খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটি ছাড়তে হয়েছে.... বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা কে কী বলেন?

abdullah.shafi's picture

বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটি ছাড়তে হয়েছে। এ নিয়ে রবিবার সারা দেশে বিএনপির হরতাল পালন ও সাংঘর্ষিক রাজনীতি শুরু হয়েছে। স্বভাবতই দেশবাসী এতে উদ্বিগ্ন। এছাড়া এ হরতাল ঈদে ঘরমুখো লাখ লাখ মানুষের জন্য অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা এ বিষয়ে তাঁদের সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন। আমার দেশ, কালের কন্ঠ, প্রথম আলোসহ নানা পত্রিকায় প্রকাশিত মন্তব্য কলাম।

তাঁকে বাড়ি থেকে বের করা হলোই

দীর্ঘ ১০ ঘণ্টাব্যাপী বিভিন্নমুখী টানাহেঁচড়ার পর বেগম জিয়াকে অত্যন্ত অবমাননাকর ও লজ্জাজনক অবস্থায় তাঁর ক্যান্টনমেন্টের বাসস্থান থেকে জোর করে বের করা হলো। প্রায় চার দশক এ বাড়িতে তিনি বাস করে আসছিলেন জিয়াউর রহমান যখন উপ-সেনাপ্রধান ছিলেন তখন থেকে। শহীদ জিয়া যখন রাষ্ট্রপতি হন তখনো তিনি এ বাসায়ই বসবাস করতেন ও রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম করতেন। আমরা এ কথা বলতে চাচ্ছি যে এ গৃহটি বেগম জিয়ার দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত। সুদিনের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আবেগ থেকে কোনো মানুষই মুক্ত নন। সে যাই হোক, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেগম জিয়াকে তাঁর ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে বের করা হলো তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমাদের সমাজে ও সংস্কৃতিতে আমরা সব সময় নারীদের আলাদা মর্যাদা দিয়ে থাকি। আর তা যদি না করতে পারি, তাহলে কিভাবে আমরা নিজেদের সুসভ্য মানব পদবাচ্য হিসেবে দাবি করব?

বিভিন্ন পত্রিকার সূত্র থেকে আমরা যা জানতে পারছি তা এই যে, সেই কাকডাকা ভোরে বেগম জিয়ার বাসস্থানে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড নিয়োজিত কিছু লোক অবস্থান নেয়। তাঁর বাসার টেলিফোন লাইন ইত্যাদি ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামার দিয়ে তাঁর বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাঁর বাসার গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদিও বিচ্ছিন্ন করা হয়। তাঁর বাসায় তাঁর আইনজীবীসহ যে কারো প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। এসব অমানবিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া তো হয়ই, শেষে তাঁকে দরজা ভেঙে টেনেহিঁচড়ে এক কাপড়ে বাসা থেকে বের করে নিয়ে আসা হয়। এর থেকে লজ্জাজনক ও অবমাননাকর আর কী হতে পারে; একজন বিশিষ্ট মহিলার জন্য যিনি জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে বারবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন। এখন যে বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে তা ওই বাসার মালিকানা কতটা বৈধ ছিল এ নিয়ে। একপক্ষের অভিমত হচ্ছে, যে বাড়ির দাম ধার্য করে নিবন্ধনের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়েছে, তা অবৈধ হয় কেমন করে? আর এ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি তো সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া তো গ্রহীতা ছিলেন। এখানে তাঁর কোনোই ভূমিকা ছিল না। মহামান্য হাইকোর্ট অবশ্য কতগুলো কারণ দর্শিয়ে প্রক্রিয়াটি অবৈধ ছিল সেই রায় দিয়েছেন।


কিন্তু এখনকার প্রশ্নটি অন্যখানে। এ রায়ের বিরুদ্ধে বেগম জিয়ার পক্ষের আইনজীবীরা আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল বা আপিলের অনুমোদন চেয়েছেন। মহামান্য প্রধান বিচারপতির আদালত এর শুনানির জন্য একটি দিন ধার্য করেছেন। অর্থাৎ বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। কিন্তু সরকারপক্ষ বলছে যেহেতু বিতর্কিত বাড়িটি ১২ নভেম্বরের মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার হাইকোর্টের রায় ছিল, সেহেতু ওই বাড়ি ওই তারিখের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বেগম জিয়ার আইনজীবীরা অন্য ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, যা সঠিক বলে আমরা মনে করি। তাঁরা বলছেন, রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা সর্বোচ্চ আদালতে গিয়েছেন। আর সেই আদালত যেহেতু শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন, তাই হাইকোর্টের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে গেছে।

অতএব, বাসা ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই এখনো আসেনি। কারণ বিতর্কিত বিষয়টির সব দিক বিবেচনা করেই তো সর্বোচ্চ আদালত দেখবেন। সারা দিনের দৌড়াদৌড়ির মাধ্যমে আইনবিদরা উপায়ান্তর না দেখে মাননীয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে জানান যে শুনানি না হওয়া পর্যন্ত বেগম জিয়াকে কোনোরূপভাবে বিব্রত করা হবে না বলে প্রধান বিচারপতি অভিমত দিয়েছেন। সরকারপক্ষ সে সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি; কিন্তু কেন? সরকারের কি এমন আশঙ্কা ছিল যে আপিল বিভাগে তারা হেরে যেতে পারে? নাকি বেগম জিয়াকে চরমভাবে হয়রানি করা ও লজ্জাজনক পরিস্থিতির মধ্যে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করা, তা না হলে বোধ হয় কারো কারো শান্তিতে ঘুম হচ্ছে না।

সে যাই হোক, আমরা যারা আমজনতার কাতারে অবস্থান করি তাদের চিন্তাধারা কিছুটা ভিন্ন। আমরা মনে করি, এ দেশ যতই দরিদ্র হোক না কেন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনেক সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এই যে রাজনীতির খেয়োখেয়ির মধ্যে আমরা কিছুতেই এগোতে পারছি না। ১৩ নভেম্বরের ঘটনার মধ্য দিয়ে যে বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করা হলো, তা মহীরুহের আকৃতি যখন নেবে তখন যে আর কী হতে পারে তা আমরা কল্পনা করতেও শঙ্কিত হচ্ছি।

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক রাষ্ট্রদূত, সেনেগাল

........................................................................................................


অনেক আগেই বাড়িটি ছাড়া উচিত ছিল



বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়িটি ছাড়ার জন্য নোটিশ দেয় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড। কারণ বাড়িটা ‘এ’ ক্যাটাগরির এবং সেটা একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত। জিয়াউর রহমানকে যখন ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ করা হয়, তখন তিনি ওই বাড়িতে ওঠেন। সেখানে তিনি সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবেও সপরিবারে বাস করেন।


১৯৮১ সালের ৩০ মে যখন তাঁর দুঃখজনক মৃত্যু ঘটে তখন বেগম খালেদা জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন। এবং যেহেতু জিয়াউর রহমানের কোনো সহায়সম্বল ছিল না এবং তাঁর ছেলেরা নাবালক, এই বিবেচনা থেকে তাঁদের জন্য গুলশানে একটি বাড়ি দেওয়া হয় এবং ১০ লাখ টাকা তাঁদের জন্য ফিক্সড ডিপোজিট করা হয়। পরবর্তী সময়ে এরশাদের আমলে সেনানিবাসের এই বাড়িটাও বেগম খালেদা জিয়াকে বেআইনিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরশাদ ধারণা করেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া সেনানিবাসের এই বাড়িতে দুই ছেলেসহ বাস করবেন আর গুলশানের বাড়িটি ভাড়া দিয়ে ছেলেদের পড়াশোনার ব্যয়ভার চালাবেন। পরবর্তী সময়ে যখন বেগম জিয়া রাজনীতিতে এলেন তখন তিনি সেনানিবাসের ভেতরের এই বাড়িতেই থেকে গেলেন। সেখানে থেকেই তিনি রাজনীতি করেছেন, তাঁর ছেলেরা ব্যবসা করেছেন।


১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য একবার নোটিশ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তখন বাড়িটি ছাড়েননি। এবার ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড যখন আবার নোটিশ দেয়, তখন বেগম খালেদা জিয়া হাইকোর্টে এর বিরুদ্ধে একটি রিট মামলা দায়ের করেন। সেই রিট মামলার রায় তাঁর বিপক্ষে যায় এবং আদালত তাঁকে বাড়িটি ছাড়ার জন্য ৩০ দিন সময় দেন, সেই সঙ্গে উচ্চ আদালতে লিভ টু আপিল করারও অনুমতি দেন। তাঁরা চেম্বার জজে লিভ টু আপিল করেছিলেন, চেম্বার জজ তা শুনানি না করে ফুল বেঞ্চে রেফার করেন। তাঁরা ফুল বেঞ্চে মুভ করেন, যেখানে প্রধান বিচারপতিও ছিলেন। ফুল বেঞ্চে তাঁরা সময় প্রার্থনা করেন, ফুল বেঞ্চ ২৯ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন এবং প্রধান বিচারপতি তাঁদের কাছে জানতে চান, তাঁদের আর কোনো আবেদন আছে কি না। উত্তরে তাঁরা বলেন, আর কোনো আবেদন নেই।


অর্থাৎ ৩০ দিনের মধ্যে বাড়িটি ছেড়ে দিতে হবে—হাইকোর্টের দেওয়া এই রায়টিই বহাল থাকল। গত শনিবার ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাইকোর্টের সেই রায়ের আলোকেই ব্যবস্থা নিয়েছে। আসলে বেগম খালেদা জিয়ার অনেক আগেই বাড়িটি ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়াকে গুলশানে একটি বাড়ি দেওয়ার পরও সেনানিবাসের ভেতরে ওই বাড়িটি দেওয়া ছিল বেআইনি। কারণ বাড়িটি কেবল সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই বরাদ্দ পেতে পারেন চাকরিরত অবস্থায়। আর বেগম খালেদা জিয়ার বাড়িটি নেওয়াও ছিল অনৈতিক। এবং যখন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড তাঁকে বাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য নোটিশ দিল, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সেখান থেকে বেরিয়ে আসা উচিত ছিল।


শনিবার তিনি সেনানিবাসের বাড়িটি ছেড়ে দিয়েছেন। আইএসপিআর বলছে, তিনি নিজেই আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে বাড়িটি ত্যাগ করেছেন। আর বেগম জিয়া নিজে বলছেন, তাঁদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। আমরা কোনো পক্ষের বক্তব্যের সত্যাসত্য যাচাই করতে যাচ্ছি না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেত কি না। আইনের দৃষ্টিতে অপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। বেগম খালেদা জিয়া যদি হাইকোর্টের রায়ের ব্যাপারে স্থগিতাদেশ চাইতেন এবং আদালত স্থগিতাদেশ দিতেন, তাহলে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুযোগ থাকত। কিন্তু তাঁরা স্থগিতাদেশ চাননি।


কেন স্থগিতাদেশ না চেয়ে শুধু লিভ টু আপিল করেছেন? ধারণা করি, ইচ্ছাকৃতভাবেই তাঁরা স্থগিতাদেশ চাননি, ২৯ নভেম্বর লিভ টু আপিলের শুনানির দিন ঘোষণার সময় প্রধান বিচারপতি তাঁদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁদের আর কোনো আবেদন আছে কি না, তখনো তাঁরা স্থগিতাদেশ প্রার্থনা করেননি। আসলে বিএনপি এ বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন; তারা জানে এবং বেশ ভালোভাবে বোঝে, এর সঙ্গে জনগণের স্বার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। জনজীবনে এত সমস্যা, অথচ বেগম খালেদা জিয়া তাঁর দলকে পরিচালিত করছেন নিজের পারিবারিক স্বার্থে। তাঁরা সংসদে যান না, জনজীবনের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন না; বেগম জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ি আর ছেলেদের নিয়ে দুই বছর পার করে দিলেন। এখন বেগম জিয়া ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এসেছেন, এখন জনসাধারণের মধ্যে বাস করে, তাদের কাতারে দাঁড়িয়ে তাদের স্বার্থে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শামিল হবেন—এই প্রত্যাশা করি।


 আবদুল মান্নান:
সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

...............................................................................................................

সংঘাতময় রাজনীতিকে উসকে দেওয়া হলো

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে যেভাবে তাঁর সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, তা মোটেও যুক্তিসংগত ছিল না। বিষয়টি যেহেতু একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল, তাই আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের অপেক্ষা করা উচিত ছিল। আইনি প্রক্রিয়ায় যদি বেগম জিয়া হেরে যেতেন, তিনি নিশ্চয়ই স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে চলে যেতেন। কারণ আমরা মনে করি, আইনের প্রতি তাঁর যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ আছে বলেই তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তা না করে এভাবে জোরপূর্বক এবং অশালীন ও অশোভন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাঁকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এর ফলে বর্তমানে দেশব্যাপী যে উত্তপ্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হবে বলেই আমি মনে করি এবং তা হবে জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

এ ছাড়া তিন-তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের স্ত্রী প্রেস ব্রিফিংয়ে যেভাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের বর্ণনা দিয়েছেন, তা গোটা জাতির জন্য লজ্জাকর। সারা দেশের মানুষ টিভি চ্যানেলগুলোতে সে দৃশ্য দেখেছে এবং সরকারের এ কর্মকাণ্ডকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমি মনে করি, খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে এভাবে উচ্ছেদের ঘটনাটি অত্যন্ত অনভিপ্রেত এবং এটি জাতির সামনে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

এর ফলাফল কী হবে? বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে গতকাল রবিবার হরতাল আহ্বান করেছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সে হরতালে সমর্থন জানিয়েছে। আগের দিন ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা রাস্তায় রাস্তায় মিছিল-সমাবেশ করেছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু নেতা-কর্মী আহত হয়েছে। বেশ কিছু গাড়িতে অগি্নসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়েছে এবং এ ধরনের কর্মসূচি আসতেই থাকবে। এক কথায় রাজনীতি একটি অশান্ত ও সংঘাতময় রূপ নিয়েছে। এটি দেশের জন্য কোনোক্রমেই কল্যাণকর হতে পারে না। বর্তমান সরকারকেই এর দায়দায়িত্ব নিতে হবে। বর্তমানে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে ঢাকায় রয়েছেন। এ সময়ে হরতাল ও সংঘাতময় রাজনীতি, বিশেষ করে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন জাতীয় নেতার প্রতি যে ধরনের আচরণ করা হলো, তা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তুরস্কের যেসব বিনিয়োগকারী সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছেন, তাঁরাও এ দেশে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবেন। একই প্রতিক্রিয়া হবে অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের ওপরও। বলা বাহুল্য, মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টিও বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা না করে জঘন্য পন্থায় যেভাবে খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে, দেশের সুশীল সমাজ ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রিয়াজউদ্দিন আহমেদ
সম্পাদক, নিউজ টুডে ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি

......................................................................................................

 

অঘটনের জন্য দায়ী খালেদার আইনজীবীরা

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ি বরাদ্দের বৈধতা নিয়ে আদালতে যে ফয়সালা হওয়ার কথা সেটিকে রাস্তায় নিয়ে আসা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।


আইন অনুযায়ী তাঁর বাড়ির বরাদ্দটি সঠিক ছিল না। আর এই বেআইনি কাজটি করেছেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে বিদ্রোহী সেনাদের হাতে জিয়াউর রহমান যখন মারা যান, তখন তাঁর নিজস্ব কোনো প্লট বা বাড়ি ছিল না। অন্যান্য সিনিয়র সেনা কর্মকর্তারও ছিল না। জিয়াউর রহমানের ছেলেরা ছিল নাবালক। সে কারণে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য দুটি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে গুলশানে একটি বাড়ি দেওয়া হয়। আরেকটি বাড়ি মহাখালী বা বনানীর প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক এলাকা বা ডিওএইচএসে হওয়াই সমীচীন ছিল। সেখানেই সেনা কর্মকর্তারা প্লটের বরাদ্দ পেয়ে থাকেন।


কিন্তু সুচতুর রাজনীতিক এরশাদ সেনানিবাসের উপপ্রধান সেনাপ্রধানের জন্য নির্ধারিত বাড়িটিই খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেন। তাঁর এই বরাদ্দ দেওয়ার দুটি উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, জিয়ার হত্যাকাণ্ডে এরশাদের জড়িত থাকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা চলছিল। তিনি খালেদা জিয়াকে ওই বাড়িটি বরাদ্দ দিয়ে তাঁর সহানুভূতি পেতে চেয়েছিলেন। সে সময়ে সেনাবাহিনীর অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা খালেদা জিয়াকে বাড়িটি না নিতে পরামর্শও দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, এরশাদ চাইতেন না যে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে যোগ দিন। সেনানিবাসে থেকে যে রাজনীতি করা যায় না সেটিও তিনি জানতেন। সেই কারণেও এরশাদ সেনানিবাসে খালেদা জিয়ার জন্য বাড়িটি বরাদ্দ দিয়েছিলেন।


এটি ছিল ১৯১১ সালের সেনা আইনের মারাত্মক বরখেলাপ। সামরিক ভূমি সম্পত্তি আইন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকাণ্ডে ব্যবহূত কোনো জমি বা বাড়ি বেসামরিক ব্যক্তিকে দেওয়া যায় না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেখানে পিলখানা ট্র্যাজেডিতে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ করা আইনসম্মত হবে না। সেনাবাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত জায়গা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। সেনাবাহিনীর কাজেই ব্যবহূত হতে হবে। জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকা পর্যন্ত এটি সেনা-উপপ্রধানের বাসভবন ছিল।


সে দিক থেকে দেখলে সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়াকে এ বাড়িটি বরাদ্দ দেওয়াই ছিল আইনবহির্ভূত। আদালত যথার্থই রায় দিয়েছেন এবং খালেদা জিয়ার উচিত ছিল সেই রায় মেনে নিয়ে সসম্মানে বাড়িটি ছেড়ে দেওয়া।


কিন্তু আমার ধারণা, তাঁর আইনজীবীরা তাঁকে ভালো পরামর্শ দেননি। তাঁদের উদ্দেশ্য যে ভালো ছিল না তার প্রমাণ শুক্রবার সকালে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তাঁরা সাক্ষাৎ করলেন, বৃহস্পতিবার গেলেন না কেন? আইনজীবী সমিতির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে তাঁরা সেখানে যেতে পারেন না। তাঁরা যেতে পারেন তাঁদের মক্কেলের স্বার্থরক্ষার জন্য। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করার পর আইনজীবীরা যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন, তাও সমর্থনযোগ্য নয়।
সুপ্রিম কোর্টের লিভ টু আপিলের আবেদনের সঙ্গেও খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা স্থগিতাদেশ চাননি। এর অর্থ হলো, তাঁরা হাইকোর্টের রায় মেনে নিয়েছেন। আসলে তাঁরা খালেদা জিয়ার বাড়িকে ব্যবহার করে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চেয়েছিলেন বা তাঁর আনুকূল্য লাভে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁদের কারণেই খালেদা জিয়া অপদস্ত হলেন। এরপর বিএনপির নেতারা যে কাজটি করলেন, তাতে বিএনপির প্রতি জনগণের সহানুভূতি বা সমর্থন থাকার কথা নয়। মানুষ দেখল, একটি বাড়ির জন্য বিএনপি লাখ লাখ মানুষকে দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার জন্য খালেদা জিয়া যে সহানুভূতি পেতে পারতেন, ঈদের আগে হরতাল ডাকার জন্য তাও পেলেন না। আসলে বিএনপি এটিকে রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে চেয়েছিল, সে ক্ষেত্রে তারা সফল না ব্যর্থ হয়েছে সেই বিচার জনগণই করবে।


অন্যদিকে এ ব্যাপারে সরকার বা সামরিক ভূসম্পত্তি প্রশাসক তাড়াহুড়া না করলেও পারত। আদালতের রায় যখন তাদের পক্ষে ছিল, তখন কাজটি আরও কদিন পর করলেও অসুবিধার কিছু ছিল না। তাতে জনগণ ভোগান্তি থেকে রেহাই পেত।
আমি মনে করিনা, এই ঘটনা সেনাবাহিনীতে কোনো প্রভাব ফেলবে। তবে বিবদমান রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক নয়। আমাদের রাজনীতিতে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব সব সময়ই ছিল। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সবাইকে সহনশীল মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।


আমীন আহম্মেদ চৌধুরী বীর বিক্রম
: অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও সাবেক রাষ্ট্রদূত।

.........................................................................................................................

এভাবে উচ্ছেদ লজ্জার এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন

ক্ষমতা এমন একটি জিনিস, এখানে যে বসে সেই অন্ধ হয়ে যায়। দেশের এখন মার্শাল ল’ নেই। এভাবে উচ্ছেদ লজ্জার এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সরকার হয়তো ভেবেছে ২৯ তারিখ অন্য কিছু হবে। এসব আইনের শাসনের পরিপন্থী। আর কতো নিচে নামা হবে জানি না। এসব দেশের জন্য খারাপ। কারও জন্য ভালো হবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের, এভাবে থাকার জন্য স্বাধীনতা চাইনি। তিনি বলেন, তিন দিন পর ঈদ। এ সত্ত্বেও বিএনপি হরতাল দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের খুব অসুবিধা হয়েছে। কিন্তু হরতাল দেয়া ছাড়া বিএনপির কোনো উপায় ছিল না। তিনি বলেন, ভূমিকম্প, সুনামি দিন-তারিখ ঠিক করে আসে না। এটা আমরা চাই না। এ লক্ষ্যে আমাদের উচিত সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং এ ব্যবস্থা সচল রাখতে হলে উভয় দলকেই চেষ্টা করা।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক
সিনিয়র আইনজীবী

 

..............................................................................................................................

অসহায়ত্বের কাল কি কাটেনি?

শহীদ মইনুল রোডের বাড়িটি নিয়ে যে রকম বাড়াবাড়ি হচ্ছে এবং এর সঙ্গে রাজনীতি যেভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে, তা কাম্য ছিল না। মামলা যেহেতু চলছিল সেহেতু আদালতেই বিষয়টির চূড়ান্ত সুরাহা হতে পারত। অন্যদিকে খালেদা জিয়াও বাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার যে ভান দেখাচ্ছিলেন, তাও স্ববিরোধী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট কর্তৃপক্ষ তাঁকে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে জবরদস্তি করেছে বলে তাঁর দল এবং তিনি নিজে সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা শুধু সাধারণ মানুষের সহানুভূতি কাড়ার একটা প্রয়াস মাত্র। বাড়িটি নিয়ে এই নাটকীয় রাজনীতি তিনি না করলেই পারতেন। তাঁরাও একটি স্লোগান অন্যদের মতো বিশ্বাস করেন বলে প্রচার করেন_'ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়'। এ স্লোগানটির কোনো প্রতিফলন তাঁর বা তাঁদের কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়টি কেন্দ্র করে বিএনপি যে হরতাল ডেকেছে তাকে অবিবেচক সিদ্ধান্তের ফসল ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?

যখন দেশের অসংখ্য মানুষ ঈদুল আজহা পালনে নানা দিক থেকে ঘরমুখী ও কর্মব্যস্ত তখন এমন আকস্মিক হরতাল আহ্বান মানুষের ঈদ আনন্দকে চরমভাবে আঘাত করল। মানুষের বিপন্ন-বিপর্যস্ত অবস্থার চিত্র পুনর্বার এটিই প্রমাণ করল, তাঁদের রাজনীতি জনস্বার্থে নয়, ব্যক্তিস্বার্থে। অন্যদিকে মানুষ যেন বর্তমান সরকারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, এ জন্যও তাঁরা এ অপপ্রয়াস চালিয়েছেন। তবে অবশেষে তিনি যে বাড়িটি ছেড়েছেন, এ জন্য তাঁকে অভিনন্দন। এত দিন তিনি যে অজুহাতে একটি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে নিজ দখলে রেখেছিলেন সাড়ে তিন দশক পর আজও কি তা আঁকড়ে ধরে থাকা তাঁর পক্ষে যৌক্তিক? সেই অসহায়ত্ব এবং নিঃস্বতার কাল কি এখনো কাটেনি?

রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এভাবে কাউকে দিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার রাষ্ট্রের কারোরই নেই, আদালতও তা বলেছেন। আমাদের সবার উচিত আদালতের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা, আইনের শাসন মেনে চলা। রাজনীতির মাধ্যমে একটি আইনি বিষয়কে জটিল করে বেগম জিয়া ও তাঁর দল যে ফায়দা লুটতে চাচ্ছেন, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেন তিনি একই সুযোগ গ্রহণ করে বিশাল বাড়িতে একাকী বসবাস করছিলেন এবং সরকারের অনুকম্পায় পাওয়া আরেকটি ভাড়ায় দিয়েছেন? এ তো কোনো দেশের বিরোধীদলীয় নেতার (যিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন) মনোভাব হতে পারে না।


কামাল লোহানী
: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমী

 

.....................................................................................................

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অপমানকর আচরণ ছাড়াও আইনি প্রক্রিয়া ও মানবতাবিরোধী ব্যবহার করা হয়েছে

বেগম জিয়াকে যখন বের করে দেয়ার জন্য পুলিশ বাহিনী হাজির হয় তখন প্রথমেই বেগম জিয়ার বাড়ির কর্মচারীদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন বেগম জিয়া একা হয়ে পড়েন। তারপর তাকে জোর করে উচ্ছেদ করা হয়। বাংলাদেশে নারী, বৃদ্ধ এবং শিশুদের সঙ্গে কখনই এরকম আচরণ করা হয় না। তাদের স্থানান্তর করতে হলে, এমনকি তারা স্বেচ্ছায় কোথাও যেতে চাইলে তাদের সঙ্গে একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গী দেয়া হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী একজন বিধবা এবং প্রবীণা। তাকে একাকী নিয়ে যেভাবে হেনস্থা করা হয়েছে তা আমাদের দেশের এবং মুসলমানদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা আমাদের সারাদেশের জন্য লজ্জাজনক হয়ে থাকল। তাই আমার মনে হয় হরতালকে যারা স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন করেছেন তারা বেগম জিয়ার লাঞ্ছনাকে বড় করে দেখেছেন।


দ্বিতীয়ত, এ ঘটনা ঘটে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভেতরে। আমরা জানি বিশ্বের সব সুশৃঙ্খল সশস্ত্র বাহিনীর একটি কোড অব অনার আছে। আমার মনে হয় বেগম জিয়ার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে এবং তার বাড়ি নিয়ে এখনও যে অপপ্রচার করা হচ্ছে, তা ওই ধরনের কোড অব অনারের মারাত্মক ব্যত্যয়।


তৃতীয়ত, আইনি প্রক্রিয়ায়ও যদি উচ্ছেদ করা হতো, তাহলে সে সময় সেই প্রক্রিয়ায় গ্রহণযোগ্য সাক্ষী রাখতে হতো। যেমন বাড়িতে যেসব মালামাল থাকত, তার ফটো তৈরি করা। বাড়ির চাবি হস্তান্তর করা। আদালতে এসব কাজের এমন সাক্ষী যিনি দেশের আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন, তাকে হাজির রাখা উচিত ছিল। অথচ বেগম জিয়াকে উচ্ছেদ করার সময় তার ভাইদের কাউকে, তার অন্য কোনো আত্মীয়স্বজনকে, তার কোনো আইনজীবীকে, তার কোনো রাজনৈতিক সহকর্মীকে অথবা কোনো সাংবাদিককে ওই বাড়ির ত্রিসীমানার কাছাকাছি যেতে দেয়া হয়নি। কাজেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অপমানকর আচরণ ছাড়াও আইনি প্রক্রিয়া ও মানবতাবিরোধী ব্যবহার করা হয়েছে।


তবে সর্বশেষ আমার একটি প্রশ্ন আর সেটি হচ্ছে গত শনিবার বেগম জিয়ার আইনজীবীরা ক্যান্টনমেন্টের চালু প্রক্রিয়া স্থগিত করার জন্য প্রধান বিচারপতির বাসস্থানে গেলেন, অথচ এর আগে তার এজলাসে লিভ টু আপিলের দিন ধার্যের শুনানির সময় বেগম জিয়ার বিজ্ঞ উকিলরা স্থগিতাদেশে এ আবেদনের কথা উল্লেখ করতে ব্যর্থ হলেন কেন? সেক্ষেত্রেতো বিষয়টি সেদিনই আদালতে সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারত।

 

আতাউস সামাদ
প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট সাংবাদিক

.....................................................................................................

আইন ও নৈতিকতার বিষয়


বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার ঢাকা সেনানিবাসের বাড়ি ছাড়া নিয়ে রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে। শুরু হয়েছে আবারও রাজপথের সহিংসতা। বাড়িটি নিয়ে দলনিরপেক্ষ অগণিত মানুষের অনেক প্রশ্ন বহুকাল ধরেই অমীমাংসিত ছিল। সন্দেহ নেই, বাড়িটি বরাদ্দ করা হয়েছিল একটি বিশেষ সময়ের বিশেষ পরিস্থিতিতে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একজন রাজনৈতিক নেত্রী সেনানিবাস থেকে দল পরিচালনা করতে পারেন কি না, বিষয়টি নৈতিক কি না; একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রী একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দুটো বাড়ি রাখার অধিকার রাখেন কি না_এসব প্রশ্ন কখনোই স্তিমিত হয়নি। বলাবাহুল্য, এসব প্রশ্নের মীমাংসা হয়েছে মাননীয় হাইকোর্টের গত মাসের রায়ে। বিরোধীদলীয় নেত্রীকে দেওয়া সেনানিবাসের বাড়িটি বৈধ পন্থায় দেওয়া হয়নি, ৩০ দিনের মধ্যে তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হবে_এই ছিল রায়। আইনসম্মতভাবেই এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দরখাস্ত দাখিল করেছেন বেগম জিয়া। ২৯ নভেম্বর যার পরবর্তী শুনানি।

আইনের ঘোরপ্যাঁচ বেশি না বুঝলেও কেউ কেউ এটি নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করলেও স্পষ্ট বোঝা গেছে, বিষয়টি আইনি। এর সমাপ্তি আশা করেছিলেন সবাই আইনের পথেই। হাইকোর্টের রায় মতে, ১২ নভেম্বরের মধ্যে বাড়িটি ছাড়তে হবে। কিন্তু এর পরও আছে সুপ্রিম কোর্ট। অবশ্য বিতর্ক ছিলই_হাইকোর্টের রায়কে স্থগিত করেননি সুপ্রিম কোর্ট। তাহলে কী হবে? দুই পক্ষের আইনজীবীদের মতভেদ আছে এ নিয়ে। ঠিক এ সময়ই দিনভর নাটকীয় ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া বাড়ি ছেড়েছেন। সশস্ত্র বাহিনীর যথাযথ কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার ভাষায় বারবার বলেছে, বিরোধীদলীয় নেত্রী স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে ছেড়েছেন। আবার বিরোধীদলীয় নেত্রী স্বয়ং সংবাদ সম্মেলন করে জানান, তাঁকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে।

১৩ নভেম্বর দিনব্যাপী টিভি পর্দায় যখন ঘটনাপ্রবাহ দেখছিলাম, নেতা-নেত্রীদের কথাবার্তা, বাদানুবাদ শুনছিলাম শুধু এ প্রশ্নটিই মনে এসেছে, নিছক একটি আইনি বিষয় কীভাবে রাস্তার রাজনীতির বিষয় হয়ে যায় কিংবা তা করা হয়! এ দেশেই হয়তো তা সম্ভব! রাজনীতিতে রুচি যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সংযম। সহিংসতা এবং অসহিষ্ণুতা কোনো দিন কোনো সমাজের মঙ্গল বয়ে আনে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে রাজনীতি-সংস্কৃতিতে দেশ আছে, তাতে এ বাড়ি নিয়ে রাজনীতির ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা হবে। হয়েছেও। যানবাহন পোড়ানো হয়েছে। ঈদের দুদিন আগে দেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়েছে। ঘরমুখো লাখো মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। পরীক্ষা বন্ধ হয়েছে। ঈদের আগে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন হরতালের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু যায় আসে না এ দেশে। মানুষ নিয়ে রাজনীতি করা হলেও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ এখানে মুখ্য নয়। কবে এই দুর্ভাগ্যজনক রাজনীতি-সংস্কৃতি পেরিয়ে আমরা সভ্য রাজনীতির দিকনির্দেশনা পাব, জানি না।


হারুন হাবীব
: সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও মুক্তিযোদ্ধা

.........................................................................................................................


শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে পারেনি সরকার


খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের গুজব ছড়িয়ে পড়ে শুক্রবার সন্ধ্যার পর। যাঁরা গুজব শুনেছেন তাঁরা কারণও জেনেছেন। শুক্রবার আর শনিবার সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ। খালেদা জিয়াকে এই দুই দিনের মধ্যে উচ্ছেদ করা হলে তাঁর আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে ছুটে গিয়ে স্টে অর্ডার নিয়ে উচ্ছেদ বন্ধ করতে পারবেন না। যাঁরা গুজবে বিশ্বাস করেননি, তাঁরা ভেবেছেন সরকার এতটা বাড়াবাড়ি করবে না হয়তো। তাঁদের বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে। শনিবারেই খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

এ সম্পর্কে সরকার ও সরকারের পক্ষের লোকজনের ভাষ্য শুনলাম। তাঁদের যুক্তি, বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার যে আদেশ হাইকোর্ট দিয়েছেন, তা স্থগিত করার আবেদন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা করেননি। হয়তো সত্যি তাঁরা তা করেননি। কিন্তু আপিল বিভাগ ২৯ নভেম্বর আপিলের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, এর শুনানির দিন তো ঠিক করেছিলেন। এর আগেই তাঁকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলে ২৯ তারিখের শুনানি কি অর্থহীন বা আইনের ভাষায় ইনফ্র্যাকচুয়াস হয়ে যায় না? ২৯ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করলে এবং রায় সরকারের পক্ষে গেলে অনভিপ্রেত ঘটনার কোনো সুযোগ আর থাকত না। খালেদা জিয়াকে তখন নিজে থেকেই বাড়ি ছেড়ে দিতে হতো। ২৯ তারিখ বা অন্তত রোববার ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করলে খালেদা জিয়ার পক্ষে আপিল বিভাগের কাছে গিয়ে উচ্ছেদ স্থগিত রাখার সুযোগও থাকত। সরকার খালেদা জিয়াকে সেই আইনি সুযোগ দিতে চায়নি কেন?


আইন আর বিচারব্যবস্থার অন্যতম দার্শনিক মূলনীতি জনস্বার্থ। ২৯ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করে খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়তে আইনগতভাবে বাধ্য করা হলে কি জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হতো? হতো না। যে দেশে বহু দুর্নীতিবাজ, ভূমিদস্যু, ঘৃণিত ব্যক্তির অবৈধ দখল উচ্চ আদালতের স্টে অর্ডারে কিংবা সরকারের শৈথিল্যে অব্যাহত থাকে, সে দেশে এত অত্যুৎসাহী হয়ে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধী দলের নেত্রীকে প্রায় ৪০ বছরের বাসভবন থেকে উৎখাত স্বাভাবিক বিষয় নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, হাইকোর্ট সরকারকে বলেছিলেন খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়তে কমপক্ষে ৩০ দিন সময় দিতে। কমপক্ষে ৩০ দিন মানে ৩২তম দিনেই কাজটি করার বাধ্যবাধকতা নয়। সরকার বরং আরও কিছুদিন অর্থাৎ আদালতের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করার শুভবুদ্ধি দেখাতে পারত। দেশ তাতে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত আর অনিশ্চয়তা থেকে বেঁচে যেত। সরকারের আচরণ ও নিয়ত থাকত অনেকাংশে প্রশ্নমুক্ত।


সরকারের একজন মন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, সরকার কিছু করেনি, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু এমন বক্তব্য হাস্যকর। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড সরকারের অধীন এবং সরকারেরই একটি অংশ। একজন প্রতিমন্ত্রী অশালীন ভঙ্গিতে এটিএনকে বলেছেন, ‘খালেদাকে উচ্ছেদ করা হলে তিনি সাজুগুজু করার সময় কোথায় পেলেন?’ তাঁর বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য নয়। উচ্ছেদ হতে পারেন, বহু ঘণ্টা আগে এটি জেনে একজন ভদ্রমহিলা আলুথালু ভঙ্গিতে মিডিয়ার কাছে হাজির হতে পারেন না। এসব আলোচনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে এটি প্রমাণ করে সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যের সারবত্তা নেই কিংবা সারগর্ভ বক্তব্য দেওয়ার যোগ্যতা তাঁদের নেই। যে দুজন মন্ত্রীর কথা বললাম, তাঁরা কেউই বড় রাজনীতিক নন, একজন এমনকি জনপ্রতিনিধিও নন। আমার ধারণা, খালেদা জিয়ার বাড়ির বিষয়টি যদি আওয়ামী লীগের পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হতো তাহলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না দেশে।


খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের সঙ্গে শেখ হাসিনার গণভবন ত্যাগ করার তুলনা টেনেছেন কেউ কেউ। কিন্তু আসলে দুটি ঘটনা অবিকল নয়। শেখ হাসিনাকে গণভবন বরাদ্দ দিয়েছিল তাঁরই সরকার, খালেদাকে অন্য একটি সরকার। খালেদা জিয়ার বরাদ্দ বাতিল করেছে হাসিনার সরকার। আর শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। পরে খালেদা সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে গণভবনের বরাদ্দ বাতিল করা হয়। ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটি মূলত একটি বাসভবন, গণভবন কোনো বাসভবন নয়। তাই বলে আমি বলছি না, ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি নিজ দখলে রাখার সংকল্প সমর্থনীয় এ কারণে। পরিবারে সচ্ছলতা আসার পর ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি নিজেই ছেড়ে দিতে পারতেন খালেদা জিয়া। সেটি বড় মাপের মানুষ ও নেতার পরিচায়ক হতো।


এ ক্ষেত্রে বড় মাপের পরিচয় দিতে না পারা খালেদা জিয়ার ব্যর্থতা, কিন্তু অন্যায় নয়। খালেদা জিয়ার অন্যায় অন্য জায়গায়। তাঁর আমলে শেখ হাসিনার প্রাণনাশের নির্মম ও ভয়াবহ প্রচেষ্টা হয়েছিল। তিনি বলতে পারেন এ সম্পর্কে তিনি আগে জানতেন না। কিন্তু এর দায়, বিশেষ করে এর হাস্যকর তদন্তের দায়, তিনি সরকারপ্রধান হিসেবে এড়াতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধুর আরেক কন্যা শেখ রেহানার নামে বরাদ্দ করা জায়গায় নিজে উপস্থিত হয়ে থানা উদ্বোধনের অনভিপ্রেত আচরণের দায়ও তিনি বিস্মৃত হতে পারেন না।


দুই নেত্রী এভাবেই পরস্পরকে আঘাত করে চলেছেন। হয়তো তাঁদের মধ্যে কাজ করে এক ধরনের অবজ্ঞা ও প্রতিশোধস্পৃহা। কিন্তু এর মূল্য তো দিতে হয় তাঁদের দুজনকেই! এর মাশুল দিতে হয় জনগণকেও। সর্বশেষ ঘটনায় তা-ই ঘটেছে। শেখ হাসিনার সরকার খালেদাকে শান্তিতে ঈদ করতে দিলেন না, তাঁর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেন না। বিক্ষুব্ধ খালেদা জিয়ার দল হরতাল ডেকে জনগণের নির্বিঘ্নে ঈদের প্রস্তুতি নিতে দিল না। দেশের অর্থনীতি, জনগণের নিরাপত্তা, এমনকি কোমলমতি শিশুদের পরীক্ষার মারাত্মক বিঘ্ন ঘটার মূল দায় এই দুই নেত্রীর।


হতে পারে দুজনের আশপাশে সুপরামর্শ দেওয়ার লোক নেই। হতে পারে পরিকল্পিতভাবে সংঘাত সৃষ্টি করে দেশে আরও একবার এক-এগারো ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে তাদের আশপাশের কোনো কোনো মহল। কিন্তু দুই নেত্রী যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারেন, যদি কারও উসকানি বা যড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেন, তাহলেও তা তাঁদের ব্যর্থতা। দুঃখ হচ্ছে, এই ব্যর্থতার মূল্য শুধু তাঁদের দুজনকে নয়, সারা দেশকে দিতে হচ্ছে, দিতে হবে।

 আসিফ নজরুল:
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

.............................................................................................................................

হরতাল ডেকে মানুষের বিচার করার পথ রুদ্ধ করলেন


১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একটি সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। আক্রান্তকারীদের গুলিতে তাঁর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাঁকে চট্টগ্রামে প্রথমে দাফন করা হয়। পরে আবার তাঁর লাশ নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। দুর্জনরা বলে থাকে, চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসা বাঙ্ েকোনো লাশ ছিল না। তবুও সরকারি প্রচারযন্ত্রের সুবাদে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর তাঁকে অতি-মানবের পর্যায়ে উপনীত করা হয়। তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন, সেনাপ্রধান ছিলেন; কিন্তু তখন প্রচার করা হয়, তাঁর কোনো অর্থ-বিত্ত নেই। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার ৪০ দিন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বা বিটিভিতে দোয়া মাহফিলের পাশাপাশি এই চরম দারিদ্র্য প্রদর্শন করা হতো। একটি ভাঙা সুটকেস থেকে ছিন্ন গেঞ্জি বা কিছু পুরনো কাপড় সারা দিন প্রদর্শিত হতো। সাধারণ মানুষের মধ্যেও তখন একটি আবেগ তৈরি হয়। এ আবেগকে কাজে লাগিয়ে জিয়াউর রহমানের গড়ে তোলা তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সরকার তাঁর পরিবারকে শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি এবং গুলশানের একটি বাড়ি অনুদান হিসেবে প্রদান করে। এমনকি এ পরিবারের ভরণ-পোষণ ও সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্বও তখন রাষ্ট্র গ্রহণ করে, যদিও সন্তানদের পড়াশোনা ওই অর্থে কিছু হয়নি।


বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার কিয়ৎকাল পর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড তাঁকে এ বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেয়। তিনি নোটিশের বিরুদ্ধে কোর্টে রিট করে হেরে যান। এ ক্ষেত্রে শুধু তিনি কোর্টেই হারলেন না, রাজনীতিতেও হেরে গেলেন। কারণ এ বিষয়টি নিয়ে কোর্টে যাওয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত ছিল, তা বিএনপির রাজনীতিবিদরাই এখন চিন্তা করবেন। কারণ কোর্টের রায় বিপক্ষে যাওয়ার পর তা নিয়ে রাজনীতি করলে সচেতন মানুষ তাকে ভালোভাবে নেবে না_এটা আগেভাগেই অনুধাবনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। কোর্টের নির্দেশমতো বাড়ি ছাড়ার সময়সীমা ছিল ১২ নভেম্বর। খালেদা জিয়া এ রায়ের কার্যকারিতা স্থগিতের আবেদন করেননি। এ ক্ষেত্রে তিনি আইনি সুযোগ হাতছাড়া করেছেন। তিনি বোধ হয় বিস্মৃত হয়েছেন যে কিভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণভবন থেকে বিদায় করেছিলেন। মন্ত্রিসভার মাধ্যমে গণভবন শেখ হাসিনার নামে বরাদ্দ করা হয়েছিল এবং জাতির পিতার পরিবারবর্গকে এসএসএফের নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল, যদিও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা শেখ হাসিনাকে এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া হতে নিষেধ করেছিলেন। ওই সময় সরকারের কাছ থেকে শেখ রেহানার নামে লিজ দেওয়া দুই কাঠা জমির বরাদ্দও খালেদা জিয়া বাতিল করে সেখানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেন। এমনকি তাঁদের প্রদত্ত এসএসএফের নিরাপত্তাও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

১২ নভেম্বর আদালতের বাড়ি ছাড়ার সময়সীমা অতিক্রমের পর ১৩ নভেম্বর শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি যথাযথ কর্তৃপক্ষ (ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড) পুনরুদ্ধারে চলে আসে। খালেদা জিয়া হয়তো আগেই তা অনুমান করেছিলেন এবং বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছিলেন বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশ। এ জন্য কর্তৃপক্ষের উপস্থিতির পরপরই ৬১ জন কর্মচারী বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তারপর এখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন খালেদা জিয়া। তাঁর ভাষায়, ঘরের দরজা ভেঙে তাঁকে অনেকটা টেনেহিঁচড়েই বের করা হয়। অতঃপর তিনি তাঁর নিজের গুলশানের বাড়িতে বা বিরোধীদলীয় নেতার ২৯ মিন্টো রোডের বাড়িতে না গিয়ে সোজা দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত হন। ততক্ষণে বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী বিক্ষোভে অংশ নেন। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে_ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের লোকজন উপস্থিত হওয়ার পর তিনি ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে ছিলেন কি না? কেনই বা দরজা বন্ধ করে থাকলেন? তিনি বিরোধী নেতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জোরালো ভাষায় কথা না বলে তাদের জবরদস্তি করার সুযোগই বা করে দিলেন কেন? এই সময়ের মধ্যে হয়তো তিনি দলীয় কর্মীদের চাঙা করতে চেয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি বাড়িতে হয়তো এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছেন, বাড়ি উদ্ধারকারী দল তাঁর সঙ্গে অসদাচরণ করুক, যা তিনি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে পারেন। যেকোনো রাজনৈতিক নেতাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে গেলে তাঁরা স্বেচ্ছায়ই পুলিশের গাড়িতে উঠে পড়েন। কিন্তু খালেদা জিয়া এ ক্ষেত্রে এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশার সমপর্যায়ে উপনীত হলেন। ফলে সরকার এটিকে নাটক বলার সুযোগ পাচ্ছে।


জিয়াউর রহমান যে তাঁর পরিবারকে কপর্দকশূন্য রেখে যাননি তাঁর অনেক প্রমাণ পরবর্তী সময়ে পাওয়া গেছে। তাঁর পেনশনের ১০ লাখ টাকার এফডিআর রয়েছে। গাজীপুর ও সাভারের জায়গার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। এ ছাড়াও তাঁর দুই সন্তানের নামে প্রায় ২২টি শিল্প-কারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই এখন আর তাঁকে কপর্দকশূন্য বলা যায় না। খালেদা জিয়া যে সত্যিকারের ভিখিরি নন, তার প্রমাণ মিলেছে ৬১ জন কর্মচারীর ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ত্যাগের মধ্য দিয়ে। তিনি একজন রাজনীতিবিদ। জনগণের সঙ্গে বসবাস করাটাই তাঁর জন্য শ্রেয়, ক্যান্টনমেন্টে নয়। তদুপরি সেনা আইনে সেনানিবাসের মধ্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে তিনি নিষিদ্ধ কাজটিই করে আসছেন। তিনি কর্মীদের উসকে দিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের জানমালের ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। হরতাল ডাকার কারণে ঈদ-পূর্ববর্তী সময়ে ঘরমুখো মানুষের জীবনে যে দুর্ভোগ নেমে এসেছে তার দায়দায়িত্ব তাঁকে অংশত হলেও বহন করতে হবে। ঈদের তিন দিন আগে ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতিসাধন করা হলো, তা পুষিয়ে নেওয়া যাবে না। অথচ ২০০১-এ গণভবন ত্যাগের পর শেখ হাসিনা হরতাল বা অনুরূপ কোনো কর্মসূচি দেননি। তিনি দেশের মানুষের কাছে বিচার চেয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া হরতাল ডেকে নিজেই মানুষের বিচার করার পথ রুদ্ধ করে দিলেন।


মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

..................................................................................................................................

রাজনীতির রীতি ও নীতি


ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে খালেদা জিয়ার নামে নামমাত্র প্রতীকী মূল্যে ৯ বিঘা জমির ওপর নির্মিত বাড়িটির ইজারা প্রত্যাহারের বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শানিত করবে মনে করি। বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক চারটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।

প্রথমত, কোনো ব্যক্তির নামে সরকারি সম্পত্তির এ চিরস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্ত দেশের স্বার্থবিরোধী। অর্থাৎ এ সিদ্ধান্ত শুরুতেই যথার্থ ছিল না।

দ্বিতীয়ত, যে প্রশ্নটি জরুরি, এ সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন আর কার জন্য নিয়েছিলেন? উত্তরটা সর্বজনবিদিত। সেনা অভ্যুত্থানে নিহত অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারী সেনাপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী-পুত্রদের জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারী সেনাপতি এরশাদ। আমরা সাধারণ জনগণ কারো হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়ন যেমন সমর্থন করি না, তেমনি এ-ও সত্য যে এসব কারণসূত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়-সম্পত্তি নিয়ে ছিনিমিনি খেলাও সমর্থন করি না। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেনাপতি জিয়ার স্ত্রী-পুত্রদের জন্য ভিন্ন কিছু করার অবকাশ নিশ্চয়ই ছিল। যেমন_বেগম জিয়ার জন্য প্রযোজ্য কোনো চাকরি-বাকরির ব্যবস্থা করে তাঁর সন্তানদের জীবনযাপনের নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব ছিল।

তৃতীয়ত, এই ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্ত মহামান্য আদালত কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। সুতরাং এর বিপক্ষে আদালতে না গিয়ে রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো, হরতাল ইত্যাদি দেশের বিচার বিভাগকে অসম্মান করাই শুধু নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায় বলে মনে করি। তা ছাড়া এমন একটা সময়ে এই হরতাল ডাকা হলো, যখন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে লাখ লাখ মানুষ ঘরমুখো। তাদের অন্তহীন বিড়ম্বনার চিত্র আমরা টেলিভিশনে দেখেছি।

চতুর্থত, ইংরেজিতে যেভাবে বলে লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, বেগম জিয়া যদি রাজনীতি করতেই চান, তবে তাঁর সংরক্ষিত এলাকা ক্যান্টনমেন্টে না থেকে জনগণের মধ্যে বসবাস করাই সমীচীন। সেটিই রীতি ও নীতি।

ড. খুরশীদা বেগম
: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

10Comments

1
roxxky
Tue, 08/05/2012 - 2:56am

I recently found many useful information in your website especially this blog page. Among the lots of comments on your articles. Thanks for sharing. personal statement essay

2
roxxky
Mon, 30/04/2012 - 2:32am

Essay writer I wanted to thank you for this excellent read !! I definitely loved every little bit of it. I have you bookmarked your site to check out the new stuff you post

3
roxxky
Fri, 20/04/2012 - 12:34am

Personal statement writersGreat Buddy , Thank you for sharing information.

4
vivienbing
Mon, 16/04/2012 - 11:42am

It never ceases to amaze me Rockstar Energy hats the Internet can be to traditional businesses and practices. Companies that are unwilling to use NBA Snapback Hats technology in their favour put NFL 59Fifty Fitted Hats at a disadvantage.

5
jamesbro147
Tue, 03/04/2012 - 7:37pm

Well, really. It’s been a while. I wonder about the list.
Regards, james

website marketing companies | los angeles web design

6
actiform
Thu, 13/10/2011 - 7:21pm

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ি বরাদ্দের বৈধতা নিয়ে আদালতে যে ফয়সালা হওয়ার কথা সেটিকে রাস্তায় নিয়ে আসা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

bruleur de graisse

7
andalib masud
Wed, 17/11/2010 - 12:09am

 


  There may be lot of arguments and counter arguments in favour of evictions of Kheleda Zia from Shahid Moinul road house but general public expect a more matured action and behaviour from AL. Because AL is the oldest political party in the country and it has lot of contribution towards the liberation of this country. AL should behave in such a manner so that other should take lessons and follow its good qualities and actions. This incident will deffinitely increase the gap between Govt and opposition which is very much detrimental for the country. The more we go up and close to the power we should be more and more polite and broad hearted. I have lot of doubt whether Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman would have done it, if he was alive. Is AL going a way from Bangabandhu's idology ?

8
bdguru
Tue, 16/11/2010 - 1:49am

Vhai ami desher ak jon oti saderon nagorik. ato kichu bujhe na. Khaleda Zia tar bari nia issue kora hortal na dia desher atogulo manush ka eid ar aga kosto na dilao parten. Jara din ana din khai, kothor porishom kora chola, tader kotha vaba uchit chilo. Kintu tini ta koren ni. Atai amade political culture. Self interest...ar sob gurutohin.

Morhum Ziaur Rahman ar potni hober subada tini politics a ashachilen jar joggo tini ba tar poriber a sodoso ra non. Amader desha political dunesty chola ascha. Onner aloay alokito hoya khomotai ashea desher manusher 12 ta bajia dan. Govt ar thaka obostai abong opposition a thakao tader hat thaka rahai pan na kao. Ki ja hoba a deshter!

Vahi Engraji ta likce na jano bidleshi ra na porta para amader a sob dukher kotha.