চুরি, ঘুষ, দুর্নীতির পর এবার রাহাজানি

Badruddin.Umar's picture

দেশে এখন চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি এত বিস্তার লাভ করেছে যে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থেকে নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই এখন এক বিপর্যস্ত অবস্থা। আজকের সংবাদপত্রের এক খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকচালক ও ট্রাক মালিকরা মালামাল বহনে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এর কারণ, এই রুটে রাস্তার ওপর ট্রাক থেকে মাল নামিয়ে লুট করা হচ্ছে। এই রাহাজানি এত ঘন ঘন ও নিয়মিত ব্যাপারে দাঁড়িয়েছে যাতে এটা বন্ধ না করলে চট্টগ্রাম থেকে লোহার রডসহ বিভিন্ন আমদানিকৃত জিনিসপত্র ঢাকা নিয়ে আসা পরিণত হয়েছে এক বিপজ্জনক এবং ক্ষতিকর ব্যাপারে। কাজেই সরকার এই পরিস্থিতির উন্নতি সাধন না করলে অর্থাৎ এই রাহাজানি বন্ধ না করলে ব্যবসা-বাণিজ্য এখন বড় রকম সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে এবং ঢাকাসহ সারাদেশে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি একেবারে অনিয়ন্ত্রিত হবে। বাড়িঘরের নির্মাণ খরচও সেই অনুযায়ী বৃদ্ধি পাবে (ডেইলি স্টার, ৯.৭.২০১২)।

১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে যে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে সেটা একের পর এক রঙবেরঙের সরকারের আমলে বন্ধ না হয়ে ক্রমশ বিস্তার লাভ করেছে এবং এখন এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যা এই লুটপাটের বাইরে আছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে লুটপাট বলতে সাধারণ অর্থে লুটপাটই বোঝায় না, ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, কমিশনখোরী থেকে নিয়ে জমি ও জলা দখল, রাহাজানি সবকিছুই এখন এই লুটপাটের অন্তর্গত। এরই এক একটি রূপ। এই সর্বজনীন লুটপাটই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশে সম্পদ অর্জনের সর্বপ্রধান উপায়। এই লুটপাট যে কী ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তারই এক দৃষ্টান্ত হলো চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে রাহাজানি, ট্রাক আটক করে মালপত্র লুটপাট।

দেশে দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, লুটপাট হলে তা বন্ধ করার একটা সক্রিয় প্রক্রিয়া প্রশাসন ও সরকারের ওপরতলা থেকে যদি জারি থাকে, তাহলে এসব বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু এসব চুরি, ডাকাতি, রাহাজানির সঙ্গে তাল রেখে যদি ওপরতলাতেই চুরি, দুর্নীতি, ঘুষখোরী চলতে থাকে, তাহলে এই অবস্থা পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। বাংলাদেশে আজ ঠিক এই অবস্থাই তৈরি হয়েছে।

সংবাদপত্র রিপোর্ট থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে পুলিশ, র‌্যাব, বর্ডার গার্ড, আনসার ইত্যাদি হরেক রকম বাহিনী থাকলেও খুব সামান্য ক্ষেত্রেই এরা অপরাধীদের চিহ্নিত ও পাকড়াও করতে সমর্থ হয়। অনেক সময় এরা কোনো কেইসই নেয় না। এর জন্য পুলিশও ঘুষ চায় এবং ঘুষ না দিলে থানায় কোনো অভিযোগকেই পাত্তা দেওয়া হয় না। বহু ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপে অথবা সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়েও তারা জেনারেল ডায়েরি বা জিডি পর্যন্ত করতে চায় না। এ ছাড়া অন্য ব্যাপারও আছে। এসব সরকারি বাহিনী নিজেরাও দুর্নীতিগ্রস্ত। কোনো ব্যক্তি, সংস্থা, সংগঠন বা বাহিনী দুর্নীতিগ্রস্ত হলে তার কার্যযোগ্যতা ঠিকমতো থাকে না। বাংলাদেশে এ কারণে পুলিশ থেকে নিয়ে অন্য বাহিনীগুলোরও যোগ্যতা বলে বিশেষ কিছু নেই। তাছাড়া সরকার থেকে যদি ক্রমাগত এদের কাজের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা হয়, সরকারি লোকদের দুর্নীতিকে আড়াল বা উধাও করার জন্য যদি পুলিশকে ব্যবহার করা হয়, তাহলে পুলিশ ও সরকারি লোকদের লুটপাটের যোগ্যসূত্র পুলিশের মধ্যে দুর্নীতি বৃদ্ধি করে, অপরাধী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে পুলিশের যোগ্যতা কমায় এবং অপরাধী শনাক্ত করা গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দুর্নীতি সৃষ্ট অপরাধের বিস্তার ঘটায়। দেশে এখন সরকারি পর্যায়ে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং খুন-খারাবির ব্যাপক বিস্তারের কারণ এটাই।

গতকালের (৮.৭.১২) সংবাদপত্রে দেখা গেল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রেসের সামনে বলেছেন যে, বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়নি! কথাটি 'সাত কাণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা রামের মা'-এর মতোই! বাংলাদেশে যেভাবে ব্যাপক আকারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ক্রসফায়ার, গুম, সন্ত্রাস ইত্যাদির মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি বলেন, বাংলাদেশে তাদের আমলে আজ পর্যন্ত কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়নি, তাহলে তিনি যে সরকারের মন্ত্রী তার নৈতিক চরিত্র বলতে কী দাঁড়ায়? এর ফলে এই সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কি বৃদ্ধি পায়? কাজেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই স্বচ্ছ মিথ্যাচার দেশের জনগণের মধ্যে, সরকার ও সরকারি দলের প্রতি অনাস্থা গভীর করে, তাদের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। কিন্তু শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই নয়, অধিকাংশ মন্ত্রীই নিজ নিজ ক্ষেত্রে একই ধরনের দায়িত্বহীন কথাবার্তা এবং মিথ্যা বেপরোয়াভাবে বলে চলেছেন। এসবের ফলে তারা যে কীভাবে জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছেন এর কোনো উপলব্ধি তাদের আছে বলে মনে হয় না। মন্ত্রিসভার প্রত্যেকটি সদস্য এবং সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যেভাবে কথা বলেন তাতে মনে হয় না যে, সত্যের প্রতি, বাস্তবতার প্রতি তাদের কোনো দৃষ্টি আছে। তারা একইভাবে সকলেই বেপরোয়া।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যা অবস্থা তাতে এটা বলা তার পক্ষে অসম্ভব নয় যে, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে রাহাজানির যে কথা বলা হচ্ছে তা পরিপূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা অভিযোগ! এসব অভিযোগ যারা তুলছে তাদের উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নস্যাৎ করা অথবা এ বিচারের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা! যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সরকার পক্ষ থেকে এভাবেই কথাবার্তা বলা হচ্ছে। তারা এতদিনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, এটা ভালো কথা। কিন্তু যে কোনো লোক বা দল সরকারের যে কোনো অপকর্ম, দুর্নীতি বা অযোগ্যতার সমালোচনা করলেই যে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বিঘি্নত করার উদ্দেশ্যেই এ কাজ করছেন এর কোনো বাস্তব ভিত্তি একেবারেই নেই। উপরন্তু এই ধরনের কথাবার্তা বলে সরকার নিজেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে পরিণত করছে একটা খেলো ব্যাপারে।

আমি বহুবার লিখেছি যে, বাংলাদেশে অপরাধের বিস্তার এবং সর্বক্ষেত্রে এই অপরাধ ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ, এখানে অপরাধীদের শাস্তির কোনো ব্যবস্থা নেই। যে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলতে পারেন যে, বাংলাদেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়নি তাদের সরকারের কাছে ক্রসফায়ার, গুম, খুন ইত্যাদির বিচার ও শাস্তি কীভাবে জনগণ আশা করতে পারেন। এখন চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ট্রাক চলাচল যেভাবে মালিক ও ড্রাইভাররা বন্ধ রেখেছেন এতে দেশের অর্থনীতির কী ক্ষতি হবে এর হিসাব কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আছে? তিনি এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা করছেন? যারা সাধারণ হত্যাকাণ্ডের আসামিকেও ধরতে পারেন না, যারা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের আসামি গ্রেফতার করার কথা বলে পরে সে ব্যাপারে কোনো কিছু করার অক্ষমতা প্রকাশ করেন, তারা চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে রাস্তার ওপর ডাকাত ও লুটপাটকারীদের পাকড়াও করে রুটটিকে নিরাপদ করবেন এমন ভরসা কে করতে পারে? কাজেই যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ট্রাক মালিক ও ট্রাকচালকরা চলাচল করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সে পরিস্থিতির উন্নতি কীভাবে হবে এটা দেখার ব্যাপার। এসব দেখেশুনে তো মনে হয়, 'ঈশ্বরের' ওপর ভরসা করে থাকা ছাড়া এদের আর কোনো করণীয় নেই।