মসৃণ হোক ক্ষমতার পালাবদল

Dr.Mahbubullah's picture

বাংলাদেশে গণতন্ত্র যে পরিপকস্ফতা অর্জন করতে পারেনি এবং এখানে গণতন্ত্র সন্তোষজনকভাবে বিকশিত হতে পারেনি সে ব্যাপারে খুব কম মানুষই দ্বিমত পোষণ করবেন। আমরা যদি ধরে নেই ১৯৯১ সাল থেকে এখানে রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক পর্বের সূচনা হয়েছে তাহলে দেখব এই পর্বটিও দীর্ঘ সময় অতিক্রম করে এসেছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত জরুরি শাসনের ২ বছর বাদ দিলেও এই পর্বটি ১৯ বছরমেয়াদি। মোটামুটিভাবে বলা যায় বাংলাদেশের বয়সের অর্ধেক পরিমাণ সময়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে একটি সুষ্ঠু খাঁজে প্রবাহিত করার জন্য ১৯ বছর সময় কম কিছু নয়। এরই মধ্যে জাতির জীবন থেকে জরুরি শাসনের মধ্য দিয়ে ২ বছরের জন্য গণতন্ত্র ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। এটিও কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ত্রুটিরই বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ গণতন্ত্রকে আমরা গত ৪০ বছরেও টেকসই করতে পারলাম না। এই ব্যর্থতার গ্লানি আমাদের খুব ছোট করে ফেলে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে অনেকেই বলেন, প্রথমত এই গণতন্ত্র নিছক ভোটের গণতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ভোট এলে রাজনীতিবিদরা জনগণের দুয়ারে গিয়ে ভোটভিক্ষা করেন এবং ভোটের পর্ব সমাপ্ত হওয়ার পর যারা ক্ষমতায় যান তারা জনগণের কথা ভুলে যান; ভুলে যান জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি।

তারা ভাবতে শুরু করেন নির্বাচনী বিজয় তাদের দেশের মালিক-মোক্তারে পরিণত করেছে। সংবিধানে যদিও বলা হয়েছে যে প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ, তা কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে আরেকটি সমালোচনা হলো ডরহহবত্ং ঃধশব ধষষ অর্থাত্ যারা জয়লাভ করে তারা সবকিছুই গ্রাস করতে চায়। অথচ একটি পরিণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে দেশের শাসন ক্ষমতা থাকে বটে, কিন্তু তাদের সংখ্যালঘিষ্ঠের সম্মতি নিয়েই দেশ চালাতে হয়। গত ২১ বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত অন্তত দুটি নির্বাচনে দেশের শাসনক্ষমতা এমন এক সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে গেছে যাকে বলা হয় ব্রুট মেজরিটি। ব্রুট মেজরিটির আচরণও হয় অনেকটা ব্রুট বা নির্মম। ব্রুট শব্দটির বাংলা আরেকটি প্রতিশব্দ হলো ‘বিচারবুদ্ধিহীন’। মানুষ ‘বিচারবুদ্ধিহীন’ হলে পশুর মতোই নির্মম আচরণ করে। বাংলাদেশী গণতন্ত্রের তৃতীয় দুর্বলতা হলো একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে পরবর্তী সরকারের উত্তরণের প্রক্রিয়াটি মসৃণ হয় না। প্রায়ই দেখা যায় পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ সুনিশ্চিত করতে বিরোধী দল নির্বাচনের আগেই আন্দোলনের মাঠে ক্ষমতাসীনদের পরাস্ত করতে প্রয়াস পায়। এ ব্যাপারে অবশ্য বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামী লীগের কৃতিত্ব অপরিসীম। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ দীর্ঘমেয়াদি অসহযোগ আন্দোলনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বিপুল সংখ্যক ক্যাডার বাহিনীকে ব্যবহার করে হরতাল, জ্বালাও-পোড়াওসহ নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তারা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল যে তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার বাধ্য হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের দাবি মোতাবেক সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজন করতে। এখানে উল্লেখ্য যে, সে আন্দোলনে আওয়ামী লীগের মিত্র ছিল এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। একসময়কার মিত্র জামায়াতের নেতাদের বিরুদ্ধে বর্তমান আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার চলছে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেন পরিপকস্ফতা অর্জন করতে পারছে না সেটা এক কঠিন প্রশ্ন। অনেকের মতে, আমাদের রাজনৈতিক কালচারই এর জন্য দায়ী। এই রাজনৈতিক কালচারের বৈশিষ্ট্য হলো সহনশীলতার অভাব, ভিন্নমতাবলম্বীদের সহ্য করতে না পারা এবং সম্ভব হলে তাদের সমূলে উত্পাটন করাই এই রাজনৈতিক কালচারের ভয়াবহ রূপ। কিন্তু এখানেই কথা শেষ হয়ে যায় না। অসহিষ্ণুতা রাজনৈতিক রোগের একটি লক্ষণ মাত্র। এটি নিজ থেকে বলে দেয় না রোগটি আসলে কী। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এই রাষ্ট্র এখনও শ্রেণীস্বার্থের প্রতিভূ হিসেবে পরিপকস্ফতা অর্জন করতে পারেনি। বিখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্যারিংটন মুর (জুনিয়র) বলেছেন, বুর্জোয়া নেই তো গণতন্ত্র নেই। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত একটি সুগঠিত বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে ওঠেনি। ধন-সম্পদের প্রাচুর্য, বিলাস জীবনযাপন এবং বল্গাহীন খরচের মাত্রা একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বুর্জোয়ায় পরিণত করে না। বুর্জোয়ায় পরিণত হওয়ার জন্য উত্পাদন ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হতে হয়। অর্থাত্ বুর্জোয়াকে উত্পাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীকে শোষণ করে উদ্বৃত্ত সম্পদের মালিক হতে হয়। এই উদ্বৃত্ত সম্পদ যদি উত্তরোত্তর বিনিয়োগ হয়ে উত্পাদনের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিতে পারে তাহলেই কেবলমাত্র বলা যায়, দেশে একটা বুর্জোয়া শ্রেণী বা বুর্জোয়া ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের মুহূর্ত থেকে এদেশে এমন একটি গোষ্ঠী তত্পর হয়ে উঠেছে যারা লুটপাট করে ধন-সম্পদের মালিক হয়েছে। যেহেতু তারা অবৈধ ও সহজপন্থার আশ্রয় নিয়ে ধন-সম্পদের মালিক হয়েছে সেহেতু তাদের চরিত্রে ধন-সম্পদের যে একটি মূল্য আছে তা কদাচই প্রতিফলিত হয়। স্বীকার করতে হবে যে কোনো পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আদিতে এভাবেই ধনিক শ্রেণীর উত্পত্তি হয়। এরা যতদিন তাদের ধন-সম্পদ উত্পাদনের কাজে বিনিয়োগ না করে ততদিন তাদের আচার-আচরণ থাকে অসংযত ও দায়িত্বহীন।

এদের গঠনের প্রথম যুগে এরা রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল থাকে নিদারুণভাবে। কারণ রাষ্ট্রের প্রশ্রয় না পেলে এদের পক্ষে লুণ্ঠনবৃত্তি অব্যাহত রাখা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশের ক্ষমতাপ্রত্যাশী কিংবা ক্ষমতাসীন দলগুলো তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য যে অর্থায়নের প্রয়োজন অনুভব করে সেটা অনেকটাই পূরণ হয় এই লুটেরা শ্রেণীর সহায়তায়। ফলে ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দলগুলোও এদের অনৈতিক চাপ ও তদবিরের কাছে নিজেদের অসহায় বোধ করে। লুণ্ঠনবৃত্তিতে নিমজ্জিত শ্রেণীটির অপর একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো দেশপ্রেমহীনতা। তাদের দেশপ্রেমের ঘাটতির মূলে রয়েছে মুনাফার জন্য পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে দেশীয় বাজারের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন না থাকা। কথাটা হলো পণ্য উত্পাদন করলেই পণ্য বিক্রি বা বাজারজাতকরণের প্রশ্ন উঠবে। অন্যথায় নয়। চোরাচালান, শেয়ারবাজার থেকে লুটপাট, ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং করে লুটপাট, মাদকের ব্যবসা কিংবা ঘুষ-দুর্নীতি এর কোনোটিরই উত্পাদনের সঙ্গে সংযোগ নেই। অথচ বাংলাদেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে বেশুমার। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এ ধরনের লুটপাটকারীরা বিরাট একটি স্থান দখল করে আছে বলে একটি সুগঠিত বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশ আমরা লক্ষ করছি না। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুরোটাই এদের দখলে নেই। দেশে পোশাক খাতের বিপুল বিকাশ এবং ওষুধ শিল্প, চামড়া শিল্প, বস্ত্র শিল্প, সিরামিকস এবং জাহাজ নির্মাণসহ বেশকিছু পণ্য উত্পাদন খাত প্রমাণ করছে যে বাংলাদেশে একটি উত্পাদন-ঘনিষ্ঠ বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশ ঘটছে। উত্পাদনের এইসব খাতসহ অন্যান্য খাতে উত্পাদনমুখী বুর্জোয়াদের বিচরণ যতই প্রবল হবে ততই বাংলাদেশে আইনের শাসনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হতে থাকবে। এই আইনের শাসন নিশ্চিত করবে ধন-সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, লেনদেনে নিয়মানুবর্তিতা এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় সমতল মাঠ। দেশে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকে তাহলে এধরনের কাম্য পরিস্থিতিমুখীন অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। আর যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকে তাহলে এই অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। বাংলাদেশ এমন একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সন্নিবিষ্ট, যে রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা কামনা করে না।

বরং বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতাকে পুঁজি করে নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়। তারা এটি বিলক্ষণ জানে, যদি এই ১৬ কোটি মানুষের দেশে একটি শক্তিশালী ও সুগঠিত বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে তাহলে বাংলাদেশ পরিণত হবে একটি অপরাজেয় জাতীয় রাষ্ট্রে। এই জাতীয় রাষ্ট্রের অবস্থান প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের ব্যাপারে এমন এক নীতির আশ্রয় নিয়েছে যার ফলে বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিমুহূর্তে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি এই উপলব্ধিতে পৌঁছতে সক্ষম হয় যে তারা একে অপরের সংহারে প্রবৃত্ত না হয়ে বরং একে অপরের সঙ্গে দেশের মঙ্গল সাধনে প্রতিযোগিতা করবে। প্রতিযোগিতা করবে কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা যায়, প্রতিযোগিতা করবে কীভাবে দেশকে মর্যাদার আসনে বসানো যায়—তাহলেই কেবল আমরা স্বপ্ন দেখতে পারব অচিরেই আমাদের দেশ মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ফন্দি-ফিকির না এঁটে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই পথেই এগুতে হবে যে পথ হলো পরস্পরকে সম্মান করার পথ। দেশের সামনে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের কর্তব্য হলো এই সাধারণ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। আর এটি যদি নিশ্চিত করা যায় তাহলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শত জটিলতা সত্ত্বেও প্রথমবারের মতো জাতিকে যদি ক্ষমতার পালাবদলের সুস্থির পন্থাটি উপহার দেয়া সম্ভব হয় তাহলে পরবর্তী দিনগুলো ক্রমে সুখকর হয়ে উঠবে—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

» Topics: