শাহবাগ চত্বরকে মেনে নেয়া যায় না !!

Md. Galib Mehdi Khan's picture

313338_489123417814625_1039663302_n.jpg

শাহবাগের দিকে তাকালে এরশাদের দুঃখ লাগে, বিএনপির গাত্রদাহ হয়, জামায়াতের কাছে তো এটা নাস্তিকদের মঞ্চ, আওয়ামীলীগের কাছে শাখের কড়াত। ইতিমধ্যেই সোজা শাপটা কথা বলা দু একজন আওয়ামী লীগ নেতা শাহবাগ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। দু’দিন বাদে আওয়ামী লীগও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিবে না তার নিশ্চয়তা কি? যতদিন পর্যন্ত শাহবাগের আন্দোলনে সরকার সুবিধা পাবে ততদিন পর্যন্ত তারা একে সমর্থন দিয়ে যাবে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই শাহবাগ থেকেই যদি দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয় তখনও কি তারা এই সমর্থন যোগাবেন?

শাহবাগের আন্দোলন শুরু হয়েছিল মুলত সরকারেরই বিরুদ্ধে। সেটা তারা প্রথমেই বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিরোধী জোট যাতে এর থেকে ফায়দা নিতে না পারে সেজন্য তারা শুরু থেকেই একে সমর্থন জুগিয়েছে। সরকার সুচতুরভাবে এই আন্দোলনকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে এসেছেন। যদি এ ক্ষেত্রে তারা মেধা না খাটিয়ে চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী জেদের বশবর্তী হতেন। তাহলে হয়ত পুরো দৃশ্যপটই ভিন্নতর হত। এখন দেখার বিষয় এই আন্দোলনকে সরকার শেষ পর্যন্ত কিভাবে সামলায়।

যারা শাহবাগ আন্দোলনের উদ্যোক্তা তারাও শেষপর্যন্ত কতটা নির্মোহ থাকতে পারেন সেটাও দেখার বিষয়। তবে শাহবাগ আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের মনে রাখা উচিত; যারা এই আন্দোলনকে সফল করতে সব থেকে বেশি ভূমিকা পালন করেছে সেই সাধারণ মানুষ কিন্তু প্রাণের দাবীতেই এখানে একাত্ম হয়েছেন। শাহবাগ চত্বর কোন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম নয় বলেই তা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। আর এই অরাজনৈতিক পরিচয়ই যে এক সময় এর কাল হয়ে দাঁড়াবে তার লক্ষণও ইতিমধ্যেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

প্রশ্ন হল, কেন রাজনৈতিক নেতাদের কাছে শাহবাগ চত্বর চক্ষুশুল? এর উত্তর আর একটি প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে নিহিত। আর তা হল- কখন এ দেশের রাজনীতিবিদগণ একাট্টা হন? বিশেষ করে বড় দলগুলি।
৯০ এর পরে সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার হটাতেই তারা একতাবদ্ধ হতে পেরেছিলেন। তার কারণ আর কিছুই নয়, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা। শাহবাগের গন আন্দোলন যখনই যে রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তখনই তারা এর বিরোধিতা করবে এটাই স্বাভাবিক। সরকার কৌশলগত কারণে একে সমর্থন যুগিয়ে গেলেও নিয়ন্ত্রণের সব রকম চেষ্টাই তারা করে যাচ্ছেন। এই চত্বর থেকে পরবর্তীতে যাতে এমন কোন দাবী উত্থাপিত না হয় যা ক্ষমতাসিনদের জন্য অস্বস্তিকর, সে ব্যাপারে তারা যে কতটা সচেতন তা এই চত্বরে তাদের সরব উপস্থিতিই বলে দেয়।

শাহবাগ চত্বর এ দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে। এখানে যারা উপস্থিত হয়েছেন তারা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন বলেই আজ রাস্তায় নেমে এসেছেন। এ দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ রাজনীতি করেন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। দলের সদস্যরা অপেক্ষা করে থাকেন সুবিধা লাভের আশায়। এখানে সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়া গৌণ। এরা হরতালের রাজনীতি করেন, জালাও-পোরাও-ভাংচুর আর হত্যার রাজনীতি করেন শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্য। কোন আদর্শ প্রতিষ্ঠা বা সাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নয়। সাধারণ মানুষের কাছে তা অনেক আগেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তাই তারা এই ধারার বিকল্প খুঁজে আসছে বহুদিন ধরে। তা না পেয়ে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পর্যন্ত সাধারন মানুষ সমর্থন দিয়েছিল এই আশায় যদি এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়। যদিও ভুল ভাঙ্গতে বেশি সময় লাগেনি। অগনতান্ত্রিক সে সরকারও বেশি দিন টিকতে পারেনি। আজো যখন একই ধারায় দেশ চলছে; তখন সাধারন মানুষ নিজেরাই নিজেদের দাবীর স্বপক্ষে রাস্তায় নেমে এসেছে।

প্রজন্ম চত্বর থেকে যখন সমগ্র দেশবাসীকে আহবান করা হয় তিন মিনিট নীরব থেকে তাদের সাথে একাত্ম হতে। তখন মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত সারা দিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে। যখন নির্দিষ্ট সময়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ডাক দেয় তখনও মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত সারা দিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে। ঠিক একই সাথে তারা রাজনীতিবিদদের কাছে কি একটি বার্তাও পৌঁছে দিচ্ছে না?

দুর্ভাগ্য, সামন্তবাদী ধ্যান ধারনার এই নেতৃবৃন্দ সে বার্তা অনুধাবন করতে পারছেন না বরং একে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। আর এর মাধ্যমে তারা তাদের প্রভূত্বসুলভ আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন। অথচ তারা ঠিক উল্টোটিও করতে পারতেন। তারা এই গণজাগরণকে ব্যবহার করে সর্বগ্রাসী দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারতেন। পারতেন আর্থ সামাজিক আরো যে সব সমস্যা দেশটাকে নিয়ত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। তারা করলেন না, করবেনও না। তাহলে যে সাফ সুতোরও হতে হয় নিজেদেরই। সেই নৈতিক সাহস কি তাদের আছে? যারা ভবিষ্যতে আন্দোলন করতে প্রয়োজন হবে বলে সুযোগ থাকা স্বত্বেও হরতালের মত ভয়াবহ কর্মসূচির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে চান না। যারা নিজেদের রক্ষায় দুর্নীতি দমন কমিশনকে ভঙ্গুর করে রাখেন তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শাহবাগের এই গন জমায়েত। এই মঞ্চ কতদিন স্থায়ী হবে, কতটা সফল হবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে তারুণ্যের এই জাগরণ থেমে থাকবে না। যদি শাহবাগে স্থায়ী মঞ্চ নাও হয়, জন্ম নেবে নতুন শাহবাগ। গড়ে উঠবে আন্দোলনের নতুন মঞ্চ। এরশাদ সাহেবদের দুঃখ পেয়ে লাভ নেই। আস্তিক নাস্তিকের ধুয়া তুলে গণজাগরণকে ঠেকানো যায় না বরং জন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হয়।

kmgmehadi@yahoo.com

4Comments

1
muzib
muzib's picture
Sat, 09/03/2013 - 10:46pm

এই শাহবাগ থেকেই যদি দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয় তখনও কি তারা সমর্থন যোগাবেন?
ভয় কি বন্ধু - তরুণরা একবার ওদিকে দৃষ্টি দিলে দেশের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই।
আমি তো ভাবছি তরুণরা ওই দিকটায় ও একটু নজর দিক। তখন দেখবেন রাজনীতির ব্যবসায়ীরা খুশী না হলেও সাধারণ মানুষ তাদের মাথায় করে নাচবে। তরুণরা যদি যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মত একটা নৈতিক কালিমা পরিস্কারের জন্য মাঠে নেমে গণ-মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেন তো দেশ বাঁচানোর ডাক দিলে দেখবেন (গুটি কয় স্বার্থান্বেষীর অস্বঃস্থির কারণ হলেও) গোটা দেশ তরুণদের পিছনে জেগে উঠবে। সূতরাং এখনই সময়; একমাত্র তরুণরাই পারে শোষনমুক্ত ও দূর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশ বাঁচানোর আন্দোলনের ডাক দিতে। শাহবাগের বর্তমান আন্দেলনে সাধারণ মানুষের কৌতুহল ও আগ্রহ থাকলেও সবার কাছে যে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয় তা ইতোমধ্যেই নানান ভাবে প্রকাশও পাচ্ছে। জানিনা - তরুণরা বিষয়টি নিয়ে কি ভাবছেন।

শাহবাগে তরুণরা যে ছয়দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন সেখানে দূর্নীতির মত একটা দফা থাকবে এটাই সাধারণ মানুষের আশা। এখন শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে নানান পক্ষের নানান মত আছে বটে দূর্নীতির ইস্যূটিকে সামনে এনে দেখুন (কতিপয় স্বার্থান্বেষী ছাড়া) দলমত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গোটা দেশ তরুণদের সাথে থাকবে।

উদ্যোক্তাদের বিষয়টি ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।

2
Md. Galib Mehdi Khan
Md. Galib Mehdi Khan's picture
Sat, 09/03/2013 - 11:10pm

তারুণ্যের এই জাগরণ থেমে থাকবে না। যদি শাহবাগে স্থায়ী মঞ্চ নাও হয়, জন্ম নেবে নতুন শাহবাগ। গড়ে উঠবে আন্দোলনের নতুন মঞ্চ। এখান থেকেই ডাক আসবে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের। এই তারুন্যের কন্ঠ থেকেই ডাক আসবে রাজনীতির নামে ষোল কোটি মানুষ নিয়ে যারা খেলছে তাদের প্রতিরোধের। সময়টা খুব বেশি দূরে নয় বন্ধু।

3
Rita Roy Mithu
Rita Roy Mithu's picture
Thu, 07/03/2013 - 10:11pm

গালিব ভাই, আমি লিখবার আগেই আপনি লিখে ফেললেন??????? হা হা হা হা!! উফ! এক শাহবাগ আমাদের কত নতুন নতুন 'কার্টুন' যে দেখাচ্ছে! গোলাপী আপা স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর উনার দেবর মুখ খুলছেন। কার্টুন ক্যারেক্টারে রদবদল হচ্ছে।

4
Md. Galib Mehdi Khan
Md. Galib Mehdi Khan's picture
Thu, 07/03/2013 - 10:38pm

দিদিভাই দারুন বলেছেন।
সামন্তবাদী চরিত্র সহজে কি বদলায়?