প্রসঙ্গঃ বাংলা এবং বাঙ্গালির চিরন্তন সংস্কৃতি ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আমাদের সংবিধান

দ্বিজাতিতত্ত্বের ধোঁয়াটে ফানুসে উপমহাদেশ ১৯৪৭ সালে ভারত এবং পাকিস্তান নামক ২টি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্ম হয় । দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ব্যক্তিগত জীবনে ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে প্রভাবিত একজন সেক্যুলার মুসলিম ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সেক্যুলার হওয়ার পরও দ্বিজাতিতত্ত্বের মত একটি ধর্মভিত্তিক পন্থা উপমহাদেশের জন্য দিয়ে গিয়েছিলেন। এর পেছনে কারণ ছিলো, মুসলমান গোষ্ঠীর পশ্চাৎপদসরিত করুণ অবস্থা যার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী ছিলো।  ব্রিটিশ আমলে তারা ব্রিটিশদের সকল প্রকার সাহায্য করা থেকে বিরত থাকে এবং ইংরেজি শিক্ষাকে উপেক্ষা করে। পক্ষান্তরে হিন্দু জনগোষ্ঠী ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ব্রিটিশদের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে এবং ব্রিটিশদের মনোভাজন হয়। ফলে সমাজে এবং চাকুরীক্ষেত্রে তারা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা অর্জন করতে গেলে যে গোঁয়ার হয়ে থাকা চলবে না এটি তারা অনুধাবন করতে পারলেও মুসলমান জনগোষ্ঠী তা পারেনি এবং নিজেদের গোঁয়ার্তুমির কারণে তারা সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে ।তাদের সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি সাধনের নিমিত্তে জিন্নাহ সাহেব নিজে সেক্যুলার হওয়া সত্ত্বেও দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ভারত বিভাজনের দাবী উত্থাপন করেন । এতে মুসলমানদের সামগ্রিক অবস্থার কিছু উন্নয়ন ঘটে কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি চরমভাবে বিনষ্ট হয়। পুরো উপমহাদেশে ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে,ধর্মভিন্নতার কারণে মানুষ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে, লুটতরাজ করে, বাড়িঘর জমিজমা বসতভিটা সকল কিছু দখল করে নেয়,রক্তগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয় গোটা উপমহাদেশকে ।সেই দ্বিজাতিতত্ত্বের মত ধর্মীয় তথা সাম্প্রদায়িক পদ্ধতিকে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জনসাধারণ সমর্থন জানিয়েছিলো,ভারতের জনগণের মধ্যে ছিলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া,অনেক নামকরা মুসলিম ব্যক্তিত্ব দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করেছিলেন। 

 

ভিডিওসূত্রঃ মৌলানা আবুল কালাম আজাদ দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ভাষণ দিচ্ছেন

 

ভারতের সর্বোচ্চ উপাধি ভারতরত্ন প্রাপ্ত ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী বিখ্যাত কংগ্রেসনেতা মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন একজন ধার্মিক মৌলানা মুসলমান,তিনি চেয়েছিলেন সাম্প্রদায়িকতার উন্মত্ত আবেগে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গে টুকরো টুকরো না হোক,তিনি মনেপ্রাণে সেক্যুলার ছিলেন, তিনি বুঝেছিলেন, সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় থাকলে উপমহাদেশের প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে এবং বিশ্বের মানচিত্রে ভারতবর্ষ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে সম্মানের সঙ্গে অবস্থান করবে যেখানে হিন্দু মুসলিম জাতিবিদ্বেষ ভেদাভেদ থাকবেনা এবং উপমহাদেশের জনগণ ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ঊর্ধ্বে উঠে প্রজাতন্ত্রের জন্য কাজ করতে পারবে । ধর্মনিরপেক্ষতার মন্ত্রে দীক্ষিত মৌলানা আজাদ অখন্ড ভারতের যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলেছিলেন -

 

I am proud of being an Indian. I am part of the indivisible unity that is Indian nationality. I am indispensable to this noble edifice and without me this splendid structure is incomplete. I am an essential element, which has gone to build India. I can never surrender this claim.

 

হাসরাত মোহানী,আল্লামা মাশরীকি,আসাফ আলি,হাকীম আজমল খান,ডঃ মুখতার আহমেদ আনসারী,আব্দুল কাইউম আনসারী,ডঃ সাইফুদ্দিন কিসলু,আব্দুল মোতালিব মজুমদার,আব্দুল মজিদ খাজা,একে ফজলুল হক,খান আব্দুল ওয়ালী খান,খান,হুমায়ূন কবির,আব্দুল গাফফার খান এবং জি এম সাইয়্যেদের মত নামকরা মুসলিম নেতারা সেক্যুলার চিন্তক ছিলেন এবং উপমহাদেশ বিভক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন ।তারা মুসলমান ছিলেন,অনেকেই ছিলেন নামকরা ইসলামিক চিন্তাবিদ, তারা নাস্তিক/অজ্ঞেয়বাদী/ধর্মহীন ছিলেন না, তাদের মত ইসলামিক চিন্তাবিদেরা যদি সেক্যুলারিজমের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন, তাহলে আমাদের দেশের সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠী কেন পারবে না ?  

 

লিংকঃ http://forum.urduworld.com/f101/quaid-e-azam-islam-pakistan-329785/

 তবে উল্লেখ্য, সরোজিনী নাইডু অভিহিত আম্ব্যাসেডর অব হিন্দু মুসলিম ইউনিটি খ্যাত ধর্মনিরপেক্ষ মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ জীবনের শেষদিকে তার ভুলটি বুঝতে পেরেছিলেন, ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানের প্রতি ক্রমশঃ তিনি বিতৃষ্ণ বা মোহমুক্ত হয়ে পড়ছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ অভিন্ন ভারতবর্ষই ছিল বিচক্ষণপন্থা ।

 

সূত্রঃ

 

It is said that when the then Viceroy of India, Lord Louis Mountbatten, learned of Jinnah's ailment he said 'had they known that Jinnah was about to die, they'd have postponed India's independence by a few months as he was being inflexible on Pakistan'.(Collins, L; Lapierra, D, 1975, Freedom at Midnight, Preface p. xvii)

 

আসুন এই সুযোগে শুনে নেই প্রখ্যাত গজলশিল্পী জগজিৎ সিংয়ের সেই বিখ্যাত গানটি

 

ম্যায় না হিন্দু না মুসলমান, মুঝে জিনে দো দোস্তি হ্যায় মেরা ঈমান, মুঝে জিনে দো

 

 

ভিডিওর শেষে দেখুন হিন্দু মুসলিমের এই সম্প্রীতিই কি আমাদের কাম্য নয় ? অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষতাই পারে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টানকে একই সূত্রে বাঁধতে ।

 

যাই হোক, সেক্যুলারিজম নিয়ে উইকিপিডিয়ার বিশ্লেষণটি দেখা যাক -

 

 

Secularism is the belief that government or other entities should exist separately from religion and/or religious beliefs.In one sense, secularism may assert the right to be free from religious rule and teachings, and the right to freedom from governmental imposition of religion upon the people within a state that is neutral on matters of belief. (See also Separation of church and state and Laïcité.) In another sense, it refers to the view that human activities and decisions, especially political ones, should be unbiased by religious influence.

 

সূত্রঃ Kosmin, Barry A. "Contemporary Secularity and Secularism." Secularism & Secularity: Contemporary International Perspectives. Ed. Barry A. Kosmin and Ariela Keysar. Hartford, CT: Institute for the Study of Secularism in Society and Culture (ISSSC), 2007.

 

অর্থাৎ, সরকার এবং তৎসংশ্লিষ্ট সস্থাগুলো ধর্মভিত্তিক বা ধর্মীয় বিশ্বাস আচারাদি দ্বারা পরিচালিত হবেনা। এক সেন্সে, এটি ধর্মীয় আইনকানুন এবং শিক্ষা থেকে নিজেকে মুক্ত করা, আবার অন্য সেন্সে, এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্টতা বা বৈষম্য যাতে না ঘটে সেটি নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে প্রবর্তিত একটি মতবাদ ।

 

 

এখানেই বিতর্কের সূত্রপাত, কেননা এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনেকেই সেক্যুলারিজমকে প্রথমে উল্লেখিত ব্যাখ্যা হিসেবে ধরে নেয় । আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে -সেক্যুলারিজম শব্দের এহেন দ্ব্যর্থকতার কারণে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা দুটি শব্দই সংবিধান থেকে নিশ্চিতভাবে বাদ দেওয়া উচিত এবং সেক্যুলারিজমের স্থলে সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা উল্লেখ করে সংবিধান সংশোধন করা উচিত । এ প্রসঙ্গে জর্জ হোলিয়ক তার ইংলিশ সেক্যুলারিজম গ্রন্থে সেক্যুলারিজম মূলত কাদের জন্য প্রযোজ্য এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন -

 

Secularism is a code of duty pertaining to this life, founded on considerations purely human, and intended mainly for those who find theology indefinite or inadequate, unreliable or unbelievable. Its essential principles are three: (1) The improvement of this life by material means. (2) That science is the available Providence of man. (3) That it is good to do good. Whether there be other good or not, the good of the present life is good, and it is good to seek that good.

 

সূত্রঃ

 

Holyoake, George J. (1896). English Secularism. Chicago: The Open Court Publishing Company.

 

অর্থাৎ যারা ধর্মকে অনির্দিষ্ট, অপর্যাপ্ত, অনির্ভরযোগ্য এবং অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন, মূলত তাদের জন্যই সেক্যুলারিজম প্রযোজ্য । তবে এটাও বলেছেন

 

Holyoake held that secularism and secular ethics should take no interest at all in religious questions (as they were irrelevant), and was thus to be distinguished from strong freethought and atheism.

 

সূত্রঃ http://en.wikipedia.org/wiki/Secularism

 

সেক্যুলারিজম এবং সেক্যুলার এথিকের যে কোন ধর্মসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবস্থান নেওয়া উচিত নয় এবং তাই মুক্তচিন্তা এবং নাস্তিক্য থেকেও এটি পৃথক থাকা দরকার । আবার চার্লস ব্র্যাডলহ, পিটার সিঙ্গার প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ একে পুরোদস্তুর নন-রিলিজিয়াস মতাদর্শ বলে উল্লেখ করেছেন । অর্থাৎ এখানেও আবার সেই দ্ব্যর্থকতা ।

 

তাই সংবিধানে শুধু সেক্যুলারিজম শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করাটা সঠিক হবেনা , বরং মতদ্বৈততা এবং বিভ্রান্তি বেড়েই চলবে। স্টেট সেক্যুলারিজম শব্দটি বিভ্রান্তি এবং মতপার্থক্য নিরসনের একটি তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে। সেক্যুলার স্টেট বলতে বোঝায়

 

A secular state is a concept of secularism, whereby a state or country purports to be officially neutral in matters of religion, supporting neither religion nor irreligion

 

 

সূত্রঃ

) Madeley, John T. S. and Zsolt Enyedi, Church and state in contemporary Europe: the chimera of neutrality, p. , 2003 Routledge

) http://en.wikipedia.org/wiki/Secular_state

 

অর্থাৎ সেক্যুলার স্টেট সেক্যুলারিজমেরই একটি শাখা বা মতবাদ যেখানে শুধুমাত্র স্টেট বা রাষ্ট্র ধর্মের যাবতীয় বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকবে (ব্যক্তিগত বিষয়ে নয়, কেননা রাষ্ট্রের কাজ রাষ্ট্র সংক্রান্ত, ধর্মে ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস নিয়ে নয় ), অর্থাৎ ধর্মের সপক্ষেও যাবেনা কিংবা বিপক্ষেও যাবেনা, ধর্ম নয় বরং মানবিকতা এবং জনগণের যোগ্যতা অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের অবস্থান নির্ধারিত হবে । উইকিপিডিয়াতে দেখি

 

A secular state also claims to treat all its citizens equally regardless of religion, and claims to avoid preferential treatment for a citizen from a particular religion/nonreligion over other religions/nonreligion.

 

অর্থাৎ, সেক্যুলার স্টেটে রাষ্ট্রের সকল জনগণকে সমানভাবে গণ্য করা হবে, নির্দিষ্ট ধর্মের জনগণের প্রতি পক্ষপাতদুষ্টতা থাকবেনা । এই যে - নির্দিষ্ট ধর্মের জনগণের প্রতি পক্ষপাতদুষ্টতা বা অধিকতর সুযোগসুবিধা প্রদান কিংবা অন্য ধর্মের প্রতি বৈষম্যকরণ এবং সংখ্যালঘু শব্দটি, এগুলো রাষ্ট্র সমাজ এবং জনগণের জন্য ক্ষতিকারক, এবং ধর্মীয় রাষ্ট্রে এই বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে ঘটে বলেই স্টেট সেক্যুলারিজম মতবাদের উৎপত্তি ।

 

ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝানো হয় কিছু নির্দিষ্ট প্রথা বা প্রতিষ্ঠানকে ধর্ম বা ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে থেকে পরিচালনা করা। এক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় স্বাধীনতাকে প্রকাশ করে। এই মতবাদ অনুযায়ী,সরকার কোনরূপ ধর্মীয় হস্তক্ষেপ করবে না,কোন ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হবে না এবং কোন ধর্মে কোন প্রকার অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করা হবে না। ধর্মনরপেক্ষতা সেই বিশ্বাসকে ধারণ করে যাতে বলা হয় মানুষের কর্মকাণ্ড এবং সিদ্ধাণ্তগুলো, বিশেষত রাজনীতিক সিদ্ধান্তগুলো, তথ্য এবং প্রমাণ এর নির্ভর করবে,কোন ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর নয়। অর্থাৎ বলা যায় - ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। রাজনৈতিক ব্যবহারের দিক থেকে বলা হয়, ধর্মনিরপেক্ষতা হল ধর্ম এবং রাষ্ট্রকে পৃথক করার আন্দোলন,যাতে ধর্মভিত্তিক আইনের বদলে সাধারণ আইন জারি এবং সকল প্রকার ধর্মীয় ভেদাভেদ মুক্ত সমাজ গড়ার আহবান জানানো হয়। উপমহাদেশে সেক্যুলারিজম শব্দটির মূল অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়না। যেখানে অন্যান্য দেশে সেক্যুলারিজম বলতে ধর্ম এবং রাষ্ট্র পৃথক থাকবে বোঝানো হয়, সেখানে উপমহাদেশে এটি সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় । আমি এই লেখায়  সেক্যুলারিজম বলতে ২য়টিকেই বোঝাবো, যেহেতু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ২য়টিই অধিকতর প্রাসঙ্গিক বা  যুক্তিযুক্ত ।

 

ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র যে ব্যর্থ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাকিস্তান। পাকিস্তান একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র, সেখানে আজ পর্যন্ত কোন হিন্দু বা খ্রিষ্টান দেশের সর্বোচ্চ পদগুলোতে অধিষ্ঠিত হতে পারেনি, তাদের কেউই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেনি, সেদেশে জঙ্গিবাদ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে এবং এই জঙ্গিবাদের কারণে প্রতিদিন অকাতরে যে মানুষগুলো মরছে, তারা কিন্তু মুসলিমই । সেক্যুলারিজম নেই বলেই সমাজ ও রাষ্ট্রে সাম্যহীনতা, বৈষম্য, অরাজকতা, পক্ষপাতদুষ্টতা, জঙ্গিবাদের উত্থান, মানবাধিকারের ভূলুণ্ঠিত অবস্থা । সেখানে আজও খ্রিষ্টান ধর্মাবলবম্বীদের আগুনে পোড়ানো হয়, সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রীদের সংস্কারমূলক কাজের পরিণাম হয় তাদের জীবননাশ, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সন্তান হরহামেশা কিডন্যাপ করা হয়, রিপোর্ট হয়না, হলেও লাভ হয়না । সেক্যুলারিজম থাকলে ধর্মের নামে এই অরাজকতাগুলো হতে পারতো না । সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ৪% ভিন্ন ধর্মবলম্বী জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত হতো, দেশের ৯৬% জনগণের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা এবং সম্প্রীতিবোধের সৃষ্টি হতো, তখন হিন্দু মুসলিম উভয়ে মিলে দেশের জন্য সমান মমত্ববোধ নিয়ে কাজ করতো । কিন্তু সেক্যুলারিজম নেই বলে আজ সেখানে মুসলমানদের চরম আধিপত্য এবং স্বেচ্ছাচার, হিন্দুদের কৌশলী এবং দেশপ্রেমহীন ভারতপন্থী মনোভাব, জঙ্গিবাদের আগ্রাসন, রাষ্ট্রে অন্যায় ও দুর্নীতির চরম উত্থান । তাহলে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বানিয়ে পাকিস্তানের কি আদৌ কোন  লাভ হলো ? 

 

গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশও ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর একটি, পাকিস্তানের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়ে বাংলাদেশও সেই পাকিস্তানেই পরিণত হয়েছে, দুর্নীতিতে ২০০১-২০০৯ পর্যন্ত পাকিস্তানের চেয়েও উৎকর্ষ লাভ করে বাংলাদেশ, যার কারণে পরপর ৫ বছর দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, জঙ্গি বিষয়ে ভৌগলিক অবস্থানের কারণে পাকিস্তান থেকে তুলনামূলক কম উৎকর্ষ (!) লাভ করলেও বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলো, বাংলা ভাই, শায়খ আব্দুর রহমান, ইলিয়াস কাশ্মিরী, মুফতী হান্নান, সাহেব আলি, রফিকুল ইসলাম, একরামুল হক ইত্যাদি ইসলামিক জঙ্গিবাদীরা বিএনপি-জামাত শাসনামলে দেশে দোর্দণ্ড প্রতাপ চালিয়েছে। নিরীহ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, একদিনে ৫০১ টি বোম্বব্লাস্ট করেছে, শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা করেছে, আইভী রহমান সেই গ্রেনেড হামলায় নিহত হন। বাংলাদেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমান ধর্মে বিশ্বাসহীন ছিলেন বলে তার ওপর আক্রমণ করা হয়েছে, বাংলার সক্রেটিস বলে খ্যাত বহুমাত্রিক লেখক ডঃ হুমায়ুন আজাদ তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন । আক্রান্ত হয়েছেন আরো অনেকেই, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হলে এই জঙ্গিবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যা রাষ্ট্রের প্রভূত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় । আফগান যুদ্ধের সময় থেকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং পাক গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই মিলে তালেবানের মত জঙ্গিবাদী দলের সৃষ্টি করেছিলো, ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হওয়ার পর থেকেই এই দুইয়ের প্রভাবে এদেশে জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল এবং উত্তরোত্তর জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

 

২০০১ সালের ১-২ কোটি ভুয়া ভোটার সম্পন্ন নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোটের অবিশ্বাস্য বিজয়ের পরে তাদের নেতাকর্মীরা এথনিক ক্লিনজিং করতে সচেষ্ট হন, সংখ্যালঘুরা একসময়কার ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী আওয়ামীলীগকে  ভোট দেয় বলে তাদের পরিবারের নারীদের প্রতি চলে বিএনপি-জামাত জোটের উন্মত্ত পাশবিকতা, অজস্র হিন্দু নারীকে ধর্ষণ করা হয়, অজস্র নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় বা নীরবে চুপ করে থাকে আর আমরা শহরের বাসিন্দারা শহরে বসে আরামে ভাবলেশহীনভাবে দিনাতিপাত করে যাই । হিন্দু নারীদের প্রতি এই গণধর্ষণ মনে করিয়ে দেয় ১৯৭১ সালের পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পাশবিক যৌনউন্মত্ততার কথা । তাহলে, বিএনপি-জামাত নেতাকর্মী এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মধ্যে পার্থক্য থাকলো কি ? ১৯৭১ সালে ধর্ষিতা নারীদের আমরা সম্মানের সঙ্গে বীরাঙ্গনা বলে অভিহিত করি । এই হিন্দু নারীগণও কি বীরাঙ্গনা নয় ? যুদ্ধাপরাধী এবং নারীর প্রতি সহিংসতার জন্য পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিচার হলে বিএনপি জামাতের এই নেতাকর্মীদের বিচার হবেনা কেন ? অথচ ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে মানবতার প্রতি এই চরম অন্যায়কর্মটি সম্পন্ন হতে পারতো কি ?

 

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক নামকরা ব্যক্তিবর্গ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রভূত অবদান রেখেছেন, দেশের জন্য কাজ করেছেন, ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ । জি সি দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, আনন্দ পায়ান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, শিবসদন চক্রবর্তী, এস কে লাল, হেমচন্দ্র বসাক, হাসিময় হাজরা, নরেন ঘোষ, এস কে সেন, অমূল্য কুমার চক্রবর্তী, আর সি দাস, মিহির কুমার সেন, অনীল কুমার সিনহা, সুনীল চন্দ্র শর্মা, কাজল ভদ্র, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, ইন্দু সাহা, দানবীর রনদ প্রসাদ সাহা, যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ বুদ্ধিজীবী ১৯৭১ সালে নিহত হয়েছিলেন ।

 

সূত্রঃ Bangladesh: A souvenir on the 1st anniversary of victory day december 16, 1972 Page – 88-89)

 

হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর নৃশংসতায় সাফ হয়ে যায় । ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেই জনগোষ্ঠীর এত বিশাল অবদান,তাদের বঞ্চিত করে কেন আজকে দেশের সংবিধান রচনা করা হবে ?

 

 

 

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আছে বলেই আজকে অনেকে ব্লাসফেমী আইনের কথা বলতে পারছে, নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদীদের হুমকি দেওয়া কিংবা আক্রমণ করার মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং অমান্য করার  ধৃষ্টতা দেখাতে পারছে । রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আছে বলেই অন্যান্য ধর্মের জনগণকে আলাদা করে দেখার একটা সুযোগ তৈরী হয়েছে । তাদেরকে সংখ্যালঘু বলার মওকা পাওয়া গেছে, তাদেরকে পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে অনেকটা জিম্মি করে রাখার সুযোগ পাওয়া গেছে, অর্থাৎ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম দিয়ে বাংলাদেশের সংহতি এবং ঐক্যকে বিনষ্ট করার সকল ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু,নামাজী এবং রোজা রাখেন ;ধর্ম পালন করেন তাতে কোন আপত্তি আগেও ছিলোনা,এখনো নেই ।যখন সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিলো,তখনও এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী মুসলিম পরিচয়ে পরিচিত ছিল এবং তারা ধর্মীয় সবকিছুই ঠিকমত পালন করেছে । সে সময়ের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মানুষ যদি ধর্মহীন না হয়ে থাকে, তাহলে আজকেও হবেনা । তাই যারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে প্রচার করতে চায় তারা কি চরম মিথ্যেচার করেনা ?

 

১৯৭২ সালের সেই সুভ্যেনিরে বিএনপিপন্থী অধ্যাপক সৈয়দ আলি আহসান বলেছেন

 

It was not possible for the Bangalees to carry on their life in Pakistan under an artificially imposed sense of religious restrictions giving up all their intrinsic feelings and emotions and obliterating the last trace of their distinctive existence

 

 

সূত্রঃ Bangladesh: A souvenir on the 1st anniversary of victory day december 16, 1972 Page-12

 


চিত্রঃ ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের ১ম সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা

বাঙালি জাতি যে ধর্মনিরপেক্ষ জাতি ছিলো,হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সম্প্রীতিতে পূর্ণ আস্থাবান ছিলো তার প্রমাণ সৈয়দ আলি আহসানের এই বাক্যটি । সেসময়ে এদেশের জনগণ ধর্মভিত্তিক বা ইসলামী আবেগে পরিচালিত হয়নি বরং গনতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের মহামন্ত্রে পরিচালিত হয়েছিল। সেজন্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম সংবিধানে দেশ পরিচালনার জন্য এই চারটি মূলমন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো । এ নিয়ে সেসময়ে কোন বিতর্কের ঝড় ওঠেনি, কেননা জনগণের প্রত্যাশা এমনই ছিলো । গনতন্ত্রের সংজ্ঞায় কোন বিশেষ ধর্ম উল্লেখিত থাকতে পারেনা, এমনটি হলে সেটি আর গণতান্ত্রিক থাকেনা, হয়ে যায় একনায়কতান্ত্রিক । তাই একনায়কতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকাটা নিশ্চিতভাবেই গনতন্ত্রের নীতির সঙ্গে চরমভাবে সাংঘর্ষিক ।

 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখল করে সামরিক স্বৈরাচার বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দেশের পবিত্র সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। তারই একটি ছিল সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকেই ধর্ষিত করা হয়েছিলো, এটি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ হয়নি সামরিক শাসক এবং রাজাকারদের মদদদাতা জিয়াউর রহমানের।

 

সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বহাল করে সংবিধান থেকে যেসব বিষয় বাদ দেয়া হয়েছিল তা হলো

 

১)জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের জন্য ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ বাদ দিয়ে করা হয়েছিল জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ (মুক্তিযুদ্ধ শব্দটাই মুছে ফেলার অপচেষ্টা, জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ শব্দটির প্রতি এত বিদ্বেষ ছিলো কেন ?)

 

২)বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বাদ দিয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ (নাগরিকত্ব বাংলাদেশী হতে পারে কিন্তু জাতীয়তাবাদ আজকের বা ১৯৭১ সালের প্রতিষ্ঠিত বিষয় নয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ হাজার বছরের জাতীয়তাবাদ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই এদেশের মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলো, তাই নাগরিকত্ব এবং জাতীয়তাবাদের মধ্যে গুলিয়ে ফেলা একেবারেই কাম্য নয় )

 

৩)ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয়া হয়েছিল এবং

 

৪)সমাজতন্ত্র বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র।

 

 

এই সেই জিয়াউর রহমান যিনি প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেনই না, সম্প্রতি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন,জিয়া মুক্তিযুদ্ধের কোন পর্যায়েই সেক্টর কমান্ডার ছিলেন না। ছিলেন প্রথম দিকে এরিয়া কমান্ডার। পরে জেড ফোর্সে কমান্ডার (কালের কণ্ঠ, ৯ ডিসেম্বর ২০১০) তিনি ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে চরম উচ্চাভিলাষী, যে কারণে নিজেকে মুক্তিসংগ্রামের প্রধান হিসেবে দাবী করে কালুরঘাটে রেডিওতে ঘোষণাও করেছিলেন (সেটি প্রচার করা হয়নি), অধঃস্তন কর্মকর্তাদের চাপে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, ১৯৭৫ সালে কুখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন এবং ১৯৭৯ সালে তাকে বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে জিয়াউর রহমান দেশের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেন, জয়পুরহাটের রাজাকার আব্দুল আলিমকে মন্ত্রী বানান, সেই ধারাবাহিকতায় ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি শাসনামলে রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী বানানো হয় । দেলোয়ার হোসেন সাইদীরা বিএনপি জামাত জোটের ব্যানারেই এমপি নির্বাচিত হন ।

 

দ্রোহের লেখক সাংবাদিক সানাউল্লাহ লিখেছেন,

 

জিয়া অনেকটা পরিস্থিতির চাপে আর খালেদ মোশাররফ পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন

 

সূত্রঃ http://www.droho.net/?p=1348

http://www.shobdoneer.com/mdjakirhosain/10053

 

একই কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন

 

১৯৭১ সালে জিয়া পাকিস্তান বাহিনীর হয়ে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে যাচ্ছিলেন। অধস্তন সৈন্যদের চাপে বাধ্য হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন

 

 

সূত্রঃ http://www.mzamin.com/index.php?option=com_content&view=article&id=2008:2011-02-01-16-45-30&catid=49:2010-08-31-09-43-32&Itemid=83

 

এজন্যই বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন জিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন

 

একবার যে রাজাকার, সব সময়ই সে রাজাকার। কিন্তু একবার যে মুক্তিযোদ্ধা, সব সময় মুক্তিযোদ্ধা না-ও থাকতে পারে।

 

এই সেই জিয়াউর রহমান, যিনি

 

১. জিয়া বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নসাধ স্বাধীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের দুনিয়াব্যাপী সাড়া জাগানো রণধ্বনি জয়বাংলা_কে ভুলিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছেন।

২. জিয়া সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করছেন, সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটি মুছে ফেলেছেন।

৩. জিয়া হানাদার পাকি-সামরিক জান্তার সহযোগী ঘৃণিত মুসলিম লীগ জামায়াতীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেছেন।

৪. জিয়া মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বিভ্রান্ত বাম চৈনিকদের রাজনীতির ঘরবাড়ি দিয়েছেন।

৫. জিয়া কুখ্যাত রাজাকার-এ-আযম গোলাম আযমকে দেশে এনে পুনর্বাসন করেছেন।

৬. জিয়া আব্দুল আলিম এবং শাহ আজিজুর রহমানের মত রাজাকারদের মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন।

৭. জিয়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিদেশী দূতাবাসে বড় বড় চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন।

৮. জিয়া দালাল আইন বাতিল করে সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন ১১ হাজার রাজাকার আল-বদরকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করেন।

৯. জিয়া টাকা-পয়সা কোন সমস্যা নয় (Money is no Problem) বলে গোটা সমাজকে নীতিহীন দুর্নীতিপরায়ণ হওয়ার পথ তৈরি করেছিলেন।

১০. জিয়া হিযবুল-বাহার রাজনীতি করে দেশের মেধাবী ছাত্র ও যুব সমাজকে আদর্শহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত করেন।

 

তাই তার রাজাকার ও তার দোসর পরিপুষ্ট বিএনপি সরকারের আমলের সংবিধান কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা, তার কত বড় ধৃষ্টতা যে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শব্দটি পালটে জাতীয় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন । ধর্মনিরপেক্ষতাকে গলা টিপে হত্যা করে বাংলাদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে দেশের মানুষকে ধর্মান্ধ এবং অমানবিক অবিবেচক করে তুলতে চেয়েছেন ।

 

আজকে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ছেলেমেয়েদের ভারতে পাঠিয়ে দেন, নিজের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হয়েই তাদের এহেন সিদ্ধান্ত । দিনদিন অবহেলা, নির্যাতন, নিপীড়ন, অন্যায় এবং বৈষম্য সয়ে সয়ে আজকে তারা দেশ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত, তাদের দেশপ্রেম জাগবে কিভাবে যদি তারা তাদের মানবিক অধিকার না পায় ? কেন একটি অনুষ্ঠানে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম শুধু আবৃত্তি করা হবে ? কেন একজন হিন্দু বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টানের ধর্মের প্রথম বাণী আবৃত্তি করা হবেনা ? তবে কি তারা দেশের ২য় শ্রেণীর নাগরিক ? শুধু বিসমিল্লাহ উচ্চারণে কি তাদের ধর্মানুভূতি আহত হবেনা ? তারা কি নিজেদের বঞ্চিত বলে মনে করবেনা ? কেন আমরা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র এবং বিসমিল্লাহ প্রবর্তনের মাধ্যমে তাদেরকে দেশবিমুখ করে তুলবো ? কেন আমরা তাদের অধিকার না দিয়ে এবং অত্যাচার নির্যাতন করে বাংলাদেশ বিদ্বেষী করে তুলবো ? এদেশে তাদের জন্ম, তারা এদেশের নাগরিক, তারা এদেশের জন্যই কাজ করবে, অন্য দেশের জন্য নয়। কেন তারা ভারতে চলে যাওয়ার চিন্তায় থাকবে ? কেন তারা ছেলেমেয়েদের ভারতে পড়াশোনা করতে এবং সেটল হতে পাঠাবে ? ১৯৭১-এ তাদের যেরূপ অবদান, ২০১১ তেও তারা সেরূপ অবদান রাখতে পারতো যদি তাদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ না করা হতো । এই সবকিছুর মূলে এই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের হাত । পুরো দেশটাকে নষ্ট করে দিয়ে গেছে সে, পয়সা দিয়ে সুযোগ সুবিধা দিয়ে এদেশের বেশ কিছু মানুষের বিবেক কিনে নিয়েছিলো এই কুখ্যাত ব্যক্তিটি, দম্ভের সাথে ঘোষণা করেছিলো-আই উইল মেইক পলিটিক্স ডিফিক্যাল্ট । সেই জালে শেষ পর্যন্ত সে নিজেও ফাঁসলো, ১৯৮১ সালেই এই ধূর্ত উচ্চাভিলাষী শাসকের মহাপতন । কিন্তু দেশটা ততদিনে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।

 

 

১৯৮২ সালে বিশ্ববেহায়া হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন । জিয়াউর রহমান চাপে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু মনে মনে তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিলোনা, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে তার কোন কৃতিত্ব বা অবদানের নজীরও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাওয়া যায়না, আর হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ তো মুক্তিযুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেননি ।

 

বাংলা উইকিপিডিয়া থেকে

 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় এরশাদ ছুটিতে রংপুর ছিলেন। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তিনি পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসে তখন তিনিও ফিরে আসেন

 

সেই এরশাদ ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রের ধর্ম আবিষ্কার করেন, অবশ্য এর জন্য নোবেল পুরস্কার তিনি পাননি, জিয়াউর রহমান বিসমিল্লাহ লাগিয়ে বাংলার সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করেছিলেন, হুসেন মোহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বুকে নির্দ্বিধায় ছুরি বসিয়ে দেন । বাংলাদেশের জনগণ কিন্তু কখনোই দাবী করেনি, রাষ্ট্রধর্ম এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার, এক এরশাদ এসে তার বিকৃত মস্তিষ্ক থেকে এই বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে দেন। বাংলাদেশে আজকে এরশাদের সমর্থক কজন ? আর রাষ্ট্রধর্ম করার বিরোধিতা করে শুধু আওয়ামী লীগ কেন, বিএনপি ও বিএনপিপন্থী ৭ দল ১৯৮৮ সালে সফল হরতাল পালন করেছিল, সেটি এদেশের তরুণ প্রজন্ম হয়তো জানেনা, কেননা তাদের জন্ম হয়নি বা শিশু অবস্থায় ছিলো তারা, কিন্তু তাদের পূর্বসূরিরা তো জানেন, সেটি কেন তারা তাদের সন্তানদের বলেন না ?

 

 

সেই বাংলাদেশের মূলনীতির গায়ে এবার ছুরি বসাতে যাচ্ছেন গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাদের প্রধান প্রবক্তা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি আসলে ভয় পেয়েছেন, আড়াই বছরের সরকার বেশ কিছু সাফল্য অর্জন করলেও সেগুলো ম্লান হয়ে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তপনা এবং মন্ত্রী-আমলাদের অবিবেচক উদ্ভট বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে। মুহাম্মদ ইউনূস লিমন শেয়ার বাজার- ছাত্রলীগ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে জনসমালোচিত হচ্ছে সরকার, বিসমিল্লাহ উঠিয়ে দিলে আবারো জনসমালোচিত হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে, তাই বাস্তবতার নীরিখে তিনি এবিষয়ে উচ্চবাচ্য করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন, তাছাড়া বিসমিল্লাহ উঠিয়ে দিলে তাদের প্রধান শরীক জাতীয় পার্টির হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ নাখোশ হবেন আর মহাজোট থেকে এরশাদ সরে দাঁড়ালে তার পুরো ফায়দা লুটবে রাজাকারদের দল বিএনপি এবং জামাত  - এমনটা আশংকা করেই শেখ হাসিনা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছেন না, দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ তিনি বিএনপি জামাতের হাতে তুলে দিতে চাননা, মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অসন্তুষ্ট করে স্বীয় ভোটব্যাংক নষ্ট করতে তিনি একেবারেই আগ্রহী নন । তাই অবশ্যই এটি একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত । কেননা, বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে হয় আওয়ামী লীগ না হয় বিএনপি আসবে। আর ক্ষমতা ছাড়া দেশের উন্নতি করা একেবারেই সম্ভব নয়, তাই সেই বিচারে বিসমিল্লাহ নিয়ে বাড়াবাড়ি এই মুহূর্তে না করার শ্রেয় । কিন্তু সমাধান এটি নয় । সমাধান তখনই হতে পারে, যখন ইসলামের সাথে সাথে বাকি ৩টি ধর্মকেও রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে বাকি ৩টি ধর্মের প্রথম বাণীগুলোও উচ্চারিত হবে । এমনটি হলে এদেশের হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কেউই অসন্তুষ্ট হবেনা, সকলেই খুশি থাকবে সরকারের প্রতি, মুসলিম দলগুলোও সরকারের বিরুদ্ধে যুৎসই ইস্যু পাবেনা কেননা, অন্য ধর্মের বিপক্ষে বলতে গেলেই তারা সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়বে এবং তখন প্রশ্ন উঠবে আসলেই কি ইসলাম সাম্প্রদায়িক ধর্ম ? তাই, ধর্মভিত্তিক দলগুলো এটি নিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারবেই না । আবার, বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসলে তারা যদি এটি পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে মানুষ বুঝে ফেলবে যে বিএনপি সাম্প্রদায়িক এবং অন্যান্য ধর্মবিদ্বেষী, এবং সেজন্য বিএনপি সেক্ষেত্রে বেকায়দায় পড়ে যাবে । তাই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত যে ভুল তা বলা যায়না ।

 

তবে আওয়ামী লীগে এখন অনেক ডানপন্থী স্বার্থান্বেষী চক্র ঢুকে পড়েছে,এরা আওয়ামী লীগের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে,এরা আওয়ামী লীগের মূল আদর্শ থেকে আওয়ামী লীগকে পদে পদে বিচ্যুত করবে,এরা পয়সাওয়ালা শ্রেণী,এদের টাকার খেলায় দরিদ্র বামপন্থী আওয়ামী লীগাররা পেরে উঠবে না । ফলে ডানপন্থীদের হাতে চলে যাবে আওয়ামী লীগের সকল নিয়ন্ত্রণ, আওয়ামী লীগের পতনের মূল কারণ হবে এই ডানপন্থী ব্যবসায়ী শ্রেণী । ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানের ভাঙনের জন্য এই আওয়ামী লীগই দায়ী, তাই ভেতরে ভেতরে ধর্মপন্থী ডানপন্থীদের যতই খুশি করা যাক না কেন তারা কোনদিনও আওয়ামীকে মন থেকে সমর্থন দেবেনা, এরা সুযোগসন্ধানী, আজকে আওয়ামী লীগ বলে স্তবস্তুতি করছে, আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে পরাজিত হলে এদের সুর পাল্টে যাবে, এদের টীকিটিও খুঁজে পাওয়া যাবেনা । দেশের জন্য ভালো কাজ করে দেখাতে পারলে জনগণ ঠিকই পুনরায় আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে,এর জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে বিসর্জন দিয়ে ডানপন্থীদের খুশি করার প্রয়োজন নেই ।  খালেদা জিয়ার চেয়ে শেখ হাসিনা চলনে বলনে অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ পরহেজগার হলেও সেটিতে কোন প্রভাব পড়বেনা কেননা, পাকিস্তান ভেঙে আওয়ামী লীগ তার ইমেজ তৈরি করে ফেলেছে,তাই ইসলামপন্থী দলগুলো এর জন্য কখনোই আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করবেনা, বঙ্গবন্ধু তো ইসলামিক একাডেমিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন করেছিলেন,জোটনিরপেক্ষ দল থেকে ওআইসি তে যোগদান করেছিলেন,পাকিস্তান ও ইসলামিক রাষ্ট্রগুলো থেকে স্বীকৃতি নেওয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালিয়েছিলেন,লাভ হয়েছিলো কিছু ? ইসলামপন্থীদের মন্ত্রীসভায় রেখে দিলেন,তাজউদ্দিন আহমেদের মত সৎ এবং ধর্মনিরপেক্ষ মন্ত্রীকে ভুল বুঝে অপসারিত করলেন,কি লাভ হলো ? সেই যাদের মন্ত্রীসভায় এবং বিভিন্ন পদে রেখে দিয়েছিলেন, তারা খন্দকার মোশতাক আহমেদ,তাহেরুদ্দিন ঠাকুর,মাহবুবুল আলম চাষী এবং ইসলামপন্থী আর্মিদের একাংশ দ্বারাই তো শেষমেশ নৃশংসভাবে নিহত হলেন। শেখ হাসিনাও একই ভুল করতে যাচ্ছেন,বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে অনেকেই প্রাণভয়ে চুপ ছিলেন,এটিকে শেখ হাসিনা তার মস্তিষ্কে সেট করে রেখেছেন,কিন্তু তারা যে পরিস্থিতির কারণেই চুপ ছিলেন সেটি তার চোখে পড়ছে না । তিনি বলেছেন -'পঁচাত্তরের পরে আমি সব কিছুই জানি,দেখেছি। যখন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে ছিল তখন কেউ এগিয়ে আসেনি।'তিনি আরও বলেন,'আমি যখন জেলে ছিলাম তখন কে কী করেছে,আমি সব জানি। যেটা করা হয়েছে সেটা বাস্তবতার নিরিখে করা হয়েছে।'(কালের কণ্ঠ ২১শে জুন ২০১১)

  

 

চিত্রঃ ধর্মনিরপেক্ষতায় মহামন্ত্রে বিশ্বাসী দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা, বামে মুক্তিযুদ্ধের উপসেনাপ্রধান একে খন্দকার এবং ডানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পরিকল্পনামন্ত্রী একে খোন্দকার  বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রবীণ সদস্য । তারা সংবিধানে বিসমিল্লাহ রাখার বিরোধিতা করার কারণে শেখ হাসিনা তাদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলেছেন,এমনটি তাঁর কাছ থেকে শোভা পায়না । তাঁর ভেতরে পরিবার হারানোর চরম কষ্ট,সেই কষ্ট আমরা কোনদিনও বুঝতে পারবো না কেননা কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে কভু আশীবিষে দংশেনি যারে কিন্তু তারপরও তাকে ধৈর্য ধারণ করা উচিত,তিনি প্রধানমন্ত্রী,মা যেমন সন্তানের জন্য কোনকিছুর আশা না করেই নিঃস্বার্থভাবে করে যায়, তাকেও তেমনটি করে দেখাতে হবে। কথাবার্তায় আরো সংযত হতে হবে, কেউ কটুক্তি করলে তাকে প্রত্যুত্তর দেওয়া যাবেনা,তাতে যত কষ্টই হোক না কেন । এই বাকি আড়াই বছর আওয়ামী লীগের জন্য এসিড টেস্ট,তিনি এবং তাঁর মন্ত্রী ও নেতা-কর্মীদের মন্তব্য করার সময় সাবধান থাকতে হবে,ছাত্রলীগের সন্ত্রাসকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে,দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে,কৃষকের উন্নয়নের জন্য আড়তদার এবং মজুতদার ব্যবসায়ীরা যাতে খাদ্যদ্রব্য গুদামে রেখে কৃত্রিম খাদ্যসংকট এবং খাদ্যমূল্যের বৃদ্ধি না করতে পারে,সেজন্যে নতুন আইন বানাতে হবে । শেয়ারবাজারের ঘটনা নিয়ে দিনের পর দিন অতিবাহিত করলে তা আওয়ামী লীগের ইমেজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, লিমন ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে । সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো,আবেগের বশে মন্তব্য এবং নিজেদের সাফল্য নিয়ে সাফাই গাওয়া যাবেনা,যতবড় সাফল্যই আসুক না কেন। জনগণ সাফাই গাওয়া এবং উদ্দেশ্যবিহীনভাবে বিরোধীপক্ষকে দোষারোপ করা একেবারেই পছন্দ করেনা,এগুলো অবশ্য বর্জনীয় ।

 


৪ নবেম্বর (১৯৭২) গণপরিষদে সংবিধান গ্রহণের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

 

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করব না। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারও নেই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারও বাধা দেয়ার ক্ষমতা নেই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম করবে, তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যভিচার এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি। কেউ যদি বলে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার নেই, আমি বলব সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যদি গুটিকয়েক লোকের অধিকার হরণ করতে হয়, তা করতেই হবে।

 

এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা কেননা, ধর্মনিরপেক্ষতা যে ধর্মহীনতা নয় সেটি শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ়কণ্ঠে ব্যক্ত করেছেন । ধর্মহীনতাবাদ = Atheism / Irreligionism কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ = Secularism, not atheism or irreligionism. যদি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানে ধর্মহীনতাবাদ হতো তাহলে তো সেক্যুলারিজম শব্দটি লেখার প্রয়োজন পড়েনা, তাহলে অ্যাথেইজম বা ইরিলিজিয়নিজম বললেই তো হয়। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আর নাস্তিক্যবাদ/ধর্মহীনতাবাদ যে এক জিনিস নয় এখান থেকেই সুস্পষ্ট । সরলভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের এমন অভূতপূর্ব চমৎকার বর্ণনা বিশ্বের আর কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই ।

 

সৈয়দ মুজতবা আলী ও সন্তোষ কুমার ঘোষের সঙ্গে আলাপচারিতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

 

স্বাধীন বাংলাদেশ ও সেক্যুলার বাঙালী জাতির অস্তিত্বের রক্ষাকারী হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আমি এই ধর্মনিরপেক্ষতার চারা বাংলাদেশের মাটিতে পুঁতে রেখে গেলাম। যদি কেউ এই চারা উৎপাটন করে তাহলে বাঙালী জাতির স্বাধীন অস্তিত্বই সে বিপন্ন করবে। (কলকাতার দৈনিক যুগান্তর, ২৯ নবেম্বর ১৯৭২ )

 

তারপরেও ভাষাগত দ্বৈততা/দ্ব্যর্থকতার কারণে যদি সেক্যুলারিজমকে স্টেট সেক্যুলারিজম বলে উল্লেখ করা হয় এবং তার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু কথিত ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয় তবে সেক্যুলারিজম নিয়ে সমস্যার অনেকটাই দূর হয়। যেহেতু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিশাল অংশ সচেতনভাবে শিক্ষিত ও জ্ঞানী নয়, তাই এই স্টেট সেক্যুলারিজম হিসেবে উল্লেখ করার চেয়েও তুলনামূলকভাবে অধিকতর যুক্তিযুক্ত হলো কোন ইসম বা মতবাদে না যেয়ে সুস্পষ্টভাবে লেখা, সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা । ৪টি ধর্মের প্রত্যেক ধর্মের ১ম বাণীটি উল্লেখ করে অনুষ্ঠান শুরু করতে হবে, এমনটি বাধ্যতামূলক করা হলে দীর্ঘ পরিসরের বিচারে ভবিষ্যতে ধর্মান্ধতা এবং পরধর্ম বিদ্বেষ অনেকটাই হ্রাস পাবে।  উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ বিলোপ করা হয়েছিল কিন্তু  সকল ধর্মকে সমান মর্যাদা দেওয়া হতো । তাই  বেতার এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরান শরীফ, গীতা, বাইবেল এবং ত্রিপিটক প্রত্যেকটি থেকেই পাঠ করা হতো । এটিই যুক্তিযুক্ত, কেননা এতে কোন ধর্মের জনগণই অসন্তুষ্ট হবেনা, ফলে ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সৌহার্দ্য বজায় থাকবে ।

 

১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে যে ভিত্তিগুলো কাজ করেছিল,তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ভিত্তিটা ছিলো ভাষা,বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারার স্বাধীনতা। বাংলাদেশের জন্ম, নামকরণ সবকিছুর ভিত্তি বাংলাভাষা। আর সেই দেশের সংবিধানের ১ম শব্দটিই যদি আরবীশব্দ হয়,তাতে বাংলাদেশের ভিত্তিটিই কি নষ্ট হয়ে যায়না ? যেই ভাষার জন্য ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারীতে ছাত্রেরা অকাতরে প্রাণ দিলো,যেই একুশের চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে একে একে আমরা সকল অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখলাম,যেই একুশের চেতনার কারণেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভ,সেই দেশের সংবিধানের প্রথম বাক্যটি আরবী শব্দের বিসমিল্লাহ না হয়ে কি বাঙালি জাতীয়তাবাদ হতে পারেনা ? বিসমিল্লাহ থাকুক, কিন্তু সাথে সাথে অন্য ৩ ধর্মের ১ম লাইনও থাকুক, কেননা,এদেশ মুসলমানের একার সম্পত্তি নয়,এদেশ মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সকলের । তাই স্বাধীন বাংলাদেশের গড়ে ওঠার প্রাক্কালে রচিত দেশপ্রেমের সেই অমর ধর্মনিরপেক্ষ গান দেশদরদী শিল্পী রথীন্দ্রনাথের দরাজ কণ্ঠের সাথে সাথে আমাদের হৃদয়েও আলোড়ন তুলুক, আমাদের বিবেককে জাগ্রত করুক -

আমারি দেশ সব মানুষের -হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান দেশমাতা এক সকলের । মন্দির মসজিদ গির্জার আবাহনে বাণী শুনি - একই সুরে আমারি দেশ সব মানুষের সব মানুষের

 

 

শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় যে দরদভরা কন্ঠে গান গেয়েছেন, যে দেশাত্মবোধ নিয়ে গান গেয়েছেন, তাকে কি কৃত্রিম দেশপ্রেম বলা যাবে ? এই বাংলাদেশ যেমন আমাদের মুসলমানদের, তেমনি রথীন্দ্রনাথ রায়ের মত হিন্দুদেরও, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টানেরও, গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সকলের।

 

পরিশেষে এটাই বলতে চাই, গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাকে সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হোক এবং ৪টি ধর্মের ১ম বাক্যগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক । বেতার টেলিভিশন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই ৪টি ধর্মের ১ম বাক্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হবে, তবে রাষ্ট্র এটি ছাড়া অন্য কোন ধর্মীয় বিষয়ে নিজেকে জড়াবে না । পারফেক্ট বা নিখুঁত বলে পৃথিবীতে কিছু নেই, কতিপয় নাস্তিক ব্যক্তি আইডিয়ালিস্টিক মনমানসিকতাসম্পন্ন এবং বাস্তবতা বিবর্জিত বলে সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা কে সোনার পাথরবাটির মত মনে করতে পারেন, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনি এবং আমি একই ধর্মীয় মতে  বিশ্বাসী হওয়ার পরেও আমি ব্যক্তিগত ইচ্ছে আমার দেশের জনগণের ওপরে চাপিয়ে দিতে আগ্রহী নই, জনগণের অধিকাংশের মতামতের গুরুত্ব আমার কাছে আছে বলেই সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধার বিষয়টি আমার কাছে গ্রহণীয়, ১০০% বাস্তবায়ন কোনকিছুতেই সম্ভব নয়, এটিতেও নয়, কিন্তু একটি বিশাল অংশ যদি সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা করতে কিছুটা হলেও শেখে, তাতে দেশ ও দশের লাভ ।

পার্শ্ববর্তী দেশে গুজরাট এবং বাবরি মসজিদের মত ২-১ টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সেদেশে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সৌহার্দ্যের মধ্যে বসবাস করে, হিন্দু-মুসলিম কিংবা আন্তঃ ধর্মীয় প্রেম প্রীতি ভালোবাসা বিবাহ ইত্যাদি সেখানে অহরহ ঘটছে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি আছে বলেই ভারত অন্তত বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের থেকে মোটামুটিভাবে সকল ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে আছে । ভারতে আজ পর্যন্ত ৪ জন মুসলিম দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তারা হলেন ডঃ জাকির হুসেইন, ডঃ ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ, ডঃ এপিজে আব্দুল কালাম এবং মোহাম্মদ হেদায়েতউল্লাহ। শেষোক্ত ব্যক্তি ছিলেন দুটি ভিন্ন ভিন্ন দফায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি সেই বিরল ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম যিনি ভারতের একাধারে রাষ্ট্রপতি - উপরাষ্ট্রপতি এবং চিফ জাস্টিসের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বর্তমান উপরাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ হামিদ আনসারীও একজন মুসলমান । নামকরা ভারতীয় ব্যুরোক্র্যাটদের মধ্যে অনেক মুসলিম রয়েছেন - আবিদ হোসেন, আসাফ আলি, জাফর সাইফুল্লাহ, সালমান হায়দার ইত্যাদি । নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের মধ্যে রয়েছেন - শেখ আব্দুল্লাহ, ফারুক আব্দুল্লাহ, ওমর আব্দুল্লাহ, মুফতী মোহাম্মদ সাইয়েদ, সিকান্দার বখত, এ আর আন্তুলে, সি এইচ মোহাম্মদ কোয়া, মুখতার আব্বাস নাকভী, সালমান খুরশীদ, সাইফুদ্দিন সোজ, ই আহমেদ, গুলাম নবী আজাদ, সৈয়দ শাহনেওয়াজ হুসেন, আসাদুদ্দিন ওয়াইসি। ভারতের ক্রিকেট অধিনায়ক ছিলেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন এবং বর্তমানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এছাড়া রয়েছেন জহির খান, ইরফান পাঠান, ইউসুফ পাঠান, মুনাফ প্যাটেল ইত্যাদি ।একসময়ে ইফতিখার আলি খান পাতাউদি এবং মনসুর আলি খান পাতাউদি ভারতীয় ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আরো ছিলেন সৈয়দ কিরমানি, আরশাদ আইয়ুব, ওয়াসিম জাফর, মোহাম্মদ কায়েফ ইত্যাদি। ফিল্মজগতে রয়েছে খানের ছড়াছড়ি - ইউসুফ (দীলিপ কুমার) শাহরুখ খান সালমান খান আমির খান সাইফ আমি খান - খান আর খান । এছাড়া রয়েছেন এমরান হাশমী, ক্যাটরিনা কায়েফ, আয়েশা টাকিয়া, মধুবালা, নাসিরুদ্দিন শাহ, জনি ওয়াকার, শাবানা আজমী, ওয়াহিদা রেহমান, আমজাদ খান, পারভীন ববি, ফিরোজ খান, মিনা কুমারী, প্রেম নাজির, নার্গিস দত্ত ইরফান খান, ফরিদা জালাল, আরশাদ ওয়ারসি, মেহমুদ, জিনাত আমান, ফারুক শেখ, টাবু ইত্যাদি । নামকরা ফিল্ম ডিরেক্টরের মধ্যে রয়েছেন মেহবুব খান, কে এ আব্বাস, কে আসিফ, কামাল আমরোহী, আব্বাস মাস্তান ইত্যাদি । কদিন আগে চলে গেলে মকবুল ফিদা হুসেইন, রয়েছেন একাডেমি এ্যাওয়ার্ড বিজয়ী রেসুল পুকুত্তি, এ আর রেহমান, নওশাদ, সেলিম-সুলায়মান, নাদিম আখতার (নাদিম-শ্রাবণ ডুয়োর), আবরার আলভী । নামকরা সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ রফি, তালাত মাহমুদ, অনু মালিক, লাকি আলি, মোহাম্মদ আজিজ, শামসাদ বেগম, বেগম আখতার প্রমুখ। তবলায় বিশ্বসেরা জাকির হুসেইন, সানাইয়ে বিসমিল্লাহ খান, এছাড়া রয়েছেন নামকরা সঙ্গীতজ্ঞ ভিলায়াত খান,আলাউদ্দিন আলি প্রমুখ । ভারতে যে ধর্ম নয় বরং যোগ্যতা দিয়েই মানুষকে বিচার করা হয় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই ব্যক্তিগুলো । এখানে মানুষ সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল, তাই তাদের মধ্যে সহজে ভেদাভেদ বা কলহের সূচনা হতে পারেনা । ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের এবং অন্যান্য দেশগুলোর জন্য অনুকরনীয় আদর্শ হতে পারে। ভারত এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে আজকে দুনিয়ার তৃতীয় সুপার পাওয়ার রূপে আবির্ভূত হয়েছে, আমরা যদি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সকলে মিলে মিশে দেশের জন্য কাজ করতে পারি, তাহলে আমরাও একদিন নব্য শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারবো ।

মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের রক্ত চুষে খাবে কেন ?
 একজন মুসলমানকে আক্রান্ত হতে দেখলে একজন হিন্দু তার সাহায্যে ছুটে যাবে, একজন হিন্দু আক্রান্ত হলে তার সাহায্যে একজন মুসলিম ছুটে যাবে এটাই মানবতা। আমার ধর্ম বড় না তোমার ধর্ম বড় তালগাছ আমার -রাষ্ট্রধর্ম আমার এসব কখনো শান্তি বয়ে আনবে না ।  মানবতাবাদী গায়ক ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে তাই ধর্মনিরপেক্ষ মানবতারই আহবান

 

 

জন্ম হতে ঐ মৃত্যুবধি তুমি হিসাব করো, এই পৃথিবীর ধর্ম যত তুমি বিচার করো, দেখবে সেথায় একই কথা, ঊর্ধ্বে সবার মানবতা, সেই কথাটাই বলে সবাই বড়াই করো, আবার কেন লড়াই করো ?

 

 ( উল্লেখ্য,গানটির রচয়িতা একজন মুসলমান এবং মনেপ্রাণে ধর্মনিরপেক্ষ )

 

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক সাধকদের অন্যতম লালন শাহ বা লালন ফকির হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং অসুস্থ অবস্থায় তার পরিবার ছেলেবেলায় তাকে ত্যাগ করেছিল । তখন সিরাজ সাঁই নামের একজন মুসলমান বাউল তাঁকে আশ্রয় দেন এবং সুস্থ করে তোলেন । সেই লালন কালক্রমে হয়ে ওঠেন বাউল সম্রাট, গান্ধীরও ২৫ বছর আগে,ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম,তাকে মহাত্মা উপাধি দেয়া হয়েছিল। একজন মুসলিম বাউল তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, সেবাশুশ্রূষা করেছিলেন । এই হলো বাংলার সংস্কৃতি, বাঙ্গালির সংস্কৃতি অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি । সেই যুগের একজন মুসলমানের মধ্যে যদি এই অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং মানবতাবাদী আদর্শ থাকতে পারে, সেই আদর্শ দেখে কি আজকে আমাদের দেশের সাধারণ মুসলমানেরা অনুপ্রাণিত হতে পারেনা ? ধর্মনিরপেক্ষতা যে বাংলার এবং বাঙ্গালির চিরন্তন বৈশিষ্ট্য, তা এখান থেকেই সুস্পষ্ট এবং সংবিধানেও তাই এর পুনঃ অন্তর্ভুক্তি আজ অতীব প্রয়োজন।

বিশেষ অনুরোধঃ এটি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ পোস্ট, দয়া করে কেউ গালাগালি - কটুক্তি - অশিষ্ট ভাষা - বিদ্রূপাত্মক ভাষা ব্যবহার করবেন না । ভদ্র এবং শিষ্ট ভাষায় আপনার মন্তব্য উপস্থাপন করুন, ধন্যবাদ ।

একই রকম আরো কিছু ব্লগ