তবুও মানুষ প্রত্যাশা জাগিয়ে রাখতে চায়

রাজনীতি নষ্ট আবর্ত থেকে বেরুতেই পারছে না। বরঞ্চ ক্ষমতার রাজনীতির পথে হাঁটা প্রতিপক্ষ দলগুলোর দেশপ্রেমহীন দলতন্ত্র এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার উত্কট মোহ গণতন্ত্র বিকাশের সম্ভাবনাকে প্রতিদিন অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। জামায়াত মুক্ত হতে না পারায় বিএনপি সাধারণ মানুষের চোখে অনেকটা ব্যাকফুটে রয়েছে। বিরোধী দলীয় রাজনীতির মন্দ সংস্কৃতি লালন করতে গিয়ে সংসদ লাগাতার বর্জন করে গণতন্ত্রের পদযাত্রায় অনেকটা পিছিয়ে ফেলেছে নিজেকে। অন্যায় দুর্নীতির অতীত পাপের জন্য ক্ষমা চেয়ে শুদ্ধ হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেনি। এসব যুক্তি ও দলীয় নানা দুর্বলতার কারণে বার বার চেষ্টা করেও আন্দোলনের মাঠে তেমন সুবিধা করতে পারছে না। তারপরও আল্টিমেটামের মত হটকারী ঘোষণা দিয়ে নিজেদের আন্দোলনের শক্তিকে অনেকটা খাটো করে ফেলেছে। তবুও দলটির সৌভাগ্য রাজনীতির ময়দানে প্রভূত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে আওয়ামী লীগই বিএনপিকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে। বিপুল জনসমর্থনের শক্তি নিয়ে সরকার গঠন করেও সরকার পরিচালক আওয়ামী নেতা-নেত্রীরা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। সত্ রাজনীতিকে নির্বাসন দিয়ে এখন পথহারা হয়ে গেছেন আওয়ামী নেতৃত্ব।
এদেশের বিগত দিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে যতদূর তাকানো যাবে এ বিষয়টি স্পষ্ট হবে যে, রাজনীতিকদের হাতে জনগণ সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয়েছে। রাজনীতি আর নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে ‘জনগণ’ শব্দটির বহুল ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে রাজনীতিবিদগণ খুব কমই মূল্য দিয়েছেন। তাঁরা স্লোগান দিয়েছেন ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়—দলের চেয়ে দেশ বড়।’ কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দলগুলো দল, ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। সুবিধার ভাগ-বাটোয়ারা পেয়েছেন দলীয় নেতারা। কর্মীরা কখনো এর ছিটেফোঁটা পেয়েছেন কখনো না পেয়েই অন্ধ মোহজালে জড়িয়ে প্রাণপাত করছেন। দেশ ও জনগণের দিকে তেমন করে কেউ ফিরে তাকায়নি। এই দেশ এবং দেশের মানুষ তো এসব ক্ষমতাশালী ও ক্ষমতা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে বস্তুগত কিছু চায় না; এরা চাঁদাবাজির অর্থের ভাগ চায় না, দখল করা খাসজমি, মার্কেট, নদী-খালের ভাগ চায় না। জনগণ চায় একটি নিভাজ-নিপাট গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুক রাজনৈতিক দলগুলো। এ জন্য কাউকে গণতন্ত্রের কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে না। নিজেদের শুধু পরিশুদ্ধ হতে হবে। অন্তরে হতে হবে দেশপ্রেমিক। ব্যক্তিপূজা, দলবন্দনা বাদ দেয়া যাবে না জানি, দলের প্রতি ভালবাসা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধ বিষয় নয়, তবে সবার আগে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক আচরণ তো ঘর থেকেই শুরু করতে হয়। কিন্তু সে চেষ্টা দু’তিন দশকে কি আমরা দেখেছি?
নির্বাচন না করে বৃহত্তর নেতা-কর্মীদের অনুমোদন ছাড়া বড় দলগুলোর প্রধান পদ একই নেত্রীদের অলংকৃত করে রাখতে দেখা যায় কেন? গণতন্ত্রের পথে হেঁটে কেউ আজীবন পার্টিপ্রধান থাকায় তো কোন অন্যায় নেই। তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় কমিটি পর্যন্ত সকল স্তর বছরের পর বছর কাউন্সিলবিহীন পড়ে আছে। সভানেত্রী এবং কয়েকজন নেতার ইচ্ছেয় বার বার নানা পদে ব্যক্তি মনোনীত হচ্ছেন। দেশজুড়ে থাকা অধিকাংশ নেতা-কর্মীর তাতে সায় আছে কিনা তা কি কেউ পরীক্ষা করেছেন?
গণতন্ত্র না থাকায় বিএনপিতে খালেদা জিয়া আর আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার খুব একটা সুযোগ থাকে না। বিএনপির কথা না হয় বাদ দিলাম, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ বর্তমান নেতৃত্বের কল্যাণে অনেকটা শহুরে এলিট দলে পরিণত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের কতটা মূল্যায়ন করা হয়? গণতান্ত্রিক আচরণ অব্যাহত রাখতে পারলে আওয়ামী ধমনিতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ত। ফলে দেশজুড়ে বলবন্ত হতে পারত দলের জীবনীশক্তি। কিন্তু আওয়ামী নেতাদের শহর কেন্দ্রিক বণিক মনোবৃত্তির কারণে ধীরে ধীরে সুবিধার ফসল ঘরে তুলতে তত্পর জামায়াত আর বিএনপি।
সামপ্রদায়িক দল জামায়াত আর ভুঁইফোঁড় দল বিএনপির পক্ষে সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া সহজ ছিল না। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র চর্চাবিহীন পথ চলা বরঞ্চ জামায়াত-বিএনপির পায়ের নিচে মাটি পাওয়ার বাস্তবতা নিশ্চিত করে দিয়েছিল। কার্যপদ্ধতি ও আচরণে এই অগণতন্ত্রী দলগুলো জনকল্যাণ বিচ্ছিন্ন হলেও হাস্যকরভাবে জনগণের দোহাই দিয়েই নিজেদের বক্তব্য উত্থাপন করে। দলগুলোর দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক আচরণে মানুষ যেমন আস্থাহীনতায় ভুগছে আবার অনন্যোপায় হয়ে এসব দলের প্রতিই আস্থাশীল হতে চাইছে। এখানেই দলগুলোর আত্মতুষ্টির জায়গা খুঁজে নেয়া উচিত।
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি-আওয়ামী লীগ কেন গণতান্ত্রিক আচরণ করতে পারছে না? বিএনপির বিষয়টি বোঝা যায়। একটি বড় রাজনৈতিক শূন্যতার সময় সামরিক অঞ্চলের ভেতর থেকে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তাই তাঁর গড়া দল স্বাভাবিকভাবেই গণতান্ত্রিক আচরণ নিয়ে যাত্রা শুরু করতে পারেনি। পরবর্তী সময়েও নিয়মতান্ত্রিক পথে দলটির বিকাশ ঘটেনি। ডান-বাম-সামপ্রদায়িক দল সকল অঞ্চলের সুবিধাবাদী মৌমাছিরা বিএনপি নামের মৌচাকে এসে জায়গা করে নিতে থাকে। স্বার্থবাদী মানুষদের দিয়ে গণতন্ত্রের চর্চা হতে পারে না। এ কারণে বিএনপির গণতন্ত্র বক্তৃতা আর স্লোগানেই রয়ে গেল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় অর্থ আর প্রভাব বলয় দিয়ে বিএনপি দ্রুত সারাদশে সংগঠনটিকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। এই দলটি গ্রামেগঞ্জে পৌঁছে দেখল তাদের প্রতিহত করার মতো কোনো গণতান্ত্রিক শক্তি আর সেখানে অবশিষ্ট নেই।
গণতন্ত্র চর্চা যে কোনো দলকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যার পরে আওয়ামী নেতৃত্বের আচরণ বুঝিয়ে দিল হত্যাকারীরা কতটা মেধাবী পরিকল্পনায় হেঁটেছে। তারা আওয়ামী লীগের কর্মক্ষম হাত-পাগুলো ভেঙ্গে দিয়েছিল। তাই পরবর্তী নেতৃত্ব ব্যক্তিগত গুণাগুণের কারণেই আত্মবিশ্বাসী হতে পারেননি। নয়ত নতুন বেড়ে ওঠা ভুঁইফোঁড় দল বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করার জন্য যেখানে গণতান্ত্রিক বোধ নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার কথা সেখানে প্রতিযোগিতার রাজনীতিতে নেমে পড়ল। যে কারণে আওয়ামী আচরণে গণতন্ত্র দৃঢ়ভাবে জায়গা করে নিতে পারল না।
তবে অসহায় দেশবাসী শেষ পর্যন্ত আশা নিয়ে বাঁচতে চায়। সবকিছুরই শেষ থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোরও নিশ্চয় দোদুল্যমানতার অবসান ঘটবে। এসব দলের নেতৃত্বে থাকা মহাজনদেরও উপলব্ধি হওয়ার কথা। গণতান্ত্রিক আচরণহীন স্বার্থবাদী রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এ সময়ে আমাদের জীবনেও কেন সুবাতাস বইবে না? এখনও আমাদের বুকে আশা ঘর বাঁধে। এটি তো ঠিক, রাজনীতিবিদদের মেধা-চিন্তা-সততার পথ বেয়েই সার্বিক কল্যাণ সাধিত হতে পারে। আমাদের বিপুল জনশক্তি, মেধাবী মানুষ, উর্বর কৃষিভূমি, গ্যাস-কয়লার মতো খনিজ সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া কঠিন কিছু নয়। এ জন্য প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, জনকল্যাণমূলক প্রশাসন আর গণতন্ত্রের সুপ্রতিষ্ঠা। আর এ সব ক’টি কাজ সম্পন্ন করার পূর্বশর্ত হচ্ছে কলুষমুক্ত দেশপ্রেমিক রাজনীতি। রাজনীতিবিদদের অধিকাংশ যদি চিন্তা-কর্মক্ষেত্রে সত্ হতে পারতেন তাহলে অনুসারী বা তালবেলেম নেতা-কর্মীরা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অন্যের সম্পদ দখলকারী মস্তান হতে পারত না। নেতাকে অনুসরণ করে দেশ কল্যাণে নিবেদিত হতে পারত। দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণের ব্রত নিয়ে যাঁরা রাজনীতিতে টিকে যেতেন রাজনীতির দরোজা শুধু তাঁদের জন্য খোলা থাকত।—এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই শুধু পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে পারত দেশ।
এবার আওয়ামী লীগের শাসনকালে অনেক নেতিবাচক উপাদান যুক্ত হয়েছে। প্রশাসনিক অদক্ষতা আর দুর্নীতিকে লুকোনো যাচ্ছে না। মানুষের যাপিত জীবনে স্বস্তি ফিরে আসার সুযোগ কম। এর মধ্যে সাংবাদিক সাগর-রুনির হত্যা রহস্য উন্মোচনে সরকারি বাহিনীর রহস্যজনক ব্যর্থতা। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ রহস্য অন্ধকারেই থেকে যাওয়া। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি প্রসঙ্গ ধামাচাপা দেয়ার সরকারি প্রচেষ্টা ইত্যাদি সরকারের প্রতি মানুষের সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দিকভ্রান্তের মত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের অনেকে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন। সমালোচনাকারী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী সকলকে শত্রুজ্ঞান করে প্রকাশ্য বক্তব্য রাখছেন।
এই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের এধরনের দুর্বলতা প্রগতিবাদী মানুষের কাম্য নয়। আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়ে সামপ্রদায়িক শক্তিকে সবল করুক তা জাতি কামনা করে না। একারণে এদেশের আশাবাদী মানুষ প্রত্যাশার দীপ জ্বালিয়ে রাখতে চায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বোধোদয় হবে এটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত মানুষ আশা করে। আওয়ামী নেতৃত্ব বচনে চলনে আরো হিসেবি এবং মার্জিত আচরণ করবে এখন জাতির এমনটিই প্রত্যাশা। দেশপ্রেমের শক্তিতে যদি দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে বর্তমান সরকার আর এর প্রশাসন তাহলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নানা ঘুরপথ খুঁজতে হবে না আওয়ামী নেতৃত্বকে। তাই এ সময়ে প্রয়োজন আওয়ামী নেতৃত্বের ধৈর্যশীল হওয়া এবং সমালোচনা শোনার সহ্যশক্তি বাড়ানো। কারণ অধিকাংশ সমালোচনার ভেতর থাকে পথের দিশা। প্রগতিবাদী এবং অসামপ্রদায়িক চেতনার মানুষ বর্তমান বাস্তবতায় চাইবে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াক। শুধু দল নয় জনগণের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারলে তার প্রতিদান আওয়ামী লীগ অবশ্যই পাবে। আর এদেশের বেশিরভাগ মানুষ অনন্যোপায় হয়ে হলেও তেমন প্রত্যাশা বাঁচিয়ে রাখছে।
- AKM.Shahnawaz's blog
- Login to post comments
- 423 reads
একই রকম আরো কিছু ব্লগ
- আমরা লিখিয়েরা ও আদালত - Ataus.Samad
- বিচারপতি হাবিবুর রহমানের স্পষ্ট ভাষণ - Ataus.Samad
- চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক - abdullah.shafi
- ভারতে বাংলাদেশ-ভাবনা - সাজ্জাদ শরিফ - sajjad.sharif
- সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা - Haidar.Akbar.Kh...
- একটি 'অকারণ' বিতর্কের 'প্রকৃত কারণ' - Mujahidul.Islam...
- সাতটি লাশের রাজনীতি - Mohshin.Habib
- প্লিজ প্রধানমন্ত্রী, খালেদা জিয়ার ভাষায় কথা বলে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবেন না - Abdul.Gaffar.Ch...
- ভালো কাজে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার - Ataus.Samad
- কচুঘেচু, লুটপাটের সংস্কৃতি - Hasan.Hafiz

Recent comments
3 hours 37 min ago
4 hours 18 min ago
11 hours 11 min ago
12 hours 27 min ago
12 hours 29 min ago
13 hours 56 min ago
18 hours 47 min ago
11 hours 42 min ago
2 days 4 hours ago
2 days 6 hours ago