পাকিস্তানে ক্ষমতার টানাপড়েন

Fakir.Abdur.Razzak's picture

পাকিস্তান এখন তার স্বাভাবিক পরিণতির দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর টানাপড়েন এখন এমন একপর্যায়ে এসে পেঁৗছেছে, সেনাবাহিনী যে কোন সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নিতে পারে। টানাপড়েন শুরু হয়েছিল 'মেমোগেট' নামক ঘটনা থেকে। পাকিস্তানের ভূখ-ে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রবেশ করে যখন গোপন আস্তানা থেকে ওসামা বিন লাদেনকে গ্রেফতার ও হত্যা করা হয় তখন সরকারের পক্ষ থেকে গোপনে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে সহায়তা চেয়ে পাকিস্তানে যাতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ না করে এবং নির্বাচিত সরকারের যাতে পতন না ঘটে, সে কথা জানানো হয়েছিল। বেশ কয়েক মাস পরে ওই ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়ার কথা অস্বীকার করা হলেও সেনাবাহিনীর প্রধান কর্মকর্তারা তা মেনে নিতে পারেনি। সেনাবাহিনীর ওপর সরকারের আস্থা নেই_ সেটাই বিশ্বাস করে সেনাধ্যক্ষরা শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। এতে সরকারের সঙ্গে সেনাধ্যক্ষদের বিরোধ চরমে পেঁৗছে। এমনই একটা অবস্থার খবর সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে_ পাকিস্তানে সেনাবাহিনী আবার ক্ষমতা দখল করতে চলেছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির প্রতি সেনাধ্যক্ষদের যে কোন আস্থা নেই, তা বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরবার্তা থেকে অনেক দিন আগেই কৌতূহলী মানুষ বুঝতে পেরেছিল। এবার গোটা সরকারের সঙ্গেই তাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদের জরুরি এক অধিবেশন ডেকে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। বিরোধীদলের আস্থা ভোট গ্রহণের দাবি তিনি বাতিল করে দিয়ে বলেছেন, আমার বা আমার সরকারের আস্থা ভোট নেয়ার প্রয়োজন নেই; বরং তাদের অর্থাৎ সরকারের পরিপূর্ণ আস্থা রয়েছে দেশের প্রেসিডেন্টের ওপর।

এমনই একটা সময় প্রেসিডেন্ট জারদারি দুবাই চলে গিয়েছিলেন একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদানের উদ্দেশে। সেই অনুপস্থিতিতে গুজবটি আরও বেশি রটেছিল_ সেনাবাহিনী অবিলম্বে ক্ষমতা দখল করতে চলেছে। কিন্তু দুইদিন পরই প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানে ফিরে আসেন। উল্লেখ্য, চিকিৎসার প্রয়োজনে একাধিকবার জারদারি দুবাই গেছেন অতীতে। কিন্তু এবার গিয়েছিলেন একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে যখন দারুণ উত্তেজনা চলছিল তখনই সেনাপ্রধান তার শীর্ষ কমান্ডারদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। তার সচিত্র খবর প্রকাশ পাওয়ার পর ধরেই নেয়া হয়েছিল, পাকিস্তানে ক্ষমতার রদবদল হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই লেখা প্রস্তুত করার সময় পর্যন্ত তা হয়নি। সেনাধ্যক্ষদের ওই বিশেষ বৈঠকের আলোচনার বিষয়বস্তু কেউ জানতে না পারলেও সচেতন পাকিস্তানিরা খারাপ কিছুই অনুমান করেছেন।

কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী গিলানি তার প্রতিরক্ষা সচিবকে বরখাস্ত করেন। তারপরই সেনাবাহিনী থেকে এক অস্বাভাবিক বিবৃতি দিয়ে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছিল। তাতে সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি ও আইএসআই-প্রধান জেনারেল আহমেদ সুজাত পাশা_ এরা দুজনই মূলত সেনাবাহিনীর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। তারাই কলকাঠি নাড়ছেন বলে সবার ধারণা। পাকিস্তান রাজনীতির একজন বিশিষ্ট বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমদ বলেছেন, সরকার ও সেনাবাহিনীর এই বিরোধের পরিণতি হলো পাকিস্তানে আগাম নির্বাচন। ২০০৮ সালে পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, মেয়াদপূর্ণ হবে ২০১৩ সালে। সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তারা মেয়াদ পূর্ণ করেই সাধারণ নির্বাচন দেবে। আলোচ্য এই বিরোধের প্রেক্ষাপটে যদি আগাম নির্বাচন হয় তাতে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না। কিন্তু সেনা কর্তৃপক্ষ যদি সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করে ক্ষমতা দখল করে নেয় তাহলে পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতি তার স্বাভাবিক পরিণতির দিকেই ধাবিত হবে। উল্লেখ করা যেতে পারে, গত ৪০ বছরেও পাকিস্তানের কোন নির্বাচিত সরকার তাদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। বারবার সেনাবাহিনী বেসামরিক ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে দেশ শাসন করেছে। অবশ্য পাকিস্তানের রাজনীতিকদের এখন কিছুটা হলেও বোধ জাগ্রত হয়েছে। আগে সেনাবাহিনী কোন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক মহল বাহাবা দিতেন। কিন্তু এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তার মুসলিম লীগ সেনা শাসনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। আবার পাকিস্তানি রাজনীতিতে ইদানীং অস্বাভাকি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সাবেক ক্রিকেট জায়ান্ট ইমরান খান ও তার দলও সম্ভাব্য সেনা শাসনের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করে সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়েছেন। এসব প্রধান রাজনৈতিক দল ছাড়া ছোট ছোট কিছু দলও সেনা শাসনের ব্যাপারে তাদের নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। তারপরও '৪৭-এ স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পাকিস্তানের ভাগ্যের সঙ্গে সেনা শাসন জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর প্রথম একদশক পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক শাসন বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা সরকার পরিচালনার একটা প্রচেষ্টা ছিল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছিলও সে প্রচেষ্টা। পাকিস্তানের একটি স্থায়ী শাসনতন্ত্র রচনারও প্রচেষ্টা ছিল সে সময়। ১৯৫৮ সালের আগ পর্যন্ত সীমিত আকারে গণতন্ত্রের যে প্রদীপ জ্বলছিল তা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল মুহাম্মদ আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখল করার পর নিভে যায়। তারপর থেকে পাকিস্তানের জনগণের ভাগ্যের ওপর জংলি সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর চেপে বসে আছে। ১৯৬৯ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের পতনের পর থেকে আজ পর্যন্ত রাজনীতিকদের চাইতে পাকিস্তানকে বেশি সময় ধরে শাসন করেছে জেনারেলরাই। আর কোন বেসামরিক সরকারই তাদের পূর্ণ মেয়াদে দেশ পরিচালনার সুযোগ পায়নি। বারবার অজুহাত সৃষ্টি করে তাদের কাছ থেকে সামরিক ব্যক্তিরা ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। দেশটির জন্মের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল ষড়যন্ত্র নামক বিষয়টি। আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রের তীব্র প্রভাব কমা তো দূরের কথা, বরং যতই দিন গেছে ততই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা ছিনতাইয়ের রাজনীতি যেন নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচিত সরকারপ্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো, তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী শাসনভার গ্রহণ করেছে। ভুট্টো ও বেনজিরকে হত্যা করা হয়েছে। বৈষম্য-ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১৯৭১ সালে বাঙালি পাকিস্তান ভেঙে তার পূর্বাংশ স্বাধীন করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলেও পাকিস্তানিদের বোধদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। বাঙালি ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ করে এবং তিরিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েই পাকিস্তানি সৈন্যদের যুদ্ধে শোচনীয় ও লজ্জাজনক পরাজিত করেই স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছে। তারপরও পাকিস্তানি সেনা শাসকদের শিক্ষা হয়নি। বাকি পাকিস্তান অর্থাৎ পশ্চিমাংশ নিয়ে আজকের যে পাকিস্তান, সেটিকেও তারা সুশসান দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বই টিকে থাকবে কি না তা নিয়ে বিশ্বের কৌতূহলী মানুষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আর সেটা যদি কখনো সত্যি হয়, তাহলে সেটা হবে পাকিস্তানের সেনা শাসকদের উদগ্র ক্ষমতার লোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অতিমাত্রায় পাকিস্তানের ব্যাপারে নাক গলানোর ফল। সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের জনগণ নিমিত্তমাত্র। পাকিস্তানের ক্ষমতার টানাপড়েন যখন জটিল আকার ধারণ করেছে তখনই সেদেশের সাবেক সেনা শাসক জেনারেল (অব.) পারভেজ মোশারফ, যিনি স্বেচ্ছায় এখন ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন এবং দেশে ফিরে আসার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ব্যাপারে এর আগেই তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসেননি। এখন তিনি দেশে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ ব্যাপারে তিনি নাকি এরই মধ্যে বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গেও কথা বলেছেন। কিন্তু সরকারি মহল থেকে পূর্বাহ্নে জানিয়ে দেয়া হয়েছে_ পারভেজ মোশারফ দেশে ফিরলে তাকে কারাগারে যেতে হবে; কারণ তার বিরুদ্ধে বেনজির ভুট্টোর হত্যাকা-সহ কয়েকটি মামলা রয়েছে। সেটা জেনেও নাকি সাবেক সামরিক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশারফ দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট দুটি মামলার ব্যাপারে তদন্ত করছে। এর একটি হলো মেমোগেট কেলেঙ্কারি, অন্যটি বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির দুর্নীতি। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর অদক্ষতা এবং দুর্নীতির ব্যাপারেও আরেকটি মামলা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট নাকি বর্তমান সরকারকে অযোগ্য বলেও রায় দিতে পারে। এমনই একটা ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে এ সরকার তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হবে কি না, সে ব্যাপারে পাকিস্তানের সচেতন মানুষসহ বিশ্বের কৌতূহলী মানুষের মনে সন্দেহ রয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে_ মেয়াদ শেষেই তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট গত একদশকে সরকারের দুঃশাসন ও অযোগ্যতার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশারফকে নাস্তানাবুদ করে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছেড়ে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য করার পেছেনে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারকের ঐতিহাসিক রায়ও বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।
পাকিস্তানে ক্ষমতার এই টানাপড়েনের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী, তা পরিষ্কার নয়। তবে তাদের যে গোপন হাত রয়েছে, তা পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত সেদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। দেশটিতে এখন যে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে অস্তিত্বের প্রশ্নই সন্দিহান হয়ে পড়েছে, তার জন্য মূলত দায়ী পাকিস্তানের রাজনীতি ও অর্থনীতির ব্যাপারে মার্কিন কর্তৃপক্ষের অতিমাত্রায় নাক গলানো। এক সমঝোতার অধীনে সৈন্যরা এসেছিল পাকিস্তানে আল কায়দা, তালেবান ও আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদকে নির্মূল করার উদ্দেশে। তারা জঙ্গিদের সঙ্গে ক্রমান্বয়ে সম্মুখযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে পাকিস্তান ভূখ-ের মধ্যে প্রবেশ করে জঙ্গি দমনের উদ্দেশে তৎপরতা চালানোর সুযোগ করে নেয়। মার্কিন সৈন্যরা শেষ পর্যন্ত বিমান থেকে হামলা এবং ড্রোন হামলা চালাতেও শুরু করে। তাতে পাকিস্তানের, বিশেষ করে আফগান সীমান্তে এলাকায় অসংখ্য বেসামরিক লোকজন নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত ড্রোন হামলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনেক সৈন্যও নিহত-আহত হয়। ওইসব ঘটনায় পাকিস্তান-মার্কিন সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অবশেষে মার্কিন গোয়েন্দা এবং সেনারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে অত্যন্ত গোপনে লুকিয়ে থাকা আল কায়দা শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনকে গ্রেফতার ও হত্যা করে লাশ নিয়ে চলে যায়। এতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, জনগণ ও সরকার মনে করে তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে। তীব্র প্রতিবাদ জানায় মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে। সম্পর্কের অবনতি ঘটায় মার্কিন কর্তৃপক্ষ ভিন্ন কৌশল নেয়। এবার সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি। অবশেষে ক্ষমতার টানাপড়েন এবং বিশ্বব্যাপী গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, যে কোন সময় জারদারি-গিলানি সরকারের পতন ঘটবে এবং কায়ানি-পাশা গং অর্থাৎ সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে নেবে।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তৃতীয় পক্ষের কোন চেষ্টায় নয়, সরকার ও সেনাবাহিনীর নেতারাই উভয় পক্ষের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জেনারেল আশফাক কায়ানি প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের মধ্যে কী আলাপ হয়েছে তা জানা না গেলেও ধরে নেয়া যায়, উত্তেজনা প্রশমিত করার লক্ষ্যেই তারা একটা মীমাংসায় পেঁৗছানোর উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। পাকিস্তানের জনগণ প্রধান রাজনৈতিক দল, প্রচার মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও গণতান্ত্রিক দেশগুলো সামরিক শাসক আর সমর্থন করে না। আগের পরিস্থিতি এখন অনেক পাল্টে গেছে। বিশেষ কোন সুপার পাওয়ার তার স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে সেনা শাসক মেনে নিলেও পাকিস্তানের ঘটনা এতটাই জটিল ও প্রকাশ্য ব্যাপার যে, ওই সুপার পাওয়ারের নিজ দেশের জনগণ, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়াও এখন আর পাকিস্তানের মতো 'বোঝা' টেনে নেয়ার পক্ষপাতি নয়। কিছুদিন আগেই খোদ মার্কিন মুল্লুকেই দাবি উঠেছিল_ পাকিস্তানে সাহায্য অনুদান বন্ধ করা হোক। এ অবস্থায় যদি কোন কোন মহলের গোপন ইচ্ছাও থাকে পাকিস্তানে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করুক_ বিশ্ব জনমতের কথা চিন্তা করে তারা আর তেমন সাহসী হবে না। এমনকি তারা অর্থাৎ মার্কিন জনগণ চায় না তাদের সৈন্যরা বিদেশের মাটিতে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর লাশ হয়ে ফিরে আসুক। ইরাক-আফগানিস্তানে যে পরিমাণ মার্কিন সৈন্যের লাশ পড়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এখনো সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি।
বিশ্ব এখন শান্তি, সহযোগিতা ও সমঝোতার মাধ্যমে উন্নতির শিখরে যাক_ সেটাই সবাই কামনা করে। যুদ্ধ-উত্তেজনা-হিংসা-বিরোধ কেউই প্রত্যাশা করে না। পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলো যত দ্রুত এই উপলব্ধিতে পেঁৗছতে সক্ষম হবে, তত দ্রুতই এক শান্তিময় বিশ্ব গড়ে উঠবে। যুদ্ধ, উত্তেজনা, বিরোধ কোন সংকটেরই সমাধান নয়; বিশ্ববিবেক সেটা উপলব্ধি করলেও শক্তি মদমত্ততায় উন্মত্ত কোন কোন দেশ এখনো তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

তবে বিশ্ব জনমত যে আণবিক বোমার চাইতেও অনেক বেশি শক্তিধর, তা বোধহয় কেউই আজ আর অস্বীকার করতে পারে না। পাকিস্তান যত দ্রুত অন্যের 'দাবার গুটির বড়ে' না হয়ে নিজের ঐতিহ্য ও আত্মমর্যাদা নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হবে, ততই তার উন্নয়ন অগ্রগতি সুনিশ্চিত হবে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণ সেই বোধে জাগ্রত হোক_ এটা পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে আমাদেরও কামনা।

» Topics: