পৌর ভোটাররা সরকারকে সংশোধনের সংকেত দিলেন

Ataus.Samad's picture

পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল যে আওয়ামী লীগ সরকারকে তার কাজ ও নীতি শোধরানোর জন্য স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা গ্রহণ করবেন। কিছু ভালো কাজ করার এবং সরকারকে অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে কিছুটা মুক্ত করার জন্য তার হাতে আরও তিন বছর সময় আছে। এই সুযোগ যদি তিনি গ্রহণ না করেন তাহলে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে আরও কঠিন প্রতিবাদ জানানোর পথ খুঁজে নিতে পারেন। এইমাত্র দেশজুড়ে যে পৌরসভা নির্বাচন হয়ে গেল, বাংলাদেশের মানুষ তাতে খুব জরুরি আর দামি একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। তা হলো, তারা দেশে বহুদলীয় ও বহুমতের গণতন্ত্র প্রচলিত রাখতে চান। বরং বাংলাদেশের জনগণ আবারও বুঝিয়ে দিয়েছে, ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অথবা তার মহাজোট যত বেশি আসনই পেয়ে থাকুক না কেন, তা মোটেও একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য কোনো একটা রায় ছিল না।

সদ্যসমাপ্ত পৌর নির্বাচনের ফলাফল থেকে এও বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের জনগণ আপাতত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি_ এই দুটো দলকে পছন্দ করছে। তৃতীয় কোনো দল এদের বিকল্প হিসেবে দেখা দিতে পারেনি। সেদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সঙ্গী সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাশাসক লে. জে. (অব.) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার 'বিএনপি'র সাথী জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্ব কমই।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পৌরসভা ও অন্য সব 'স্থানীয় সরকার' প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হয় নির্দলীয়ভাবে। অর্থাৎ এসবের জন্য ভোটের সময় কোনো প্রার্থী কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক বা মার্কা ব্যবহার করতে পারেন না; না পারে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রার্থী দাঁড় করাতে। কিন্তু ঘটনাটি ওই পর্যন্তই নির্দলীয়। অর্থাৎ নামকাওয়াস্তে। কাজের বেলায় প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয়টাই আসল। ভোটাররাই সেভাবে বারবার তাদের সমর্থন দিয়ে এসেছেন, তার জন্যই সরকারি বা নির্বাচন কমিশনের ভাষায় স্থানীয় সরকারগুলো অরাজনৈতিক হলেও আসলে মেয়র ও চেয়ারম্যানের পদে প্রার্থীরা তো বটেই, এমনকি কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা হয় রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা বেসরকারিভাবে মনোনীত হন অথবা তাদের সমর্থন চান। সে জন্যই পৌরসভা নির্বাচনে আমরা দেশজুড়েই দেখা পাচ্ছি একেবারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া 'রাজনৈতিক দল সমর্থিত' প্রার্থীদের। পৌরসভার মেয়র হিসেবে সেই পরিচয়ে পরিচিত প্রার্থীদের মধ্যে এবার নির্বাচিতদের বিএনপির সফল প্রার্থী অন্যদের চেয়ে বেশি। তবে আওয়ামী লীগ সামান্য পিছিয়ে। নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে যারা দলের পছন্দের বা সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে জিতেছেন, মানে যাদের 'বিদ্রোহী প্রার্থী' বলা হচ্ছে, তারা সবাই যদি নিজ নিজ দলে ফেরত যান তবে আওয়ামী লীগ সামান্য এগিয়ে যাবে।

এবার তিন পর্বে মোট ২৪২টি পৌরসভার নির্বাচন হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশে একটি স্থগিত রয়েছে। নির্বাচনী হাঙ্গামার দরুন ফল প্রকাশ করা হয়নি সাতটির। যে ২৩৫টি পৌরসভার ফল বেসরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছে তার মধ্যে বিরোধী দল বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ৯৭টি পৌরসভায়, আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা জিতেছেন ৮৮ পৌরসভায়। বিদ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছেন ২৯টিতে, স্বতন্ত্র অর্থাৎ কোনো দলের নন, এমন মেয়র প্রার্থী জিতেছেন ১৫ পৌরসভায়। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনপ্রাপ্ত মেয়রের পদপ্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন পাঁচটিতে, আওয়ামী লীগের মহাজোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক জাতীয় পার্টির মাত্র একজন জিতেছেন। আর বিএনপির সাবেক নেতা ও মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নতুন দল এলডিপি পেয়েছে একটি মেয়র পদ। জোটগতভাবে দেখলে বিরোধী চারদলীয় জোটের দ্বারা সমর্থিত প্রার্থীরা এ পর্যন্ত মেয়র পদ পেয়েছেন ১০২টি পৌরসভায় আর সরকারে ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রার্থীরা জিতেছেন ৮৯টি আসন। বিদ্রোহী জয়ী প্রার্থীদের দলে ফেরত নেওয়া হলে চারদলীয় জোটের হবে ১১০ জন এবং মহাজোটের ১০৮ জন। স্থগিত ভোটগ্রহণ শেষ হলে ফলাফল কিছুটা পাল্টে যাবে। এবারের পৌরসভার নির্বাচনের প্রধান এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে শুরুতে যা বলেছি তার সঙ্গে যোগ করতে হয়, বাংলাদেশের ভোটাররা সমর্থন দেওয়ার বেলায় সাধারণভাবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রতি ভাগ হয়ে গেলেও তাদের মধ্যে বিশাল সংখ্যায় আছেন তারা, যাদের বলা যায় 'মুক্ত' ভোটার। অর্থাৎ মনের দিক থেকে তারা কোনো একটি দলের প্রতি পাকাপাকি বা স্থায়ী বা বংশগতভাবে অনুগত নন। ভোট দেওয়ার মুহূর্তে যে দলকে বা যে দলের প্রার্থীকে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন, তারা তাকেই ভোট দেন।

সেদিক থেকে রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করলে আমরা অবশ্যই বলতে পারি, জনগণ পৌরসভা নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে সরকারে আসীন আওয়ামী লীগকে জানিয়ে দিয়েছেন, দলটি ও সরকারের কাজকর্মে তারা খুশি নন। আমরা মনে করি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনের বেশি পেয়ে আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোট যেভাবে দেশ দখলকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তার শান্তিপূর্ণ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী প্রত্যুত্তর দিয়ে দিয়েছেন পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ভোটাররা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভ করার পর থেকে মহাজোটের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা কালবিলম্ব না করে শুরু করেন দলীয়করণ তথা সরকারি অফিস, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্রাবাস, সরকারি সেবাদান প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলার মাঠ এবং চাঁদার ঘাট গায়ের জোরে দখল করা। তারা শুরু করেন ভিন্ন মতাবলম্বী, মূলত বিএনপির নেতা ও কর্মী এবং সমর্থকদের শারীরিকভাবে নির্যাতন, পুলিশ ও আদালতে মামলা ঠুকে নিপীড়ন ও জীবিকাহরণ করে আর্থিক ও মানসিকভাবে অত্যাচার করতে। এসব কাজে ছুরি, চাপাতি, রামদা, শাবল, লাঠি ও গুলি যেমন ব্যবহার করেছে তারা, তেমনি কাজে লাগিয়েছে নির্বাহী ক্ষমতা। এসবের ফলে বহু প্রাণহানি হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বিএনপির নেতাদের তো বটেই, প্রকৃতপক্ষে সব বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরই চরিত্র হনন করে কথা বলেছেন অবিরাম। তারা জাতীয় সংসদে এই অপকর্মটি করতে গিয়ে সেখানে জাতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য সময় দেননি, বরং জাতীয় উচ্চতম প্রতিষ্ঠানটিকে অকার্যকর করেছেন, বাধ্য করেছেন বিরোধী দলকে সংসদ বর্জন করতে এবং গণতন্ত্র বিপন্ন করেছেন।

মাঝে মধ্যে আশঙ্কা জন্মেছে, দেশের অপর বড় দল বিএনপির অস্তিত্ব থাকবে কি-না। আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কথা তো এখন সরকারও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। সরকার ও তদীয় দলের সমালোচনা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য গণমাধ্যমের ওপর চাপ বাড়িয়েছে সরকার। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধও করে রেখেছেন তারা। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল যে আওয়ামী লীগ সরকারকে তার কাজ ও নীতি শোধরানোর জন্য স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা গ্রহণ করবেন। কিছু ভালো কাজ করার এবং সরকারকে অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে কিছুটা মুক্ত করার জন্য তার হাতে আরও তিন বছর সময় আছে। এই সুযোগ যদি তিনি গ্রহণ না করেন তাহলে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে আরও কঠিন প্রতিবাদ জানানোর পথ খুঁজে নিতে পারেন। আমাদের এসব মন্তব্যের সমালোচনা করে কেউ বলতে পারেন, আমরা নিছকই বদ অভ্যাসবশত স্থানীয় নির্বাচনের 'উইয়ের ঢিবিকে পর্বতপ্রমাণ' করে দেখানোর চেষ্টা করছি। আন্তরিকভাবেই বলছি, না, তা নয়। দেশে দেশে একটা সরকারের মধ্য মেয়াদে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অথবা উপ-নির্বাচনকে সরকারের নীতি ও কাজের প্রতি জনমত যাচাই করার উপায় হিসেবে নেওয়া হয়। বাংলাদেশে সে রকমই জনমত প্রকাশিত হয়েছে। আমরা কেবল তা মেনে নিতে অনুরোধ করছি সরকারকে। এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, সরকারের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী জাতীয় পার্টির নেতাদের এলাকায় দল দুটির সমর্থিত প্রার্থীরা হেরে গেছেন। রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী পৌরসভার অনেক ক'টিতেও হেরেছেন তারা। তাই ক্ষমতাসীনদের প্রতি জনগণের সংকেত বেশ স্পষ্ট।

অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপির সন্তুষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু চিন্তাভাবনা করারও আছে। তাদের খুশি হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দুটো। প্রথমত, বিএনপি জানল, তৃণমূল পর্যায়ে তাদের সংগঠন কার্যকর আছে। দ্বিতীয়ত, দলের উচ্চ পর্যায় থেকে যে ঘোষণা করা হয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছে, সেই সিদ্ধান্ত তাদের সুফল দিয়েছে। বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক কাজকর্ম করার মতো ক্ষেত্র তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাবেন। এ প্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, বিএনপির উচিত হবে জাতীয় সংসদে যোগ দেওয়া। সেখানে তারা বলবেন, দেশের এই সমস্যাসংকুল সময়ে জাতীয়ভাবে কী করণীয়। দ্বিতীয়ত, সেখানে থেকে তাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেসব পৌরসভায় বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের যেন সরকার কাজ করতে দেয়। তাদের কর্তব্য পালনে সরকার যেন অসহযোগিতা না করে বা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

সবশেষে সরকারকে অনুরোধ করব পৌরসভা নির্বাচনের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গণতন্ত্রচর্চায় সহযোগিতা করতে এবং সেই আলোকে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় আটক অন্য সব বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে মুক্তি দিতে। একই সঙ্গে আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা সংক্রান্ত সরকারি মামলা প্রত্যাহার করে নিতে এবং বন্ধ টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে খুলে দিতেও সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।