আলোচনায় বসাই মঙ্গলজনক

সরকারের পক্ষে শেখ হাসিনার দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। দলীয় এক ইফতার পার্টিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো কিছুই মেনে নেওয়া হবে না। অন্য কোনো সরকারের অধীনে দেশে নির্বাচনও হতে দেওয়া হবে না। বিএনপিই ’৯৫-তে তত্কালীন আওয়ামী লীগসহ বিরোধী জোটের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়েছিল। সংসদ ভেঙে দিয়ে বিরোধী মহলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করাতে হয়েছিল।
খালেদা জিয়া প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধানমন্ত্রীর ‘অন্তর্বর্তী’ সরকারের প্রস্তাব। বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার স্বাভাবিক সুযোগ আর নেই। দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও জাতীয় সংসদ কর্তৃক ওই ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর একমাত্র আবার সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে তা পুনর্বহাল করা সম্ভব। আর সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা আওয়ামী লীগ ও মহাজোটেরই রয়েছে। বিএনপি বা তাদের জোট এখন পর্যন্ত দেশে এমন বিশাল কোনো গণআন্দোলন তৈরি করতে পারেনি যে সরকার সংবিধান পরিবর্তন করে বিরোধী দলের দাবি মেনে নেবে। বিএনপিকে সার্বিক পরিস্থিতি বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। তা হলে তারা দেখতে পাবে-আওয়ামী লীগের মতো একটি পুরনো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল যার তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে তাদেরকে আন্দোলনের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত করা বা তাদের দাবি মানতে বাধ্য করার ক্ষমতা তাদের নেই।
সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে ভুলভ্রান্তি, ব্যর্থতা যাই থাকুক, ইমেজে যতই ভাটা পড়ুক, তারপরও বিএনপির পক্ষে কখনই এই সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর গণআন্দোলন সৃষ্টি করা সম্ভব না। তেমন ইতিহাস ঐতিহ্য তাদের নেই। বরং পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত সেই ক্ষমতা ও ঐতিহ্য আওয়ামী লীগেরই রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা নিয়ে তাদের উচিত হবে আলোচনায় বসা। আমার বিশ্বাস, খোলা মন নিয়ে আলোচনায় বসলে উভয়পক্ষের মধ্যে সৃষ্ট মতপার্থক্য অবশ্যই কমে আসবে। এবং একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
ধরে নেওয়া যাক, সরকার তাদের কোনো দাবিদাওয়াই মানল না। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন শিডিউল ঘোষণা করল। শুরু হয়ে গেল নির্বাচনের তোড়জো, প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশ। সে ক্ষেত্রে বিএনপি বা তাদের জোট নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিল, এমনকি নির্বাচন প্রতিরোধ করারও হুমকি দিল। বিএনপির নেতা-নেত্রীরা কি গ্যারান্টি দিতে পারেন-তিনশ’ আসনের কোথাও তাদের দলীয় পরিচয়ের কোনো প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়াবেন না? দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষ জানে প্রতিটি আসনেই বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন করবেন এবং অনেক আসনেই তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন। যেমন, এ সরকারের আমলে দেশে যত উপনির্বাচন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে সর্বত্রই তাদের দলীয় পরিচয়ের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বহু ক্ষেত্রে বিজীয় হয়েছেন। অথচ ওইসব নির্বাচনের সময়েও তাদের ঘোষণা ছিল-তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। কিন্তু তাদের সেই ঘোষণা স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতা-কর্মীরা মানেননি। ভুলে গেলে চলবে না, বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তারাই সেরা রাজনৈতিক দল-এটা প্রমাণের জন্যই তাদের জন্ম হয়েছিল। আগামী সাধারণ নির্বাচন বয়কট করলে আরও মহা বিপদ তাদের ওপর নেমে আসতে পারে। দলের ঐক্যে ফাটল ধরার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
ঈদের পরে সরকারের বিরুদ্ধে ‘তুমুল’ আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা বিএনপি নেতারা আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছেন। সর্বশেষ বেগম খালেদা জিয়াও সে কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ ঈদের পরে ‘এক দফা’র আন্দোলন শুরু করার কথাও বলেছেন। দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ তাতে কিছুটা উদ্বিগ্ন। জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা তাদের উদ্বেগ জানিয়ে নানা আশঙ্কা ব্যক্ত করে চলেছেন। বিএনপির প্রচার-প্রচারণাও সরকারি দলের তুলনায় অনেক বেশি ও সুপরিকল্পিত। শহর এলাকার মানুষ সব কথা কানে তুললেও গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষকে তা করে না। গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের জীবন-সংসার খুব বেশি খারাপ পরিস্থিতির মধ্য পড়েনি। যত বেশি প্রচার করা হয় বাস্তব অবস্থা তার ভিন্ন। সম্প্রতি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে অগত্যা দুটি উপজেলায় ব্যক্তিগত কাজে জড়িয়ে থাকার সুবাদে কিছু বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। বহু লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তাদের মুখ থেকেই যেসব কথা শুনেছি, তাতে মনে হয়েছে তারা খারাপ নেই। গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তারা প্রত্যক্ষ করছে উত্সাহের সঙ্গে। যেমন, আমাদের এলাকার চন্দনা নদী, জনগণ ধরেই নিয়েছিল এ নদীতে আর কোনো দিন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে না। ফলে নদীর বহু অংশে মানুষ ধান লাগিয়ে কিছু আয়ের পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই নদীটি ড্রেজিং করে এমনভাবে তার পুনঃখনন করেছে-যা রীতিমতো বিস্ময়ের ব্যাপার। আগামী শীতে নাকি ওই নদী আরও একবার কাটবে। ফলে চন্দনা নদী আবার তার পূর্বের যৌবন ফিরে পাবে। নদীতে পানি ধরে রেখে তা শুকনা মৌসুমে সেচ কাজেও ব্যবহূত হবে।
এ ছাড়া আমাদের এলাকার ওপর দিয়ে গিয়েছে কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া রেললাইন। বিশ বছরের বেশি এই লাইনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা করে দেশের সকল রেললাইনেরই সংস্কার করা হবে এবং কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া লাইনটি পুনরায় চালু করা হবে। সে মোতাবেক অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কাজ শুরু হয়। এখন তা শেষ পর্যায়ে। সম্পূর্ণ নতুনভাবে লাইন বসানো, স্টেশনঘর তৈরি ও আনুষঙ্গিক কাজ চলছে ব্যাপকভাবে। জনগণ দারুণ খুশি। গ্রামগঞ্জের ছোটবড় সকল রাস্তাঘাটের সংস্কার ও পাকাকরণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। গ্রামীণ স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি ও মেরামতের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পথে। জনগণ দারুণ খুশি।
রাজধানীতে বসে সরকারের ব্যর্থতার দাবি যত সুন্দর করেই আঁকা হোক না কেন, বাস্তব অবস্থাটা যে অনেক ভিন্ন তা সেদিন গ্রামাঞ্চলে ঘুরেই দেখে এসেছি। তবে সার্বিকভাবে এ সরকার আরও বেশি সাফল্য নিয়ে আসতে পারত, কিন্তু দলের একশ্রেণীর নেতা-কর্মীর অসত্ কর্মকাণ্ডের কারণে তা অনেকখানি পিছিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই যথার্থ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সাহস ও শক্তি সরকারের রয়েছে। বিএনপির উচিত হবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যত্ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তবে সমাধানের যে পথেই অগ্রসর হোক না কেন আলোচনার মাধ্যমেই তা ঠিক করতে হবে।
- Fakir.Abdur.Razzak's blog
- Login to post comments
- 632 reads
একই রকম আরো কিছু ব্লগ
- আমরা লিখিয়েরা ও আদালত - Ataus.Samad
- বিচারপতি হাবিবুর রহমানের স্পষ্ট ভাষণ - Ataus.Samad
- চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক - abdullah.shafi
- ভারতে বাংলাদেশ-ভাবনা - সাজ্জাদ শরিফ - sajjad.sharif
- সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা - Haidar.Akbar.Kh...
- একটি 'অকারণ' বিতর্কের 'প্রকৃত কারণ' - Mujahidul.Islam...
- সাতটি লাশের রাজনীতি - Mohshin.Habib
- প্লিজ প্রধানমন্ত্রী, খালেদা জিয়ার ভাষায় কথা বলে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবেন না - Abdul.Gaffar.Ch...
- ভালো কাজে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার - Ataus.Samad
- কচুঘেচু, লুটপাটের সংস্কৃতি - Hasan.Hafiz

Recent comments
1 hour 36 min ago
16 hours 45 min ago
16 hours 40 min ago
17 hours 14 min ago
1 day 12 hours ago
1 day 13 hours ago
1 day 13 hours ago
1 day 18 hours ago
1 day 23 hours ago
3 days 21 hours ago