দেখা-শোনার অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা

Fakir.Abdur.Razzak's picture

অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সফরে কলকাতা গিয়েছিলাম। আসা যাওয়া মিলিয়ে ১০ দিন। বেড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়, ছোট বোন হাসনার জরুরি চিকিত্সার প্রয়োজনে। মাত্র এক মাসের ভিসা মিলেছিল। বোন আর তার স্বামীকে দেওয়া হয়েছিল তিন মাসের ভিসা। যাত্রা শুরু করার প্রস্তুতি নিতেই আট দিন কেটে যাওয়ার পর ২০ জুন রাত ৮টার দিকে কলকাতা পৌঁছাই। আমার ভিসার মেয়াদের মাত্র বিশ দিন হাতে নিয়ে চিকিত্সার ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশে গিয়ে চিকিত্সার খুঁটিনাটি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া বোনের স্বামী শ্যামলও অফিস থেকে ছুটি পেয়েছিল মাত্র আট দিন। ফলে চিকিত্সার প্রাথমিক পর্ব শেষ করে ১০ দিনেই দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। তিন-চার মাস পরে ডাক্তারদের পরামর্শ নিতে আবার যেতে হবে চেকআপের জন্য। মাজা থেকে এক পায়ে প্রচণ্ড পেইন। ঢাকার ‘বিশেষজ্ঞ’ বড় বড় ডাক্তাররা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিত্সার পরও ধরতে পারেননি কিসের কারণে ব্যথা। অর্থো ও নিউরোর ‘দেশসেরা’ ডাক্তাররা ব্যর্থ হওয়ার পর একজন ডাক্তার তো অন্যদের গোষ্ঠী উদ্ধার করে ১০টি মূল্যবান ইনজেকশন দিয়ে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে তিনিও রোগ নিরাময়ে ব্যর্থ হন। লক্ষাধিক টাকা খরচের পর পারিবারিক সিদ্ধান্তে কলকাতা রওনা হই। উদ্দেশ্য ছিল চেন্নাইয়ের ভেলরে যাওয়ার। কিন্তু ভিসার মেয়াদ ও অফিসের সংক্ষিপ্ত সময়ে কথা ভেবে কলকাতাতেই দুজন নিউরো বিশেষজ্ঞকে দেখাই।

একজন তো ড. অনুপম দাশগুপ্ত এশিয়ার তিন সেরা নিউরোলজিস্টদের একজন, যিনি রাষ্ট্রীয়, রাষ্ট্রপতি ও মুখ্যমন্ত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন। তারা বাংলাদেশের এমআরআই বা অন্য কোনো রিপোর্ট দেখার প্রয়োজন মনে করেননি। নতুন করে তিনটি এমআরআই করে ধরতে পেরেছেন ভেইনের অসামঞ্জস্যের কারণেই ব্যথা। তবে ওষুধের চেয়েও নির্দিষ্ট ব্যায়ামের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিরাময় হবে সে। ওষুধ খুবই সাধারণ। রোগীর মানসিক শক্তি অর্জনই রোগ নিরাময়ের প্রধান পথ্য।

সাংবাদিকতার জীবনে অসংখ্যবার নিজের কলামে মেধা পাচার ও সাধারণ রোগবালাইতেও বিদেশে চিকিত্সা নিতে যাওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে বহু লিখেছি। এবার দেশের চিকিত্সায় হতাশ হয়ে প্রতিবেশী দেশে যাওয়ার পর মনে হয়েছে আমাদের চিকিত্সা ব্যবস্থা সত্যি এখন অনেক পিছিয়ে। ভেলর, সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের অবস্থা তো আরও বহুগুণ উন্নত। একজন দেশসেরা এমনকি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিত্সকও ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় দিয়ে রোগী ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলে পরামর্শপত্র লিখেছেন। আর আমাদের দেশের একজন ‘বিশেষজ্ঞ’ কত সময় দেন একজন রোগীর জন্য? ঢাকা থেকে রওনা দেওয়ার প্রাক্কালে প্রয়োজন হয় নতুন পাসপোর্টের। কেননা আগের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ১০ বছর আগে। তা ছাড়া প্রয়োজনের সময় সেটাও খুঁজে না পেয়ে নতুন পাসপোর্ট করতে হয়। পেশার ঘরে লিখেছি ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট। আর যায় কোথায়, তদন্ত কর্মকর্তা বাসায় এসে সে নানা প্রশ্ন। কোথায় সাংবাদিকতা করেছেন তার প্রমাণপত্র, এখন লেখালেখি করেন তার প্রমাণ? ইত্যাদি। শেষপর্যন্ত পুরনো একটা অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ও পত্রিকায় নিয়মিত কলামের কয়েকটি লেখা দিয়ে তাদের রিপোর্ট লেখায় সহায়তা করার পর যথাসময়ে পাসপোর্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু ভারতীয় হাইকমিশন আমার সঙ্গের দু’জনকে যথাসময়ে তিন মাসের ভিসা দিলেও আমারটা আটকে দেয়। প্রায় ১০ দিন পরে বলা হয় হাইকমিশনে গিয়ে দেখা করতে। সেখানেও ওই একই প্রশ্ন- ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট। সেখানেও নানা প্রশ্নের জবাব দিলাম আলাপচারিতার মাধ্যমে। দু’জন শীর্ষ কর্মকর্তা কিছু প্রকাশিত লেখা গ্রহণ করলেন এবং আশ্বস্ত করলেন ভিসা পেয়ে যাবেন। তবে যখন ভিসা হাতে পেলাম তখন দেখা গেল আমাকে এক মাসের ভিসা দেওয়া হয়েছে। এসব বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করে শেষপর্যন্ত ভিসার মেয়াদ আট দিন শেষ করে প্রস্তুতিপর্ব সেরে কলকাতায় পৌঁছালাম।

পৃথিবীর দেশে দেশে এখন সীমান্ত আইনকানুন শিথিল হচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোয় ভিসাপ্রথা নেই বললেই চলে। ভিসামুক্ত বিশ্ব গড়ার আন্দোলন হচ্ছে, কোনো দিন তা বাস্তবায়িত হবে কি না জানি না। প্রতিবেশী বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে ভিসার কড়াকড়ি মোটেই আধুনিক বিশ্বে গ্রহণযোগ্য নয়। সন্ত্রাসী জঙ্গির প্রশ্নে পৃথিবীতে যেসব সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে তা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য হবে কেন? ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে অনেক বিষয়ে সমস্যা থাকলেও তা মীমাংসার প্রশ্নে কারোরই অনাগ্রহ নেই। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে উভয় দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে যা কখনই ভঙ্গুর নয়। সে কারণে ভিসা সংক্রান্ত ঝক্কি-ঝামেলা বা অহেতুক বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার আমলাতান্ত্রিক প্রবণতা বন্ধ হওয়া উভয় দেশের স্বার্থেই একান্ত আবশ্যক। কেননা আমরা বিশ্বাস করি-প্রতিবেশী দেশের জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে কোনো দেশেরই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। আস্থা, বিশ্বাস ও উদারতার মাধ্যমেই তৈরি হয় আন্তরিকতা ও সত্যিকার বন্ধুত্ব।

কলকাতা পৌঁছেই দোকানপাট, রেস্তোরাঁ-রেস্টহাউসসহ বিভিন্ন স্থানে আলোচনা শুনতে পাই ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বেঁকে বসেছেন-তিনি ইউপিএ’র রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা, যিনি অত্যন্ত যোগ্য এবং ভালো মানুষ হিসেবে সর্বমহলে সমাদৃত প্রণব মুখার্জীর ব্যাপারে। তিনি পূর্বে আলাপ-আলোচনা না করেই সাবেক রাষ্ট্রপতি ভারতের প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালামের নাম প্রস্তাব করেছেন। দুদিন পরেই ড. কালাম তার অপারগতা ঘোষণা করে বিবৃতি দেন। শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এমন হয় যে, মমতা ব্যানার্জী অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। যাদের ওপর ভরসা করে তিনি প্রণব মুখার্জীর বিরোধিতায় নেমেছিলেন সেই সমাজবাদী দল ও অন্যরাও প্রণব বাবুকে সমর্থন জানিয়েছেন। এমনকি এনডিএ জোটের একটি অংশও প্রণব বাবুকে সমর্থন দিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হল-বাল ঠাকরের মতো কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতাও ভালো মানুষ হিসেবে প্রণব মুখার্জীর প্রতি তার দলের সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছেন। পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ইউপিএ প্রার্থীর পক্ষে। প্রণব মুখার্জী নির্বাচনী প্রচারণায় এখন ব্যস্ত। তিনি বলেছেন, ‘মমতার সঙ্গে আমার কোনোই বিরোধ নেই। তিনিসহ যারা এখনও আমাকে সমর্থন করেননি তাদের কাছে তাদের মত পরিবর্তনের জন্য আমি আবেদন জানাই।’ এসব ঘটনায় গোটা পশ্চিমবঙ্গে যে একধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তা কলকাতায় বসে এবং পত্রপত্রিকার দিকে তাকালেই বেশ বোঝা যায়। এই যখন অবস্থা তখন আরেকটি ঘটনা কলকাতা পৌঁছানোর দুদিন পরেই ঘটে, যা মমতা সরকারের ওপর দারুণ চাপ সৃষ্টি করে। যে সিঙ্গুরের আন্দোলনের মূল দল তৃণমূল কংগ্রেস ও নেতা হিসেবে মমতা ব্যানার্জী পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে অনিবার্য হয়ে উঠে ২৩-২৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনকে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেই সিঙ্গুরের চাষিদের জমি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দূরের কথা, এক বছরেও ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি। টাটার এক রিট মামলায় সরকার হেরে গেছে এবং কৃষকদের জমি ফেরত দেওয়া বেআইনি বলে হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন। ফলে মমতা ব্যানার্জীকে এবার সুপ্রিমকোর্টে গিয়ে লড়তে হবে। তবে কলকাতার অভিজ্ঞ মহলের ধারণা-সুপ্রিমকোর্টে তৃণমূল হেরে যাবে। জমি আর ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে না কৃষকদের। তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে মমতা ব্যানার্জীর রাজনীতি? ওই সময় কলকাতায় যেখানে গিয়েছি সেখানেই দেখেছি লোকের মুখে এই একই প্রশ্ন। প্রচলিত আইনই এ ক্ষেত্রে বাধা। সর্বশেষ শুনে এসেছি-সরকার কর্তৃক একবার অধিগ্রহণ করা জমি আর ফেরত দেওয়া হয় না-এই আইনটিই এবার তৃণমূল কংগ্রেস পরিবর্তনের কথা ভাবছে।

চিকিত্সা সংক্রান্ত ব্যাপারে এবারের কলকাতা সফর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে হলেও তা ছিল বেশ অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, চিকিত্সা পদ্ধতি এবং ওষুধ ও তার দামের ক্ষেত্রেই শুধু আমাদের দেশের সঙ্গে তার পার্থক্য নয়, প্রাইভেট ও সরকারি হাসপাতাল ঘিরে আমাদের দেশের মতো দালাল চক্রও সেখানে চোখে পড়েনি। আইন মেনে চলা এবং নিয়মানুবর্তিতার প্রতি কলকাতার মানুষেরও যান চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যাপক আস্থা ও আনুগত্য স্পষ্ট লক্ষ করা গেছে, যা একটা জাতি বা জনগোষ্ঠীকে দ্রুত উন্নতির দিকে ধাবিত করে। কলকাতা এখন ট্যাক্সির শহর। লাখো ট্যাক্সিচালক জানেন কখন কোন রাস্তা দিয়ে যাওয়া যাবে বা যাওয়া যাবে না। ট্রাফিক আইন মেনে চলায় তারা দারুণভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। কলকাতার মতো বিশাল শহরে ট্রাফিক আইনের সাফল্য বেশ লক্ষণীয়, যা তাদের যানজট সহনশীল পর্যায়ে রাখতে পেরেছে।

লেখাপড়ার মান আগে থেকেই আমাদের তুলনায় উন্নত ছিল। তবে দুঃখ, কষ্ট, দরিদ্রতা যে নেই তা নয়। জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে, তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। তেলের দাম ভারতে কিছুটা কমেছে। আমাদের কমেনি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তেলের দাম কমায় এখনই ভাবছে যানবাহনের ভাড়ার ক্ষেত্রে সরকার শিগগিরই ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে। জনগণ এসব ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সজাগ। পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রের কাছ থেকে ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের ব্যাপারে বাঙালির সেই আপসহীন আন্দোলন করার ঐতিহাসিক উদাহরণ থেকে পশ্চিমবঙ্গবাসী হয়তো শিক্ষা নিয়ে থাকতে পারে।