তিনটি সম্ভাব্য গন্তব্যে বাংলাদেশ

Asif.Nazrul's picture

এক-এগারো কি আসছে আবার? নাকি তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু? এমন আশঙ্কা শুনছি আমরা দেশে এখন। ২০০৭ সালের এক-এগারোর আগে রাজপথে দুই দল ছিল মুখোমুখি। সব সংলাপ আর সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। সাজানো নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে অনড় ছিল বিএনপি, এ নিয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি ছিল না আওয়ামী লীগ। দুই দলের হুংকারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল মানুষ।

অনেকের আশঙ্কা ছিল, দুই দলের সমঝোতা না হলে তৃতীয় কোনো শক্তিকে আসতে হবে অনিবার্য সংঘাত এড়াতে। সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছিল। তৃতীয় শক্তি এসেছিল দেশে। সামরিক বাহিনী সমর্থিত বা নিয়ন্ত্রিত একটি সরকারকে দেশ চালাতে হয়েছিল টানা দুই বছর। ইচ্ছে ও যোগ্যতা থাকলে হয়তো আরও অনেক দিন তারা থাকত ক্ষমতায়, গণতন্ত্রে ফেরার পথ আরও দুষ্কর হতো দেশে।

এক-এগারোর আলোচনা এখন প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে এ কারণে যে আবারও রাজপথে মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। আবারও তাদের সর্বাত্মক ও সর্বগ্রাসী সংঘাতে উদ্বিগ্ন ও অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে মানুষ। গতবার তবু লোক দেখানো হলেও সংলাপ হয়েছিল দুই দলের মধ্যে। এবার সেই পরিবেশও নেই। সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করবে এমন মানুষও নেই আর সমাজে। শ্রদ্ধেয় ও জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের একটি বড় অংশ (যেমন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ড. কামাল হোসেন, এবিএম মূসা, আকবর আলি খান) গত চার বছরে আওয়ামী লীগ বা তার অনুগত মহলগুলোর অপপ্রচারণার শিকার হয়েছেন সরকারের সমালোচনা করার কারণে। বাকিদের প্রায় সবাই অন্ধভাবে পক্ষ নিয়েছেন বড় দুটো দলের।
অবস্থা এমন যে কারোরই যেন কিছু করার নেই। দিন যাচ্ছে, বাড়ছে রাজনৈতিক সংঘাতের ব্যাপকতা। সরকারি অফিস, রেলপথ, যানবাহন, পুলিশ আর সাধারণ মানুষের জানমাল কোনো কিছু রেহাই পাচ্ছে না বিএনপি-জামায়াতের খ্যাপাটে কর্মীদের কাছে। বিরোধী দলের কর্মীকে হত্যা করে, কয়েক হাজার মামলা দিয়ে, কয়েক লাখকে আসামি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না পুলিশ। কার দোষ কতটুকু এই নিয়ে মতভেদ আছে। তবে তুলনামূলক বিতর্কহীন সত্য এই যে, সারা দেশের জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে দুই দলের মারমুখী অবস্থানের কারণে।

এই পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে অতীতে অরাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে রাজনীতি বা গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার সময়গুলোতে এবং তা কোনো না কোনো রাজনৈতিক শক্তির মদদে। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে এমন হস্তক্ষেপকে জনগণ স্বাগত জানায়, এমন উদাহরণও এ দেশে রয়েছে।
আমার আশঙ্কা, রাজনৈতিক সংঘাত আর বেশি দিন অব্যাহত থাকলে জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে সময় লাগবে না। নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গের মনোভাব আমরা বড় দুটো দলের মধ্যে আগে দেখেছি। এই মনোভাব অব্যাহত থাকলে সত্যি দেশে আবারও এক-এগারো ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

এর আগেই রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির অবসানের পথ খুঁজে পেলে ভালো। এখনো সময় আছে, এ লক্ষ্যে আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি আন্তরিক আলোচনায় বসার। প্রধান দুই দলের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা হলেই কেবল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহনীয় হবে, দেশে শান্তি আসবে।

২.
বড় দুই দলের আচরণ দেখলে অবশ্য মনে হয় না কোনো সমঝোতার জন্য তারা প্রস্তুত আছে। প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী বরং ‘সেনাবাহিনী সময়মতো তার কাজ করবে’ প্রকাশ্যে এই বক্তব্য দিয়ে সেনাবাহিনীকে উসকানি দিয়েছেন বলে সমালোচিত হচ্ছেন। উইকিলিকসের তথ্য অনুসারে ২০০৬ সালে তখনকার বিরোধী দলের নেত্রী ঘরোয়া আলোচনায় কূটনীতিকদের বলেছিলেন সেনাবাহিনী এসে নির্বাচন করে দিলে অসুবিধা নেই। আওয়ামী লীগ এখন নিশ্চয়ই তা চাইবে না। তারা খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করছে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। বিএনপির বহু নেতাকে সরকার ইতিমধ্যে অন্তরীণ করে রেখেছে, ভবিষ্যতে এমনকি খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটতে পারে। নেতাদের পাশাপাশি কর্মীদের দমন করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে দেখামাত্র গুলির চরম নির্দেশও প্রদান করেছেন।
এসব কঠোর পদক্ষেপে কি শান্তি আসবে দেশে? বিএনপির মতো দেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ লোকের প্রতিনিধিত্বকারী দলকে কোনো দমননীতির মাধ্যমে স্তব্ধ করা কি সম্ভব? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষ-বিপক্ষের কথা বলেও এটি করা হয়তো সম্ভব হবে না। এ ধরনের পক্ষ-বিপক্ষের কথা বলে ১৯৯০-পরবর্তী সব সময় আওয়ামী লীগ সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে ধর্ম ও ভারতবিরোধিতার কথা বলে বিএনপি একই চেষ্টা করেছে। আমার মনে হয় না কখনোই দুই দলের এসব রাজনৈতিক কৌশল উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষকে প্রভাবিত করতে পেরেছে। ১৯৯০ সালের পর প্রতিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয় আমাদের বরং এই বার্তা দেয় যে মানুষের কাছে সমর্থন বা বিরোধিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ক্ষমতায় থাকাকালে সরকারের আচরণ। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশ পরিচালনায় নানা ব্যর্থতায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ বিরোধী দলকে জনসমর্থনের জোরে স্তব্ধ করে রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। আর বিরোধী দলকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা হলে তার ফলাফলও শুভ হবে না।

বিরোধী দলকে অব্যাহত মামলা-হামলা-নির্যাতন করলে বরং আগামী নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলবিহীন একটি নির্বাচন দেখতে হতে পারে আমাদের। এমন নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য সুফলদায়ক হবে না। বরং একতরফা নির্বাচনে জেতার পর ভবিষ্যৎ আওয়ামী লীগ সরকার আরও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। তা ছাড়া স্বৈরতান্ত্রিক সরকার বাংলাদেশে মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছে, এমন উদাহরণও নেই। কাজেই দলীয় সরকারের অধীনে মনমতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এরপর অচিরেই রাজপথে আবারও সহিংস রাজনীতি দেখতে হতে পারে আমাদের।

৩.
আমাদের তৃতীয় এবং একমাত্র প্রত্যাশিত গন্তব্য হচ্ছে দুই বড় দলের সংলাপ। এই সংলাপ হতে হবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের এজেন্ডা নিয়ে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে নির্বাচন নিয়ে সংঘাতের কারণে আফ্রিকার বহু দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিপর্যস্ত হয়েছে (যেমন আইভরি কোস্ট, নাইজেরিয়া), জাতিগত বা রাজনৈতিক সংঘাত চরমে উঠেছে (কঙ্গো, ঘানা, বেনিন, বতসোয়ানা) বা ক্ষমতা ভাগাভাগির মতো অদ্ভুত গোঁজামিলের চেষ্টা হয়েছে (কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে)।

নির্বাচন নিয়ে সংঘাত এই অঞ্চলেও পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও নেপালে দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্ম দিয়েছিল। পাকিস্তান ও নেপাল বাংলাদেশের উদাহরণ থেকে শিখে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে চারটি পূর্ণ মেয়াদের সংসদ, দুই যুগের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের বহু প্রতিষ্ঠান ও মানদণ্ড স্থাপনকারী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন নিয়ে তাহলে আমাদের আলোচনায় না বসার যুক্তি কী?

যারা তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থার বিরোধী, তাদের একটি বড় যুক্তি হলো অনির্বাচিত সরকার দেশের গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্কজনক। এটি সত্যি হতে পারে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এর চেয়ে বড় কলঙ্ক নিয়েই কি আমরা বেঁচে আছি না বাংলাদেশে? এ দেশে রাজনৈতিক নেতারা (দুই নেত্রীসহ) প্রায় তিন দশক ধরে দলের প্রধান হয়ে আছেন, এসব দলের ভেতর গণতন্ত্র নেই, এখানে ছাত্ররাজনীতির নামে চলে হল দখল, সন্ত্রাস আর টেন্ডারবাজি, সংসদ হয়ে থাকে অকার্যকর, বিচারালয় থাকে অনেক ক্ষেত্রে শাসকের স্বেচ্ছাধীন, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বদলে থাকে সরকারের তোষামোদকারী আমলাদের রাজত্ব—এগুলো কি গণতন্ত্রের আরও বড় কলঙ্ক নয়? তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি তিন মাসের কলঙ্ক হয়েও থাকে, এটি আমাদের যে সুফল দিয়েছে, এর কোনো বিকল্প এখন সত্যিই নেই।

কারও কারও মধ্যে হয়তো আশঙ্কা আছে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি জিতে এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থামিয়ে দিতে পারে। এই বিবেচনায় তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আগ্রহী নন, হয়তো তাঁরা ভাবেন যে যেভাবেই হোক আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতা আরোহণ মঙ্গলজনক। কিন্তু এই চিন্তার ভেতরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নেই। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেওয়ার প্রচারণার সুযোগ কি বিলীন হয়ে যাবে? যাবে না। বরং এই প্রচারণা চালিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকে পরাজিত করতে পারলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়ার পক্ষে আরও শক্তিশালী নৈতিক মনোবল সৃষ্টি হবে। সেই সুযোগ নিলে অসুবিধা কী?

আবারও এক-এগারো কিংবা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা—এই দুই আশঙ্কার একমাত্র জবাব হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক কিংবা সর্বদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ যত বিলম্বে শুরু হবে, নানা আশঙ্কা ততই দেশে জেঁকে বসবে। আশঙ্কার হাত ধরে সত্যিকারের বিপদ এসেছে, এমন ঘটনা আগে ঘটেছে দেশে। এর পুনরাবৃত্তি না চাইলে রাজনীতিবিদদের তথা আমাদের সবাইকে সাবধান হতে হবে এখনই।