সন্ত্রাস মোকাবেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভূমিকা কোথায়?

Abdul.Gaffar.Chowdhury's picture

দেশে জামায়াতি সন্ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। আজ (শুক্রবার) লিখতে বসেই জানলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াতি সন্ত্রাস দমনে পুলিশকে গুলি চালাতে হয়, তাতে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক মেয়ে মায়ের সঙ্গে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছিল। জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা গাড়ির টায়ারের মধ্যে ককটেল রেখে সেটা বিস্ফোরিত করার ফলে সেই তরুণী গুরুতর আহত হয়েছে, তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। আগের দিন বৃহস্পতিবার ঢাকার বাইরে একটি প্রাইমারি স্কুলে ঢুকে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীরা হরতালে যোগ না দেওয়ায় স্কুলের হেডমাস্টারসহ কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রকে বেধড়ক পিটিয়েছে।

এই সন্ত্রাস দমনে পুলিশ যথাসাধ্য করছে। কিন্তু গুপ্ত ও আকস্মিক সন্ত্রাস যত ছোট আকারেরই হোক তা একা প্রশাসন অথবা পুলিশের পক্ষে দমন করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলে গত শতকের সত্তরের দশকে লন্ডন শহরে আইরিশ (আইআরএ) সন্ত্রাস দমনে মহাশক্তিশালী ব্রিটিশ পুলিশকে বছরের পর বছর প্রাণান্ত চেষ্টা করতে হতো না; ভারতে নকশাল সন্ত্রাস দমনে সরকারকে পুলিশ ও সেনাবাহিনী নামিয়ে দশ বছরের বেশি সময় ধরে কলকাতার রাস্তাতেও 'যুদ্ধ' চালাতে হতো না।

এই চোরাগোপ্তা সন্ত্রাসে কখনও সরকারের পতন ঘটে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে অশেষ দুর্ভোগ নেমে আসে। বাংলাদেশেও এখন তাই ঘটছে। জামায়াতিরা (সঙ্গে বিএনপিও নয় কি?) '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য সারাদেশে ভীতির রাজত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। এই জিম্মিদশা থেকে জনগণকে উদ্ধারের একটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ পন্থা সরকারকে অবশ্যই উদ্ভাবন করতে হবে।

জামায়াতিরা যে আন্দোলনের (যাতে জনসমর্থন নেই) নামে জনগণ এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা এখন স্পষ্ট। কানসাটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আওয়ামী লীগের নয়, এটি রাষ্ট্রের। এই অত্যাবশ্যক রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি জামায়াতিরা ধ্বংস করেছে। যার ফলে এলাকার শত শত একর জমিতে চাষাবাদ, জল সেচন ইত্যাদির জন্য কৃষকরা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। সারাদেশ যখন বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে, তখন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কত বড় শত্রুতা, তা কি কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে? রাষ্ট্রের এই শত্রুদের কঠোরভাবে দমনের জন্য সরকার যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করুক, জনসাধারণ অবশ্যই তাতে সমর্থন জানাবে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেওয়ার দাবিটি কি দলমত নির্বিশেষে সকল সাধারণ মানুষের নয়?

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুলিশ ও জামায়াতিদের সংঘর্ষে কয়েক ব্যক্তির যে মৃত্যু হয়েছে তার কারণ, এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যারা ধ্বংস করেছে, সেই অপরাধীদের সন্ধান করা ও গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ সেখানে গিয়েছিল। জামায়াতিরা এলাকায় কিছু মানুষ জড়ো করে পুলিশকে বাধা দেয়। পুলিশকে বাধ্য হয়ে গুলি চালাতে হয়েছে। মারমুখী জামায়াতি মিছিলকে উপেক্ষা করে কিছু দুষ্কৃতি এবং কিছু সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পুলিশ সক্ষম হয়েছে। জামায়াত আবার সেখানে হরতাল ডেকেছে।

বিস্ময়ের কথা এই যে, বিএনপি ও জামায়াত হরতাল ডাকলে সংসদে তাদের ৩৭ জন সদস্য থাকা সত্ত্বেও সংসদ চত্বরে তাদের চারজন সদস্যকে মাত্র প্রতিবাদ মিছিল করতে দেখা যায়। কিন্তু রাজপথে সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে ভাড়াটে লোক সংগ্রহে তাদের অসুবিধা হয় না। এ ব্যাপারে এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে বলেছেন, দেশে এখন বেকার যুবকের সংখ্যা বিরাট হওয়ায় জামায়াতের পক্ষে দুর্বৃত্ত রিত্রুক্রট করার ব্যাপারে সমস্যা দেখা দেয় না।

এই চোরাগোপ্তা সন্ত্রাস দমন কেবল প্রশাসন ও পুলিশ দিয়ে হয় না। এ জন্য রাজনৈতিক, সাংগঠনিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতি সন্ত্রাস দমনে তাদের প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু তাদের সাংগঠনিক শক্তি কোথায়? রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও সাংগঠনিক শক্তি ছাড়া কখনও ছোট ছোট সন্ত্রাসও কেবল পুলিশ দ্বারা দমন করা যায় না। এ সম্পর্কে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি।

আমি লন্ডনে এসেছি ১৯৭৪ সালে। সে সময় পূর্ব লন্ডনে (যা এখন বাংলা টাউন নামে পরিচিত) দেখেছি, বাঙালিরা অত্যন্ত ভীতির মধ্যে বাস করে। ব্রিকলেন থেকে শুরু করে গোটা হোয়াইট চ্যাপেল এলাকাই বাঙালি অধ্যুষিত। বাঙালিদের দোকানপাট, বসবাস ও ব্যবসাকেন্দ্র সবই সেখানে। তখন লন্ডনের ইস্ট এন্ডে বর্ণবাদী ন্যাশনাল ফ্রন্ট ও বিএনপির (ব্রিটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি) প্রচণ্ড প্রতাপ। প্রতি উইক এন্ডে, বিশেষ করে রোববারে তারা লাঠিসোটা নিয়ে এলাকাটিতে বেরোত। যথেচ্ছভাবে বাঙালির দোকানপাট ভাংচুর করত। তাদের গাড়িতে আগুন দিত। বাঙালিদের মারধর করত। তাদের নারীদের সঙ্গে অভব্য আচরণ করত।

তারা সংখ্যায় থাকত চার-পাঁচজন কি বড়জোর দশজন। কিন্তু তাদের দেখলেই বাঙালিরা দলবেঁধে পালাত। খবর পেয়ে পুলিশ আসতে আসতে বর্ণবিদ্বেষী দুর্বৃত্তরা তাদের কাজ সেরে ফেলত। যেমন জামায়াতিরা এখন বাংলাদেশে যা করছে। গোটা সত্তরের দশকেই পূর্ব লন্ডনের বাঙালিদের এই সন্ত্রাস ও ভীতির মধ্যে বাস করতে হয়েছে।

অবস্থান বদলায় আশির দশকের শুরুতে। বাঙালি ও অন্যান্য এথনিক কমিউনিটির মধ্যে তখন তরুণ প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা 'সাদা সাহেব' দেখলেই ভয় পায় না। তাদের সহযোগিতায় বর্ণবাদীদের প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টি নাৎসি লীগ নামে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বর্ণবাদী দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধ করার জন্য তারা প্রতি সানডেতে হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় টহল দিতে শুরু করে। ফলে পুলিশেরও টনক নড়ে। তারাও বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। কিছুদিন পুলিশের উপস্থিতিতেই বর্ণবাদীদের সঙ্গে অ্যান্টি নাৎসি লীগের কর্মীদের প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। ব্লেয়ার পিচ নামে এক অ্যান্টি নাৎসি লীগ নেতা আন্দোলনে আত্মদানও করেন। কিন্তু বর্ণবাদী সন্ত্রাসীরা বাঙালি তরুণদের হাতে এমন পাল্টা মার খায় যে, পূর্ব লন্ডনে বর্ণবাদী সন্ত্রাসীদের তেমন উৎপাত এখন আর দেখা যায় না।

বাংলাদেশেও জামায়াতি সন্ত্রাস দমনে গণপ্রতিরোধের বিকল্প কিছু নেই। পুলিশি অ্যাকশনের সঙ্গে গণপ্রতিরোধ যুক্ত হলে বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের মূষিকি সন্ত্রাস দমন করা এমন কিছু কষ্টকর ব্যাপার নয়। কিন্তু এই জনপ্রতিরোধ গঠন এবং সন্ত্রাস মোকাবেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি আছে কি-না এ বিষয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেন। সন্ত্রাস প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগকে পাল্টা সন্ত্রাসী সাজতে হবে এমন কথা অবশ্যই আমি বলি না। শাহবাগের বিশাল জনজমায়েত কি কখনও সন্ত্রাসী ভূমিকা নিয়েছে? তারা নেয়নি। কিন্তু তাদের ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উপস্থিতিই রাষ্ট্র এবং স্বাধীনতার শত্রুদের মনে ভীতির সৃষ্টি করেছে। '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তিদানে বিচার ব্যবস্থা ও সরকারের হাত শক্তিশালী করেছে।

দেশের অনেক মানুষই এখন অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপৌরুষ ভূমিকা লক্ষ্য করছে। এই যে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিএনপি এবং জামায়াতের এত অব্যাহত সন্ত্রাস, তার বিরুদ্ধে জনগণের মনে সাহস জোগানো এবং তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আওয়ামী লীগের একজন এমপিও কি তার নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছেন?

আমাকে আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী জেনে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, গত চার বছর ধরেই দেখছি, আওয়ামী লীগের অধিকাংশ এমপি স্ব-স্ব নির্বাচনী এলাকায় যেতে আগ্রহ দেখান না, ভয় পান। তার কারণটা কী? তাদের আমলনামা কি চার বছরেই এত ভারী হয়েছে যে, তারা নিজ নিজ এলাকায় মানুষের মুখোমুখি হতে ভয় পান? বিপদের সময়েও যদি মানুষ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির দেখা না পায়, তাহলে আগামী নির্বাচনে এদের ভবিষ্যৎ কী?
জামায়াত-বিএনপির সাম্প্রতিক সন্ত্রাস এবং সাম্প্রদায়িক নির্যাতনে দিনাজপুরে হিন্দু সম্প্রদায় সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছিল। এ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের একজনও মন্ত্রী, এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্ত্রী একবারের জন্যও দিনাজপুরে যাননি। যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি। এর কারণটা কী? ক্ষমতায় থাকার চার বছরেই তারা কি জনগণকে ভয় পেতে শুরু করেছেন?

আমি বিএনপি ও জামায়াতের সম্মিলিত সন্ত্রাসকেও ভয় পাই না। জনপ্রতিরোধ জাগ্রত হলেই এই সন্ত্রাস বিলুপ্ত হতে বাধ্য। কিন্তু আমি ভীত এই ভেবে যে, এই জনপ্রতিরোধ গঠনে আওয়ামী লীগের দুর্বল সাংগঠনিক শক্তি সক্ষম কি-না? ছাত্রলীগ ও যুবলীগ, বিশেষ করে ছাত্রলীগ গত সাড়ে চার বছর ধরে যে দুর্নাম কুড়িয়েছে, তা থেকে মুক্ত হয়ে, আবার জনআস্থায় বলীয়ান হয়ে কাপুরুষ ও গণশত্রু জামায়াতিদের সন্ত্রাস দমনে ঐক্যবদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবে কি? নইলে কেবল প্রশাসনিক শক্তি দ্বারা এই সন্ত্রাস স্থায়ী ও কার্যকরভাবে দমন করা যাবে না। প্রশাসনিক শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক ইচ্ছা ও শক্তির মিলন ঘটানো প্রয়োজন।

একটা ব্যাপার লক্ষণীয়। মহাজোটের ভেতরে ও বাইরে কিছু গণতন্ত্রমনা দল আছে, যাদের একশ্রেণীর নেতা কলামিস্ট সেজে জামায়াতি সন্ত্রাস দমনে ব্যর্থতার জন্য কেবল সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। কিন্তু এই সন্ত্রাস মোকাবেলায় সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে তাদের কোনো উদ্যোগ ও সক্রিয় ভূমিকা নেই। বর্তমানে দেশে যে সন্ত্রাসের উত্থান ঘটেছে, তা কোনো রাজনৈতিক উত্থান নয়, তা রাষ্ট্রের শত্রু এবং গণশত্রুদের উত্থান। এই উত্থান দমনে রাষ্ট্রের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের বিরাট দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। কেবল সরকার একা এই কাজে সফল হতে পারে না।

দেশে যখন জামায়াতিরা তাদের সন্ত্রাস অব্যাহত রেখেছে এবং তাদের দোসর হয়ে জুটেছে বিএনপি, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীদের দমনে তার সংগঠনকে শক্তিশালী করার ব্যবস্থা কেন নিচ্ছেন না এবং দলমত নির্বিশেষে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের এক মহাসম্মেলন ডেকে সন্ত্রাস দমনে তাদের ঐক্যবদ্ধ সক্রিয় সহযোগিতা চাচ্ছেন না_ তা আমি বুঝছি না। এটা একলা চলার সময় নয়। '৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন, 'যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো'; ২০১৩ সালেও বঙ্গবন্ধুকন্যাকে সেই ডাক দিতে হবে। এটা '৭১ সালের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধেরই সমাপ্তির যুদ্ধ। এই সত্যটা তিনি যেন বিস্মৃত না হন।

1Comments

1
mohammed anu
mohammed anu's picture
Sat, 30/03/2013 - 11:55pm

কলামে আমি আপনাকে গুরু ভাবি।বরাবরের মত আজও ভাল লিখেছেন।ধন্যবাদ পোষ্টের জন্য।