিন্তু ভবিষৎতের প্রতিায় থাকা তার নিস্তরঙ্গ জীবনে মেয়েটি একটা গভীর আলোড়ন তুলে দিল। আর মেয়েটিই ছিল সে-ই ভবিষৎ।
যারা ভবিষৎ দেখতে পায় তাদের েেত্র ঘটনাচক্র সবসময় ঠিকঠাক মেলেনা। তেমনটি হয়েছে ট্রেসলোভের েেত্রও। রাস্তায় দেখা সেই মেয়েটিকে খুব সহসাই আবার দেখতে না পেলেও মেয়েটিকে নিজের ভবিষৎতের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে সে। কল্পনার আকাশে রঙ মাখাতে মাখাতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ট্রেসলোভ। মেয়েটিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে এবং তাতে মেয়েটির কোন আপত্তি নেই। দুজনে মিলে সংসার পাতবে ; তাদের জানালার ভারী মখমলের পর্দা চুঁইয়ে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে রক্তবর্ণের আলো। বিছানার চাদর মেঘের মতো দুলছে, ফায়ারপ্লেসের চিমনি দিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে উড়ছে সুগন্ধি ধোয়া । টকটকে লাল টাইলসের ছাদ বেয়ে জানালা গলে গলগল করে ঘরে ঢুকে পড়ছে অবারিত সুখ। ট্রেসলোভের কল্পনার ডালপালা গজাতে থাকে। মেয়েটি কখনো তাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে চলে যাবে না। কখনোই বলবে না, তোমার সঙ্গে থেকে থেকে আমি কান্ত। তারপর একদিন ভালবাসার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোথাও পাড়ি জমাবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার এ কল্পনায় কোন শিশু নেই, তার ধারণা শিশুরা কল্পনার তি করে।
এমনই ছিল ট্রেসলোভের মহাকাব্যিক জীবন। কল্পনায় নারীর প্রতি তীব্র ভালবাসা অনুভব করলেও বাস্তব জীবনে তারা ছিল ট্রেসলোভের উপর মহাবিরক্ত। তার বিরুদ্ধে সৃজনশীলতাকে টুঁটি চেপে থামিয়ে দেয়ার অভিযোগ এনে তাকে পরিত্যাগ করতেও তাদের বাধেনি। আর তার এই বাস্তব জীবনে শিশুরাও ছিল বহাল তবিয়তেই। কিন্তু এই বাস্তবতার বাইরেও আরো কিছু ছিল যা তার প্রায়ই মনে পড়ে। ট্রেসলোভ তখন বার্সিলোনায়। এক ছুটির দিনে হঠাৎ মনে হল ,আচ্ছা ভাগ্যটা একবার যাচাই করে দেখলে কেমন হয়। সে যেখানে থাকতো, তার সামনের রাস্তায়ই ছিল এক জিপসী মহিলার আস্তানা। সেই মহিলা হাত দেখে মানুষের ভবিষৎ বলে দিতো পারতেন, অবশ্যই টাকার বিনিময়ে। ট্রেসলোভ গেল তার কাছে হাত দেখাতে।
মহিলা কিছুণ খুব মনোযোগ দিয়ে হাত দেখলেন, তারপর বেশ বিজ্ঞের ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে অস্ফুঠ কন্ঠে বললেন, তোমার হাতের রেখা বলছে তোমার জীবনে একজন নারী আসছে । উত্তেজিত ট্রেসলোভের প্রশ্ন: সে কি খুব সুন্দরী ?
আমার কাছে মনে হচ্ছে না, তবে তোমার কাছে সুন্দর লাগলেও লাগতে পারে।
একটু পরই বোমাটি ফাটলো । শুধু মেয়েই নয় সঙ্গে বিপদও দেখতে পাচ্ছি। এবার ভয়ার্ত কন্ঠে বললেন মহিলা হস্তরেখাবিদ।
ততণে ট্রেসলোভ আরো উত্তেজিত। জিজ্ঞেস করলো, আমার সঙ্গে তার কবে দেখা হবে-এটা আমি কিভাবে জানবো ?
জানতে পারবে ।
মেয়েটির নাম জানতে পারি ?
মৃদু হেসে জিপসী উত্তর দিলেন: আমাদের নিয়মে নাম জানতে হলে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। একটু থামলেন, অবশ্য তোমার বয়স কম, নিশ্চই চাকরি-বাকরি করো না, সে কারণে বলছি, মেয়েটির নাম হবে জুনো- তুমি কি এই নামের কোন মেয়েকে জানো ?
এক চোখ বন্ধ করে ট্রেসলোভ কিছু সময় স্মৃতি হাঁতড়ালো । জুনো ? সে কি জুনো নামে কোনও মেয়েকে চিনে ? বললো, না তার মনে পড়ছে না। সে শুধু ‘জুন’-এর নাম শুনেছে !
তাহলে জুডি জুরি বা জুডিথ- এমন কাউকে চিনো ? বললেন মহিলা।
হুডিথ ! মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো শব্দটি। পরণেই না সূচক ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালো ট্রেসলোভ। তবে নামের অনুপ্রাসের কথা ভেবে কিছুটা পুলক অনুভব করলো- জুলিয়ান ও জুডিথ, হুলিয়ান ও হুডিথ ট্রেসলোভ !
ভালো, কিন্তু জুলি জুডিথ বা জুনো যাই হোক না কেন- সে তোমার জন্যই অপো করছে, তবে আমার মনে হচ্ছে মেয়েটির নাম জুনোই হবে।বললেন মহিলা।
ট্রেসলোভ এবার তার অপর চোখটি বন্ধ করলো। তার ভেতরটা শুধু বলছে জুনো..জুনো..জুনো । জিজ্ঞেস করলো-সে আমার জন্য কতদিন অপো করবে ?
যতদিন না তুমি তাকে খুঁজে পাও।
ট্রেসলোভ কল্পনায় দেখতে পেল সে জুনোর খোঁজে সাত সমুদ্র তের নদী পার হচ্ছে। মুখে বললো, বিপদের কথা বললেন, সেটা কেমন ?
সেটা বলতে পারবো না, আমি শুধু বিপদের গন্ধ পাচ্ছি- মেয়েটির জন্য তুমি নিজে বিপদ হতে পারো কিংবা উল্টোটাও হতে পারে। এমনকি তোমরা দুজনেই অন্য কারোর জন্য বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারো।
তাহলে কি তার কথা ভুলে যাওয়া উচিত হবে ? জবাবের জন্য উন্মুখ ট্রেসলোভ।
যেন ভয় দেখাচ্ছে এমন ভাবে মহিলা বললেন, তোমার জীবনে সে অনিবার্য, কিছুতেই উপো করতে পারবে না!
জ্যোতিষী জিপসী মহিলা বেশ সুন্দরী ছিলেন, অন্তত ট্রেসলোভের দৃষ্টিতে। কানে আংটার মতো বড় আকারের সোনার তৈরী দুল, গলায় বিভিন্ন রঙ্গের ধাতব মালা পরিহিত এই জিপসী যে কোন পুরুষকে দুর্বল করে দেয়ার মতোই আকর্ষণীয়। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডের উচ্চারণে বেশ সুন্দর করে কথা বলেন, বলতে গেলে এই উচ্চারণ ভঙ্গির জন্যই মহিলাকে ট্রেসলোভের বেশ ভালো লেগেছিল। তার মনে হলো, জানা নেই এমন কিছু সে তাকে বলেনি। কেউ না কেউ, কোন একটা কিছু তার জন্য সত্যি অপো করেছিল। কিন্তু সেটা ছিল বিপত্তির চেয়েও বড় কিছু।
দুঃখ আর দুর্দশায় জালে আটকে থাকলেও বিপত্তি বা অঘটন কখনোই ট্রেসলোভের পিছু ছাড়েনি। সবসময় নিজে শিকার না হলেও কিভাবে যেন তার আশেপাশেই ঘটনাগুলো ঘটে গেছে। একবার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় একটি গাছ উপড়ে গিয়ে পড়লো তার ঠিক আধাগজ পিছনে থাকা এক লোকের উপর। বিকট চিৎকারের শব্দ শুনতে পেল সে, পরণেই আবিস্কার করলো তার গলা থেকেই বেরিয়েছে ওই শব্দ । বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। সেবার একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিল ট্রেসলোভ। আরেকবার লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ডে এক প্তি গানম্যানের ছোঁড়া গুলি তার কান ঘেষে চলে গিয়েছিল। সেবারও পৈত্রিক প্রাণটি রা পেয়েছিল। তবে এসব ঘটনায় কখনো পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়নি তাকে। কিন্তু একের পর এক এসব ঘটনা ট্রেসলোভকে বিচলিত করে তোলে। আরেকটি ঘটনা ছিল তার জন্য যার পর নাই আরো বেদনাদায়ক।
তরুণ বয়সে বাবার এক বন্ধুর মেয়ের মোহে পড়েছিল ট্রেসলোভ। মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী। শেষ গ্রীষ্মের গোলাপের পাঁপড়ির মতো ছিল তার গায়ের রঙ, চোখ দুটি যেন জল থৈ থৈ দিঘী। মেয়েটিকে সাাৎ দেবী মনে হতো ট্রেসলোভের। কিন্তু তার সেই দেবী মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। সে তখন বার্সিলোনায় জ্যোতিষীর কাছে হাত দেখাতে ব্যস্ত। তার বাবা বা পরিবারের কেউ তাকে খবরটা দেয়নি। অসুস্থতার সংবাদ তো দূরের কথা এমনকি মেয়েটির শেষকৃত্যের দিনও তাকে জানানো হয়নি। গভীর শোকাহত ট্রেসলোভ বিষয়টি নিয়ে পরে প্রশ্ন তুললে পরিবার থেকে জানানো হয়, তার ছুটির দিনটি নষ্ট হোক তা তারা চায়নি। কিন্তু ট্রেসলোভ বুঝতে পারে, ছুটির দিন-ফিন কোন ব্যাপার নয়, আসলে তার আতœসংযমের উপর ভরসা রাখতে পারেনি তার পরিবার । শুধু নিজের পরিবারই নয়, যারা ট্রেসলোভকে খুব কাছ থেকে চিনতো তারাও কারো মুত্যুশয্যায় বা শেষকৃত্যে তাকে ডাকতে দুই বার চিন্তা করতো।
এত সব ঘটনা-দুর্ঘটনায় অনেক কিছু হারালেও ট্রেসলভের জীবন থেমে থাকেনি । নানা ঘাত-প্রতিঘাত সয়েও তার আটচল্লিশ পেরুনো শরীরে কোন রোগ-ব্যাধি বাসা বাধেনি। বিপতিœকও হয়নি। সত্যিকার অর্থে সে ভালোবেসেছে বা শারিরীক ভাবে মেলামেশা করেছে এমন কোন নারীও তার জানা মতে মারা যায়নি। আর কয়েকজন তো দীর্ঘদিন ধরে তাকে সঙ্গ দিয়েছে; চূড়ান্ত ভাবে কোন কিছু পাওয়ার জন্য-যেটাকে বলা যায় মহৎপ্রেম।এসব কামহীন সম্পর্ক ট্রেসলোভকে দিয়েছে এক অস্বাভাবিক তারুণ্যদিপ্ত দৃষ্টি; যা থাকে মানুষের বিশ্বাসে, চাইলেই অর্জন করা যায় না।
- Mohammad Nadim (মোহাম্মদ নাদিম)
- Login to post comments
- 344 reads
একই রকম আরো কিছু ব্লগ
- তিনি এবং ডাঃ ফ্রিলুক্স (ছোট গল্প) - Rita Roy Mithu
- প্রলয়ক্ষণ ২০৫০-একটি বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী - ডাঃ মাহবুব মোর্শেদ
- মাটির ভিতরে....! - Hasan Kamrul
- মহান ফিহা - Ahsan.Habib
- হুমায়ূন আহমেদের শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের কাছে একটি অনুরোধ জানাতে পারি কি? - Abdul.Gaffar.Ch...
- ফেসবুকের ছায়াবন্ধু, নাকি সামনের কায়াবন্ধু! - Anisul.Haque
- স্মৃতিবিলাপ - Hasan.Azizul.Huq
- জোসনার ফুল - মফিজুল ইসলাম খান
- প্রিয় হুমায়ূন ভাই, প্রিয় জাদুকর - Jewel.Aich
- সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চক্রান্ত প্রতিরোধ করুন - Kamal.Lohani

Recent comments
1 day 19 hours ago
1 day 20 hours ago
2 days 3 hours ago
2 days 4 hours ago
2 days 4 hours ago
2 days 5 hours ago
2 days 10 hours ago
2 days 3 hours ago
3 days 20 hours ago
3 days 22 hours ago