আমি প্রবাসী। ২০০৮ সালে রাজউক যখন উত্তরা ও পূর্বাচল প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দিল, তখন পরিবারের সবাই পরামর্শ দিল সুযোগটি গ্রহণ করতে। অন্য অনেকের মত আমিও বেশ আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এবং পাওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলতে উত্তরা ও পূর্বাচল, দু’জায়গাতেই আবেদন করলাম। ইতোমধ্যে দু’বছর হয়ে গেল। আর এ দু’বছরে আমি রাজউক প্রসঙ্গে কতটা মানসিক চাপের মধ্যে গিয়েছি তা যদিও ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়, তবু শেষ পর্যন্ত না লিখে পারলাম না।
রাজউক প্লট বরাদ্দের আবেদন চেয়ে বিজ্ঞপ্তি পরিবর্তন করেছে তিন তিনবার! কোন ব্যাপারেই যেন তারা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। হলফ নামা বদলালো, ব্যাংকের সুইফট কোড দিল ভুল, তাই টাকা পাঠাতে হলো সনাতনী পদ্ধতিতে। যোগাযোগ করলে গালাগালি শুনতে হল। যাই হোক, এসব সত্ত্বেও ডাক এবং ইমেইল দু’ভাবেই আবেদন করলাম। কিন্তু রাজউক কোনটারই জবাব দেয়ার কোন পদ্ধতি রাখেনি প্রবাসীদের জন্য। তাই আমার আবেদন তাদের কাছে সঠিকভাবে পৌছেছে কি-না, তা জানতে পারলাম না। ফোন করলে ধরে না, ধরলে একটাই কথা, তাদের এত লোকবল নেই বা চলতি মাসেই হবে! একটা ইমেইল এর অটো রেসপন্স সেট আপ করার মত লোকবল ডিজিটাল বাংলাদেশের রাজউকের নেই! এর জন্য শুধু দরকার পরিকল্পনা আর সদিচ্ছার, তাও যেন বুঝতে চায়না তারা। এরপর পত্রিকায় পরলাম রাজউক এর ইমেইল এর পাসওয়ার্ড চুরি হয়েছে, প্রবাসীদের কাছ থেকে জমি বরাদ্দের আশ্বাস দিয়ে টাকা নিচ্ছে রাজউক কর্মকর্তারা; আবার শোনা গেল, রাজউক এর তহবিল থেকে টাকা সরিয়ে নেয়া হবে! এর কোন তদন্ত হয়েছে?
রাজউকের নিত্য অনিয়ম, দূর্নিতী আর অযোগ্যতার খবর পড়ে আর দেখে এভাবে কেটে গেল একবছর! ২০০৯ সালের শেষ দিকে একদিন পত্রিকায় পড়লাম লটারী হবে। নানা ক্যাটাগরীতে লটারী হবে না। এই দোলাচল। প্রবাশী অনেকের কাছে আবার ফোন আসে, প্লটের নিশ্চয়তা নিয়ে। এসব নিয়ে এত অনিয়ম আর দুর্নীতির কথা পড়েছি যে, জমি পাওয়ার আসা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তাই দীর্ঘ এক বছরের অভিজ্ঞতার পর, লটারী অনুষ্ঠিত হবার খবর আমাকে আলোড়িত করতে পারল না। আমি চিন্তা করছিলাম, কিভাবে জামানত ফেরত পাওয়া যাবে বা আদৌ ফেরত পাব কি-না। পত্রিকার অনলাইন সংস্করনে অন্যান্য খবর পড়তে পড়তে লটারীর ফলাফল পেয়ে গেলাম, আর নিজের নামটি আবিষ্কার করলাম বরাদ্দপ্রাপ্তদের তালিকায়। কিন্তু আমার মধ্যে এতটাই অনাস্থা সৃষ্টি করতে পেরেছিল রাজউক’র কর্মকান্ড যে, সবগুলো পত্রিকা ক্রসচেক করেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। এবং প্রবাসীদের কেউই আমার কথা প্রথমে বিশ্বাস করে নি। এমন কি আমার পরিচিত যারা পেয়েছে তারাও না। কারনটা খুবই স্পস্ট, অনাস্হা!
যাই হোক, শুরু হলো নতুন অপেক্ষা। বরাদ্দপ্রাপ্ত জমির টাকা জমা দিতে হবে। আর অন্য আবেদন এর জামানত ফেরত পেতে হবে। এর মধ্যে খবর শুনলাম, রাজউক বিজ্ঞপ্তিতে জমির যে দাম উল্লেখ করেছে, তা বেড়ে যেতে পারে। বেশ কিছুদিন আলোচনা সমালোচনার পর রাজউক জানাল যে, জমির দাম আর বাড়ানো হবে না। এভাবে প্রায় একটি বছর চলে যাওয়ার পর, অক্টোবর মাসের শেষ দিনের মধ্যে জমির টাকা চেয়ে রাজউক চিঠি পাঠাতে শুরু করলো, সেপ্টেম্বর মাসে। পরে সময় বাড়িয়ে করলো ডিসেম্বর মাসের শেষ দিন পর্যন্ত। আমি আমার সেই কাঙ্খিত চিঠিটি পাই অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে। অনেক কাঠখড় পোরানোর পর। খাম খোলার আগের মূহুর্তটি পর্যন্ত বুঝতে পরিনি, কি বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করছে! রাজউক পূর্ব নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশী টাকা দাবি করেছে। আমি দ্রুত রাজউক এর ওয়েবসাইট খুললাম, দেখলাম, না আগের দামই এখনো আছে, নতুন কোন বিজ্ঞপ্তি নেই। ভাবলাম আমি ভুল করছি। স্বভাবতই সবাই বলল, আমি রাজউকের ভূয়া চিঠি পেয়েছি। আরও যারা উত্তরা বা পূর্বাচলে রাজউক এর প্লট বরাদ্দ পেয়েছে তাদের সাথে যোগাযোগ করে জানাল, রাজউক জমির দাম বাড়িয়েছে! আমি আবার রাজউক এর ওয়েবসাইট চেক করলাম, ভাবলাম আমার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে। দেখলাম, আমি কোন ভুল করছি না। রাজউক সত্যিই ধোঁকা দিয়েছে। স্বাধারনের আগ্রহকে পুঁজি করে সীমাহীন ধোঁকা। রাজউকে যোগাযোগ করলে, তারা বললেন, ভাল না লাগলে ছেড়ে দিন, ভাল দাম দেয়া হবে! আমি বিশ্ময় ধরে রাখতে পারলাম না। মনে করলাম জাতীয় এ প্রতিষ্ঠাতটির সুবুদ্ধি ঘটাতে পারে একমাত্র মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, আর পত্রিকার সাংবাদিক ভাইএরাই এক কাজটা করতে সহায়তা করতে পারেন।
রাজউক অন্যান্য কাজে তাদের পারদর্শিতা দেখাতে না পারলেও, ধোঁকা দেয়ার ক্ষেত্রে পেরেছে। কোন বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে, সংবাদ সম্মেলন না করে লুকিয়ে এ কাজটা করে তারা সফল হয়েছে। কারন, বিষয়টি মিডিয়াতে আসলে আলোচনা হতো প্রতিবাদ হতো আর রাজউক কে যথার্থ কারন দেখিয়ে জমির দাম বাড়াতে হতো। অযোগ্যতা ও অব্যবস্থাপনা কোন যুক্তি হতে পারতো না সেখানে। কিন্তু প্রতিটি বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আলাদাভাবে যখন চিঠিতে সরাসরি জানাচ্ছে, তখন প্রতিবাদটা সেভাবে হচ্ছে না। আর ৩১ ডিসেম্বর এর মধ্যে টাকা দেয়ার প্রক্রিয়া শেষ না হলে বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে, তাই সবাই টাকা পরিশোধ নিয়ে ব্যস্ত।
সময়ের প্রয়োজনে যদি প্লটের দাম বাড়ানো যৌক্তিক হয়, রাজউক জমির দাম বাড়াতে পারে। কিন্তু কোন বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে এভাবে মানুষকে ধোঁকা দিতে পারেনা তারা। এটা ব্যক্তির সাথে রাস্ট্রের শর্ত ভঙ্গের সামিল। এর উত্তর কে দেবে? কারন আমরা রাজউকের অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে একটা নির্দিষ্ট মূল্য দেখে আবেদন করেছি। এখন তা বাড়িয়ে কেন এত বেশী বৃদ্ধি করা হলো, তা জানার অধিকার আমাদের আছে। আর কর্তৃপক্ষেরও যদি সৎ সাহস ও উদ্দ্যেশ্যই থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই তারা তা সবার সামনে প্রকাশ করবে। এটাই আমার দাবি। আর সবশেষে একটা প্রশ্ন, যাদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহন করেছে রাজউক, তারা কি এর ফলে কোন বাড়তি সুবিধা পাবে? তাদেরকে কি তিন গুন ক্ষতিপূরন দেয়া হবে?
রাকউকের অফিসিয়াল মূল্য পাওয়া যাবে (পেমেন্ট ইন ফরেইন কারেন্সি লিংকে)
http://www.rajukdhaka.gov.bd/rajuk/projectsHome?type=purbachal#ui-tabs-12
লক্ষ্যকরুন, ৩ কাঠার প্লটের ১ম কিস্তির পরিমান(১৯৯৯ ডলার) ঘোষিত মূল্যের দুই কিস্তি(১ম ও ২য়) (৩৫০০ ডলার) কত নিকটে। অনুরূপ ভাবে ১০ কাঠার ১ম কিস্তির পরিমান( ১৩, ৯৯৩ ডলার) ঘোষিত মূল্যের দুই কিস্তি(১ম ও ২য়) (১৫৩৩৪ ডলার) কত নিকটে।
সর্বোপরি, রাজউক যদি বরাব্দ প্রাপ্তদের চিঠি ইস্যুর ঝামেলা না করে, ফলাফল প্রকাশের মত করে ওয়েব সাইটে দিত, আর জামানত ফেরতের বিষয়টিও ডিজিটাল করতো, তাহলে রাষ্ট্র আরেক ধাপ কালো টাকা আর জনতা হ্য়রানির হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেত! সবার শেষে এটা বলতে চাই, অনেক সময় শুনি স্বপ্রনোদিত হইয়া অনেকেই বিচার শুরু করছেন, কেউ কি এক্ষেত্রে সেটা করবেন?!
Comments
ব্যাংক বদল!
রাজউকের চিঠিতে নতুন ব্যাংকের (জনতা) ঠিকানা দেয়া হয়েছে। অন্যরাও কি তাই পেয়েছেন, নাকি এটা একটা স্ক্যাম মেইল। রাজউকে যোগাযোগ করার কঠিন রাস্তায় যেতে চাচ্ছি না। কেউ জানেন কিছু। আর টাকার সংখ্যাতেও প্রশ্ন জাগছে।
রাজউকে এবছর জমি পেয়েছেন দয়া করে আমাকে একটা ইমেইল দিবেন?
অতি সত্যি কথা। আমি রাজউক এর বিষয় নিয়ে খুবই ঝামেলার মধ্যে পরে গেছি। টাকা পাঠানোর বিষয়টাতেও গলদ আছে। কেউ/যারা রাজউকে এবছর জমি পেয়েছেন দয়া করে আমাকে একটা ইমেইল দিবেন? আমার কিছু তথ্য/সাহায্য দরকার। রাজউকে যোগাযোগ করে আমি হতাশ। প্লীজ আমকে ইমেইল দিন shovon.sweden ..... @gmail.com এ। ভাই এ লেখাটি লেখার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। রাজউক আলাদা করে চিঠি দিয়ে যে ভন্ডামীর আশ্রয় নিয়েছে তা উচিৎ হয়নি। আমাদের কি উচিৎ এখন?