ক্যামেরন কী খান, আমরা কী খাই?

এই খবরটি নিশ্চয়ই আপনাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ‘ঝাড়ি’ খেয়েছেন। ভদ্রভাষায় বলি, বকুনি খেয়েছেন। কার কাছ থেকে? কফির দোকানের একজন পরিচারিকার কাছ থেকে। ৪ জুলাই ডেইলি মেইল পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। পথে তাঁর কফির তেষ্টা পায়। তিনি একটা কফির দোকানে ঢোকেন। দোকানের পরিচারিকা তখন অন্য খদ্দেরদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী কফি চাইলে তিনি তাঁকে লাইনে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন এবং জানান, কফি পেতে ১০ মিনিট দেরি হবে।
ক্যামেরনের সঙ্গীরা তখন পাশের দোকান থেকে কফি আর একটু খাবার কেনেন। সেই দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন খাবার খাচ্ছিলেন, তখন লোকজন তাঁকে চিনে ফেলে। ভিড় এড়াতে প্রধানমন্ত্রী আবার সেই প্রথম কফি শপেই ঢুকে পড়েন।
দোকানের পরিচারিকা তাঁকে আবার ধমক দেন এই বলে, এই দোকানে বসে বাইরের খাবার খাওয়া নিষেধ।
পরে এই পরিচারিকা, শিলা টমাস, বলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী খুব ভালো ব্যবহার করেছেন এবং হাত মিলিয়েছেন।
ঢাকায় একটা লাফটার ক্লাব হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর একটা হোটেলের বলরুমে তারা তাদের দ্বিতীয় অনুষ্ঠান করেছে। ওই অনুষ্ঠানে বিভিন্নজন একটার পর একটা কৌতুক পরিবেশন করলেন। অবসরপ্রাপ্ত মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া কিছু কৌতুক শুনিয়েছেন, যা থেকে দুটো আপনাদের পরিবেশন করি।
বনের রাজা সিংহ। সে তো বনেরই রাজা। এটা আমাদের বাংলা বইয়ে লেখা আছে, সিংহও তা জানে এবং মানে। কিন্তু বনের পশুপাখি জানে তো? মানে তো যে সিংহই বনের রাজা? সে বনের পথে ঘুরতে লাগল। সামনে পড়ল একটা শেয়াল। তাকে সে বলল, ‘এই শিয়াল, বল তো, বনের রাজা কে?’
শেয়াল হাতজোড় করে বলল, ‘মহারাজ, আপনি ছাড়া আর কে?’
সিংহ খুশি হয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। সামনে পড়ল এক খরগোশ। তাকে সে বলল, ‘এই খরগোশ, বল তো, বনের রাজা কে?’
‘জাহাপনা, আপনি, মহাপরাক্রমশালী সিংহ, আপনিই বনের রাজা।’
সিংহ হূষ্টচিত্তে এগিয়ে যেতে লাগল। সামনে পড়ল একটা হাতি। সিংহ বলল, ‘এই হাতি, বল তো, বনের রাজা কে?’
হাতি তাকে শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে আকাশে তুলে মারল এক আছাড়।
সিংহ মাটিতে পড়ে কাতরাতে কাতরাতে বলল, ‘বললেই তো হয়, উত্তরটা আপনার জানা নাই। এত চেতাচেতির কী হলো?’
বনের মধ্যে একটা সরু পায়ে চলা পথ। এক বাঘ সেই পথে শুয়ে আছে। পথ দিয়ে যাচ্ছে একটা শিয়াল। শিয়াল বলল, ‘মামা, আপনি অসময়ে এই পথের ওপরে শুয়ে আছেন যে, ব্যাপার কী?’
বাঘ বলল, ‘আর বলো না। মনে হয় বাঁচব না। এক শিকারি বন্দুক দিয়ে গুলি করেছে। গুলি আমার পেটে লেগেছে। নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে পড়েছে। একবিন্দু নড়ার ক্ষমতা নাই। মরলে বাঁচি। এই যন্ত্রণা আর সইতে পারছি না।’
শিয়াল ভালো করে চারপাশ ঘুরে বাঘের প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করল। আসলেই বাঘটা আর বাঁচবে না। নড়াচড়ার কোনো ক্ষমতাই তার নেই। সে তখন বলল, ‘হারামজাদা, মরার আর জায়গা পাইলি না, মরবিই যখন, একটু সরে শুয়ে তারপর মর। রাস্তাটা আটকে রেখেছিস কেন?’
ডেভিড ক্যামেরন এর আগেও কফিশপে ঝাড়ি খেয়েছেন। নিজের পরিবারের সঙ্গে ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার সময় তিনি খাবারের দোকানে খাবার কেনার পরে পরিচারিকাকে বলেছিলেন খাবারের ট্রেটা তাঁর টেবিলে একটু এগিয়ে দেওয়ার জন্য। পরিচারিকা তাঁকে বলেছিলেন, ‘দেখছ না আমি ব্যস্ত। আমি পারব না।’
তবে গত মাসে ক্যামেরন খবর হয়েছিলেন নিজের বাচ্চাকে খাবারের দোকানে ফেলে রেখে আসায়। বাচ্চাকাচ্চা আর বউ সামন্থাকে নিয়ে ক্যামেরন গিয়েছিলেন ওখানে রোববারের মধ্যাহ্নভোজে। ফেরার সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁর রক্ষীদের নিয়ে একটা গাড়িতে ওঠেন। বউ তাঁর বাচ্চাদের নিয়ে আরেক গাড়িতে ওঠেন। বাড়িতে ফেরার পরে তাঁরা দেখেন একটা বাচ্চা, ন্যান্সি, বয়স ৮, বউয়ের গাড়িতেও নেই, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতেও নেই। বউ ভেবেছিলেন, মেয়ে আছে তার বাবার সঙ্গে। আর বাবা ভেবেছেন, ন্যান্সি আছে মায়ের সঙ্গে।
সঙ্গে সঙ্গে দোকানে ফোন। হ্যাঁ, আছে মেয়েটা সেখানে।
যাক, ১৫ মিনিটের মধ্যেই মেয়েটি ফেরত আসে তাদের বাড়িতে।
এবং এই ভুলের জন্য কারও চাকরি যায়নি। কারণ, তাঁরা বলেছেন, এটা তো একটা ভুল বোঝাবুঝি।
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, থ্রো আউট দ্য বেবি উইথ দ্য বাথ ওয়াটার। কে জানে, কেউ সত্যি বাথটাব থেকে পানির সঙ্গে বাচ্চাও ফেলে দিয়েছিল কি না! ক্যামেরন অবশ্যই পানির সঙ্গে বাচ্চাকে ছুড়ে মারেননি, রেস্তোরাঁয় মেয়েকে ফেলে রেখে পালিয়েও যাননি। প্রবাদগুলো যে কোনটা কোত্থেকে আসে। এই ধরা যাক লেজে-গোবরে কথাটা। ডিকশনারিতে এর মানে, অক্ষমতার জন্য বিপর্যস্ত অবস্থায় উপনীত। যাঁদের বাড়িতে বা গোয়ালে গরু আছে, লেজে-গোবরে অবস্থায় পড়া গরু তাঁরা দেখে থাকবেন। কিন্তু মানুষও কি লেজে-গোবরে অবস্থায় পড়তে পারে? বাংলা একাডেমীর ডিকশনারি আবার লেজে-গোবরের অর্থের সঙ্গে অক্ষমতা অর্থাৎ ক্ষমতাহীনতার প্রসঙ্গ এনেছে। কেন এনেছে, তারাই জানে। মানুষের অবশ্য লেজ থাকে না। থাকার কথাও নয়। তবে মেরুদণ্ডের শেষে লেজের ধ্বংসাবশেষ রয়ে গেছে, কেউ কেউ বলেন। মানুষের যদি লেজ থেকেও থাকে, গোবর সে কোথায় পাবে?
কিন্তু ক্ষমতা আর অক্ষমতার সঙ্গে লেজে-গোবরে কথাটার সম্পর্ক দেখে একটু বিস্ময় বোধ হচ্ছে।
বিস্ময়েরই বা কী আছে? আসলে তো প্রবাদ হলো একটা জনগোষ্ঠীর বহু বছরের অভিজ্ঞতার নির্যাস।
আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে এসব প্রবাদ-প্রচলনকেই সত্য হতে দেখি। এতে আসলে বিস্ময়ের কিছু নেই।
কোত্থেকে কোথায় এলাম। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন তো এই রকম সাধারণভাবেই চলবেন। কারণ গণতন্ত্রের চর্চা সেই দেশে বহু বছরের। আমাদের কোনো এককালে দিল্লির বাদশাহ নাসিরউদ্দিন ফকিরের মতো জীবন যাপন করিতেন। নিজের ছেঁড়া টুপি নিজ হাতে সেলাই করিতেন। বেগমকে বলিতেন, রাজকোষের অর্থ আমার নহে, প্রজাসাধারণের।
সেই দিন আর নেই। এখন উল্টো নিয়ম। এখন প্রজাসাধারণের টাকা প্রজাসাধারণের নহে, রাজা-বাদশাহ-বেগমের। এ কারণেই তো ওই গল্প, চীনের মন্ত্রী বললেন, ওই যে সেতু দেখছ, ওই সেতুর টেন পারসেন্ট দিয়ে এই বাড়ি। আর তার বন্ধু দেশের মন্ত্রী বললেন, ওই যে দেখছ প্রমত্তা নদী, ওর ওপরে কোনো সেতু নেই, তার হান্ড্রেড পারসেন্ট দিয়েই এই আমার বাড়ি-গাড়ি-সাম্রাজ্য...
আমাদের মন্ত্রীরা তো ক্যামেরন নন যে নির্বাচিত হওয়ার পরও সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়ে দোকান থেকে পাউরুটি কিনে বাড়ি ফিরবেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে সকালবেলা পাউরুটি কিনে নাশতা খেতে হয়। দোকানে গিয়ে ওয়েট্রেসের ধমক খেতে হয়। বাচ্চা ফেলে এসে নিশ্চয়ই বউয়ের বকুনি খেতে হয়েছে।
আর আমরা কী খাই?
লোকে বলে, পারসেন্টেজ। ধেৎ, তাও কি হতে পারে?
- Anisul.Haque's blog
- Login to post comments
- 706 reads
একই রকম আরো কিছু ব্লগ
- আমরা লিখিয়েরা ও আদালত - Ataus.Samad
- বিচারপতি হাবিবুর রহমানের স্পষ্ট ভাষণ - Ataus.Samad
- চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক - abdullah.shafi
- ভারতে বাংলাদেশ-ভাবনা - সাজ্জাদ শরিফ - sajjad.sharif
- সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা - Haidar.Akbar.Kh...
- একটি 'অকারণ' বিতর্কের 'প্রকৃত কারণ' - Mujahidul.Islam...
- সাতটি লাশের রাজনীতি - Mohshin.Habib
- প্লিজ প্রধানমন্ত্রী, খালেদা জিয়ার ভাষায় কথা বলে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবেন না - Abdul.Gaffar.Ch...
- ভালো কাজে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার - Ataus.Samad
- কচুঘেচু, লুটপাটের সংস্কৃতি - Hasan.Hafiz

Recent comments
9 hours 45 min ago
11 hours 33 min ago
15 hours 41 min ago
1 day 1 hour ago
2 days 39 min ago
2 days 5 hours ago
2 days 6 hours ago
4 days 3 hours ago
4 days 5 hours ago
4 days 3 hours ago