সরকারকে ধসিয়ে দিল বিশ্বব্যাংক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যত বড় কথাই বলুন না কেন, এটা বাস্তব যে, পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থঋণ চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেশ-বিদেশে লীগ সরকারের জন্য একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। নবম সংসদ নির্বাচনের আগে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের সমর্থন আদায় করেছিল শাসক লীগ। পদ্মা সেতু নির্মাণও ছিল অন্যতম প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী মেনিফেস্টোর অগ্রাধিকারভিত্তিক পাঁচটি কর্মসূচির কোনোটিরই আশাব্যঞ্জক বাস্তবায়ন হয়নি গত সাড়ে তিন বছরে। বাকি দেড় বছরে মন্ত্রী-মিনিস্টার আর শাসক লীগের হোমরা-চোমরারা আখের গোছানোর কাজেই ব্যস্ত থাকবেন বলে জনমনে ধারণা বদ্ধমূল। সরকারের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা, ব্যর্থতা, দলবাজি, গলাবাজি, দুর্নীতিগ্রস্ততার গণঅভিযোগ প্রবল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, গুম, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য শুধু লীগ শাসনকেই নয়, দেশে সিভিল রুলের কার্যকারিতাকেই প্রশ্নবোধক চিহ্নের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি দেশের জনগণের একটি অংশের আবেগাশ্রিত সমর্থন থাকলেও তার সরকার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। বলা চলে দিন দিন তাদের সমর্থনে ধস নামছে। আরও ধসিয়ে দিল বিশ্বব্যাংক।
দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পদ্মা সেতুর অর্থঋণ চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। অর্থমন্ত্রী এমন কি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন তা আক্রমণাত্দক বলেই মনে হচ্ছে।
৪ জুলাই সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে খুব কঠোর এবং আক্রমণাত্দক দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে সেদিন বলেছেন, 'যেখানে তারা এক পয়সা ছাড় দেয়নি সেখানে দুর্নীতি হলো কি করে? বরং কারা এর পেছনে আছে, তাদের উদ্দেশ্য কি, তার খোঁজ নেওয়া দরকার। বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করে তিনি বলেছেন, ওয়ান স্ট্রিট জার্নাল ও ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন পড়ে দেখা হোক। তাহলেই আসল দুর্নীতি কোথায় আছে তা জানা যাবে। কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে অত্যন্ত সাহসী বলে চিত্রিত করছেন এবং তাকে এ জন্য বাহবা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের ভয় হয়, এটা জলে বাস করে কুমিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হয়ে যাচ্ছে না তো! কেউ কি প্রধানমন্ত্রীকে ভুল পরামর্শ দিচ্ছেন? স্বৈরাচার এরশাদের (লীগ নেতা আবদুল জলিল এরশাদকে স্বৈরাচার বলবেন না বলে তওবা কাটলেও দেশের জনগণ সেই তওবা আমলে নেয়নি) অতি বিশ্বস্ত অর্থ উপদেষ্টা ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কৌতুকপ্রদ বক্তব্যও আলোচনার বাইরে রাখার উপায় নেই। ২ জুলাই জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া বক্তব্য বাংলাদেশকে অপমান করেছে। বিশ্বব্যাংক অসমর্থিত বা অসম্পূর্ণ অভিযোগের ভিত্তিতে একটি দেশকে এভাবে অপবাদ দিতে পারে না বা সে দেশের জনগণের মর্যাদাহানি করতে পারে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সম্ভবত বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক তার মেয়াদকালে বিষয়টির সুরাহা করার জন্য একটি অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিশেষভাবে বিপর্যস্ত করেছে।
অর্থমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করায় দেশ এবং জাতি অপমানিত ও বিপর্যস্ত। এ জন্য এককভাবে বিশ্বব্যাংকই দায়ী, না এ ব্যাপারে আমাদেরও কিছু দায় আছে? ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের এই ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে। পাঁচ মাস যেতে না যেতেই ওঠে দুর্নীতির অভিযোগ। প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংক শুধু অভিযোগ নয়, একটি তদন্ত প্রতিবেদনই অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করে ২০১১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। অর্থমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে গোটা জাতির অপমান ও বিপর্যস্ততার কথা বলছেন; কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ বাংলাদেশ ও এর সমগ্র জনগণের বিরুদ্ধে ছিল না। তারা অভিযোগ এনেছিল তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম এবং মন্ত্রীর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সাকোর বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তারা মন্ত্রী আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। সরকার বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ সঠিকভাবে আমলে না নিয়ে দুদককে দিয়ে যে তদন্ত করিয়েছে তাতে সন্তুষ্ট হয়নি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। দুদকের সেই তদন্তে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের মধ্য এপ্রিলে দুর্নীতির তথ্যসংবলিত আরেকটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও দুদকের কাছে জমা দেয় বিশ্বব্যাংক। অভিজ্ঞমহল মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি সমঝোতায় পেঁৗছানোর শেষ সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যায় তাদের দ্বিতীয় দফা অভিযোগও অগ্রাহ্য করায়। একজন মন্ত্রী আবুল হোসেনের গদি রক্ষার জন্য সরকার যেন সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। দেশ ও জাতির মান রক্ষার চেয়ে একজন অভিযুক্ত মন্ত্রীর মান রক্ষার দায়ই বেশি মনে হচ্ছে। কি হতো মন্ত্রীকে বাদ দিলে? সরকারের ঘাড়ে দুর্নীতির অপবাদের বোঝা চাপতো_ এই তো! কিন্তু ঋণচুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এই বোঝা কি আরও ভারী হয়ে যায়নি? আমাদের সরকারের অবস্থান যেখানে উত্থাপিত অভিযোগের বিরুদ্ধে, তখন ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় কানাডায়। অর্থের অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে পদ্মা সেতুর পরামর্শক হতে আগ্রহী কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়েরে দুহাইমকে গ্রেফতার করে সে দেশের পুলিশ। গত ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয় একই প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তা রমেশ সাহা ও মোহাম্মদ ইসমাইলকে। কানাডা সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়। তখনই উচিত ছিল রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ও দক্ষ, শাণিত কূটনৈতিক সাফল্যের সোনালি জমিনে বাংলাদেশ আর বিশ্বব্যাংকের আস্থার সম্পর্ককে দাঁড় করানো। এখনো এটি অসম্ভব কিছু নয়। বিষয়টি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হার-জিতের বিষয় নয়, জাতীয় স্বার্থেরও বিষয়। বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তাদের আচরণ, প্রেসক্রিপশন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য সব সময় সুখকর নয়। তারা বিশ্বের বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠীর স্বার্থের পাহারাদার। কিন্তু আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তাদের দ্বারস্থ হই। অর্থমন্ত্রীই বলেছেন, 'স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত তারা ২৫১টি প্রকল্পের বিপরীতে ১ হাজার ৬৮০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়ন করেছে এবং এখনো ১ হাজার ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অপরিশোধিত রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৩৫টি প্রকল্প বাংলাদেশে চলমান রয়েছে। যাতে মোট ৪৯৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। এ বাস্তবতার আলোকে বিশ্বব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না।
বিশ্বব্যাংকের প্রথমে অভিযোগ ছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা এবং মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কিন্তু ঋণচুক্তি বাতিলের ঘোষণায় আঙ্গুল উঠেছে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও দুদকের বিরুদ্ধেও। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উলি্লখিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সন্তোষজনক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার বা ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তিনটি শর্ত ১. যেসব সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে এসএনসি লাভালিন কর্মকর্তার ডায়েরির ভিত্তিতে অভিযোগ করা হয়েছে তাদের ছুটি দেওয়া, ২. দুর্নীতি দমন কমিশনে এই তদন্তের জন্য বিশেষ টিম গঠন করা, ৩. তদন্তের সব বিষয়ে বিশ্বব্যাংক নিয়োজিত একটি প্যানেলকে অবহিত রাখা এবং তাদের উপদেশ গ্রহণ করা। আমরা বুঝতে পারি না এই তিনটি শর্ত মানতে কি অসুবিধা ছিল এবং তাতে জাতীয় মর্যাদাহানির কি উপাদান ছিল। এখন মানুষের মনে এ ধারণা জন্মাতেই পারে যে, বিশ্বব্যাংকের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে লীগ সরকারের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন না করার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো দুর্বলতা ছিল। এতে তাদের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান অবিশ্বাসের কারাগারে বন্দী হয়ে গেল। ঋণচুক্তি বাতিলের পর অর্থমন্ত্রী একে বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী সভাপতি রবার্ট জুয়েলিকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেছেন। তার মত ছিল, এটি বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত নয়। এমন একটি ধারণা তিনি দিতে চেয়েছেন যে, ব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দিনই বলে দিয়েছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে ঋণচুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক। ওয়াশিংটনে ১ জুলাই সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে কতিপয় ব্যক্তির কারণে বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিশ্বব্যাংক শাস্তি দিচ্ছে কিনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের দরিদ্র জনগণের বিষয়টি আমরা খুব ভালোভাবেই জানি। কিন্তু বিশ্বব্যাংক কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করবে না। তাদের অবস্থান বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে যে নয়, তা-ই তিনি স্পষ্ট করেছেন এ বক্তব্যে। কাজেই এ ইস্যুতে জনগণকে পক্ষে টানার যে কৌশল অর্থমন্ত্রী নিয়েছেন, তাতে কোনো সুবিধা হবে না। বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার ঋণের টাকা থেকে দুর্নীতি হয়েছে সে কথা কোথাও বলেনি। পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের সঙ্গে অভিযুক্তদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রামাণিক তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযোগ করেছে বিশ্বব্যাংক। আমাদের দেশের মানুষেরও এই অভিজ্ঞতা আছে যে, কোনো বড় সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তদবিরবাজি আমাদের দেশেও হয়। এই জন্য কমিশন নিয়ে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান ও তদবিরকারকের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী লেনদেন হয়। বিল পাওয়ার পর কমিশনের অর্থ দেওয়া হবে এমন সমঝোতায় কেউ যায় না। পেমেন্টটা কাজ পাইয়ে দেওয়ার আগে বা কাজ পাইয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই করতে হয় বলে শোনা যায়। এ ক্ষেত্রে পেমেন্টটা কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকেই দিতে হয়। বিশ্বব্যাংক অর্থ ছাড়ই দেয়নি, দুর্নীতি হলো কি করে_ প্রধানমন্ত্রী কোন যুক্তিতে এ মন্তব্য করেছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। এ ব্যাপারে পাবলিক পারসেপশন প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী বা লীগ সরকারের অবস্থানের অনুকূল নয়। কাজেই এ ব্যাপারে বিরোধ নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া খুবই জরুরি। তা না হলে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় আমাদের দেশের অন্য চালু সব প্রকল্প নতুন নতুন কঠোর শর্তের জালে জড়িয়ে সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত সুর অনুযায়ী আমরা যদি আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হতাম তাহলে বিশ্বব্যাংককে অবহেলা করার বা চ্যালেঞ্জ করার ঝুঁকি আমরা নিতে পারতাম। কিন্তু আমাদের নিকট প্রতিবেশী ও পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারতও তা পারছে না। রবার্ট জোয়েলিক আমলেই ভারত বিশ্বব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ঋণ সহায়তা নিয়েছে ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ভারতের ভাবী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি জোয়েলিককে বলেছেন ভারতের প্রকৃত বন্ধু। আমাদের অর্থমন্ত্রী তাকে কেন বাংলাদেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করলেন বলা মুশকিল। অন্য সব দেশের চেয়ে ভারতের একক ঋণ গ্রহণ সর্বোচ্চ হওয়ায় নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে জোয়েলিক বলেছেন, 'আমরা ভারতের সঙ্গে সমবায় গড়েছি'। ভারত যেখানে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমবায় গড়েছে, সেখানে আমাদের সরকার কোন শক্তি ও সামর্থ্যের ভরসায় সেই বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে? আমরা বিশ্বব্যাংকের কাছে আত্দসমর্পণের কথা বলছি না, ভারতের মতো আত্দমর্যাদা নিয়ে সম্পর্ক বজায় রাখার কথা ভাবতে বলছি সরকারকে। ৬৮ বছরের বিশ্বব্যাংক জন্মলগ্ন থেকেই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় লালিত ও বর্ধিত। এই ৬৮টি বছর মার্কিন নাগরিকরাই এই ব্যাংকের সভাপতি হয়েছেন। বিশ্বব্যাংক মানেই আমেরিকার ব্যাংকের মতো হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের ব্যাপারে সরকারের কঠোর অবস্থানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে নেবে সেটাও আমাদের সবার বিবেচনায় থাকা উচিত।
নিজস্ব অর্থায়নে বা অন্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে পদ্মা সেতু নির্মাণের যে আশ্বাসবাণী প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী-মিনিস্টাররা শোনাচ্ছেন সে সম্পর্কে দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদদের মনোভাব নেতিবাচক। কেননা, তাতে খরচ বেড়ে যাবে অনেক। বিনিয়োগকারীরা লাভের জন্য বিনিয়োগ করবে। বিশ্বব্যাংকের চেয়ে কম সুদে পৃথিবীর কোথাও কেউ অর্থ দেয় না। এটা আদৌ সম্ভব কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অনেকেই সরকারের এই ঘোষণাকে আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য ভরাডুবি রোধের একটা কৌশল বলে ধরে নিচ্ছেন। আত্দরক্ষার জন্য বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে সরকারি মহল থেকে সত্য কথা বললেও মানুষ বিশ্বাস করতে চাইছে না। জনগণের তরফ থেকে নেমে আসা ধস ঠেকাতে হলে সত্যকে মেনে নেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে অন্য কোনো পথ নেই।
- Kazi.Siraj's blog
- Login to post comments
- 647 reads
একই রকম আরো কিছু ব্লগ
- পদ্মা সেতু : অভিযুক্ত মন্ত্রীর বিদায় এখন কী করবে বিশ্বব্যাংক? - Mostafa.Kamal
- বিশ্বব্যাংক, পদ্মা সেতু এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব - Ranesh.Maitra
- পদ্মা সেতু প্রকল্প : ঋণচুক্তি পুনর্বিবেচনায় ইতিবাচক বিশ্বব্যাংক - kausarmumin
- স্থানীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ - Mamun.Rashid
- প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তবে সংশয় দূর হয়নি - Haidar.Akbar.Kh...
- উচিত - অর্থহীন
- বচনামৃত ও ফরেন হেল্প - Anisul.Haque
- পদ্মা সেতু : দেশজ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি মুক্ত হোক - Masuda.Bhatti
- পদ্মা সেতু : বিশ্বব্যাংকের কাছে এত ধরনা কেন? - Mostafa.Kamal
- পদ্মা সেতুর জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও অর্থ নেওয়া যেত - Abu.Ahmed

Recent comments
1 day 6 hours ago
1 day 8 hours ago
1 day 12 hours ago
1 day 21 hours ago
2 days 21 hours ago
3 days 1 hour ago
3 days 2 hours ago
4 days 23 hours ago
5 days 1 hour ago
4 days 23 hours ago