সৃষ্টিশীলতার বরপুত্রের রাজসিক বিদায়

Abdul.Mannan's picture

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ হুমায়ূন আহমেদ গত ১৯ জুলাই বাংলাদেশ থেকে আট হাজার মাইল দূরে নিউ ইয়র্ক শহরে নামকরা বেলভিউ হাসপাতালে ৬৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করে। ইতোমধ্যে তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশে এবং দেশের বাইরে এত লেখালেখি এবং আলোচনা হয়েছে যে তা একসঙ্গে করলে বিশাল একটি গ্রন্থ হবে। সম্ভবত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অন্য কোন লেখকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মিডিয়া এত সরগরম ছিল না। গত সেপ্টেম্বর মাসে ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য হুমায়ূন আহমেদ নিউ ইয়র্কের বিশ্বখ্যাত ক্যান্সার হাসপাতাল সেøায়ান ক্যাটারিং-এ ভর্তি হয়। এক অপরাহ্ণে নিউ ইয়র্কের জ্যাক্সন হাইট্সে অবস্থিত বাংলা বইয়ের দোকান মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী বিশ্বজিৎ সাহা আমাকে খবরটা দিল যে হুমায়ূন দু’দিন পর চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্ক আসছে। নিউ ইয়র্ক গেলে অবশ্যই দু’চারবার মুক্তধারায় যাওয়া হয়। সেবার আমার প্রকাশিত কয়েক কপি বইও বিশ্বজিৎকে দিয়ে এসেছিলাম। বিশ্বজিৎ জানাল, সে নিজে হুমায়ূনের জন্য ডাক্তারের সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছে। পারিবারিকসূত্রে জানা গেছে, সেøায়ান ক্যাটারিং হাসপাতালের চিকিৎসায় হুমায়ূন অনেকটা ভাল হয়ে উঠেছিল। পরে এক অজ্ঞাত ভাইরাসে সে আক্রান্ত হয়। তাতেই সে বেলভিউতে মারা যায়। তাও ঘটল আমেরিকার মতো একটি দেশে যেখানে বিশ্বের সেরা চিকিৎসা মেলে বলে বিশ্বাস করা হয়।

হুমায়ূন আহমেদ এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিল। জীবদ্দশায় যেমন করে হুমায়ূন তার সৃষ্টিশীল কাজের জন্য সব সময় গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে থাকত মৃত্যুর পরও সে গণমাধ্যম তো বটেই দেশের আপামর কোটি কোটি ভক্ত আর জনগণের কাছ হতে অসামান্য সম্মান পেয়েছে। হুমায়ূন একজন অসাধরণ ভাগ্যবান কালজয়ী মানুষ। মৃত্যুর পর তার দাফন নিয়ে ঘটনাগুলো যদি না ঘটত তা হলে তার আত্মা আরও দ্রুত শান্তি পেত। শেষের সমস্যাটুকুর সমাধান দেয়ার জন্য তার সন্তানরা অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। তারা অনেক বড় উদারতার পরিচয় দিয়েছে। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী প্রয়াত ব্যক্তিকে দ্রুততম সময়ে দাফন করার কথা।

কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে আমি ক’টি হুমায়ূন আহমেদের গল্প বা উপন্যাস পড়েছি, তাহলে বলতে হবে, খুব বেশি না। কিন্তু আমাদের পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম দাবি করে তারা তার প্রায় সব বই ও উপান্যাস পড়েছে এবং সেগুলোর কাহিনীও বলতে পারে। আমি বড়জোর তার কিছু টিভি নাটক আর ছায়াছবি দেখেছি, তার বাইরে কিছু নয়। গত চল্লিশ বছরে কোন অনুষ্ঠানে হয়ত দু’একবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমরা দু’জনে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। ছিলাম হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হলের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। হুমায়ূন ৫৬৪ নং কক্ষের বাসিন্দা আর আমি ৩৪০ এর। মুহসিন হল যখন চালু হয় তখন যে সকল ছাত্র এইচএসসিতে ভাল ফল করেছিল তাদের সিঙ্গেল সিট দেয়া হয়েছিল। সেই সুবাদে আমিও একটা প্রাপ্য ছিলাম। কিন্তু একটা কক্ষে একেবারে একলা থাকাটা আমার জন্য তেমন সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। সুতরাং আমি ডবল সিটে। আমার রুমমেট যশোর বোর্ডে বাণিজ্য বিভাগে প্রথম হওয়া মুহাম্মদ হোসেন। পাশের কক্ষে বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কাদের কুমিল্লা বোর্ড মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিল। দু’বছর পর আমি ৫১৫ নং কক্ষে গেলে তখন আমি আর হুমায়ূন একই ফ্লোরের বাসিন্দা, তবে দেখা হয় কদাচিৎ। হুমায়ূনও আমার মতো আর দশজন ছাত্রের মতোই অন্য আর একজন ছাত্র। তার সঙ্গে আমার তেমন কোন মিল নেই। সে বিজ্ঞানের ছাত্র। মোটা চশমা পরে। একটা বুদ্ধিজীবী ভাব আছে। আমার চাইতে পড়ালেখায় অনেক বেশি সিরিয়াস। আমি বাণিজ্যের ছাত্র। দুপুরের পর ক্লাস নেই। দু’টার মধ্যে হলে এসে ডাইনিং হলে খেয়ে লম্বা দিবানিদ্রা। এখনও দিবানিদ্রা আমার একমাত্র বিলাসিতা। আমি হলের লনে আড্ডা দিতে পছন্দ করি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার অথবা ব্রিটিশ কাউন্সিলে কাটাই। বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে বিকালে ফুটবল-ক্রিকেট খেলি। ভোরে জগিং করি। সিনেমা দেখা তখন আমার একটা বড় নেশা। হুমায়ূনের মধ্যে এসবের তেমন একটা কিছু ছিল বলে জানা যায় না। হুমায়ূনকে মাঝেমধ্যে ডাইনিং হল আর ক্যান্টিনে দেখা যেত। সে সম্ভবত বেশি সময় কাটাত বিজ্ঞান অনুষদে তার ক্লাসে আর পরীক্ষাগারে। কখনও কখনও তাকে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে দেখেছি তবে কথা হয়েছে কদাচিৎ। শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন ছিল উঠতি লেখক-সাহিত্যিকদের আড্ডাস্থল। তবে হুমায়ূনকে হলের আবাসিক ছাত্ররা চিনত একজন জাদুকর হিসেবে। কারণ সে হলের কোন কোন অনুষ্ঠানে ছাত্রদের জাদু দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিত। পরবর্তীকালে সে আর তার জাদুবিদ্যায় মনোযোগী না হলেও হয়ে উঠেছিল গল্পের জাদুকর; যে জাদুতে তার গল্প-উপন্যাসের লাখ লাখ পাঠক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেত।

১৯৬৯ আইয়ূববিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। বাংলাদেশের ইতিহাসের গতি পরিবর্তন তখন শুরু হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশের জন্মবীজ তখন দ্রুত বড় হচ্ছে। আমার জন্য বটতলার পল্টন ময়দানের সভা-সমাবেশে যোগ দেয়া তখন একটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন মিছিলে যাওয়া আর পুলিশ-ইপিয়ারের সঙ্গে রাজপথে খ-যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মধ্যে বেশ একটা থ্রিল অনুভব করতাম। পুলিশের গুলিতে কয়েকজনকে চোখের সামনে শহীদ হতে দেখেছি। শেখ মুজিব তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা মাথায় নিয়ে কারাগারে। ঢাকা সেনানিবাসে তার বিচার শুরু হয়েছে। রাজপথের মিছিলে একটাই সেøাগান ‘জেলের তালা ভাঙ্গব শেখ মুজিবকে আনব।’ হুমায়ূনকে এসব কর্মসূচীতে তেমন একটা দেখা যেত না। হুমায়ূন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে তেমন একটা সম্পৃক্ত ছিল না। সম্ভবত তার একটা কারণ মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এনএসএফ তখন ছাত্র রাজনীতিকে এক কদর্য রূপ দিয়ে ফেলেছে। এমন কোন কুকর্ম নেই তারা ক্যাম্পাসে ঘটায়নি। ১৯৬৮ সালে এনএসএফের বড়মাপের পা-া সাইদুর রহমান (পাসপাত্তর) এসএম হলে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হলে এনএসএফ ক্যাম্পাসে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। একদিন দুপুরে তারা মুহসিন হলের সব কক্ষে তল্লাশি চালায় এবং ছাত্রদের কাছ থেকে টাকাপয়সা, হাতঘড়ি কেড়ে নেয়। বইপত্র, লেপ- তোষক বাইরে এনে তাতে আগুন দেয়।

হুমায়ূনের কক্ষও তা থেকে রেহায় পায়নি। নিশ্চয় এনএসএফের এসব অছাত্রসুলভ কর্মকা- হুমাযূনকে ছাত্র রাজনীতি হতে আরও দূরে সরিয়ে নেয়। ১৯৭২ সালে হুমায়ূনের প্রথম বই ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হলে তা হুমায়ূনকে পাঠক মহলে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয়। তখন একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের একটি আস্ত বই প্রকাশিত হয়েছে তা একটি বিস্ময়কর ঘটনা বটে। অবশ্য বর্তমানে তখনকার তুলনায় অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্রের কোন গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে তেমনটা শোনা যায় না। আমাদের সময় যারা মেধাবী ছাত্র ছিল তাদের প্রথম পছন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া অথবা একজন আমলা (সিএসপি) হওয়া। হুমায়ূন পাস করে শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই পেশা তাকে ধরে রাখতে পারেনি। এই পেশায় থাকলে হুমায়ূন একজন সফল শিক্ষক ও গবেষক হতে পারত তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যখন অনেকের পক্ষে নিজ বাড়িতে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না অথবা সীমান্ত পার হওয়াও দুরূহ হয়ে উঠেছিল তখন কিছু ছাত্র এক সময় বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকাটা নিরাপদ মনে করে। হলের হাউস টিউটররা তাদের অভয় দেন এবং তাদেরও কেউ কেউ ছাত্রদের সঙ্গে হলে রাতও কাটান । জুলাই-অগাস্ট মাসে শ’খানেক ছাত্র মুহসিন হলে ওঠে। আমি অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে হলে আসি। হুমায়ূনও এ সময় হলে আসে। অগাস্টের কুড়ি তারিখ রাতে হঠাৎ করে পুলিশ আর ইপিক্যাপ (স্থানীয় অবাঙ্গালীদের সমন্বয়ে গঠিত আধাসামরিক বাহিনী) আমাদের হল রেইড করে এবং প্রত্যেকটা কক্ষ তল্লাশি চালায়। আমার কক্ষে এসে তারা প্রত্যেকটা জিনিস খুব যতœ করে সময় নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে। একজন উর্দুতে প্রশ্ন করে আমি কখন ভারত থেকে এসেছি? কোন্ কোন্ ‘মুক্তি’কে চিনি ? বলি আমি ভারতে যাইনি বা কোন ‘মুক্তি’কেও চিনি না । ভেতরে ভেতরে বেশ নার্ভাস থাকলেও উপরে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। এর সপ্তাহ দু’এক আগে ভাগ্যক্রমে পুরনো ঢাকার ওয়াইজঘাটে সেনাবাহিনীর একটা ফায়ারিং স্কোয়াড হতে বেঁচে গিয়েছিলাম। আমাদের ভরসা রেইড পার্টির সঙ্গে আসা হলের হাউস টিউটর ইতিহাস বিভাগের গিয়াসউদ্দিন স্যার। তিনি আমাকে সার্টিফিকেট দিলেন এই বলেÑ আমি একজন ভাল ছাত্র, লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি এবং খুবই শান্তিপ্রিয়। মনে হলো না তারা স্যারের কথা বিশ্বাস করল। আমার কক্ষে প্রায় ঘণ্টাখানেক অবস্থান করে তারা বিদায় নিলো ।

পরদিন গিয়াসউদ্দিন স্যার হলের পিয়ন সাত্তারকে দিয়ে আমার কাছে একটা চিরকুট পাঠালেন যাতে লেখা ছিলÑআমি যেন তার বিভাগীয় দফতরে বেলা দশটায় দেখা করি। ঠিক দশটার সময় দেখা করতে গেলে স্যার অনেকটা হুকুমের স্বরেই বললেনÑআমি যেন আর হলে না ফিরি এবং প্রথম সুযোগেই ঢাকা ত্যাগ করি। স্যারকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। এর ক’দিন পরেই আবার পুলিশ আর সেনাবাহিনী হল রেইড করল এবং হলে যে ক’জন তখনও অবস্থান করছিল তাদের সবাইকে ধরে নিয়ে গেল যার মধ্যে হুমায়ূনও ছিল। হলের অনেক কক্ষ আবার তারা তছনছ করল । আমার কক্ষটাকে একেবারে ওলটপালট করে দিয়েছিল। মনে হতে পারে তারা কিছু একটা খুঁজছিল। সম্ভবত হুমায়ূন চারদিন পর ফিরে এসেছিল। পরে শুনেছি তাদের প্রত্যেককে সেনাবাহিনী ভীষণভাবে নির্যাতন করেছে। ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর আলবদর ঘাতকরা গিয়াসউদ্দিন স্যারকে হল থেকে চোখবেঁধে তুলে নিয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বরের পর স্যারের মৃতদেহ মিরপুরের বধ্যভূমিতে আবিষ্কার করা হয় ।

প্রয়াত হুমায়ূন ছিল একজন বহুমাত্রিক সৃজনশীল ব্যক্তি; একজনমে যা হওয়া খুব সহজ নয়। একাধারে একজন জাদুকরি গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, টিভি সিরিয়াল ও সিনেমা নির্মাতা, নির্দেশক, গীতিকার এবং শেষেরদিকে এসে একজন চিত্রকর। যাতেই হুমায়ূন হাত দিয়েছে তাতেই সোনা ফলেছে। বাঙালী মধ্যবিত্তকে হুমায়ূনের মতো এত গভীরভাবে খুব কম লেখকই বুঝেছেন। তার সৃষ্টি মধ্যবিত্ত সমাজকে যেমনভাবে আকর্ষণ করেছে তা অন্য কোন লেখক সম্ভবত করতে পারেননি। তার কোন কোন লেখায় হুমায়ূন কিছু ব্যতিক্রমী চরিত্র সৃষ্টি করেছে। হলুদ পাঞ্জাবীর ভবঘুরে হিমু, যুক্তিবাদী মিসির আলী অথবা তার নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বাকের ভাই, যে কিনা একজন প্রতিনায়ক তার জন্য সকল টিভি দর্শক মাতোয়ারা হয়ে গেল। নাটক-সিনেমায় একজন প্রতিনায়কের সাজা হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। তারপরও নাটকের শেষপর্ব প্রদর্শিত হওয়ার আগে গ্রামেগঞ্জে পর্যন্ত মিছিল বের হলো ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ বলে। নাটকের কোন একটা কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে এমন অবাক করা ঘটনা এদেশে তো বটেই অন্য দেশেও বিরল। হুমায়ূনের মৃত্যুর পর পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেনÑজনপ্রিয়তার দিক থেকে হুমায়ূন শরৎচন্দ্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটি হয়ত একটু বেশি বলা। দু’জন ভিন্ন সময়ের লেখক। শরৎচন্দ্র যখন সাহিত্য চর্চা করেছেন তখন বাংলা সাহিত্যের পাঠক সংখ্যা ছিল সীমিত, কিছুটা কলকাতাকেন্দ্রিক । হুমায়ূনকে বলা যেতে পারে সত্যজিৎ রায়ের একজন মিনি বাংলাদেশী সংস্করণ। স্যার আর্থার কনেন ডয়েল শার্লক হোম্স এবং ডা. ওয়াটসনের মতো অমর চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। হুমায়ূনের হিমু বা মিসির আলী সে সব চরিত্রের মতো কালজয়ী হবে কি-না তা আগামীতে বলা যাবে। তবে হুমায়ূন যে কাজটি খুব সফলতার সঙ্গে করেছে তা হচ্ছেÑএই বাংলার পাঠকদের গল্প-উপন্যাস পাঠের জন্য কলকাতার লেখকদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়েছে। আমাদের সময়ের মতো এখনকার বাংলাদেশের উঠতি বয়সের পাঠকদের আর শুধু নীহার রঞ্জন গুপ্ত বা সমরেশ বসু পড়তে হয় না। তাদের সামনে এখন হুমায়ূন আহমেদ তো আছেই; আছে জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন বা সৈয়দ শামসুল হক। হুমায়ূনের আর একটি অনবদ্য সৃষ্টি ছিল ‘বহুব্রীহি’ নাটকের সেই ময়না পাখি যে শুধু দু’টি শব্দ উচ্চারণ করতে পারেÑ‘তুই রাজাকার’।

এমন একটি সময় হুমায়ূনের এই চরিত্রটি রাজাকার শব্দটি উচ্চারণ করেছে যখন রাজাকার শব্দটি উচ্চারণ করা অনেকটা অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল। নতুন প্রজন্ম আবার রাজাকার শব্দটির সঙ্গে জাতির এক ক্রান্তিকালে পরিচিত হলো যখন চারদিকে রাজাকার আর আলবদরদের উল্লাস নৃত্য চলছে তখন।
হুমায়ূনের মৃত্যুর পর তার ভক্ত এবং গণমাধ্যম তাকে অনেকটা অতিমানবের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। এটিও বাঙালীর এক ধরনের আবেগের বহির্প্রকাশ। অনেকের মতো হুমায়ূনেরও দুর্বল মুহূর্ত ছিল। সে রকম কোন এক দুর্বল মুহূর্তে গুলতেকিনের সঙ্গে সে তার বত্রিশ বছরের সংসারকে বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছিল। হুমায়ূনের মৃত্যুতে গুলতেকিন হয়ত নীরবে অশ্রু ফেলেছে কিন্তু প্রকাশ্যে তার কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়নি। নিজের এবং হুমায়ূনের সম্মানের প্রতি সে সজাগ দৃষ্টি রেখেছে। আর কিছু না হোক হুমায়ূন তো তার চার সন্তানের জনক। কেউ কেউ বলবেন, এটি তো হুমায়ূনের ব্যক্তিগত ব্যাপার। খ্যাতিমান মানুষদের অনেক সময় ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকে না। ভারতের চলচ্চিত্র জগতের প্রবাদপুরুষ দিলীপ কুমার তার প্রথম স্ত্রী সায়রা বানুকে না জানিয়ে ১৯৮২ সালে হায়দ্রাবাদী সুন্দরী আসমাকে বিয়ে করলে ভারতজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রতিবাদের তোড়ে দু’বছরের মাথায় দিলীপ কুমার আসমাকে তালাক দিতে বাধ্য হন।

হুমায়ূনের মৃত্যুর পর সারা দেশের মানুষ তাকে যেই সম্মানে অভিষিক্ত করেছেন তা নজিরবিহীন। হুমায়ূন তার ভক্তদের মাঝে তার কর্মদ্বারা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। তার জানাজা পড়তে গিয়ে বার বার মনে হয়েছে, ক’জনের ভাগ্যে এমন রাজসিক বিদায় জোটে? বিদায়! সতীর্থ হুমায়ূন আহমেদ।