অন্তর্বর্তীকালীন হামিদ সরকারের রূপরেখা

Mizanur.Rahman.Khan's picture

সংলাপে বসতে হাইকোর্ট বিভাগের রুল এসেছে এমন একটি সময়, যখন দেশে সংঘাত চলছে। সংলাপের কোনো সংজ্ঞা নেই। এই রুলেরও ভবিষ্যৎ নেই। সংকট সমাধানে সংলাপ নানাভাবে হতে পারে। এক ছাদের নিচে মুখোমুখি না বসেও সংলাপ হতে পারে। এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের সুযোগ উন্মুক্ত। সঠিকভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশ্নেরও নিষ্পত্তি ঘটানো যেতে পারে। আমরা একটি প্রাথমিক খসড়া রূপরেখার ইঙ্গিত দিচ্ছি।

গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসী একজন বাংলাদেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বললেন, তিনি আওয়ামী লীগের ভেতরকার এক সূত্রে একটি খবর পেয়েছেন। সেটি হলো, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি হবেন। সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার করা হবে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে না। বিএনপি তখন বিপদে পড়বে। কারণ, তখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাই না বলতে পারবে না।
নিঃসন্দেহে এটা ধূর্ত কল্পনা। কারণ, আগামী সংসদ নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, শেখ হাসিনা সে ক্ষেত্রে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। এর গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন রাজনীতিবিশারদ বললেন, ‘এই গুজব যাচাই করেছি। এর ভিত্তি দেখি না। কারণ, রাষ্ট্রপতি হলে শেখ হাসিনাকে দলীয় প্রধানের পদ ছাড়তে হবে। সেটা তিনি এখনই ছাড়তে প্রস্তুত নন। আরেকটি মেয়াদ তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হতে শেখ রেহানাকে হয়তো প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে চাইতে পারেন।’

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কিছু না হওয়াই বাংলাদেশের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তবে ওই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বললেন, কথাটা তিনি নেহাত গুজব বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু জেনারেল এরশাদের মন্তব্যে তিনি তাৎপর্য খুঁজছেন। সরকারি দলের মিত্র এরশাদ হঠাৎ করেই বললেন, রাষ্ট্রপতি পদ্ধতিতে গেলে তাঁর আপত্তি নেই। তখন শেখ হাসিনার সঙ্গে তিনি লড়তে রাজি আছেন। রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হলে বিএনপির রাজনীতি আরও বড় খাদে পড়বে।

এরশাদের পতনের পর আওয়ামী লীগ সংসদীয় পদ্ধতির সরকার চাইল, বাকশালে যা সমাহিত হয়েছিল। মনে করা হতো, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার সঙ্গে পিছিয়ে থাকবেন। এই আশঙ্কার একটা ভিত্তি আছে। শেখ হাসিনা নন, খালেদা জিয়াই একযোগে পাঁচ আসনে জিতেছেন। বাংলাদেশে সংসদীয় না রাষ্ট্রপতি—এই তর্ক প্রায় অর্থহীন। কারণ, দুয়ের মধ্যে মৌলিক শাসনগত পার্থক্য টানা যায়নি। খালেদা জিয়া না চাইলে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরা কঠিন ছিল এবং ওই পুনঃপ্রবর্তন পর্বটি জাতির সঙ্গে একটি বিরাট প্রতারণা ছিল। কারণ, সংসদীয় পদ্ধতি এনে দুই নেত্রীর দল ও সরকার চালানোটা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। আড়াই দশকের বেশি সময় দল ও সরকারপ্রধানের পদ আঁকড়ে আছেন তাঁরা।

২২ বছর আগে সংসদীয় পদ্ধতির প্রত্যাবর্তনকে ‘গণতন্ত্রের পথে ঐতিহাসিক যাত্রা’ বলে আমরা স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু অগ্রগতি হতাশাব্যঞ্জক। সরকারকে বৈধভাবে চোখ রাঙাতে পারে, এমন একটিও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। প্রমাণিত হয়েছে, সব অবস্থায় কিছু ব্যক্তিকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ থাকতেই হবে। কেবল পদ্ধতি মুক্তি দেয় না। সংসদীয় কিংবা রাষ্ট্রপতি—উভয় ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের অনুশীলন চলে। কোনটি বেশি ভালো, এই বিতর্ক চূড়ান্ত বিচারে অর্থহীন। বাংলাদেশের জনগণ প্রতারিত হয় ১৯৭২ সালেই। সংসদীয় পদ্ধতি ছিল ছদ্মবেশ। তখনই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন চালু করা হয়েছিল। বাংলাদেশ না দেখেছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংসদীয় পদ্ধতি, না দেখেছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি। ব্যক্তির প্রয়োজনে বারবার এর খোলনলচে পাল্টানো হয়েছে। মোসাহেব বুদ্ধিজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা সামরিক-বেসামরিক স্বৈরশাসক নির্বিশেষে রয়েসয়ে বুদ্ধি খরচ করেছেন। শাহবাগের নির্দলীয় তরুণ প্রজন্ম, এই ফাঁকিটা একদিন বুঝতে পারবে, সেই আশায় দিন গুনি।

এ দেশে ‘রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির’ মানে কী? নির্বাহী ক্ষমতা এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আছে। সেটা রাষ্ট্রপতির কাছে আনলেই হলো। আমরা তখন মুহূর্তেই ‘গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করার ইচ্ছা ত্যাগ করব। বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক ‘নির্দলীয় ব্যক্তি’ চান। হোসেন জিল্লুর রহমানের চাওয়া ‘গ্রহণযোগ্য ও যোগ্য ব্যক্তি’।

আমীন আহম্মদ চৌধুরী চান ‘রাজনীতির বোধসম্পন্ন ব্যক্তি’। সালমা খান ‘দেশকে এগিয়ে’ নেওয়ার রাষ্ট্রপতি চান। প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা নিশ্চয় সুবিবেচনাপ্রসূত। কিন্তু ‘কবর জিয়ারত’ এবং ‘ফিতা কাটার’ মতো কাজ যদি একজন দলীয় কিংবা অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি করেন, তাহলে আমাদের খুব কি ক্ষতি হবে? কবর জিয়ারতটা একান্ত দলীয় এবং অগ্রহণযোগ্য বশংবদ ব্যক্তিকেই করতে দিন! প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করা এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের নির্বিচারে বিচারপতি নিয়োগ করার মতো রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ইতিহাস তো বাসি নয়।
এ দেশে মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় একটা প্রতিবন্ধিত্ব আছে। এতে ব্যক্তি-শাসনের অভিঘাত উগ্র। ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, রাগ-অনুরাগ এবং কেবল তাঁরই মান-অভিমান বিবেচনায় নিয়ে এ দেশে শাসনব্যবস্থার উচিত-অনুচিত বিষয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে আমরা পরিচিত।

শাসক দল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা বলছে। ধরে নিচ্ছি, বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় আমরা আর ফিরব না। কিন্তু আমাদের তো অবশ্যই সবার অংশগ্রহণসম্পন্ন একটি নির্বাচন করতে হবে। শুধু সংসদ নয়, উপজেলা পরিষদের নির্বাচন নিয়েও হিসাব-নিকাশ আছে। আগামী জানুয়ারির ১৮০ দিন আগে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন শেষ করতে হবে। হতে হবে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনও। হয়তো আগামী আগস্ট থেকেই দিন গণনা শুরু হবে। সন্দিগ্ধ সরকার সংসদ আইনি জটিলতা এড়াতে হয়তো সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করতে বাধ্য হবে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে দোটানা চলতেই থাকবে। তাই সংসদ ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের সময়সীমা নিয়েও সংলাপের দরকার আছে।
মুখোমুখি সংলাপ হয়তো হবে না। এতে হায় হায় করার কিছু নেই। ধরে নিই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও আর হবে না। অনির্বাচিত ব্যক্তিদের উপদেষ্টা হওয়ার রুদ্ধ দ্বারটা আর খোলার দরকার নেই। এ ব্যাপারে সুশীল সমাজকে প্রধানমন্ত্রীর খোঁচাটা একদম ঠিক আছে। অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং এক-এগারোর মতো কোনো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না। এও তো ঠিক, আমাদের শাসনব্যবস্থা যে ঘোরতরভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, তার দায় সম্ভবত কেবলই দুই নেত্রী কিংবা কয়েকজন নেতার ওপর চাপানো চলে না। কারণ, এখানে আমাদের সমষ্টিগত দায় আছে। আর্থসামাজিক ও আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলও সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলন থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। আমরা এমন কোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর শাসনের কথা চিন্তা করতে পারি না, সেটা দুই নেত্রীর গড়ে তোলা ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের চেয়ে চূড়ান্ত পরিণামে উত্তম হতে পারে। কিন্তু এ কথাও সত্য যে ‘লগি-বৈঠার’ মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধের কাজটুকু এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের প্রতিভূদেরই নিশ্চিত করতে হবে। এটুকু অন্তত মুখ্যত তাঁদের ব্যক্তিগত চাওয়া না-চাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। সময় থাকতে তাঁরা বুঝবেন, এই দুর্বল, আধা কার্যকর রাষ্ট্রের এমন কোনো বলশালী অঙ্গ নেই, থাকতে পারে না, পারবে না, যারা সব বৈরী পরিস্থিতিতে হুকুমদাতা কিংবা আহ্বানকারীর প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলার মদদ দিতে সামর্থ্যবান থাকবে। শর্তহীন আনুগত্যের কোনো গ্যারান্টি নেই। এটা বড়জোর নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কাছে থেকে পাওয়াটাই বাস্তবসম্মত মনে করা উচিত।

এর আগে বলেছিলাম, নির্বাচনের আগে সমঝোতা করে কতিপয় ব্যক্তিকে উপনির্বাচনে জয়ী করে এনে নির্দলীয় অথচ নির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার করা যায়। সে বিকল্প থাকছে। এখন জাতীয় সংসদের স্পিকার তথা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বেই একটি স্থায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সুযোগ এসেছে। ১৯ জুন পর্যন্ত সময় রয়েছে। প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স পাঠিয়ে এই সময় বাড়ানো যেতে পারে। তবে সদিচ্ছা থাকলে তার দরকার পড়বে না। ফ্রান্স একবার স্পিকারকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান করে নির্বাচন করেছিল। বর্তমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে দলীয় আনুগত্যের খুব বাইরে যেতে দেখিনি। দৃশ্যত বিনা বাক্য ব্যয়ে আপিল বিভাগে চার বিচারক নিয়োগের নথিতে সই করে ইতিমধ্যে তিনি তা প্রমাণ করেছেন। আমরা আহত হয়েছি। তবু দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে বলব, সঠিক ব্যক্তি সঠিক জায়গায় এসে পড়েছেন। শুনেছি, বিএনপি মহলেও তাঁর বিষয়ে একটা নমনীয়তা রয়েছে। ত্রয়োদশ সংশোধনীর আওতায় রাষ্ট্রপতি প্রকৃতপক্ষে একজন ‘সর্বশক্তিমান’ রাষ্ট্রপতি ছিলেন। যদিও সংবিধানে অস্পষ্টতা ছিল। এবারে বিধান করা যায়, নির্বাচনকালে সংসদ ভঙ্গরত অবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতা আপনা-আপনি রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত হবে। অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভার কলেবর ছোট হবে। তার সদস্যরা রাজনীতিক হবেন। কিন্তু তাঁরা নির্বাচনে অংশ নেবেন না। আরও একটি বিকল্প হচ্ছে, সংসদ ভেঙে গেলে প্রধানমন্ত্রী প্রথা অনুযায়ী পদত্যাগ করবেন। রাষ্ট্রপতি তখন তা গ্রহণ করে জনাব হামিদ বা গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা গঠনে আমন্ত্রণ জানাবেন। তবে এর বিপদ হলো, নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে আবার জাতিকে একই আন্দোলনে রক্ত দিতে হবে।

আওয়ামী লীগ একমাত্র দল, যারা সংবিধান সংশোধনের সুযোগ পেয়ে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা পরিবারের বাইরে কারও হাতে নেওয়ার বিধান করেনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা কীভাবে রাষ্ট্রপতির হাতে নিতে হয়, তার একটি রূপরেখা চতুর্থ সংশোধনীতে আছে। আমরা মনে করি না যে নির্বাচনকালে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ না করতে দিয়ে কোনো নির্দলীয় বা গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে বসালে, তাঁর পক্ষে রাজনৈতিক সংকট মোচনে বা নির্বাচনকালে কার্যকর কিছু করা সম্ভব হবে।