তৃতীয় শক্তি যখন সুদূরপরাহত

AKM.Shahnawaz's picture

তৃতীয় শক্তি বললে আবার ব্যাখ্যা করে স্পষ্ট করতে হয়। বিশেষ এলাকার মানুষকে তৃতীয় শক্তি বিবেচনা করলে গণতন্ত্রপ্রত্যাশীরা শঙ্কিত হবেন। আমি এমন তৃতীয় শক্তির কথা বলছি না। এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে এবং পরগাছা সাম্প্রদায়িক দল বাদ দিয়ে সুস্থধারার একটি রাজনৈতিক দলের কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু এমন রাজনৈতিক দলের শক্ত পায়ে দাঁড়ানো আমাদের মতো দেশে খুব কঠিন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট রাজনীতির আধিপত্যের জন্য নীতিবান ভালো মানুষরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন। অথবা নিজ দলে পাত্তা পাচ্ছেন না। এর বাইরে উদীয়মান কোনো কোনো রাজনৈতিক দলকে ঘিরে স্বপ্ন তৈরি হতে পারে। কিন্তু তৃতীয় শক্তি হিসেবে নিজেদের দাঁড় করানোর আগেই নানা বাস্তবতায় গুটিয়ে যান এসব দলের নেতারা। তাই প্রথম বা দ্বিতীয় শক্তির কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হয়। এভাবে নানা সংখ্যার দল হয়ে আবার গত্বাঁধা ক্ষমতার রাজনীতির পথে হাঁটতে থাকেন বড় বড় বচন বিতরণকারী নেতারা। আর এই ছকের বাইরে যারা থাকেন তারা ড. কামাল হোসেন আর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো একা হয়ে যান। মিডিয়ায় অভিমত প্রকাশ ছাড়া জাতীয় জীবনে বড় কোনো প্রভাব ফেলার সুযোগ থাকে না তাদের। ফাঁকা মাঠে এখন এরশাদ আবিষ্কার করেছেন তৃতীয় শক্তি তার দলটিই। ইদানীং স্বৈরাচার বললে তিনি দিলে ব্যথা পেলেও মানুষের মনে তার পরিশুদ্ধ ইমেজ প্রতিস্থাপিত হয়েছে-এমন বিশ্বাস করা কঠিন।

এসব কারণে আমরা দুই দলের কাছেই বাঁধা পড়ে আছি। তাই সচেতন মানুষ এখন অগত্যা দুই দলের নেতাদের মধ্যেই শুভবুদ্ধি আর দেশপ্রেম প্রত্যাশা করে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের বাড়তি সুবিধা আছে। এখন চেহারা যাই থাক দলটির মধ্যে তো ঐতিহ্যের ছাপ আছে আর কাজীর গোয়ালে আছে দলীয় আদর্শ। এ অবস্থায় বিএনপি যদি রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য তৈরি না-করতে পারে তবে এর অশুভ পরিণতি জাতিকে ভোগ করতে হবে। তাই আজকের এই লেখাটিতে বিএনপির প্রতিই বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। কারণ আমরা জাতীয় স্বার্থে দুই দলকেই সমান উজ্জ্বল দেখতে চাই।

বহুবার বলেছি-লিখেছি যে, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে নিয়ে ভাবার আছে। বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থক সবাই আত্মপ্রসাদ লাভ করেন এই ভেবে যে, একটি অন্যতম বড় দল হিসেবে দেশজুড়ে এবং প্রবাসে ছড়িয়ে আছে তাদের নেতা-কর্মী। স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় এই দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। আপাতদৃষ্টিতে এসব অঙ্ক সঠিক হলেও গতানুগতিক ফর্মুলায় এ অঙ্ক মিলবে না। কারণ কোনো দল ঐতিহ্যিক শক্তিতে দৃঢ় না-হলে অথবা জন্মের পর সঠিক দায়িত্বে এবং মানসিক সুস্থতায় ঐতিহ্য গড়ে না-তুললে এর বড় হওয়া আর বিস্তারিত হওয়া ঠুনকো হয়ে যায়। ফলে শক্তিশালী কোনো ঝড়ে আচমকা অমন দলের উপড়ে পড়া গভীর দৃষ্টিতে তাকালে বা ঐতিহাসিক বাস্তবতায় অস্বাভাবিক মনে হবে না।

বিগত নির্বাচনে বিএনপির বিপর্যয় নিবিড়ভাবেই গাঁথা একটি ধারাবাহিকতার পরিণতি। কতটা সুস্থতার ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছিল বিএনপি? পঁচাত্তরের হত্যাযজ্ঞ আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তো হঠাত্ উগ্রচণ্ডী ক’জন বিপথগামী সেনাসদস্যের খামখেয়ালিপনাতে হয়নি! একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র জন্ম দিয়েছিল পঁচাত্তরকে। পরাজিত পাকিস্তান আর তাদের দোসরদের প্রতিশোধস্পৃহা নির্বাপিত হওয়ার নয়। বাংলাদেশ যাতে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে শক্ত পায়ে না-দাঁড়াতে পারে তার জন্য পাকিস্তান, তার সহযোগী পশ্চিমা শক্তি এবং এদেশের যুদ্ধাপরাধী রাজাকার-আলবদররা সতর্ক সচেষ্ট ছিল। আর সে উদ্দেশ্য সাধন করতেই অভ্যুত্থান-পাল্টাঅভ্যুত্থানের নাটক হল। সূক্ষ্ম খেলার ফল হিসেবে শিখণ্ডী দাঁড় করানো হল একজন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানকেই। এর আগে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা আর অরাজকতায় দিশেহারা করে ফেলা হল জনগণকে। বঙ্গবন্ধু আর জেলে নিহত চার নেতাহীন আওয়ামী লীগ এই বিপর্যয় ঠেকাতে সফল হল না। সময়ের এই সুবিধা নিয়েই জিয়াউর রহমানের বিএনপি গড়া। বলা ভালো, জাতীয়তাবাদের স্লোগান নিয়ে জন্ম নিল বিএনপি। বিপন্ন সময়ে সুচিন্তিত জনপ্রিয় কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমে পড়লেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। লক্ষণীয়, জনপ্রিয়তাও পেলেন তিনি। প্রথমদিকে বিএনপিতে জড়ো হতে লাগলেন তিন ধরনের মানুষ। এক. দলে ছিল সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের একটি গ্রুপ। যারা আওয়ামী লীগ সরকারে থেকে যাবতীয় রসাস্বাদন করে অথবা আওয়ামী আমলে সুবিধা করতে না পেরে নতুন রসের সন্ধানে এখানে এসেছেন। দ্বিতীয় দলে ছিলেন তারা যারা আওয়ামী আমলে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। আর তৃতীয় গ্রুপ বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে দেশকে সুন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে এসে জড়ো হয়েছিলেন এই নতুন দলটিতে। জিয়াউর রহমান খুব কৌশলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে একটি তরুণ সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করে ফেললেন। বিএনপির প্রথম পর্বটিকে সাধারণ মানুষ অনেকটা স্বাগতই জানিয়েছিল।

এদেশের রাজনৈতিক পালাবদলে বিএনপির এখন ঘুরে দাঁড়ানো প্রয়োজন। প্রয়োজন ইতিবাচক রাজনীতির মধ্য দিয়ে দলটির পুনরুজ্জীবন। এদিক থেকে বিএনপি অনেকটা পিছিয়ে আছে। বর্তমান সরকার নানা দুর্বলতায় সমালোচিত হলেও তা থেকে বাড়তি সুবিধা ঘরে তুলতে পারছে না বিএনপি। নানা আন্দোলন শানাতে গিয়ে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কারণে বারবার হোঁচট খাচ্ছে। নীতি-নির্ধারকরা বুঝতে চাইছেন না ক্ষমতার জন্য অস্থির না-হয়ে রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করা এখন বিএনপির জন্য জরুরি।

বিএনপি নেত্রীকে ঘিরে রেখেছিলেন যেসব সুবিধাবাদী তারা দলটিকে সুস্থধারায় এগুতে দেননি। নানা অন্ধকার পথ হাতড়ে ক্ষমতাবান থাকতে চেয়েছেন। ১৯৯৬-এর নির্বাচনে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হারানোর পর বিএনপির মধ্যে অস্থিরতা ও হতাশা দেখা দিয়েছিল। ফলে পরবর্তী পাঁচ বছর কূটকৌশলে পারদর্শীরা গোপন ছক কেটেছেন। আর তার ফসল ফলেছে ২০০১-এর নির্বাচনে। ক্ষমতায় এসে বিএনপি অনেকটা বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে। এ আত্মবিশ্বাস ছিল ক্ষমতা স্থায়ী করার কৌশল আত্মস্থ করার। তাই বোধহয় ভবিষ্যতে জবাবদিহিতা করার কেউ থাকবে না বিবেচনায় দুর্নীতির এত বাড়বাড়ন্ত হল। পাত্রমিত্র অনেকে দুর্নীতির মচ্ছবে মেতে গেলেন। জনগণের হূদয়ের কথা আর চোখের ভাষা বিএনপি নেতৃত্বের পড়ে দেখার অবকাশ ছিল না। পড়তে পারলে বোঝা সহজ হতো কীভাবে দলটি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ক্রমে প্রতিবাদী হয়ে পড়ছিল সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। বিএনপি-জামায়াত জোটের বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিচ্ছিন্ন করানোর সব আয়োজন বুমেরাং হল। এসব প্রেক্ষাপটের একটি বড় প্রভাব ছিল নির্বাচনে বিএনপির মহাধস নামায়।
আমরা মনে করি নেতারা নিজেদের মধ্যে সত্ মানুষ খুঁজে না-পেলেও দেশজুড়ে বিএনপির অনেক সত্ কর্মী-সমর্থক আছেন। অতীতের সব কলঙ্ক ঝেড়ে ফেলে রাজাকার-আলবদরদের কবলমুক্ত হয়ে সত্ কর্মী-সমর্থক নিয়ে যদি সত্ মানুষের বিএনপি গড়া যায় তবে দলটি নিশ্চয়ই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। বুঝতে হবে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানোর দিন শেষ হয়ে গেছে। প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বা অসংস্কৃত শব্দে কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার স্থূল আচরণ এখন আর কাজে লাগবে না। ঘুর পথে নির্বাচনে জেতার অন্ধকার ফর্মুলা যে এখন পরিত্যক্ত, এ সত্যটি মানতে হবে। বিএনপির কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে দেশবাসী পরিবর্তিত বিএনপিকে দেখতে চায়। আচার-আচরণ, বলনে-চলনে বিএনপির নেতা-নেত্রীরা সপ্রতিভ, সত্ ও দায়িত্বশীল বলে মানুষের আস্থার জায়গায় চলে আসবেন, এটা এখন সময়ের চাওয়া।

মাত্র দেড় বছর বাকি। তাই এখন নির্বাচনের মাঠে দলকে শক্তিশালী করার সময়। কোনো হঠকারী ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কর্মসূচি বিএনপিকে এখন জনবিচ্ছিন্ন করে দেবে। বরঞ্চ সরকারের নানা দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে এনে নিজ পক্ষে জনমত গঠন করা এখন বিএনপির কর্তব্য। এভাবে সুপথে হাঁটতে পারলে নির্বাচনের মাঠে বিএনপির প্রবল প্রতিপক্ষ হওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে সিন্দাবাদের বুড়ো জামায়াতকে ঘাড় থেকে নামাতে পারলে বিএনপি হতে পারে অনেকটা নির্ভার।

এমন অবস্থার সৃষ্টি হলে আওয়ামী লীগও দাম্ভিকতার সিঁড়ি থেকে নিচে নেমে আসতে বাধ্য হবে। সম্ভাবনা বাড়বে দলীয় ঐতিহ্য থেকে নতুন করে শক্তিমান হওয়ার। তত্ত্বাবধায়ক ও অতত্ত্বাবধায়কের কূট ঝগড়ায় যেতে হবে না। মানুষের প্রতি আস্থা বাড়াতে পারলে সত্ রাজনীতি আবার জায়গা করে নিতে পারে দলটির ভেতর। এমন একটি সুদিনের অপেক্ষা করছে এদেশের মুক্তিপ্রত্যাশী মানুষ। তৃতীয় শক্তির বিকাশ যেখানে সুদূরপরাহত সেখানে অগত্যা দুই প্রধান দলের কাছ থেকে সুস্থ রাজনীতির প্রত্যাশা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই বিপন্ন মানুষের।