‘দেশপ্রেমিক’ ও একজন ‘রক্তচোষা’র কাহিনী নতুন প্রজন্মের প্রতি শেখ হাসিনার উপহার

Mahfuz.Anam's picture

আপন জাতিকে নেতাগণ অনেক কিছুই উপহার দিয়ে থাকেন। শেখ হাসিনা নিজেও তার ব্যতিক্রম নন। বাংলাদেশকে তিনি কী কী দিয়েছেন, সে বিচারের ভার ইতিহাসের ওপর বর্তালে, আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, একজন ‘দেশপ্রেমিক’ ও একজন ‘রক্তচোষা’র প্রতিমূর্তি উপহার দেয়ার জন্যে উত্তরকালের মানুষ তাঁকে অবশ্যই স্মরণ করবে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানসহ দেশে প্রায় সবাই এবং বিদেশে অনেকেই যখন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকার কথা বলছে, তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার মধ্যে ‘দেশপ্রেমিক’কে দেখতে পেলেন। কিন্তু কেন? কারণ তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন। কখন? দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন চুক্তি বাতিল হয়ে যাবার প্রধান কারণ হিসাবে প্রতিভাত হওয়ার পর, বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশের সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পর। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নিকট তিনি একজন দেশপ্রেমিক এবং তিনিই (প্রধানমন্ত্রী) সঠিক।

সবাই জানেন যে, মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য এবং নিজ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকেই তাকে পদত্যাগ করার অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন গোড়া থেকেই, যাতে সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হতে পারে। অন্য যে কেউ, নিজের দেশ, আপন দল এবং দলের নেতার প্রতি সামান্যতম মমত্ববোধও যার রয়েছে (তিল পরিমাণ আত্মমর্যাদাবোধও যার আছে) তিনি অবশ্যই সেই কাজটিই করতেন। বিতর্কের সূত্রপাত হওয়ার সাথে সাথে প্রকাশ্যে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষ প্রমাণ করার জন্যে সরকার ও বিশ্বসংস্থাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি সরকারকে এই প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারতেন। কিন্তু আমাদের ‘দেশপ্রেমিক’ সেটা করেননি। তার দেশ সেবার সাধ এতটাই প্রবল যে, এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিল হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের মর্যাদাহানি এবং দেশবাসী অপমানিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করেছেন। বলাবাহুল্য, তার পদত্যাগপত্র এখনও পর্যন্ত অফিসিয়ালি গৃহীত হয়নি।

আমাদের দেশপ্রেমিক হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি আগের মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা থেকে পাসপোর্ট সংক্রান্ত একটি ঘটনার দায়ে বাদ পড়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি সেই ব্যক্তি যাকে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি ‘লেস দেন অনেস্ট’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এক ক্যাবলবার্তায় মরিয়ার্টি উল্লিখিত মন্তব্য করেন, উইকিলিকস ২০১১ সালের ৩০ আগস্ট সেটি ফাঁস করে দেয়। তা সত্ত্বেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাকে ‘দেশপ্রেমিক’ বিবেচনা করছেন এবং তিনি অবশ্যই সঠিক।

এবার আমাদের রক্তচোষা প্রসঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তত্পরতায় তিনি অংশগ্রহণ করেন, ঠিক যেমনটি করেছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত, সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এসএএমএস কিবরিয়াসহ আরও শত শত মানুষ। যারা সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। তিনি কিভাবে ক্ষুদ্র ঋণের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেছিলেন এবং কিভাবে সেটা বিশ্বময় আন্দোলনে রূপান্তরিত হলো তা সর্বজনবিদিত। এর পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়ার পর থেকে দারিদ্র্য নির্মূলের পথদিশা পেতে তিনি সমস্ত মেধা ও শ্রম নিয়োজিত করেন। যখন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সংগতকারণেই সমাজের বোঝা হিসাবে দেখে আসছিল, তখন তিনি তাদের সম্পদ হিসাবে ভাবলেন। তিনি ভাবলেন যে, তাদের মধ্যে রয়েছে নিজেদের সমস্যা সমাধান করার মত বিস্ময়কর সৃজনশীলতা।

যাদের জামানত দেবার সামর্থ্য নেই, কেবল সেই দরিদ্রশ্রেণীর জন্যে মহিলাদের নিয়ে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘটনাটি ছিলো ইতিহাসে প্রথম। বিশ্বের কোথাও কেউ কখনও পল্লীর দরিদ্র নারীদের জন্য এরকম ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেননি। তিনি এই চিন্তার ধারকই কেবল নন, তিনি এটাকে ফলপ্রসূ করেছেন এবং দুই দশক ধরে পরিচালনা করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। যার ফলস্বরূপ ‘রক্তচোষা’ এবং তার গড়া রক্তচোষা প্রতিষ্ঠান? উভয়ই নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়।

এ যাবত্ খুব বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠান নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়নি। ১৯১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২২টি প্রতিষ্ঠান/সংগঠন এই পুরস্কার অর্জন করেছে। ইন্টার গভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ, আইএইএ, ইউএন, ইউএনএইচসি আর, ইউএন পিস কিপিং ফোর্স, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এখানে উল্লেখনীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এই যে, পুরস্কারে ভূষিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই আন্তর্জাতিক সংস্থা। প্রত্যেকটি সংস্থারই রয়েছে আন্তর্জাতিক সচিবালয়, যেখানে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিশেষজ্ঞমন্ডলী। সম্পূর্ণরূপে একটি দেশের নাগরিকদের দ্বারা পরিচালিত গ্রামীণ ব্যাংকের ন্যায় জাতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান এর আগে নোবেল পুরস্কার পায়নি। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরাই নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। ব্যক্তির বিষয়টিকে আলাদা রেখে যদি আমরা প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখি, তাহলে আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে, তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী থেকে শুরু করে মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপক, সর্বোপরি মহিলাদের দ্বারা গঠিত পরিচালনা বোর্ড নিরলস প্রচেষ্টায় গ্রামীণ ব্যাংক একটি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অনন্যসাধারণ এই সংস্থার সাফল্য, এটি অনুকরণীয় প্রেরণাসঞ্চারি, বিস্ময়কর এবং কার্যকর। ফলে বিশ্ব এই সংস্থাটিকে উপেক্ষা করতে পারেনি। তারা মাথা নুইয়ে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানকে, ভূষিত করেছে নোবেল পুরস্কারে। এই সব অনস্বীকার্য অর্জন যার অবদান, তিনি আর কেউ নন, তিনি সেই ‘রক্তচোষা।’

একজন ব্যক্তিকে অবমানিত ও হয়রানি করার উদ্দেশ্যে আমাদের সরকারের লজ্জাকর এবং দুর্বোধ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে কি আমরা গ্রামীণ ব্যাংকের লক্ষ লক্ষ দরিদ্র ঋণগ্রহীতা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার উজ্জ্বল অর্জনকেই অপমানিত করছি না? একজন ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন করার এই প্রয়াস নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে।

শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি আমরা আহবান জানাই, নিজেদের হেয় করার এই তত্পরতা বন্ধ করুন। যে ব্যক্তিটি আমাদের জনগণের সৃজনশীল সম্ভাবনার ব্যাপক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে তাকে অপমানের লজ্জাকর ভূমিকা বিশ্ব তাকিয়ে দেখছে। এমন একটি নাম, যা বিশ্বের সব বড় নগরীতে স্বীকৃত। সাম্প্রতিককালের দারিদ্র্য নিয়ে অনুষ্ঠিত সব বিশ্ব সম্মেলনেই তার নাম উল্লেখ হয়। তিনি সেই ব্যক্তি যার কাজ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ের ওপর পিএইচডি থিসিস হিসাবে নির্ধারিত হয়। তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি দেখিয়েছেন যে, আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী কতোটা গতিশীল, সৃজনশীল এবং উত্পাদনশীল এবং কতোটা প্রাণবন্ত। তিনি দেখিয়েছেন যে, আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী কত অল্প প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেলে তাদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারে। প্রফেসর ইউনূসকে হেয় প্রতিপন্ন করতে গিয়ে আমরা আকাশে থুতু ছিটাচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের মুখেই এসে পড়ছে। সংকীর্ণ চিন্তার একটি ঘৃণ্য কল্পচিত্র হচ্ছে ‘রক্তচোষা’।

যার পশ্চাতে ইন্ধন যুগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ রাসপুটিনরা। যারা প্রধানমন্ত্রীকে ভ্রান্ত ধারণা এবং তার মনে সন্দেহের বীজ বুনে দিয়েছে। যত দ্রুত আমরা এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো ততই মঙ্গল। সরকারি নেতাদের বর্তমান পদক্ষেপ তাদের জন্যে বুমেরাং হয়ে যাবে। তরুণদের মনে আমাদের নোবেল লরিয়টের জায়গা কতটা উঁচুতে তারা তা জানেন না। তরুণরা তার মধ্যে দেখতে পায় নয়া চিন্তা, অনুপ্রেরণা, আত্মবিশ্বাস এবং আশার আলো। সংঘাত-সন্ত্রাস, গালি-গালাজ এবং গভীর অবিশ্বাসের পুরোনো রাজনীতির কাছে তারা কিছুই আশা করে না। তরুণরা মর্যাদাপূর্ণ এক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চান। আমাদের নেতারা কবে বুঝবেন যে, প্রজ্ঞা কেবল একটি দল, একটি কোটারি কিংবা কোনো এক নেতার একচেটিয়া নয়? আর কবে তারা ঘৃণাবোধ কমিয়ে অন্যের প্রতি ইতিবাচক হতে শিখবেন।

- সৌজন্যে ইত্তেফাক